
জামালউদ্দিন বারী : দেশের সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বেপরোয়া, দাম্ভিক ও নির্বতনমূলক মানসিকতার কারণে বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে অনিশ্চিত ও বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় উপনীত হয়েছে। সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে অনাস্থা ও অসহিষ্ণুতার কারণে সংসদীয় গণতন্ত্র তার প্রত্যাশা পূরণে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের গ্যাঁড়াকলে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাও নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাংবিধানিক আইনের আওতায় পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকারসমূহ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত হলেও তাদের হাতেই জনগণের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার পদদলিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সভ্য সমাজে নাগরিক অধিকার মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত এবং রাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। গণতন্ত্র তথা রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য, অপশাসন ও অর্থনৈতিক বৈষ্যমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে জাতি একটি দোর্দ- প্রতাপ জান্তা সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার চারদশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর সে জাতির নাগরিকদের মানবিক অধিকারসমূহ এভাবে ব্যাহত ভূ-লুণ্ঠিত হতে পারে না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও-না-কোথাও সাধারণ মানুষের লাশ পড়ছে। কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে, কখনো রাজনৈতিক সহিংসতার তা-বে, কখনো অজ্ঞাত দুর্বৃত্তের পরিকল্পিত নাশকতায় বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা। অনেক সম্ভাবনা সত্ত্বেও এখনো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর তালিকার নিম্নস্তরেই ঠাঁই পাচ্ছে বাংলাদেশ, এখনো দেশের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, এখনো আমরা মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। এহেন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন আগামী দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে ২০২১ সালে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপরেখা জনগণের সামনে মেলে ধরছেন, ঠিক তখন তাদেরই খামখেয়ালিপনা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণে এক অভাবনীয় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
হিংসা, অনৈক্য, বিভাজন ও নানা চড়াই-উৎরাই, ঘাত-প্রতিঘাত ডিঙ্গিয়ে ঐক্য, সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলাই সভ্যতার ইতিহাস। দেশের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় যখন নানাবিধ অসঙ্গতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, রাষ্ট্র ও সরকার যখন ব্যর্থ হয়, তখন দেশের সাধারণ মানুষ নতুন শক্তির জন্য উদগ্রীব থাকেন এবং কখনো কখনো সাধারণ জনগণ নিজেরাই নতুন শক্তির জন্ম দিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার কারণে জনগণের কাক্সিক্ষত বিকল্প শক্তির উন্মেষে নাগরিক সমাজের ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের চলমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক জোট ও দলগুলোর মত দেশের নাগরিক সমাজও স্পষ্টত দুইটি শিবিরে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অস্বস্তিকর নাভিঃশ্বাস অবস্থায় শাহবাগের তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগারদের ইসলাম বিদ্বেষী অপপ্রচারে প্রথমবারের মতো দেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে ফুঁসে উঠতে দেখেছি আমরা। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থান ও আন্দোলন যখন ইসলাম বিদ্বেষী মোড়ক লাভ করেছে এবং সরকারের প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন লাভ করেছে, তখন দেশের ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতাও ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে একটি অভাবনীয় শক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছে। সরকারের পরোক্ষ মদতে সরকার সমর্থক অনেকগুলো সংগঠনের ডাকা হরতাল, অবরোধসহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও গত ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের ঢাকামুখী লংমার্চে জনতার যে মহাপ্লাবন দেখা গেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে তা ব্যতিক্রমী ঘটনা। সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আয়োজনে গত অর্ধ শতাব্দীতে ঢাকায় অনেক মহাসমাবেশ হয়েছে। কিন্তু এত প্রতিবন্ধকতা ও হুমকি উপেক্ষা করে শত শত কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অরাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর এত বড় মহাসমাবেশে সমবেত হওয়ার ঘটনা বিরল। সরকারের পক্ষ থেকে বাধা বিপত্তি ও নানা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার পর হেফাজতের মহাসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল এবং তাদের দেয়া ১৩ দফা দাবি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাসের মধ্যদিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করা হয়েছিল। হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকারের সমঝোতা প্রয়াস বা দূতিয়ালীতে নিযুক্ত বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ হেফাজতের দাবিগুলোকে ‘যৌক্তিক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে হেফাজতের লংমার্চ মহাসমাবেশের একদিন পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-মহাসচিব মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছিলেন হেফাজতের দাবি বাংলার মানুষ কোনদিন মেনে নেবে না। এরপর দেশের অন্য যে কোন রাজনৈতিক ইস্যুর মতো হেফাজতে ইসলামের এই ইস্যুগুলোও ইতোমধ্যে নানাভাবে অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন সময়ে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে ১৩ দফার পক্ষে রাউন্ড টেবিল ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন ও বিভ্রান্তি নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও পরিকল্পিত অপপ্রচার বন্ধ হয়নি। এসব দাবির অপব্যাখ্যা বর্তমানে এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, কোন কোন মহল বলতে শুরু করেছে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা মেনে নিলে বাংলাদেশ ১৩শ’ বছর পিছিয়ে গিয়ে অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে, এমনকি এসব দাবির একটি দাবি মেনে নিলেও নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলো কোন বিপ্লবী দাবি নয়, এ কারণেই সরকারি দলের মধ্যেই এসব দাবির পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। তাদের অন্যতম দফা নাস্তিক-ব্লগারদের শাস্তির দাবির প্রতি বাহ্যিকভাবে সরকারের কোন দ্বিমত নেই, ইতোমধ্যে কয়েকজন ধর্মবিদ্বেষী ব্লগারকে গ্রেফতারের মধ্যদিয়ে তাই প্রতীয়মান হয়। প্রথম দফা ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানে পুনঃ প্রতিষ্ঠার যে দাবি মানে হচ্ছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে এই শব্দবন্ধ আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাসূল প্রেমিক ধর্মপ্রাণ মানুষের উপর পুলিশি নির্যাতন ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ বন্ধ করা, আলেম-ওলামাদের অযথা হয়রানি বন্ধ করে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেয়া, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সকল মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘেœ নামাজ আদায় এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কর্মকা- পরিচালনায় বাধাবিপত্তি দূর করা, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ব্যভিচার ও বিজাতীয় সংস্কৃতি বন্ধের দাবি, দাড়ি-টুপিওয়ালা ধার্মিক লোকদের নিয়ে গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়ার তৎপরতা বন্ধের দাবি ইত্যাদি দাবিগুলোর কোনটিকেই অযৌক্তিক প্রমাণের সুযোগ নেই।
হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির কোথাও নারী প্রগতি বিরোধী বা নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে বিরত রাখার কোন শব্দ না থাকলেও বাম রাজনীতিকদের মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর এনজিও মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ দেশের কর্মজীবী নারী শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শাহবাগের নাস্তিক ব্লগারদের প্রচ্ছন্ন সমর্থক, তথাকথিত প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী নাগরিক সমাজের চিহ্নিত সদস্যরা যখন ইসলামের অনুশাসনকে প্রকারান্তরে মধ্যযুগীয় বলে চিৎকার করছেন, ঠিক তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী মদিনা সনদ অনুসারে দেশ চলবে বলে হঠাৎ ঘোষণা করলেন। হেফাজতে ইসলামের দাবির বিরুদ্ধে বিষোদগারে তাদের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর ক্ষীণকণ্ঠেও তাদের কোন প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। একদিকে ইসলামবিদ্বেষীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দান, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সংবিধান থেকে ইসলামী মূল্যবোধের অপসারণ অন্যদিকে মদিনা সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্ববিরোধিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে যে যাই বলুন, বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে ইসলাম যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তা আবারো প্রমাণিত হলো। ধর্মনিরপেক্ষতাকে দলীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করার পরও নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত ধর্মাচার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের শরিক বাম রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থক নাগরিক সমাজের ব্যাপক অপপ্রচার সত্ত্বেও এবং হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের পর দেশের শাসক রাজনৈতিকদলগুলোর মধ্যে এই বাস্তবতা নতুনভাবে উপলব্ধ হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তারা যখন হেফাজতে ইসলামের যৌক্তিক ও সাধারণ দাবিগুলোকে মধ্যযুগীয়, দেশের অর্থনীতি ও নারী প্রগতির অন্তরায় বলে আখ্যায়িত করছেন তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘দেশ চলবে মদিনা সনদের ভিত্তিতে’। নানা মতভেদ ও বৈরিতা সত্যেও একটি সংঘাতপূর্ণ সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মদিনা সনদই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীনতম সামাজিক-রাজনৈতিক চার্টার। এটি বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবেও স্বীকৃত। মদিনা চার্টারের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, পরস্পরের প্রতি হিংসা-হানাহানি, রক্তপাত ও উৎখাতের রাজনীতির বদলে সকল মতপার্থক্য সত্ত্বেও মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান ও প্যাগানদের নিজ নিজ ধর্মীয় আত্মপরিচয় অক্ষুণœ রেখেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করার নিশ্চয়তা। পশ্চিমা দুনিয়া নিজেদেরকে মানবাধিকার রক্ষার প্রবক্তা হিসেবে দাবি করলেও ইউরোপ-আমেরিকায় মানবাধিকার ও উদারনৈতিক রাজনীতি প্রর্বতনের বহু আগে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনা সনদ তথা প্রথম ইসলামিক সংবিধান এবং বিদায় হজের ভাষণে সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল সপ্তম শতকে (৬২২ খ্রি.) ইসলামের নবী যখন মদিনা সনদ ঘোষণা করেন তখন চার্চ ও সামন্তবাদের কঠোর অনুশাসনে পশ্চিমা সমাজ শৃঙ্খলিত ছিল। মদিনা সনদের ৬শ’ বছর পর ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে মানবাধিকারের প্রথম সনদ ম্যাগনাকার্টা ঘোষিত হয়। ব্রিটিশ বিল রাইটস ঘোষিত হয় ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে এবং মার্কিন বিল অব রাইটস ঘোষিত হয় এর ১০০ বছর পর ১৭৮৯ সালে। তবে এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোন নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। এক শতাব্দী আগেও ইউরোপ আমেরিকায় নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার ছিল না। সাংবিধানিকভাবে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দেয়া হলেও ধর্ম-বর্ণ ও লিঙ্গভেদের কারণে এখনো নানা রকম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী যখন মদিনা সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন, এর অর্থ হচ্ছে এখন থেকে দেশে হিংসা ও ঘৃণা নির্মূল এবং ধর্মবিদ্বেষের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না বা বন্ধ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইভ-টিজিং, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আমাদের জন্য বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন শহরে গণধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর আগে এইডস’র মতো মরণব্যাধি মহামারির আকার ধারণ করলে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং এনজিও’র পক্ষ থেকে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। ইসলামের নির্দেশিত পর্দাপ্রথা এবং বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ক বন্ধের ইসলামের কঠোর অনুশাসনকে যারা নারী প্রগতির অন্তরায় বলে প্রচার করছেন, ইভটিজিং, ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহ বন্ধে তারা কোন বিকল্প পন্থা দেখাতে পারেননি। অর্থনীতি, রাজনীতি ও জীবনাচারে পশ্চিমা পুঁজিবাদী সংস্কৃতির অনুকৃতি নারীদেরকে উলঙ্গ ও মর্যাদাহীন করে তুলেছে। সস্তা বিনোদন ও বিজ্ঞাপনের কল্যাণে নারীরা পণ্যে পরিণত হয়েছে। ইসলাম যেমন নারীর শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার এবং কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে একটি ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্যপূর্ণ বা ইনসাফ ভিত্তিক নির্দেশনা বহাল করেছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, দেশে যখন রাজনৈতিক সহিংসতায় শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র ও সার্বজনীন মানবাধিকার চরম হুমকির সম্মুখীন তখন দেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও তথাকথিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হেফাজতে ইসলামের দাবিকে মধ্যযুগীয় আখ্যা দিয়ে দেশের ওলামা মাশায়েখদের বিরুদ্ধে সহিংস বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হিসেবে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মদিনা সনদের সার্বজনীনতায় বিশ্বাস করেন। মদিনা সনদের ৪৭টি অনুচ্ছেদের ২৩টিতে প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের নানা গোষ্ঠী, মুহাজির, আনসারসহ শাসক ও প্রজাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়-দায়িত্বের বিষয় বর্ণিত হয়েছে, আর ২৪টি অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে ইহুদি, খ্রিস্টানসহ অমুসলিমদের নাগরিক অধিকার ও দায় দায়িত্ব সম্পর্কে। পশ্চিমা বিশ্ব যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত, ধর্ম ও লিঙ্গ বৈষম্যের ভিত্তিতে শাসকরা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতো যথেচ্ছভাবে। এমনই অন্ধকার সময়ে সবচেয়ে পতিত আরব সমাজে ইসলামের নবী সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দিয়েছেন মদিনা সনদ ও বিদায় হজ্জের ভাষণের মধ্য দিয়ে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সত্যিকারের গণতন্ত্র এবং পালার্মেন্টারি (শুরা) ব্যবস্থাও মদিনা সনদের বিশেষ অবদান। আমাদের নাগরিক সমাজের যে সকল সদস্য ইসলামের অনুশাসনকে মধ্যযুগীয় বলে আখ্যায়িত করছেন তারা ইসলাম এবং এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ, মূল্যবোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে কোন ধারনা রাখেন বলে মনে হয় না। উপরন্তু বিদেশি প্রেসক্রিপশন অথবা ক্ষমতার রাজনীতির পাঁকে জড়িয়ে দেশে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা উসকে দিতেই তাদেরকে বেশি তৎপর দেখা যায়।
Comments