পদ্মা দুর্নীতির চূড়ান্ত বিচার শুরু
অর্থনৈতিক রিপোর্টার : চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘুষ লেনদেনের চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে। কানাডার টরন্টোর ফেডারেল পিয়া কোর্টে পরিচালিত পদ্মা সেতুর দুর্নীতি মামলা চূড়ান্ত শুনানির জন্য অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসে পাঠানো হয়েছে। এটি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত। নিম্ন আদালতে টানা ১২ দিনের শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দুর্নীতির সঙ্গে সরকারের পাঁচ কর্তাব্যক্তির পাশাপাশি আকের ব্যক্তির নাম উঠে আসে। তবে কানাডার আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে, এই প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য জানাতে কানাডার আদালতে স্বেচ্ছায় রাজসাক্ষী হচ্ছেন অভিযুক্ত এসএনসি লাভালিনের সাবেক এক কর্মকর্তা।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ৩৮০ কোটি টাকা। এই কাজ পেতে ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে রাজি হয় কানাডীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠন এসএনসি লাভালিন। সম্ভাব্য ঘুষ গ্রহীতার তালিকায় ছয়জন। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। তার জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। যদিও ঘটনা প্রকাশের পর থেকেই তিনি নাকি কান্না কেঁদে আসছেন, ঘটনার সঙ্গে তার ন্যূনতম সংযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর ভাতিজা ও হুইপ নূরে আলমের ভাই মুজিবুর রহমান নিক্সন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার এবং কানাডার আদালতের নির্দেশে নাম প্রকাশ করা হয়নি এমন এক ব্যক্তি। তাদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা করে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ও সাবেক সেতু সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া। এদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা করে। সবার প্রশ্ন নিক্সনকে নিয়ে। অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে নিক্সন বাদে সবাই সরকারের কর্তাব্যক্তি। সরকারি কোন পদে না থেকেও কিভাবে ঘুষের তালিকায় আসে- নাম প্রকাশের পর থেকেই সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
কাজ পেতে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কানাডার আদালতে মামলা হয় এসএনসি-লাভালিনের সাবেক দুই কর্মকর্তা রমেশ শাহ ও মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে। করাপশন অব ফরেন অফিসিয়াল অ্যাক্ট লংঘনের দায়ে ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া শুনানী শেষে চূড়ান্ত শুনানীর জন্য প্রাদেশিক সর্বোচ্চ আদালতে মামলাটি পাঠান বিচারপতি ম্যালকম ম্যাকলয়েড। অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিস মামলাটি আমলে নিয়েছে।
জানা গেছে, ওই মামলার চূড়ান্ত শুনানির জন্য ২৯ মে বিবাদীদ্বয় সুপিরিয়র কোর্টে হাজির হবেন। পারস্পরিক আলোচনায় কোর্টের সুবিধাজনক সময়ে শুনানির সম্ভাব্য দিনক্ষণ ধার্য করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, চূড়ান্ত শুনানি ২০১৪ সাল নাগাদ গড়াতে পারে।
এদিকে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য জানাতে কানাডার আদালতে স্বেচ্ছায় রাজসাক্ষী হচ্ছেন দুদকের মামলায় অভিযুক্ত এসএনসি লাভালিনের সাবেক এক কর্মকর্তা। আদালতে তিনি পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘুষের ষড়যন্ত্র এবং নেপথ্যের অনেক কিছু খোলাসা করবেন। দুদক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুদকের মামলার কানাডিয়ান তিন আসামি হলেন, এসএনসি লাভালিনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ এবং সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল। এদের মধ্যে একজন রাজসাক্ষী হচ্ছেন।
রয়েল কানাডিয়ান পুলিশ রমেশ শাহের ডায়েরির সূত্র ধরে রমেশ ও ইসমাইলকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। পরে অবশ্য তারা জামিনে মুক্তি পান। এ অবস্থায় তারা আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, অভিযুক্ত সাবেক লাভালিন কর্মকর্তা রাজসাক্ষী হলে সব বিষয় খোলাসা হবে। সাজা কম পাওয়ার আশায় তিনি রাজসাক্ষী হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে বাদ দিয়ে মোট সাত জনকে আসামি করে রাজধানীর বনানী থানায় মামলা (মামলা নং-১৯) দায়ের করে দুদক।
সম্প্রতি পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পেতে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়া সংক্রান্ত চক্রান্ত ও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করে নেয় কানাডাভিত্তিক কারিগরি প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন। সারাবিশ্বে বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানটির স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে ১৭ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন প্রকল্পের যাবতীয় কাজে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে বিশ্বব্যাংক। লাভালিনকে কালো তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির ঘটনা আরও স্পষ্ট হয়।
লাভালিনের বিরুদ্ধে এর আগেও ভারতে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়ার অভিযোগ ওঠে। তখনও প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এসএনসি লাভালিনকে নিষিদ্ধ করায় বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান।
বুধবার এসএনসি লাভালিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত এই তথ্য প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংকের অনুসন্ধান বিভাগের ডাইরেক্টর (অপারেশন্স) স্টিফেন জিমারম্যান বলেছেন, সুসংবাদ হচ্ছে, পদ্মা সেতুর কাজ পেতে ঘুষের টাকাটা হাতবদল হওয়ার আগেই আমরা এই চক্রান্ত সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তিনি বলেন, কারও কারও চোখে টাকাটা যেহেতু হাতবদল হয়নি কাজেই এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ নয়। কিন্তু আমি এই ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করি না। এটিও বড় ধরনের অপরাধ। তবে সৌভাগ্য যে, টাকাটা হাতবদল হওয়ার আগেই আমরা সেটা জানতে পেরেছি। তিনি বলেন, তবে দুর্ভাগ্য হচ্ছে এ ঘটনাটাই পদ্মা সেতুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্তত এ সময়ের জন্য হলেও।
বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শুধু এসএনসি লাভালিনই নয়, তাদের অধীনস্থ শতাধিক প্রতিষ্ঠানকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দায়িত্বশীল বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসএনসি-লাভালিন গ্রুপের ঘুষ-দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এসএনসি লাভালিন অবশ্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই তারা ১০ বছরের জন্য ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। তবে কি শর্তের ভিত্তিতে তারা ‘সমঝোতা’ করেছেন সে ব্যাপারে কোন কথা বলতে রাজি হননি কোম্পানির কোন প্রতিনিধি। কোম্পানিটি বলেছে, ‘এটি তাদের গোপনীয় বিষয়।’
Comments