কাজীপাড়ায় ছাত্রলীগ নেতা খুন, প্রতিবাদে ভাঙচুরের মহোৎসব



নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২২-০৪-২০১৩
  • সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ছাত্রলীগের নেতা এ কে এম ফজলুল হকের স্বজনদের আহাজারি
    সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ছাত্রলীগের নেতা এ কে এম ফজলুল হকের স্বজনদের আহাজারি
    ছবি: প্রথম আলো
  • ছাত্রলীগের নেতা এ কে ফজলুল হক পাটোয়ারী হত্যার জের ধরে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাজীপাড়ায় রাস্তা অব
    ছাত্রলীগের নেতা এ কে ফজলুল হক পাটোয়ারী হত্যার জের ধরে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাজীপাড়ায় রাস্তা অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। এ সময় শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করা হয়
    ছবি: প্রথম আলো
1 2
রাজধানীর পূর্ব কাজীপাড়ায় গতকাল রোববার সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হয়েছেন ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা এ কে ফজলুল হক পাটোয়ারী ওরফে বাবু (২৫)। এই হত্যার জের ধরে দুপুরে রাস্তা অবরোধ করার পর এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় ছাত্রলীগ নামধারীরা। স্থানীয় লোকজন জানান, এ সময় শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। 
নিহত ফজলুল হক ৯৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর বাবা হেদায়েতউল্লাহ পাটোয়ারী ও অন্য স্বজনদের অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ‘সন্ত্রাসীরা’ ফজলুল হককে হত্যা করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে ফজলুল হক পূর্ব কাজীপাড়ার ইটাখোলা বাজারসংলগ্ন এক রিকশার গ্যারেজে বসে ছিলেন। এ সময় দুই তরুণ তাঁকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। এর পর তারা হেঁটে হেঁটে কাছের গলিতে গিয়ে সেখানে রাখা মোটরসাইকেলে চড়ে স্থান ত্যাগ করে।
গুলিবিদ্ধ ফজলুলকে স্থানীয় লোকজন একটি ভ্যানে তুলে দেন। পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ সূত্র জানায়, নিহতের শরীরে পাঁচটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, খুনি দুই তরুণের একজনের মাথায় হেলমেট ও আরেকজনের মুখে ধুলা-বালি প্রতিরোধক মুখোশ ছিল। 
নিহত ফজলুলের বাবা হেদায়েতউল্লাহ পাটোয়ারী বলছেন, জমিজমার বিরোধই এ হত্যার পেছনের কারণ। তিনি বলেন, ফজলুলের মামা লুৎফর রহমান কাজীপাড়ায় নিজের ৫ শতাংশ জমিতে টিনশেড বাসা তুলে সপরিবারে থাকতেন। আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বহুতল ভবন করার জন্য গত বছর টিনশেড বাড়িটি ভাঙা হয়। এরপরই জমির সাবেক মালিকের তরুণ ছেলে এসে জমির মালিকানা দাবি করেন। একপর্যায়ে জমির ওপর আর দাবি করবেন না এ শর্তে তাঁকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরও তিনি টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কয়েক দিন আগে এলাকায় এলে ফজলুলের ঘনিষ্ঠ লোকজন তাঁকে মারধর করেন। তখন ওই তরুণ ফজলুলকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। ফজলুলের বাবা হেদায়েতউল্লাহ জানান, হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁকেই সন্দেহ করছেন তিনি। 
নিহত ফজলুলের মামা ও জমির মালিক লুৎফর রহমানও দাবি করেন, জমির সাবেক মালিকের ছেলেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁরা আর কাউকে সন্দেহ করেন না।
তবে গতকাল বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম বলেন, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ যখন সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত, তখন ছাত্রসমাজের নন্দিত নেতা ও মেধাবী ছাত্রনেতা ফজলুল হককে হত্যা করেছে বিএনপি ও জামায়াত।
ফজলুলের স্বজনেরা জানান, সম্মান শ্রেণীতে পড়ার সময় শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ে তাঁর। এরপর মিরপুরের একটি কলেজে স্নাতকে (ডিগ্রি) ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। এরপর তাঁর শিক্ষাজীবনের কথা আর কেউ বলতে পারেন না। ফজলুল এলাকায় ডিশের ব্যবসা করতেন।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, এ ঘটনায় একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। রিকশা গ্যারেজের মালিক জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে ভাঙচুরের বিষয়ে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানান তিনি।
প্রতিবাদের নামে তাণ্ডব: গতকাল দুপুরে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর থেকে রোকেয়া সরণি ধরে যতদূর চোখ যায়, রাস্তার ওপর ছিল শুধু ভাঙা কাচ আর ইটের টুকরো। ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগ নামধারী কর্মী-সমর্থকেরা এই তাণ্ডবের জন্য দায়ী বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তাঁরা বলেন, হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দুপুর ১২টার দিকে ফজলুলের ঘনিষ্ঠরা রোকেয়া সরণি অবরোধ করেন। এতে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে পুলিশ মোতায়েন করার পর এক ঘণ্টার মধ্যে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এরপর বেলা দুইটার দিকে ছাত্রলীগ নামধারী একদল তরুণ মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে লাঠিসোঁটা আর ইট নিয়ে গাড়ি ভাঙা শুরু করেন। তাঁরা ক্রমে মিরপুর ১৩, ১০ নম্বর গোলচক্কর, রোকেয়া সরণি হয়ে কাজীপাড়া পর্যন্ত গাড়ি ভাঙতে ভাঙতে এসে গলির ভেতরে ঢুকে যান। আরেকটি দল মিরপুর ১০ নম্বর হয়ে সোজা মিরপুর ২ নম্বরের দিকে যেতে যেতে গাড়ি ভাঙে। সবচেয়ে বেশি ভাঙচুরের শিকার হয় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো। 
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, আতঙ্কে তাঁরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, রাস্তায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ থাকলেও তারা তাণ্ডব ঠেকানোর মোটেই চেষ্টা করেনি। বাস, কার, হাসপাতালের গাড়ি, অটোরিকশাসহ সব মিলিয়ে শতাধিক গাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা। এ সময় প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক আব্দুল ওয়ারেছের গাড়িটিও (ঢাকা মেট্রো খ ১২-৯৩৭০) ভাঙচুর করা হয়।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জসিমউদ্দীন বলেন, পুলিশ ঠেকিয়েছে বলেই ভাঙচুর কম হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শতাধিক নয়, ১০-১২টি গাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়েছে।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জসিমউদ্দীন বলেন, পুলিশ ঠেকিয়েছে বলেই ভাঙচুর কম হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শতাধিক নয়, ১০-১২টি গাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়