অবরুদ্ধ দুর্গ, কাটা জিহ্বা এবং রাষ্ট্রীয় হরতাল
সি রা জু র র হ মা ন
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
আগের দিনে দেশে দেশে যুদ্ধ অনেক বেশি হতো। এক দেশ অন্য দেশকে আক্রমণ করত। আক্রান্ত দেশ সীমান্তে বাধা দিত আক্রমণকারী দেশকে। যে দেশ হেরে যেত তারা পিছোতে পিছোতে নিজেদের দুর্গে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দিত। প্রতিপক্ষ সে দুর্গ অবরোধ করে রাখত। তাদের রণকৌশল হতো সাধারণত এ রকম : কতকাল দুর্গে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে? একদিন না একদিন বেরিয়ে আসতেই হবে। নয়তো না খেয়ে কিংবা প্লেগের উপদ্রবে মারা যাবে।
বাংলাদেশে হয়েছে সে রকম অবস্থা। সরকার এখন গণদুশমন হয়ে গেছে। দেশের মানুষ তাদের আর বরদাশত করতে রাজি নয়। তাড়া খেয়ে খেয়ে তারা এখন ঢাকার দুর্গে ঢুকেছে। রাজধানীর বাইরে গিয়ে জাতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই তাদের। সেখানে এখন খালেদা জিয়ার বিচরণ ক্ষেত্র। গত শুকবার নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত কলামে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম—এ কাজটাই সরকার করবে। তাতে অবশ্যি কেরামতি কিছু ছিল না। বেশ কিছুকাল থেকে সেটাই তারা করে আসছে।
দেশের মানুষ আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদ করতে চাইলে আগে তারা বাধা দিত। বিএনপি এবং অন্য বিরোধী দলগুলোকে তারা সভা-সমাবেশ করতে দেবে না, মিছিল করতেও দেবে না, বিএনপির নেতানেত্রীদের নিজেদের সদর দফতরে তালাবদ্ধ করে আর পুলিশ পরিবেষ্টিত করে রাখবে, তাতেও সামাল দেয়া না গেলে দরজা-জানালা ভেঙে বিএনপির অফিসে পুলিশ পাঠাবে, তারা বোমা নিয়ে গিয়ে গিয়ে বিএনপির অফিসে লুকিয়ে রাখবে, তারপর ‘তল্লাশি করে’ সে বোমা খুঁজে বের করবে এবং ‘বোমা রাখার দায়ে’ নেতাদের পাইকারি হারে গ্রেফতার করবে। এই হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের স্টাইল।
একাত্তরে পাকিস্তানিরা ৯৩ হাজার সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারেনি। শেষ রক্ষার আশায় তারা রাজাকার, আলবদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটি নামে অনেকগুলো ঘাতক গোষ্ঠী গঠন করেছিল। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অনেকে অনিচ্ছায় এসব ঘাতক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। তখন শুনেছিলাম অনেক হিন্দুও এসব গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল। তাদের কারণ ছিল দুটো। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেউ কেউ যোগ দিয়েছিল। তাছাড়া সে সময়ের গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে কাতর অনেক বেকার যুবকও এসব ঘাতক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
পাকিস্তানিদের শেষাবস্থার মতো দুর্দিন এখন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের। বিশ্বাস হচ্ছে না? নাভিশ্বাস না উঠে থাকলে কেন তারা সমাজের সবচাইতে ওছা লোকগুলোকে নিয়ে শাহবাগে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেবে? আর কী সব চিজ আছে শাহবাগে! আওয়ামী লীগের চরণামৃত খেয়ে স্বল্প পানির পুঁটি মাছের মতো তড়পান ঘাদানিকের স্বনিয়োজিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয় হলে তিনি পালিয়ে গেলেন পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে বঙ্গভূমি আন্দোলন ইত্যাদি যুক্ত বাংলার বেপারীদের সঙ্গে দহরম-মহরম করলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা হিন্দুদের ওপর জুলুম করছে বলে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে তাদের সহানুভূতির উদ্রেক করে খোরপোষের ব্যবস্থা করে নিলেন। সেই শাহরিয়ার কবির এখন শাহবাগের অন্যতম প্রধান পাণ্ডা এবং শেখ হাসিনার সরকারের প্রধান মুখপাত্র।
রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি নাকি সাধারণ মানুষের দুর্বল। কিন্তু বিগত সোয়া চার বছরে প্রায় দিনই পত্রিকায় যেসব খবর তারা পড়েছে সেগুলোর কিছু কিছুও অন্তত সবার মনে থাকার কথা। ছাত্রলীগের গুণ্ডারা ঢাকার শাঁখারি বাজারে আর সূত্রাপুরে এবং দেশের অন্যত্র হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। [কালো বিড়াল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দখলে হিন্দুদের বহু একর অর্পিত সম্পত্তি আছে বলেও শুনেছি।] দেশজোড়া খুন-খারাবি, ভর্তি ও টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে তথাকথিত ছাত্রলীগের ‘পারদর্শিতা’ তো সবার চোখের সামনে অহরহ ঘটছে। ঢাকায় বিশ্বজিত্ আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের হিন্দু ছাত্রকে খুন ছাত্রলীগের গুণ্ডারাই করেছে। অতি সম্প্রতি আবার চাঁদার দাবিতে তারা বিভিন্ন জেলায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভাংচুর করেছে। ছাত্রলীগের গুণ্ডারা হচ্ছে শাহবাগের আরেকটি উপাদান।
ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা
তৃতীয় উপাদান হচ্ছে জনাকয়েক ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক ব্লগার। এদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে দেশজোড়া যে প্রতিবাদ ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছে, অঙ্কুরেই তার বিনাশ ঘটানোর ব্যর্থ আশায় সরকার একটা গণহত্যা চালিয়ে ১৮০ জন ঈমানদার বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে এই ধর্মদ্রোহী ও জাতিদ্রোহীদের জন্য সরকার তিন স্তরের পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী এই হীনমন্য ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতেই হেফাজতে ইসলাম গণআন্দোলন ৬ এপ্রিল শনিবার ঢাকায় লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
এ সরকার তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কতগুলো অসাধু পন্থায় এই দেশজোড়া প্রতিবাদকে ভণ্ডুল করে দেয়ার প্রয়াস পায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্রোধের তীব্রতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে নানা ইতস্তত করার পর তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয় যে তিনজন ধর্মদ্রোহী ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে জানা গেছে, তাদের দু’জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অবশিষ্টজনকেও যে কোনোদিন চুপিসারে ছেড়ে দেয়া হবে। ঢাকঢোল পিটিয়ে আরও প্রচার করা হয় যে, সরকার কওমি মাদরাসাগুলোর সনদ অনুমোদনের কথা বিবেচনা করবে।
সরকারের দু’মুখো নীতি
কিন্তু ভেতরে ভেতরে নানা নামে ভুঁইফোড় ওলামা দল গঠন করে হেফাজতে ইসলামের প্রতি দেশবাসীর সমর্থন নষ্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে সরকার। আমার মনে আছে, ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার পাকিস্তান সৃষ্টির প্রশ্নে গণভোটের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে পাকিস্তানের প্রতি ভারতীয় মুসলমানদের মতামতকে বিরূপ ও বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নিখিল ভারত কংগ্রেস একাধিক ভুঁইফোড় জাতীয়তাবাদী মুসলিম সংস্থা গঠন করেছিল। তারা যেমন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকারও সে রকমই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়। এ সরকার এক শ্রেণীর সরিসৃপের মতো কাটা জিহ্বা দিয়ে কথা বলে। তারা বলে এক কথা আর করে অন্য কিছু। তাদের গুণ্ডারা মানুষ খুন করে আর সরকার দোষ দেয় জামায়াত-শিবির আর বিএনপিকে।
শেষ চেষ্টা হিসেবে সরকার তাদের ‘অবরুদ্ধ দুর্গ’ নীতি গ্রহণ করে। শাহবাগে তাদের দালালদের দিয়ে ৫ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করানো হয়। মজার ব্যাপার এই যে, যখন জানা গেল ৫ এপ্রিল জুমার নামাজের পরই চট্টগ্রাম থেকে লংমার্চ ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে তখন চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, চট্টগ্রামে সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে বিকাল ৩টা থেকে হরতাল শুরু হবে। চট্টগ্রামে মার্চকারীদের পরিবহনের জন্য আগাম টাকা দিয়ে বহু বাস ভাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের চাপে বাস মালিকরা ভাড়ার টাকা ফেরত দিয়ে বাস চলাচল বন্ধ রাখে।
এক-দুয়ে আরও খবর আসে যে, দেশের সব জেলা থেকে ঢাকায় বাস চলাচল সরকারের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছে। আরও খবর আসতে থাকে, একইভাবে দেশের সব জেলা থেকে ঢাকাগামী মোটর লঞ্চগুলো ঘাটে বাঁধা রয়েছে এবং ‘নিরাপত্তার’ দোহাই দিয়ে সরকার ঢাকার সঙ্গে দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ অবশেষে পায়ে হেঁটে ঢাকার সমাবেশে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সরকারের পুলিশ আর আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা বহু স্থানে তাদের বাধা দেয়। কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গুণ্ডারা পদযাত্রীদের ওপর হামলা করে বহু লোককে জখম করেছে বলেও খবর এসেছে।
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বহু লোক পায়ে হেঁটে ঢাকা পৌঁছেছেন। বৃহত্তর ঢাকা এবং নিকটবর্তী এলাকা থেকে পদব্রজে এসেছেন হাজার হাজার। প্রমাণ হলো যে সরকারের দুর্গের ভেতরেও অজস্র শহুরে মানুষ তাদের বিরুদ্ধে এবং তাদের পতন কামনা করে। শাপলা চত্বরের চারদিকের কয়েক বর্গমাইল এলাকা জনতার মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। কোনো কোনো বিদেশি মিডিয়া জনতার সংখ্যা তিন মিলিয়ন (ত্রিশ লাখ) বলে উল্লেখ করেছে। ঢাকা থেকে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষক আমাকে বলেছেন, সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, এতবড় জনসভা বাংলাদেশে আগে আর হয়নি। পথে পথে পুলিশ ও আওয়ামী গুণ্ডারা যাদের বাধা দিয়েছে, বাস আর লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সরকার যাদের আসতে দেয়নি, নদী পার হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়ার কারণে যারা আসতে পারেনি, আর চট্টগ্রামে যে লক্ষাধিক মানুষ ২৪ ঘণ্টার অবস্থান করেছিল, তাদের সবাইকে আসতে দিলে শাপলা চত্বরে গত শনিবার নিঃসন্দেহে দেড় কোটি-দুই কোটি লোক জমায়েত হতো।
হেফাজতে ইসলাম বলেছিল, সরকারের বৈরী এবং আগ্রাসী নীতি থেকে ইসলামকে রক্ষার দাবি সোচ্চার করে দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য, কোনো ধরনের শান্তি ভঙ্গ করা নয়। সরকারও দেখেছিল এই জনসমুদ্রের বিরুদ্ধে তাদের পুলিশ আর তাদের বিজিবি খড়কুটোর মতোই অসহায় হবে। তাই তারা সমাবেশে বাধা দেয়নি। ফলে শাপলা চত্বর কিংবা পরিপার্শ্বে কোনো শান্তি ভঙ্গ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর হেফাজতে ইসলামকে সেজন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন। কিন্তু ‘স্বভাব যায় না মলে’। হাতির পায়ে পিঁপড়ের কামড়ের মতো শাহবাগিরা এখানে-সেখানে ‘ইনসেডেন্ট’ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। জনতার ধাওয়া খেয়ে শাহরিয়ার কবির আর মুন্তাসীর মামুনকে পালিয়ে নাপিতের দোকানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে এখানে-সেখানে ছাত্রলীগের গোলমাল সৃষ্টির চেষ্টারও।
ব্যাকল্যাশ ওদের হাতের বাইরে চলে গেছে
কিন্তু কে কী পেল শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে? ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ খুশি ছিল। তাদের নিজেদের ধর্মে বাধা দেয়া না হলে অন্যের ধর্ম নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা দেখা দিয়েছে বর্তমান সরকারের শুরু থেকে। নিজেদের পরিকল্পিত রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচিতে অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে তারা প্রশাসনিক ও শান্তিরক্ষী বাহিনীগুলোর নির্বাহী পদে ব্যাপক হারে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের মনস্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যাপক ইসলামবিরোধী কর্মসূচি নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসের সময় থেকে ইসলামবিরোধী একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতা লাভের পেছনে ওয়াশিংটন আর দিল্লির অত্যন্ত লক্ষণীয় এবং দৃষ্টিকটু ভূমিকা ছিল। মার্কিনিদের খুশি করার জন্য বর্তমান সরকার গোড়া থেকেই সন্ত্রাসী অপবাদ দিয়ে নিরীহ মুসলমানদের ধরপাকড় চালায়। ভারতে একটা ভুল ধারণা আছে যে, জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবেই বাংলাদেশের জনসাধারণ ভারতকে করিডোর এবং বন্দর ব্যবহারের সুযোগদানের বিরোধী। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালের জুলাই মাসে সেটা স্পষ্ট করেই বলেছেন। দিল্লির মনস্তুষ্টি এবং স্বদেশে নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দুর্বল করার আশায় সরকার গোড়া থেকেই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে দলন নীতি শুরু করে।
উভয় লক্ষ্যেই টুপি ও দাড়ি পরিহিত এবং মসজিদের জামাতে শরিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হয়রানি ও নিপীড়ন চালানো হয়। কয়েক হাজার নিরীহ মুসলমান এখন শেখ হাসিনার সরকারের কারাগারে নির্যাতন সহ্য করছেন। যুদ্ধাপরাধের আধা-খ্যাঁচড়া বিচারও শুরু হয়েছিল জামায়াতকে অপবাদ দেয়া এবং জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ফাটল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। এই বিচার প্রক্রিয়ার বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি দেশি ও বিদেশি আইন বিশেষজ্ঞরা ধরিয়ে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দণ্ড না দেয়ায় সরকার ক্রুদ্ধ হয়েছিল।
বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে (হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যে উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গজারি কাঠের লাঠিধারীদের নিয়ে মিছিল করেছিলেন) অপাঙক্তেয় প্রকৃতির কিছু লোককে নিয়ে শাহবাগে একটা দঙ্গল সৃষ্টি করা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, বোতলের দানব এখন আর বোতলে ফিরে যেতে রাজি নয়। তারা একে একে তাদের দাবির সুর চড়া করছে, সরকারের কাঁধে চেপে বসেছে। ‘কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দাও’ থেকে শুরু করে ‘শিবির ধরো জবাই করো’, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জের ধরে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করো ইত্যাদি নিত্য-নতুন দাবি তুলছে তারা, সরকারকে আলটিমেটাম দিচ্ছে।
এই অশুভ শক্তিকে সরকার এতদিন গণদাবির প্রতিভূ বলে জাহির করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম আর শাপলা চত্বর প্রমাণ করেছে কে জনতা আর কী গণদাবি—এই সরকার এখনও চিনতে পারেনি। আগেই বলেছি, শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু তারা ঘোষণা করেছে তারা আর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি নয়। কোনো কোনো বক্তা সমাবেশে দাবি করেছেন যে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র করতে হবে। শেখ হাসিনার সরকারের ধ্বংসাত্মক বৈষম্য ও দমননীতির ‘ব্যাকল্যাশের’ সম্পূর্ণ উল্টো ফল ফলছে। এই ইসলামী জাগরণকে নির্যাতন দিয়ে দমন করা যাবে না। আরও বাড়াবাড়ি করা হলে ফলাফল এই প্রধানমন্ত্রী আর এই সরকারের জন্য ভয়াবহ হবে।
দালাল মিডিয়া, ন্যক্কারজনক ভূমিকা
বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মিডিয়ার ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক। আমি সারা কর্মজীবন কাটিয়েছি মিডিয়ায়। এদের আচরণে আমি ভয়ানক লজ্জা বোধ করছি। তারা স্থির করেছিল চোখ বন্ধ করে থাকলে বিশ্বের কোথাও কিছু ঘটবে না। প্রথম আলোসহ কোনো কোনো পত্রিকার খবর থেকে মনে হতে পারত যে, শনিবার ৬ এপ্রিল শাপলা চত্বরের চাইতেও বড় সমাবেশ হয়েছিল শাহবাগের তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চে। কিন্তু সরকারের দালাল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও যা দেখেছি তার থেকে মনে হয়, শাহবাগে পাঁচ কিংবা ছয়শ’র বেশি লোক ছিল না। একমাত্র দিগন্ত টেলিভিশন ছাড়া আর কোনো চ্যানেল সরাসরি শাপলা চত্বরের সমাবেশ সম্প্রচার করেনি। কিন্তু দেশের মানুষ ঠিকই জানে ওই চত্বরে কত লোক হয়েছিল, কী ঘটেছিল। এই ঐতিহাসিক সমাবেশকে ব্ল্যাকআউট করতে গিয়ে তারা নিজেদের মুখেই কালিমা লেপন করেছে।
কিন্তু বিদেশিরা ঠিকই জানতে পেরেছে শাপলা চত্বরে কী হয়েছিল এবং বাংলাদেশের জনগণ কোন পক্ষে আছে। দিল্লিতে আর ওয়াশিংটনে নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে শাপলা চত্বরের সমাবেশ আর হেফাজতে ইসলামের সার্বজনীন জনপ্রিয়তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হবে। এরপরও শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেলে পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হবে।
সহৃদয় পাঠকদের প্রতি : বহু পাঠক ই-মেইলে জানিয়েছেন, আমার স্মৃতিকথা এক জীবন এক ইতিহাস বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনে খুশি হবেন যে, বইখানির পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ ৯ এপ্রিল প্রকাশিত হবে। পাওয়া যাবে ঐতিহ্য, ৬৮-৬৯ প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ঠিকানায়।
(লন্ডন, ০৭.০৪.১৩)
serajurrahman34@gmail.com
বাংলাদেশে হয়েছে সে রকম অবস্থা। সরকার এখন গণদুশমন হয়ে গেছে। দেশের মানুষ তাদের আর বরদাশত করতে রাজি নয়। তাড়া খেয়ে খেয়ে তারা এখন ঢাকার দুর্গে ঢুকেছে। রাজধানীর বাইরে গিয়ে জাতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই তাদের। সেখানে এখন খালেদা জিয়ার বিচরণ ক্ষেত্র। গত শুকবার নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত কলামে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম—এ কাজটাই সরকার করবে। তাতে অবশ্যি কেরামতি কিছু ছিল না। বেশ কিছুকাল থেকে সেটাই তারা করে আসছে।
দেশের মানুষ আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদ করতে চাইলে আগে তারা বাধা দিত। বিএনপি এবং অন্য বিরোধী দলগুলোকে তারা সভা-সমাবেশ করতে দেবে না, মিছিল করতেও দেবে না, বিএনপির নেতানেত্রীদের নিজেদের সদর দফতরে তালাবদ্ধ করে আর পুলিশ পরিবেষ্টিত করে রাখবে, তাতেও সামাল দেয়া না গেলে দরজা-জানালা ভেঙে বিএনপির অফিসে পুলিশ পাঠাবে, তারা বোমা নিয়ে গিয়ে গিয়ে বিএনপির অফিসে লুকিয়ে রাখবে, তারপর ‘তল্লাশি করে’ সে বোমা খুঁজে বের করবে এবং ‘বোমা রাখার দায়ে’ নেতাদের পাইকারি হারে গ্রেফতার করবে। এই হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের স্টাইল।
একাত্তরে পাকিস্তানিরা ৯৩ হাজার সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারেনি। শেষ রক্ষার আশায় তারা রাজাকার, আলবদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটি নামে অনেকগুলো ঘাতক গোষ্ঠী গঠন করেছিল। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অনেকে অনিচ্ছায় এসব ঘাতক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। তখন শুনেছিলাম অনেক হিন্দুও এসব গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল। তাদের কারণ ছিল দুটো। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেউ কেউ যোগ দিয়েছিল। তাছাড়া সে সময়ের গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে কাতর অনেক বেকার যুবকও এসব ঘাতক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
পাকিস্তানিদের শেষাবস্থার মতো দুর্দিন এখন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের। বিশ্বাস হচ্ছে না? নাভিশ্বাস না উঠে থাকলে কেন তারা সমাজের সবচাইতে ওছা লোকগুলোকে নিয়ে শাহবাগে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেবে? আর কী সব চিজ আছে শাহবাগে! আওয়ামী লীগের চরণামৃত খেয়ে স্বল্প পানির পুঁটি মাছের মতো তড়পান ঘাদানিকের স্বনিয়োজিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয় হলে তিনি পালিয়ে গেলেন পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে বঙ্গভূমি আন্দোলন ইত্যাদি যুক্ত বাংলার বেপারীদের সঙ্গে দহরম-মহরম করলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা হিন্দুদের ওপর জুলুম করছে বলে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে তাদের সহানুভূতির উদ্রেক করে খোরপোষের ব্যবস্থা করে নিলেন। সেই শাহরিয়ার কবির এখন শাহবাগের অন্যতম প্রধান পাণ্ডা এবং শেখ হাসিনার সরকারের প্রধান মুখপাত্র।
রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি নাকি সাধারণ মানুষের দুর্বল। কিন্তু বিগত সোয়া চার বছরে প্রায় দিনই পত্রিকায় যেসব খবর তারা পড়েছে সেগুলোর কিছু কিছুও অন্তত সবার মনে থাকার কথা। ছাত্রলীগের গুণ্ডারা ঢাকার শাঁখারি বাজারে আর সূত্রাপুরে এবং দেশের অন্যত্র হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। [কালো বিড়াল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দখলে হিন্দুদের বহু একর অর্পিত সম্পত্তি আছে বলেও শুনেছি।] দেশজোড়া খুন-খারাবি, ভর্তি ও টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে তথাকথিত ছাত্রলীগের ‘পারদর্শিতা’ তো সবার চোখের সামনে অহরহ ঘটছে। ঢাকায় বিশ্বজিত্ আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের হিন্দু ছাত্রকে খুন ছাত্রলীগের গুণ্ডারাই করেছে। অতি সম্প্রতি আবার চাঁদার দাবিতে তারা বিভিন্ন জেলায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভাংচুর করেছে। ছাত্রলীগের গুণ্ডারা হচ্ছে শাহবাগের আরেকটি উপাদান।
ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা
তৃতীয় উপাদান হচ্ছে জনাকয়েক ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক ব্লগার। এদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে দেশজোড়া যে প্রতিবাদ ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছে, অঙ্কুরেই তার বিনাশ ঘটানোর ব্যর্থ আশায় সরকার একটা গণহত্যা চালিয়ে ১৮০ জন ঈমানদার বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে এই ধর্মদ্রোহী ও জাতিদ্রোহীদের জন্য সরকার তিন স্তরের পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী এই হীনমন্য ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতেই হেফাজতে ইসলাম গণআন্দোলন ৬ এপ্রিল শনিবার ঢাকায় লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
এ সরকার তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কতগুলো অসাধু পন্থায় এই দেশজোড়া প্রতিবাদকে ভণ্ডুল করে দেয়ার প্রয়াস পায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্রোধের তীব্রতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে নানা ইতস্তত করার পর তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয় যে তিনজন ধর্মদ্রোহী ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে জানা গেছে, তাদের দু’জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অবশিষ্টজনকেও যে কোনোদিন চুপিসারে ছেড়ে দেয়া হবে। ঢাকঢোল পিটিয়ে আরও প্রচার করা হয় যে, সরকার কওমি মাদরাসাগুলোর সনদ অনুমোদনের কথা বিবেচনা করবে।
সরকারের দু’মুখো নীতি
কিন্তু ভেতরে ভেতরে নানা নামে ভুঁইফোড় ওলামা দল গঠন করে হেফাজতে ইসলামের প্রতি দেশবাসীর সমর্থন নষ্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে সরকার। আমার মনে আছে, ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার পাকিস্তান সৃষ্টির প্রশ্নে গণভোটের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে পাকিস্তানের প্রতি ভারতীয় মুসলমানদের মতামতকে বিরূপ ও বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নিখিল ভারত কংগ্রেস একাধিক ভুঁইফোড় জাতীয়তাবাদী মুসলিম সংস্থা গঠন করেছিল। তারা যেমন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকারও সে রকমই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়। এ সরকার এক শ্রেণীর সরিসৃপের মতো কাটা জিহ্বা দিয়ে কথা বলে। তারা বলে এক কথা আর করে অন্য কিছু। তাদের গুণ্ডারা মানুষ খুন করে আর সরকার দোষ দেয় জামায়াত-শিবির আর বিএনপিকে।
শেষ চেষ্টা হিসেবে সরকার তাদের ‘অবরুদ্ধ দুর্গ’ নীতি গ্রহণ করে। শাহবাগে তাদের দালালদের দিয়ে ৫ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করানো হয়। মজার ব্যাপার এই যে, যখন জানা গেল ৫ এপ্রিল জুমার নামাজের পরই চট্টগ্রাম থেকে লংমার্চ ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে তখন চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, চট্টগ্রামে সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে বিকাল ৩টা থেকে হরতাল শুরু হবে। চট্টগ্রামে মার্চকারীদের পরিবহনের জন্য আগাম টাকা দিয়ে বহু বাস ভাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের চাপে বাস মালিকরা ভাড়ার টাকা ফেরত দিয়ে বাস চলাচল বন্ধ রাখে।
এক-দুয়ে আরও খবর আসে যে, দেশের সব জেলা থেকে ঢাকায় বাস চলাচল সরকারের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছে। আরও খবর আসতে থাকে, একইভাবে দেশের সব জেলা থেকে ঢাকাগামী মোটর লঞ্চগুলো ঘাটে বাঁধা রয়েছে এবং ‘নিরাপত্তার’ দোহাই দিয়ে সরকার ঢাকার সঙ্গে দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ অবশেষে পায়ে হেঁটে ঢাকার সমাবেশে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সরকারের পুলিশ আর আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা বহু স্থানে তাদের বাধা দেয়। কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গুণ্ডারা পদযাত্রীদের ওপর হামলা করে বহু লোককে জখম করেছে বলেও খবর এসেছে।
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বহু লোক পায়ে হেঁটে ঢাকা পৌঁছেছেন। বৃহত্তর ঢাকা এবং নিকটবর্তী এলাকা থেকে পদব্রজে এসেছেন হাজার হাজার। প্রমাণ হলো যে সরকারের দুর্গের ভেতরেও অজস্র শহুরে মানুষ তাদের বিরুদ্ধে এবং তাদের পতন কামনা করে। শাপলা চত্বরের চারদিকের কয়েক বর্গমাইল এলাকা জনতার মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। কোনো কোনো বিদেশি মিডিয়া জনতার সংখ্যা তিন মিলিয়ন (ত্রিশ লাখ) বলে উল্লেখ করেছে। ঢাকা থেকে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষক আমাকে বলেছেন, সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, এতবড় জনসভা বাংলাদেশে আগে আর হয়নি। পথে পথে পুলিশ ও আওয়ামী গুণ্ডারা যাদের বাধা দিয়েছে, বাস আর লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সরকার যাদের আসতে দেয়নি, নদী পার হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়ার কারণে যারা আসতে পারেনি, আর চট্টগ্রামে যে লক্ষাধিক মানুষ ২৪ ঘণ্টার অবস্থান করেছিল, তাদের সবাইকে আসতে দিলে শাপলা চত্বরে গত শনিবার নিঃসন্দেহে দেড় কোটি-দুই কোটি লোক জমায়েত হতো।
হেফাজতে ইসলাম বলেছিল, সরকারের বৈরী এবং আগ্রাসী নীতি থেকে ইসলামকে রক্ষার দাবি সোচ্চার করে দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য, কোনো ধরনের শান্তি ভঙ্গ করা নয়। সরকারও দেখেছিল এই জনসমুদ্রের বিরুদ্ধে তাদের পুলিশ আর তাদের বিজিবি খড়কুটোর মতোই অসহায় হবে। তাই তারা সমাবেশে বাধা দেয়নি। ফলে শাপলা চত্বর কিংবা পরিপার্শ্বে কোনো শান্তি ভঙ্গ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর হেফাজতে ইসলামকে সেজন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন। কিন্তু ‘স্বভাব যায় না মলে’। হাতির পায়ে পিঁপড়ের কামড়ের মতো শাহবাগিরা এখানে-সেখানে ‘ইনসেডেন্ট’ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। জনতার ধাওয়া খেয়ে শাহরিয়ার কবির আর মুন্তাসীর মামুনকে পালিয়ে নাপিতের দোকানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে এখানে-সেখানে ছাত্রলীগের গোলমাল সৃষ্টির চেষ্টারও।
ব্যাকল্যাশ ওদের হাতের বাইরে চলে গেছে
কিন্তু কে কী পেল শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে? ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ খুশি ছিল। তাদের নিজেদের ধর্মে বাধা দেয়া না হলে অন্যের ধর্ম নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা দেখা দিয়েছে বর্তমান সরকারের শুরু থেকে। নিজেদের পরিকল্পিত রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচিতে অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে তারা প্রশাসনিক ও শান্তিরক্ষী বাহিনীগুলোর নির্বাহী পদে ব্যাপক হারে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের মনস্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যাপক ইসলামবিরোধী কর্মসূচি নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসের সময় থেকে ইসলামবিরোধী একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতা লাভের পেছনে ওয়াশিংটন আর দিল্লির অত্যন্ত লক্ষণীয় এবং দৃষ্টিকটু ভূমিকা ছিল। মার্কিনিদের খুশি করার জন্য বর্তমান সরকার গোড়া থেকেই সন্ত্রাসী অপবাদ দিয়ে নিরীহ মুসলমানদের ধরপাকড় চালায়। ভারতে একটা ভুল ধারণা আছে যে, জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবেই বাংলাদেশের জনসাধারণ ভারতকে করিডোর এবং বন্দর ব্যবহারের সুযোগদানের বিরোধী। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালের জুলাই মাসে সেটা স্পষ্ট করেই বলেছেন। দিল্লির মনস্তুষ্টি এবং স্বদেশে নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দুর্বল করার আশায় সরকার গোড়া থেকেই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে দলন নীতি শুরু করে।
উভয় লক্ষ্যেই টুপি ও দাড়ি পরিহিত এবং মসজিদের জামাতে শরিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হয়রানি ও নিপীড়ন চালানো হয়। কয়েক হাজার নিরীহ মুসলমান এখন শেখ হাসিনার সরকারের কারাগারে নির্যাতন সহ্য করছেন। যুদ্ধাপরাধের আধা-খ্যাঁচড়া বিচারও শুরু হয়েছিল জামায়াতকে অপবাদ দেয়া এবং জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ফাটল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। এই বিচার প্রক্রিয়ার বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি দেশি ও বিদেশি আইন বিশেষজ্ঞরা ধরিয়ে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দণ্ড না দেয়ায় সরকার ক্রুদ্ধ হয়েছিল।
বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে (হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যে উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গজারি কাঠের লাঠিধারীদের নিয়ে মিছিল করেছিলেন) অপাঙক্তেয় প্রকৃতির কিছু লোককে নিয়ে শাহবাগে একটা দঙ্গল সৃষ্টি করা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, বোতলের দানব এখন আর বোতলে ফিরে যেতে রাজি নয়। তারা একে একে তাদের দাবির সুর চড়া করছে, সরকারের কাঁধে চেপে বসেছে। ‘কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দাও’ থেকে শুরু করে ‘শিবির ধরো জবাই করো’, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জের ধরে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করো ইত্যাদি নিত্য-নতুন দাবি তুলছে তারা, সরকারকে আলটিমেটাম দিচ্ছে।
এই অশুভ শক্তিকে সরকার এতদিন গণদাবির প্রতিভূ বলে জাহির করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম আর শাপলা চত্বর প্রমাণ করেছে কে জনতা আর কী গণদাবি—এই সরকার এখনও চিনতে পারেনি। আগেই বলেছি, শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু তারা ঘোষণা করেছে তারা আর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি নয়। কোনো কোনো বক্তা সমাবেশে দাবি করেছেন যে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র করতে হবে। শেখ হাসিনার সরকারের ধ্বংসাত্মক বৈষম্য ও দমননীতির ‘ব্যাকল্যাশের’ সম্পূর্ণ উল্টো ফল ফলছে। এই ইসলামী জাগরণকে নির্যাতন দিয়ে দমন করা যাবে না। আরও বাড়াবাড়ি করা হলে ফলাফল এই প্রধানমন্ত্রী আর এই সরকারের জন্য ভয়াবহ হবে।
দালাল মিডিয়া, ন্যক্কারজনক ভূমিকা
বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মিডিয়ার ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক। আমি সারা কর্মজীবন কাটিয়েছি মিডিয়ায়। এদের আচরণে আমি ভয়ানক লজ্জা বোধ করছি। তারা স্থির করেছিল চোখ বন্ধ করে থাকলে বিশ্বের কোথাও কিছু ঘটবে না। প্রথম আলোসহ কোনো কোনো পত্রিকার খবর থেকে মনে হতে পারত যে, শনিবার ৬ এপ্রিল শাপলা চত্বরের চাইতেও বড় সমাবেশ হয়েছিল শাহবাগের তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চে। কিন্তু সরকারের দালাল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও যা দেখেছি তার থেকে মনে হয়, শাহবাগে পাঁচ কিংবা ছয়শ’র বেশি লোক ছিল না। একমাত্র দিগন্ত টেলিভিশন ছাড়া আর কোনো চ্যানেল সরাসরি শাপলা চত্বরের সমাবেশ সম্প্রচার করেনি। কিন্তু দেশের মানুষ ঠিকই জানে ওই চত্বরে কত লোক হয়েছিল, কী ঘটেছিল। এই ঐতিহাসিক সমাবেশকে ব্ল্যাকআউট করতে গিয়ে তারা নিজেদের মুখেই কালিমা লেপন করেছে।
কিন্তু বিদেশিরা ঠিকই জানতে পেরেছে শাপলা চত্বরে কী হয়েছিল এবং বাংলাদেশের জনগণ কোন পক্ষে আছে। দিল্লিতে আর ওয়াশিংটনে নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে শাপলা চত্বরের সমাবেশ আর হেফাজতে ইসলামের সার্বজনীন জনপ্রিয়তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হবে। এরপরও শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেলে পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হবে।
সহৃদয় পাঠকদের প্রতি : বহু পাঠক ই-মেইলে জানিয়েছেন, আমার স্মৃতিকথা এক জীবন এক ইতিহাস বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনে খুশি হবেন যে, বইখানির পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ ৯ এপ্রিল প্রকাশিত হবে। পাওয়া যাবে ঐতিহ্য, ৬৮-৬৯ প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ঠিকানায়।
(লন্ডন, ০৭.০৪.১৩)
serajurrahman34@gmail.com
Comments