সৌদিতে গ্রেপ্তার আতঙ্কে চার লাখ বাংলাদেশি
জানা গেছে, শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতিদিনই ভিড় করছেন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। যোগাযোগ করা হচ্ছে ঢাকার পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়েও। আতঙ্ক আরো বেড়ে গেছে গত ১৭ এপ্রিল সৌদি আরবের শ্রমমন্ত্রী আদেল আল-ফাকিহর এক ঘোষণায়। সৌদি শ্রমমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা জানায়, দেশটিতে যেসব বিদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে কাজ করছেন, তাঁদের ধরতে সরকার শিগগির নতুন অভিযান শুরু করবে। অভিযানে অবৈধ কর্মীরা ধরা পড়লে ২৬ হাজার ৭০০ ডলার (প্রায় ২০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা) জরিমানা বা দুই বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সৌদি নাগরিকদের বেকারত্বের হার কমাতেই এমন উদ্যোগ নেয় ওই দেশের সরকার।
এর আগে গত ৬ এপ্রিল সৌদি বাদশাহর বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, বাদশাহ আবদুল্লাহ ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা সংশোধনে বিদেশি শ্রমিকদের তিন মাস সময় বাড়িয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। আর ওই অবস্থায় আগামী তিন মাসের মধ্যেই সৌদি থেকে প্রায় চার লক্ষাধিক শ্রমিক বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এবং সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য যানা গেছে।
সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা জানান, সংকটের শুরু ২০১১ সালে সৌদি সরকারে একটি সিদ্ধান্তের পর। সৌদি নাগরিকদের কর্মমুখী করতে ওই সময় সরকার যেকোনো কারখানায় ২০ শতাংশ সৌদি নাগরিক থাকা বাধ্যতামূলক করে দেয়। যেসব প্রতিষ্ঠান এ শর্ত পূরণ করতে পারেনি সেগুলো 'রেড ক্যাটাগরিতে' পড়ে যায় এবং এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকদের আকামা ট্রান্সফার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেশির ভাগই রেড ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় আকামা নবায়ন করতে পারছেন না। ফলে তাঁরা দিন দিন অধিক হারে অবৈধ তালিকায় পড়ে যাচ্ছে। তবে বেঁধে দেওয়া সময়সীমার পর (তিন মাস) যাঁরা তাঁদের স্ট্যাটাস গ্রিন ক্যাটাগরিতে নিতে ব্যর্থ হবে, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হবে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা বৈধ হতে গেলে একমাত্র উপায় তাঁদের রেড ক্যাটাগরির কফিল (নিয়োগ কর্তা) পরিবর্তন করে গ্রিন ক্যাটাগরির কফিলের কাছে আকামা ট্রান্সফার করা। সৌদিতে প্রায় ৯০ লাখ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছেন প্রায় ২৫ লাখ। তাঁদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় লাখ কর্মীই আকামা ট্রান্সফার করতে না পারায় অবৈধ হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সৌদি সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটার সরাসরি আমরা বিরোধিতা করতে পারি না। কারণ সৌদিতে হজ ভিসায় গিয়ে আর ফেরেনি অনেকেই। তিন বছরের ভিসায় গিয়ে অনেকেই ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বসবাস করছে। কেউবা এক মালিক ছেড়ে অন্য মালিকের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। নীতিগতভাবে সৌদি সরকারকে এই বিষয়ে কোনো অনুরোধ করতে পারি না। তবে আমাদের অভিমত দিতে পারি যে যারা এখন সৌদিতে দীর্ঘদিন বসবাস করছে, এসব শ্রমিক সৌদির ভাষা বুঝে, তারা কাজে অনেক দক্ষ। ওই সব শ্রমিকদের সৌদিতে অবস্থানের সুযোগ দিলে সৌদির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি লাভবান হবে- এমন যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে।' তিনি আরো বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি বৈধভাবে নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে বাংলাদেশে চলে আসে, তারা পুনরায় সৌদিতে যাওয়ার সুযোগ পাবে। একসঙ্গে পাঁচ থেকে ছয় লাখ শ্রমিক বাংলাদেশে ফেরত এলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সৌদির শ্রমবাজার আবার খুলতে যাচ্ছে।
সৌদিতে আছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মুহিদউল্লাহ আরমানীর ছেলে আসলাম আরমানী। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গিয়েছেন সৌদিতে। মালিক পরিবর্তন করে অন্য মালিকের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তিনি। আসলাম বলেন, 'তিন বছর ধরে সৌদিতে আসছি, কিন্তু খরচের টাকাই ওঠাতে পারিনি। এখন কাগজপত্র নাই বলে আগামী তিন মাসের মধ্যে ফেরত যেতে হবে।' নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের মিজানুর রহমান বলেন, 'ওয়েল্ডিং কাজে যে প্রতিষ্ঠানে আসছিলাম সেখানে কাজ নেই বলে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। এখন সৌদি সরকার খুব কড়াকড়ি আইন করছে। এবার মনে হয় আর থাকা যাবে না।' এই শ্রমিকরা জানান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশের অবৈধ প্রবাসীরাও আতঙ্কে আছেন।
Comments