কয়েকশ’ মানুষ এখনও চাপা পড়ে আছে : আড়াইশ’ লাশ ও ২ হাজার জীবিত উদ্ধার
আলাউদ্দিন আরিফ ও নজমুল হুদা শাহীন
| পরের সংবাদ» |
বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াল ট্র্যাজেডি ‘রানা প্লাজা’ ধসে পড়ার ঘটনায় ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা কেউ অনুমান করতে পারছে না। একটি ভবন নয়, পুরো সাভারই যেন এখন মৃত্যুপুরী। গত রাত সাড়ে দশটায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে অন্তত ২৫০ জনের লাশ। এদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। সময় যতই গড়াচ্ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। বিধ্বস্ত ভবনের সর্বত্র এখনও ঝুলে-চাপা পড়ে আছে শুধু লাশ আর লাশ। এখনো কয়েকশ’ লোক আটকা পড়ে আছেন। তাদের কতজন জীবিত আর কতজন মৃত তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউই। তবে সবারই আশঙ্কা, লাশের সংখ্যা আরও বহু বাড়তে পারে। এমনকি তা ধারণাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অভিশপ্ত রানা প্লাজার উদ্ধার তত্পরতার দৃশ্য হদয়বিদারক, বীভত্স, নির্মম, বর্ণনাতীত। শত শত অসহায় নারী-পুরুষের এই নির্মম পরিণতি দেখে শোকে স্তব্ধ গোটা জাতি। গতকাল পর্যন্ত প্রায় প্রায় ২ হাজার জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হযেছে। এদের অনেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এখনও বেঁচে থাকা মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। রানা প্লাজার একটির সঙ্গে একটি ফ্লোর লেপ্টে আছে স্যান্ডউইচের মতো। সেখানে তীব্র সঙ্কট অক্সিজেনের। নবজাতক শিশুর কান্নাও শোনা যাচ্ছে বিধ্বস্ত ভবন থেকে। আটকে পড়া ভবনের গুমোট পরিবেশে সঙ্কট বাতাস ও পানির। এরই মধ্যে সমন্বয়হীনভাবে চলছে উদ্ধার তত্পরতা। উদ্ধার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে উদ্ধারকাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের কোনোমতে জীবিত বের করে আনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
গতকাল বিধ্বস্ত ভবন পরিদর্শন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, তদন্ত কমিটির সদস্য, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের পদস্থ ব্যক্তিরা। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে সাভারের সর্বস্তরের মানুষ। সবার প্রাণপণ চেষ্টার পরও মৃত্যুপুরী রানা প্লাজা থেকে লাশ আর জীবিত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। সময় যতই গড়াচ্ছে, আটকে পড়া ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। লাশগুলো ফুলে পচন ধরেছে। লাশের উত্কট গন্ধে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
গতকাল সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে ভবনে ঘুরে দেখা গেছে, এ যেন কেয়ামতের বিভীষিকা। শত শত লাশ একসঙ্গে। এ যেন লাশের সারি। সময় যতই গড়াচ্ছে, বাড়ছে লাশের সংখ্যা। সাভারজুড়েই চলছে আহাজারি আর শোকের মাতম। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া সেই কান্না কিছুতেই থামছে না। অবিরাম বিলাপে স্বজনহারা মানুষের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। স্বজনহারাদের আহাজারি আর শোকে স্তব্ধ সাভার। হতবিহ্বল গোটা জাতি।
উদ্ধারকাজে নিয়োজিত একজন সেনা কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, এখনও এক থেকে দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাদের অনেকেই হয়তো মৃত। ধসে পড়া ভবনের ফাঁক-ফোকরে পড়ে বেঁচেও আছেন অনেকে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। অনেক নারী, পুরুষ তাদের বের করার জন্য আকুতি জানিয়ে আর্তনাদ করছেন। অনেকে বাতাসের অভাবে গরমে দম বন্ধ হয়ে আসার কথা বলছেন। তারা ইট, রড আর কংক্রিটের স্তূপে এমনভাবে আটকে রয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা তাদের বের করে আনার কোনো নিরাপদ উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।
লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে : রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ২৫০টি লাশের সংখ্যা তালিকাভুক্ত করেছে সাভার থানার পুলিশ। কিছুক্ষণ পর পর লাশ উদ্ধারের খবর আসছে। একেকটি স্লাব একটু করে উল্টাতেই বের হয়ে আসে ৪-৫টি লাশ। ভবনটিতে এখনও অনেক লাশ পড়ে আছে। শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা দুষ্কর। হস্তান্তর করা হয়েছে প্রায় ২০০ জনের লাশ। বাকিদের লাশ অধরচন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা করা হচ্ছে। সেখানে ২৯৯ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকাও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি নারীশ্রমিক। কর্মকর্তারা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধারের পর সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় মাঠে রাখা হচ্ছে। সেখানে স্থাপিত অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষের বোর্ডে প্রাথমিক তথ্য লেখা হচ্ছে। ওই বোর্ডের তথ্যমতে, বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১৪৫ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, পরিচয় না পাওয়া লাশের সংখ্যা কম। যেসব লাশের পরিচয় পাওয়া যাবে না, সেগুলো ফুলে ওঠার আগেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। পরে যাতে ওই সব লাশ শনাক্ত করতে ওই বিদ্যালয়ে একটি ফরেনসিক দল ডিএনএ নমুনা রেখে দিচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান জানান, রানা প্লাজা ধসে পড়ার সময় ভেতরে পাঁচটি পোশাক কারখানায় তিন হাজারের বেশি মানুষ ছিল। ভেতরে এখনও ঠিক কতজন আছেন আর কতজন বেরিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
লাশ ফুলে পচে যাচ্ছে : রানা প্লাজায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ পচে ফুলে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে লাশগুলোয় দ্রুত পচে যাচ্ছে। উদ্ধারকাজে দেরি হলে এসব লাশ শনাক্ত করা দুষ্কর হবে বলে জানান উদ্ধারকারী দলের একাধিক সদস্য। তারা বলেন, অনেক লাশ স্লাব ও ভিমের নিচে পড়ে থেঁতলে গেছে। রক্তমাখা ওই সব লাশ থেকে উত্কট গন্ধ ছড়াচ্ছে। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, সেই গন্ধ ততই বাড়ছে।
এখনও বাঁচার আর্তনাদ : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মী রফিকুল ইসলাম জানান, ভবন ধসের ২৮ ঘণ্টা পর তার মুঠোফোনে আনোয়ার নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ফোন করেন। আনোয়ার বলেন, তিনি ভবনের তৃতীয় তলায় আটকে আছেন। বেঁচে থাকলেও নড়াচড়া করার শক্তি নেই। বাতাসের অভাবে দম বন্ধ হয়ে আসছে। ওই ফ্লোর থেকে অনেকেরই আর্তনাদের শব্দ তার কানে ভেসে আসছে। মাঝেমধ্যে গোঙানির শব্দ পেয়েছেন। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, নিস্তব্ধতা বাড়ছে। ক্ষীণ হয়ে আসছে আর্তনাদের শব্দ। তার আশপাশে অনেক লোকের উপস্থিতি বুঝতে পারছেন। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনের সন্ধান না পাওয়ায় সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়া, মজিদপুর, রাজাসন, সোবহানবাগ, আড়াপাড়া, বক্তারপুর, উত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ঘরে ঘরে বিলাপ ও আহাজারির করুণ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
একমাত্র ছেলের জন্য বিলাপরত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বাসিন্দা মা সোনেকা বেগম। বলেন, যাওয়ার সময় ছেলে (১৭ বয়স, আয়রন ম্যান) আমায় বলল, মাসের কয়টা দিন বাকি আছে। না গেলে বেতন দেবে না। মা চিন্তা না করো না। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসব। বুধবার সকালে কথাগুলো বলেই ‘আমার ছেলে নাজমুল চলে গেল। আর ফিরল না। ও ছিল আমার একমাত্র ছেলে। চাকরি করত রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলায়।’ দুর্ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়ার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি। মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে ফিরছেন। না পেয়ে ধ্বংসস্তূপের চারপাশে পাগলের মতো খুঁজছেন। যাকে সামনে পাচ্ছেন, তাকেই তার ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছেন। শুধু নাজমুল নয়, ধসে পড়া ভবনের বিভিন্ন তলায় এখনও চাপা পড়ে আছে শত শত নারী-পুরুষ। চাপা পড়ার ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছেন। বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন। প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন মহান আল্লাহর কাছে।
ঝুলে আছে মানুষের হাত-পা : ধসে পড়া ভবনের চারপাশে ঝুলে আছে মানুষের হাত, পা ও শরীরের অংশ। গতকাল বিকাল পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রানা প্লাজার পূর্বপাশের তৃতীয় তলায় কালো রঙের প্যান্ট পরা এক যুবকের কোমর থেকে পা পর্যন্ত বের হয়ে আছে। বাকি শরীরের ওপর পাঁচটি ছাদ ধসে পড়ে আছে। পরের তলায় একটি পা দেখা গেছে, বাকি অংশ ধ্বংসস্তূপে ঢাকা পড়েছে। ওই পা থেকে প্রায় তিন গজ দূরে দেখা গেছে চাপা পড়া একটি হাত। হাতটি ফুলে গেছে। শরীরের বাকি অংশ চাপা পড়ে আছে মোটা বিমের নিচে। উদ্ধারকর্মীরা জানান, এরা সবাই মৃত। ঘটনার পরপরই মারা গেছেন। এই মৃতদেহগুলো উদ্ধার করতে গেলে ছাদ কেটে বের করতে হবে।
উদ্ধারকাজে অগ্রগতি : গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫০ শতাংশ উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা জানান। তারা পঞ্চম তলা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এছাড়া নিচে যেটুকু সম্ভব ছিদ্র করে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী বলেন, যারা আটকে পড়েছেন, তাদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত ১ হাজার ১০০ সদস্য এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। উদ্ধার অভিযানে আছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বিজিবি সদস্যরাও। পাশাপাশি স্থানীয় বহু মানুষ শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন কংক্রিট স্তূপের নিচ থেকে আটকে পড়াদের বের করে আনার কাজে। পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উত্সুক মানুষকে সামাল দেয়ার কাজ করছেন।
আইএসপিআরের পরিচালক শাহিনুর ইসলাম বলেন, সবার আগে জীবিতদের উদ্ধারের দিকে জোর দিচ্ছি আমরা। হতাহত সবাইকেই আমরা উদ্ধার করব। উদ্ধারকাজে ‘ধীরগতি’র বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ধসে পড়া ভবন থেকে ক্রেন দিয়ে টেনে স্ল্যাব সরিয়ে নেয়ার মতো প্রযুক্তি সেনাবাহিনীর হাতে আছে। কিন্তু ভেতরে আটকা পড়া জীবিতদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ধীরে ধীরে কেটে বের করতে হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স ও সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। গতকালও কংক্রিট কেটে ছিদ্র করে ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। ওই ছিদ্র দিয়েই পানি ও খাবার পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
ছিদ্র করে সরবরাহ করা হচ্ছে অক্সিজেন ও পানি : দুই একরের বিশাল আয়তনের স্যান্ডউইচের মতো লেপ্টে যাওয়া ভবনটিতে এখনও অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছে। তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা গর্ত করে বিশেষ পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন, পানি ও শুকনো খাবার সরবরাহ করছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভেতরে মূলত প্রচণ্ড গরম আর অক্সিজেনের অভাবে আটকে পড়া লোকজন মারা যেতে পারে। তাই অক্সিজেন ও পানি সরবরাহ করছেন তারা। গর্ত করে ভেতরে প্রবেশ করে একে একে আটকে পড়া লোকজনকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। ভেতরে লাশের পাশাপাশি অজ্ঞান অবস্থায় বেশ কয়েজনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান।
রানার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল : এদিকে ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও তার বাবা আবদুল খালেকের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্থানীয় বিভিন্ন গার্মেন্টেসের শ্রমিক ও বাসিন্দারা। গতকাল বেলা দুইটার দিকে ধসে পড়া ভবনের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সহস্রাধিক কর্মী আশুলিয়া, কাঠগড়া ও বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আসেন।
চারটি তদন্ত কমিটি : ভবনটি ধসে পড়ার কারণ খুঁজে বের করা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য মোট চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার দিনই পাঁচ সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে তদন্ত কমিটিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল নিজ কক্ষে জানান, অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট মনোজ কুমার রায়কে প্রধান করে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক-২-কে প্রধান করে চার সদস্যের আরেকটি কমিটি হয়েছে বলে জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ।
গতকাল চারটি তদন্ত কমিটির সদস্যরা আলাদাভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। ভবনের ইট-বালু পরীক্ষার জন্য আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেছেন। বিভিন্নজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন।
রানাকে দেখামাত্রই গ্রেফতার : রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সোহেল রানাকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হবে। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ নির্দেশ দিয়ে রানাকে যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকেই ধরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বুধবার রাত থেকে আমরা সোহেল রানাকে খুঁজছি। আশা করছি, শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে। বুধবার ভবন ধসের সময় ওই ভবনেই ছিলেন সাভার পৌরসভা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা। পরে জনতার রোষানল থেকে বাঁচাতে স্থানীয় এমপি মুরাদ জং তাকে উদ্ধার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান।
রানার বিরুদ্ধে রাজউক ও পুলিশের মামলা : রানা প্লাজার মালিক স্থানীয় পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা এবং ওই ভবনের পাঁচ গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। বুধবার মধ্যরাতে সাভার থানায় রাজউক ও পুলিশ বাদী হয়ে এসব মামলা দায়ের করে। পুলিশ বাদী হয়ে ভবনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের হত্যার অভিযোগে রানা প্লাজার মালিক ও পাঁচ গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। ইমারত আইনে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
অভিশপ্ত রানা প্লাজার উদ্ধার তত্পরতার দৃশ্য হদয়বিদারক, বীভত্স, নির্মম, বর্ণনাতীত। শত শত অসহায় নারী-পুরুষের এই নির্মম পরিণতি দেখে শোকে স্তব্ধ গোটা জাতি। গতকাল পর্যন্ত প্রায় প্রায় ২ হাজার জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হযেছে। এদের অনেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এখনও বেঁচে থাকা মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। রানা প্লাজার একটির সঙ্গে একটি ফ্লোর লেপ্টে আছে স্যান্ডউইচের মতো। সেখানে তীব্র সঙ্কট অক্সিজেনের। নবজাতক শিশুর কান্নাও শোনা যাচ্ছে বিধ্বস্ত ভবন থেকে। আটকে পড়া ভবনের গুমোট পরিবেশে সঙ্কট বাতাস ও পানির। এরই মধ্যে সমন্বয়হীনভাবে চলছে উদ্ধার তত্পরতা। উদ্ধার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে উদ্ধারকাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের কোনোমতে জীবিত বের করে আনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
গতকাল বিধ্বস্ত ভবন পরিদর্শন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, তদন্ত কমিটির সদস্য, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের পদস্থ ব্যক্তিরা। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে সাভারের সর্বস্তরের মানুষ। সবার প্রাণপণ চেষ্টার পরও মৃত্যুপুরী রানা প্লাজা থেকে লাশ আর জীবিত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। সময় যতই গড়াচ্ছে, আটকে পড়া ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। লাশগুলো ফুলে পচন ধরেছে। লাশের উত্কট গন্ধে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
গতকাল সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে ভবনে ঘুরে দেখা গেছে, এ যেন কেয়ামতের বিভীষিকা। শত শত লাশ একসঙ্গে। এ যেন লাশের সারি। সময় যতই গড়াচ্ছে, বাড়ছে লাশের সংখ্যা। সাভারজুড়েই চলছে আহাজারি আর শোকের মাতম। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া সেই কান্না কিছুতেই থামছে না। অবিরাম বিলাপে স্বজনহারা মানুষের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। স্বজনহারাদের আহাজারি আর শোকে স্তব্ধ সাভার। হতবিহ্বল গোটা জাতি।
উদ্ধারকাজে নিয়োজিত একজন সেনা কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, এখনও এক থেকে দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাদের অনেকেই হয়তো মৃত। ধসে পড়া ভবনের ফাঁক-ফোকরে পড়ে বেঁচেও আছেন অনেকে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। অনেক নারী, পুরুষ তাদের বের করার জন্য আকুতি জানিয়ে আর্তনাদ করছেন। অনেকে বাতাসের অভাবে গরমে দম বন্ধ হয়ে আসার কথা বলছেন। তারা ইট, রড আর কংক্রিটের স্তূপে এমনভাবে আটকে রয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা তাদের বের করে আনার কোনো নিরাপদ উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।
লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে : রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ২৫০টি লাশের সংখ্যা তালিকাভুক্ত করেছে সাভার থানার পুলিশ। কিছুক্ষণ পর পর লাশ উদ্ধারের খবর আসছে। একেকটি স্লাব একটু করে উল্টাতেই বের হয়ে আসে ৪-৫টি লাশ। ভবনটিতে এখনও অনেক লাশ পড়ে আছে। শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা দুষ্কর। হস্তান্তর করা হয়েছে প্রায় ২০০ জনের লাশ। বাকিদের লাশ অধরচন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা করা হচ্ছে। সেখানে ২৯৯ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকাও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি নারীশ্রমিক। কর্মকর্তারা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধারের পর সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় মাঠে রাখা হচ্ছে। সেখানে স্থাপিত অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষের বোর্ডে প্রাথমিক তথ্য লেখা হচ্ছে। ওই বোর্ডের তথ্যমতে, বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১৪৫ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, পরিচয় না পাওয়া লাশের সংখ্যা কম। যেসব লাশের পরিচয় পাওয়া যাবে না, সেগুলো ফুলে ওঠার আগেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। পরে যাতে ওই সব লাশ শনাক্ত করতে ওই বিদ্যালয়ে একটি ফরেনসিক দল ডিএনএ নমুনা রেখে দিচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান জানান, রানা প্লাজা ধসে পড়ার সময় ভেতরে পাঁচটি পোশাক কারখানায় তিন হাজারের বেশি মানুষ ছিল। ভেতরে এখনও ঠিক কতজন আছেন আর কতজন বেরিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
লাশ ফুলে পচে যাচ্ছে : রানা প্লাজায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ পচে ফুলে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে লাশগুলোয় দ্রুত পচে যাচ্ছে। উদ্ধারকাজে দেরি হলে এসব লাশ শনাক্ত করা দুষ্কর হবে বলে জানান উদ্ধারকারী দলের একাধিক সদস্য। তারা বলেন, অনেক লাশ স্লাব ও ভিমের নিচে পড়ে থেঁতলে গেছে। রক্তমাখা ওই সব লাশ থেকে উত্কট গন্ধ ছড়াচ্ছে। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, সেই গন্ধ ততই বাড়ছে।
এখনও বাঁচার আর্তনাদ : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মী রফিকুল ইসলাম জানান, ভবন ধসের ২৮ ঘণ্টা পর তার মুঠোফোনে আনোয়ার নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ফোন করেন। আনোয়ার বলেন, তিনি ভবনের তৃতীয় তলায় আটকে আছেন। বেঁচে থাকলেও নড়াচড়া করার শক্তি নেই। বাতাসের অভাবে দম বন্ধ হয়ে আসছে। ওই ফ্লোর থেকে অনেকেরই আর্তনাদের শব্দ তার কানে ভেসে আসছে। মাঝেমধ্যে গোঙানির শব্দ পেয়েছেন। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, নিস্তব্ধতা বাড়ছে। ক্ষীণ হয়ে আসছে আর্তনাদের শব্দ। তার আশপাশে অনেক লোকের উপস্থিতি বুঝতে পারছেন। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনের সন্ধান না পাওয়ায় সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়া, মজিদপুর, রাজাসন, সোবহানবাগ, আড়াপাড়া, বক্তারপুর, উত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ঘরে ঘরে বিলাপ ও আহাজারির করুণ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
একমাত্র ছেলের জন্য বিলাপরত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বাসিন্দা মা সোনেকা বেগম। বলেন, যাওয়ার সময় ছেলে (১৭ বয়স, আয়রন ম্যান) আমায় বলল, মাসের কয়টা দিন বাকি আছে। না গেলে বেতন দেবে না। মা চিন্তা না করো না। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসব। বুধবার সকালে কথাগুলো বলেই ‘আমার ছেলে নাজমুল চলে গেল। আর ফিরল না। ও ছিল আমার একমাত্র ছেলে। চাকরি করত রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলায়।’ দুর্ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়ার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি। মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে ফিরছেন। না পেয়ে ধ্বংসস্তূপের চারপাশে পাগলের মতো খুঁজছেন। যাকে সামনে পাচ্ছেন, তাকেই তার ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছেন। শুধু নাজমুল নয়, ধসে পড়া ভবনের বিভিন্ন তলায় এখনও চাপা পড়ে আছে শত শত নারী-পুরুষ। চাপা পড়ার ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছেন। বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন। প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন মহান আল্লাহর কাছে।
ঝুলে আছে মানুষের হাত-পা : ধসে পড়া ভবনের চারপাশে ঝুলে আছে মানুষের হাত, পা ও শরীরের অংশ। গতকাল বিকাল পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রানা প্লাজার পূর্বপাশের তৃতীয় তলায় কালো রঙের প্যান্ট পরা এক যুবকের কোমর থেকে পা পর্যন্ত বের হয়ে আছে। বাকি শরীরের ওপর পাঁচটি ছাদ ধসে পড়ে আছে। পরের তলায় একটি পা দেখা গেছে, বাকি অংশ ধ্বংসস্তূপে ঢাকা পড়েছে। ওই পা থেকে প্রায় তিন গজ দূরে দেখা গেছে চাপা পড়া একটি হাত। হাতটি ফুলে গেছে। শরীরের বাকি অংশ চাপা পড়ে আছে মোটা বিমের নিচে। উদ্ধারকর্মীরা জানান, এরা সবাই মৃত। ঘটনার পরপরই মারা গেছেন। এই মৃতদেহগুলো উদ্ধার করতে গেলে ছাদ কেটে বের করতে হবে।
উদ্ধারকাজে অগ্রগতি : গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫০ শতাংশ উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা জানান। তারা পঞ্চম তলা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এছাড়া নিচে যেটুকু সম্ভব ছিদ্র করে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী বলেন, যারা আটকে পড়েছেন, তাদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত ১ হাজার ১০০ সদস্য এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। উদ্ধার অভিযানে আছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বিজিবি সদস্যরাও। পাশাপাশি স্থানীয় বহু মানুষ শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন কংক্রিট স্তূপের নিচ থেকে আটকে পড়াদের বের করে আনার কাজে। পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উত্সুক মানুষকে সামাল দেয়ার কাজ করছেন।
আইএসপিআরের পরিচালক শাহিনুর ইসলাম বলেন, সবার আগে জীবিতদের উদ্ধারের দিকে জোর দিচ্ছি আমরা। হতাহত সবাইকেই আমরা উদ্ধার করব। উদ্ধারকাজে ‘ধীরগতি’র বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ধসে পড়া ভবন থেকে ক্রেন দিয়ে টেনে স্ল্যাব সরিয়ে নেয়ার মতো প্রযুক্তি সেনাবাহিনীর হাতে আছে। কিন্তু ভেতরে আটকা পড়া জীবিতদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ধীরে ধীরে কেটে বের করতে হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স ও সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। গতকালও কংক্রিট কেটে ছিদ্র করে ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। ওই ছিদ্র দিয়েই পানি ও খাবার পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
ছিদ্র করে সরবরাহ করা হচ্ছে অক্সিজেন ও পানি : দুই একরের বিশাল আয়তনের স্যান্ডউইচের মতো লেপ্টে যাওয়া ভবনটিতে এখনও অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছে। তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা গর্ত করে বিশেষ পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন, পানি ও শুকনো খাবার সরবরাহ করছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভেতরে মূলত প্রচণ্ড গরম আর অক্সিজেনের অভাবে আটকে পড়া লোকজন মারা যেতে পারে। তাই অক্সিজেন ও পানি সরবরাহ করছেন তারা। গর্ত করে ভেতরে প্রবেশ করে একে একে আটকে পড়া লোকজনকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। ভেতরে লাশের পাশাপাশি অজ্ঞান অবস্থায় বেশ কয়েজনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান।
রানার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল : এদিকে ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও তার বাবা আবদুল খালেকের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্থানীয় বিভিন্ন গার্মেন্টেসের শ্রমিক ও বাসিন্দারা। গতকাল বেলা দুইটার দিকে ধসে পড়া ভবনের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সহস্রাধিক কর্মী আশুলিয়া, কাঠগড়া ও বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আসেন।
চারটি তদন্ত কমিটি : ভবনটি ধসে পড়ার কারণ খুঁজে বের করা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য মোট চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার দিনই পাঁচ সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে তদন্ত কমিটিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল নিজ কক্ষে জানান, অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট মনোজ কুমার রায়কে প্রধান করে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক-২-কে প্রধান করে চার সদস্যের আরেকটি কমিটি হয়েছে বলে জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ।
গতকাল চারটি তদন্ত কমিটির সদস্যরা আলাদাভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। ভবনের ইট-বালু পরীক্ষার জন্য আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেছেন। বিভিন্নজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন।
রানাকে দেখামাত্রই গ্রেফতার : রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সোহেল রানাকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হবে। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ নির্দেশ দিয়ে রানাকে যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকেই ধরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বুধবার রাত থেকে আমরা সোহেল রানাকে খুঁজছি। আশা করছি, শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে। বুধবার ভবন ধসের সময় ওই ভবনেই ছিলেন সাভার পৌরসভা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা। পরে জনতার রোষানল থেকে বাঁচাতে স্থানীয় এমপি মুরাদ জং তাকে উদ্ধার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান।
রানার বিরুদ্ধে রাজউক ও পুলিশের মামলা : রানা প্লাজার মালিক স্থানীয় পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা এবং ওই ভবনের পাঁচ গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। বুধবার মধ্যরাতে সাভার থানায় রাজউক ও পুলিশ বাদী হয়ে এসব মামলা দায়ের করে। পুলিশ বাদী হয়ে ভবনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের হত্যার অভিযোগে রানা প্লাজার মালিক ও পাঁচ গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। ইমারত আইনে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
Comments