সাভার ট্র্যাজেডি : নিহত আড়াইশ’র মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীশ্রমিক



এরশাদুল বারী
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘটনা ‘রানা প্লাজা’ ধসে নিহত ২৫০ জনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী শ্রমিক। এরা সবাই অসহায় দিনমজুর পরিবারের কারও স্ত্রী, বোন, মা কিংবা আত্মীয়-স্বজন। নিহতের অনেকেই ছিলেন নববধূ, অন্তঃসত্ত্বা এবং যুবতী। এমনকি আটকেপড়া ওই ভবনের ভেতরেই সন্তান প্রসব করেছে দুই নারী। গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টা পর্যন্ত ২৩৫টি লাশের সংখ্যা তালিকাভুক্ত করে সাভার থানা পুলিশ। এর মধ্যে হস্তান্তর করা হয় ১৭১ জনের লাশ। এদের মধ্যে নারী শ্রমিক ৮৮ জন ও পুরুষ ৮৩ জন। বাকি ৬৪ জনের লাশ অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়েছে। অজ্ঞাত ৬৪ জনের মধ্যে ৩৮ জন নারী এবং ২৬ জন পুরুষ। এ নিয়ে মোট নারী শ্রমিকের লাশ উদ্ধার হয়েছে ১২৬ জনের। পরে উদ্ধারকৃত ১৫ লাশের কতজন নারী তা জানা যায়নি। নিহত নারী শ্রমিকের অধিকাংশই এসেছিলেন গ্রামের খেটে খাওয়া অসহায় পরিবার থেকে। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে অজানা বিপদ জেনেও শহরে এসেছিলেন তারা। একেবারেই সামান্য বেতন-ভাতায় দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন এসব নারী। মাস শেষে সামান্য যে অর্থকড়ি পেতেন, তা দিয়ে পুরো পরিবার না চললেও পরিবারের চাহিদার মোটামুটি অংশেরই জোগান দিতেন এসব অসহায় নারী। অনেকেই ছিলেন যারা স্বামী-স্ত্রী মিলেই ওই গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতেন। ভবন ধসের পর কৌশল খাটিয়ে পুরুষ কর্মীদের অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারলেও অবলা এসব নারীর কেউ দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে কিংবা আটকে পড়ে আর বেরিয়ে আসতে পারেননি।
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, ধসেপড়া রানা প্লাজায় পোশাক কারখানার পাঁচটি ইউনিট ছিল। এতে ৩ হাজার ১২২ শ্রমিক কাজ করতেন। তবে এলাকাবাসী ও জীবিত উদ্ধার হওয়া গার্মেন্টকর্মীদের তথ্যমতে, ওই ভবনে মানুষের সংখ্যা ছিল ৫ হাজারেরও বেশি। এদের অধিকাংশই ছিলেন নারী শ্রমিক। তাছাড়া ৯ তলা ওই ভবনে পাঁচটি গার্মেন্ট কারখানা ছাড়াও দ্বিতীয় ও নিচতলায় মার্কেট এবং ব্যাংকও ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ছুটি ঘোষণার পরও জোর করে কারখানায় আসতে বাধ্য করে ওইদিন মূলত ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানার নেতৃত্বে হরতালবিরোধী মিছিল এবং ২৭ এপ্রিল নারী সমাবেশ উপলক্ষে তাদের ভবনের ভেতরে নারী সমাবেশের স্লোগান ও আনুষঙ্গিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল।
বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, রানা প্লাজার তিন থেকে সাততলা পর্যন্ত গার্মেন্ট কারখানার পাঁচটি ইউনিট ছিল। এতে ৩ হাজার ১২২ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে ইথারটেক্স লিমিটেডে ৩৭৭ জন, নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডে ৫২৬ জন, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে ১ হাজার ৭৩ জন, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডে ৭৩৯ জন এবং ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেডে ৪০৭ জন শ্রমিক কাজ করতেন।
গতকাল রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ২৫০টি লাশের মধ্যে প্রায় ২০০ জনের লাশ শনাক্ত করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী শনাক্ত করতে না পারা অন্ততপক্ষে ২০টি লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন নারী ও ৫ জন পুরুষের মৃতদেহ রয়েছে।
গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভবনের চারপাশে এখনও অনেক লাশ রয়েছে। সেসব লাশের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যাচ্ছে—তাতে কারও হাত, কারও পা, কারও মাথা বেরিয়ে রয়েছে। এদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে একই চিত্র। এখানে যে সহস্রাধিক জীবিত ও মৃত ব্যক্তিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে অথবা চিকিত্সা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন, তাদের দুই-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন বয়সের নারী। গতকাল দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে এক নারীর বাম হাত ও আরেকজনের এক পা কেটে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে যেখানে লাশের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে, সেই অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠেও দেখা গেছে শুইয়ে রাখা লাশের অধিকাংশই নারী।
পা কেটে পাখিকে জীবিত উদ্ধার : মিম খাতুন পাখি নামে খুলনার এক মহিলা গার্মেন্টকর্মীর পুরো শরীর বেরিয়ে ছিল। কিন্তু একটি পা দেয়ালে চাপা পড়ায় তাকে উদ্ধার করা যাচ্ছিল না। উদ্ধার করতে গেলে এক উদ্ধারকর্মীকে পাখি হাউমাউ করে কেঁদে জানান, তার পা কেটে হলেও তাকে বাঁচাতে। পাখি জানান, তার স্বামীর নাম জাহাঙ্গীর। পরে উদ্ধারকর্মী বেরিয়ে এসে ঘটনাটি জানালে স্বামীর পরিবারের এক সদস্য পা কেটেই তাকে উদ্ধারের অনুমতি দিলে পাখিকে পা কেটে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে এনাম হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়।
সাত মেয়েই আটকা পড়েছে : মোজাম্মেল হোসেন নামে রংপুর থেকে এসেছেন এক বাবা তার মেয়ে গার্মেন্টকর্মী ফাতেমার খোঁজ করতে। বুধবার সর্বশেষ তার মেয়ে ফাতেমা তাকে মোবাইলে জানিয়েছেন, ‘বাবা, আমি জীবিত আছি। চারতলায় একটি পিলারের নিচে আটকে আছি। আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তুমি আমাদের বাঁচাও বাবা।’ আর কোনো কথা বলতে পারেননি মোজাম্মেল তার মেয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেয়ে ফাতেমা, তার তিন বোন ও দুই ভাইয়ের ৫ মেয়ে এবং পাশের বাড়ির এক মেয়েসহ সাত বান্ধবী একসঙ্গে এক কক্ষে কাজ করত। তারা সবাই আটকা পড়েছে ভবনের ভেতরে। কাউকেই এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কখনও ঢাকায় বেড়াতে এলে ওই সাত মেয়ে মোজাম্মেলকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। এসব বলতেই বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মোজাম্মেল। জ্ঞান ফিরলেই আবার তিনি বলে উঠছেন—‘তোমরা আমার সাত মেয়েকে বাঁচাও।’
গতকাল তিনি ওই সাত মেয়ের খোঁজ করতে এসে রানা প্লাজা ভবনের কাছে যাওয়ার কারণে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটাও করেছে মোজাম্মেলকে। তবে গতকাল পর্যন্ত তিনি খোঁজ পাননি তার সেই সাত মেয়ের।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়