মৌয়ালরা সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত; ৫০০ কুইন্টাল মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ
মংলা থেকে মনিরুল ইসলাম দুলু : সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে চলতি মাস থেকেই মধু ও মোম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে মৌয়ালরা। বনবিভাগ এ বছর ৫০০ কুইন্টাল মধু ও ১৪০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মৌয়ালদের পাস-পারমিট দিয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৭৮ কুইন্টাল মধু ও ১২০ কুইন্টাল মোম সংগৃহীত হয়েছে। যা থেকে রাজস্ব আদাই হয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৬২০ টাকা। মৌয়ালীরা আধুনিক পদ্ধতিতে মধু ও মোম সংগ্রহ না করে সনাতন পদ্ধতিতে তারা মধু সংগ্রহ করে থাকেন। এ কারণে সুন্দরবনের মধু সম্পদ এখন হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। মধু সংগ্রহের এই মৌসুম চলবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকারী সিডরের আঘাতে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে ২০০৮ সালে বন বিভাগের মধু ও মোম সংগ্রহের পাস-পারমিট দেয়া হয়নি।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কুইন্টাল মধু সংগ্রহের জন্য মৌয়ালদের কাছ থেকে ৭৫০ ও মোমে এক হাজার টাকা করে রাজস্ব আদায় করা হয়।
ডিএফও মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী আরও জানান, ২০১০-১১ অর্থবছরে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগে থেকে ২২০.৫২ কুইন্টাল মধু ও ৪৭.৮৬ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৯৬ কুইন্টাল মধু ও ১০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করে ৪ লাখ ৬৪০ টাকা ।
মাংলার মিঠাখালীর মৌয়াল মো. আলম জানান, সুন্দরবনের গহীন জঙ্গলে প্রচুর মৌচাক রয়েছে। বৃহৎ আকৃতির এসব মৌচাকে প্রচুর মধু পাওয়া যায়। সুন্দরবনের খসলী ও গেওয়া গাছ যে অঞ্চলে বেশি সেখানে মৌচাকের সংখ্যাও বেশি। খসলী এবং গেওয়া গাছ থেকে প্রাপ্ত মধু খুবই মিষ্টি এবং মানেও উৎকৃষ্ট।
মংলা উপজেলা এলাকার মৌয়াল শরিফুল ইসলাম জানান,তারা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে মধু ও মোম সংগ্রহ করেন। সনাতন পদ্ধতিতে তারা মধু সংগ্রহ করে থাকেন। আধুনিক পদ্ধতিতে (বিজ্ঞানসম্মত) মধু ও মোম সংগ্রহ করতে চান তারা।
মো. ইদ্রিস জানান, মৌয়ালরা এখনও আগুন জ্বালিয়ে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে থাকে। যার ফলে প্রতি বছরই লাখ লাখ মৌমাছির মৃত্যু ও বনে অগ্নিকা-ের ঘটনাও ঘটে। এতে সুন্দরবনের মধু সম্পদ ধীরে ধীরে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী আগুনের ধোয়া দিয়ে চাক থেকে মৌমাছি তাড়িয়ে মধু সংগ্রহ করতে হবে। মংলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. নূর আলম শেখ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যম সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দাবি করে জানান, সুন্দরবনে মধু ও মোম সংগ্রহ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরও জানান, মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করতে-আধুনিক পদ্ধতি ও উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে সবকিছু করা প্রয়োজন।
উল্লে¬খ্য বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম সীমান্তে বঙ্গোপসাগরের তীরে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর ও বরগুনা, এই পাঁচটি জেলা এবং ভারতের পঞ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের অবস্থান ।বিশ্বের সর্ববৃহৎ একক ম্যানহ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর । মোট আয়তনের বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটার। এর বন এলাকা হচ্ছে, ৪ লাখ ১ হাজার ৬০০ হেক্টর এবং নদী-খাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর। সুন্দরবনের যতটা এলাকা জুড়ে বনভূমি রয়েছে তার মধ্যে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৩৪০ হেক্টর উন্নত বনভূমি এবং ২৬ হাজার ৮০৭ হেক্টর অপ্রধান বনভূমি।

Comments