ফটিকছড়িতে আ.লীগ-গ্রামবাসী সংঘর্ষে নিহত ৩ : ৫০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত আড়াই শতাধিক : দু’শতাধিক মোটরসাইকেলে আগুন, ১৪৪ ধারা জারি



ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
দেশের বৃহত্তর উপজেলা ফটিকছড়ির ভুজপুরে হরতালের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের মোটর শোভাযাত্রার সময় স্থানীয় কাজিরহাটে গ্রামবাসীর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে ৩ ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হয়েছে। বিজিবির গুলিতে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের দু’শতাধিক লোক গুরুতর আহত হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা চতুর্দিকে ঘেরাও করে মোটর শোভাযাত্রার দু’শতাধিক মোটরসাইকেল, ১০টি জিপ ও মিনি ট্রাক আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দেশব্যাপী জামায়াত-শিবির এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামে বিএনপির হরতাল চলছিল। ফটিকছড়িতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে গতকাল সকাল ৮টায় দক্ষিণ ফটিকছড়ির মোহাম্মদ তকিরহাট থেকে একটি হরতালবিরোধী মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি দুপুরে উপজেলা সদর প্রদক্ষিণ শেষে উত্তর ফটিকছড়ির দিকে রওনা দেয়। দুপুর দেড়টা নাগাদ মোটর শোভাযাত্রাটি উপজেলার ভুজপুর থানার কাজিরহাট বাজার মসজিদ মোড়ে পৌঁছে জামায়াত-শিবির, হেফাজতে ইসলাম এবং বিএনপির বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে হরতালকারী জনতা ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ শুরু করে।
এ সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা একজন দাড়িওয়ালা লোককে ‘তুই রাজাকার’ বলে গালে থাপ্পড় মারলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ছাত্রলীগ কর্মীরা কাজিরহাট বড় মাদরাসা মনে করে কেন্দ্রীয় মসজিদে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে মসজিদ থেকে মাইকে গ্রামবাসীকে সন্ত্রাসী প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। মুহূর্তেই গ্রামবাসী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চতুর্দিকে ঘেরাও করে আক্রমণ শুরু করে। মোটর শোভাযাত্রাটি আর কাজিরহাট বাজারে প্রবেশ করতে না পেরে ফেরত আসার চেষ্টায় কাজিরহাটের দক্ষিণে কালাইয়ারটেকে পৌঁছা মাত্র গ্রামবাসী অবরুদ্ধ করে মোটর শোভাযাত্রার সব গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় ফকিরহাটেও ১৫-২০টি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ভাগ্যক্রমে ২০-২৫টি মোটরসাইকেল পালিয়ে আসতে পারলেও দু’শতাধিক মোটরসাইকেল, আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলামের মাইক্রোবাস, শোভাযাত্রার ৯টি চাঁদের গাড়ি ও মিনি ট্রাক বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর দেয়া আগুনে ছাই হয়ে গেছে। বেলা ২টা পর্যন্ত উপজেলা সদর থেকে এক প্লাটুন বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু তৈয়বসহ সবাইকে উদ্ধারের অসংখ্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে ফটিকছড়ি থেকে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। এ সময় বিজিবির একটি টিম পেয়ারুলকে নিয়ে কৌশলে পালানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর ফাঁকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য গ্রামবাসী স্থানীয় ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সম্মুখে গাছ কেটে আবারও ব্যারিকেড দেয়।
উপায়হীন বিজিবি আওয়ামী লীগ নেতাদের জীবন রক্ষার্থে তাদের জিপে নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে এবং বিক্ষুব্ধ জনতার মাঝ দিয়ে দ্রুতবেগে গাড়ি চালিয়ে কোনোমতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময় বিজিবির গাড়ি থেকে পড়ে গেলে জনতার গণপিটুনিতে এক ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হয়। এছাড়া স্থানীয় কেজি স্কুলের দক্ষিণ পাশে বাড়ির ভেতর জনতার গণপিটুনিতে আরেক ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হয়। এ সময় বিজিবির মুহুর্মুহু গুলিতে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে জনতা ফটিকছড়ি ফায়ার সার্ভিসের গাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়। অপরদিকে সংঘর্ষের সময় বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেয়া ছাত্রলীগ কর্মীদের গণপিটুনি দিলে অর্ধশতাধিক আহত হয়।
আহত আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, আবু তৈয়ব, কামাল, চেয়ারম্যান ফারুক উল আজম, চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক, মোহাম্মদ আলী, আক্কাছ, আবদুল হাকিম. রবিন, হুমায়ন, রাসেল, সায়েম, বাপ্পা, আবুল কাশেম, মুজিব, শাহজাহান, কুদ্দুস, আজগর, কাইয়ুম, আশরাফ, শওকত, বাবু, হোসেন, রুবেল, জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজুর রহমান, ইকবাল, জানে আলম, জামাল প্রমুখ। গুলিবিদ্ধ গ্রামবাসী হলেন—মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মৌলানা আবুল বশর, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মোহাম্মদ নেজাম, মোহাম্মদ মাহাবুব, মোহাম্মদ সোহেল, আলী আহমদ, আবদুল খালেক, সেকান্দর, মোহাম্মদ আবদুল, আশরাফ প্রমুখ।
বেলা সাড়ে ৩টায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শফিউল আলম নুরী ও কাজিরহাট বড় মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা জুনায়েদ বিল জালাল কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে পুলিশের প্রতি গুলিবর্ষণ বন্ধ এবং গ্রামবাসীকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালে গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে ফেরা শুরু করে। বিকাল ৪টায় ফটিকছড়ি উপজেলা ্প্রশাসন কাজিরহাট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে উত্তর দিক থেকে এডিশনাল এসপি ফরিদ আহমদের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নানসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে যে কোনো হামলা ঠেকাতে তারা প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় পুরো ফটিকছড়িসহ উত্তর চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়