ইউরোপে জন্ম কমছে বাড়ছে প্রবীণ



ডেস্ক রিপোর্ট
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
জার্মানিসহ ইউরোপের একাধিক দেশে জনসংখ্যা হয় বাড়ছে না, কিংবা কমে যাচ্ছে। এর অর্থ, গড়ে শ্রমিকদের বয়স বাড়ছে, যার অর্থ তাদের উত্পাদনশীলতা কমছে। অর্থনৈতিক বিচারে এর ফলে সঞ্চয় কমবে, সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি কমবে। থাকছে পেনশনভোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা। জার্মানির একজন সাধারণ কর্মী তার সারা কর্মজীবনে পেনশন ফান্ডে যে পরিমাণ অনুদান দিয়ে থাকেন এবং সেই সঙ্গে নিয়োগকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান এই দুটো যোগ করলেও পেনশন ফান্ডে একজন কর্মীর মোটামুটি এক বছরের মোট আয় জমা পড়ে। সে অর্থে অবশ্যই একজন অবসরপ্রাপ্তের সারা জীবনের পেনশন দেয়া সম্ভব নয়। কাজেই পেনশন ফান্ডের ভালো-মন্দ নির্ভর করে শ্রমবাজারে আরও কত নতুন কর্মী এলো এবং তাদের অনুদান দিতে শুরু করল, তার ওপর। মুশকিল হয়, যখন পেনশনভোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, কিন্তু সেই পরিমাণে নতুন শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে গড়ে চারজন নতুন শ্রমিক একজন পেনশনভোগীর বোঝা বহন করে। ২০৫০ সালে কিন্তু দু’জন করে শ্রমিককে একজন পেনশনভোগীর পেনশনের বোঝা বহন করতে হবে, যা এক কথায় অসম্ভব। অসম্ভব এ কারণেও বটে যে, জনসংখ্যার তরুণ বা কর্মক্ষম বা কমর্রত অংশ অবশ্যই এই অসম এবং এক হিসাবে অন্যায় চাপ মেনে নেবে না। যার ফলে রাজনৈতিক গোলযোগ সৃষ্টি হওয়াও আশ্চর্য নয়।
পেনশনের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। অর্থাত্ পেনশনভোগীদের ভালো থাকা বা না থাকা যে দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই পেনশনের পরিমাণ এবং হেলথ কেয়ার বা স্বাস্থ্য সেবা, দুটোই নির্ভর করছে ওই সামাজিক কিংবা প্রজন্মগত চুক্তির ওপর। এ চুক্তি ভঙ্গ হলে গোটা প্রণালীটা ভেঙে পড়তে বাধ্য। অথচ বিপদ তো ঠিক তাই। তার একটি চরম দৃষ্টান্ত হলো লাটভিয়া, যেখানে ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে জনসংখ্যা কমেছে ১৪ শতাংশ। লাটভিয়া অতি ক্ষুদ্র দেশ, কাজেই সে দেশের জনসংখ্যা থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ কমে যাওয়াটা খুব কম কথা নয়। ওদিকে পেনশনের ক্ষেত্রে ২০৬০ সালে লাটভিয়ার প্রত্যেক চারজন শ্রমিকের জন্য থাকবে তিনজন পেনশনভোগী কিংবা ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষ।
লাটভিয়ার এই দুর্দশার জন্য শুধু নিম্ন জন্মহারই নয়, অভিবাসনও দায়ী, অর্থাত্ নেতিবাচক অভিবাসন। লাটভিয়ার মানুষজন ভালো এবং বেশি মাইনের চাকরির খোঁজে ইউরোপের অন্যত্র গিয়ে বাসা বাঁধছে, অতীতে যাকে বলা হতো ভাগ্যান্বেষণ। বিগত দশকে লাটভিয়ায় জনসংখ্যা হ্রাসের দুই-তৃতীয়াংশ ঘটেছে লাটভিয়ানরা দেশ ছাড়ার ফলে।
ইউরোপের একটির পর একটি দেশে জন্মহার হ্রাসের পিছনে এত ধরনের আর্থ-সামাজিক কারণ আছে যে, তার তালিকা দেয়া বৃথা। নারী মুক্তি থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, হালে আর্থিক সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সবকিছুকেই তার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে, রাজনৈতিক মর্জি ও প্রয়োজন অনুযায়ী। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, পর্তুগালের মতো একটি দেশে গত বছর জন্মহার ছিল নারীপ্রতি ১ দশমিক ৩২টি সন্তান, যদিও দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে নারীপ্রতি ২ দশমিক একটি সন্তানের জন্ম হওয়া উচিত ছিল।
২০১২ সালে গোটা পর্তুগালে জন্মেছে মাত্র ৯০ হাজার শিশু। আর ২০৫০ সালে পর্তুগালের প্রতি ১০ জন বাসিন্দার মধ্যে চারজনের বয়স হবে ৬০-এর ওপরে। অভিবাসন কিংবা দেশত্যাগ? প্রতিবছর এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার পর্তুগিজ দেশ ছাড়ছে ভাগ্যান্বেষণে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ!
ইউরোপের সব দেশের ‘পপুলেশন প্রোফাইল’ বা জনসংখ্যার কাঠামো যে এরকম ‘অটেকসই’, এমন বলা চলে না। যেমন ব্রিটেন একটি ব্যতিক্রম। অন্যদিকে জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে অন্তত অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়িয়ে সমস্যাটা কিছুটা বিলম্বিত করার প্রচেষ্টা চলেছে। কিন্তু মূল সমস্যাটাকে রাজনীতির নির্ঘণ্টে না তুলতে পারলে ইউরোপের কপালে জাপানের দশা হতে পারে। প্রবীণদের দেশ জাপান, যেখানে প্রবৃদ্ধিও ঘটে শম্বুকগতিতে। সূত্র : ডিডব্লিউ

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়