বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন’ দেশের বিবেক রিমান্ডে



আ ব দু ল হা ই শি ক দা র
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
এক.
আমার আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য হওয়ার কথা ছিল বৈশাখ। বাংলা সন। বাংলা সনের জন্ম নিয়ে চেপে যাওয়া কিছু ইতিহাস তুলে ধরা। কিন্তু আমাদের সরকার সে সুযোগ না দিয়ে আমাকে এখন দাঁড় করিয়ে রেখেছে মাহমুদুর রহমানের কক্ষে তার স্পর্শ করতে না পারা চায়ের কাপের সামনে। তিনি চেয়েছিলেন সকালের নাস্তার শেষে পরিবেশিত ধূমায়িত চা-টুকু পান করতে। সে সময় তিনি পাননি। তিনি চেয়েছিলেন দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিতে। তাও তাকে করতে দেয়া হয়নি। ভদ্রতা-সভ্যতার বদলে তার দিকে তাক করা হয় হিংস্র অস্ত্র। তিনি মৃদু হাসলেন। তরপর টেবিলের ওপর থেকে পবিত্র কোরআন শরীফটা হাতে নিয়ে ওদের বললেন, ‘চলুন। আমি প্রস্তুত।’ গাড়িতে তোলার আগ মুহূর্তেও তিনি ছিলেন দৃঢ় এবং অবিচল। সহকর্মীদের উদ্দেশে তার শেষ উচ্চারণ ছিল—‘পত্রিকা চালিয়ে যান, আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’ শেষ মুহূর্তেও ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তার কাছে বড় হয়ে থাকলো দেশ, আমার দেশ, জনগণের মঙ্গল।

নিজের চেয়ে বড় করে যিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে দেখেছেন, নিজের ভালো-মন্দের চেয়েও যিনি বড় করে দেখেছেন জনগণের স্বার্থকে, নিজের জীবনের চেয়েও যিনি আমার দেশকে ভালোবেসেছিলেন, সেই মানুষটাকে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল ওরা।
ওরা এসেছিল ‘মানুষ’ ধরার দল। নড়ে উঠল রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা :
‘ওরা এল লোহার হাতকড়ি নিয়ে,
নখ যাদের তীক্ষষ্ট তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
সত্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করলো আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।’
ওরা এসেছিল আলোর প্রদীপ নেভাতে। ওরা এসেছিল সত্যকে কারারুদ্ধ করতে। ওরা এখন বাংলাদেশের সত্যকে ১৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে গেছে। সত্য প্রকাশের দায়ে বাংলাদেশের বিবেককে পিষে মারার জন্য নিয়ে গেছে।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাহমুদুর রহমান ঘোষণা করলেন, মাননীয় আদালত, আমার কোনো আইনজীবীর দরকার নেই। তিনি দ্বিধাহীনভাবে অকম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘মাননীয় আদালত, বিচার বিভাগ স্বাধীন হলেও বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ নেই। সরকার বিচার বিভাগকে তার আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। আমি কোনো আইনজীবী নিয়োগ করলে তারা আপনার কাছে আমার জামিনের আবেদন ও রিমান্ড বাতিলের প্রার্থনা করবেন। কিন্তু আপনি তাদের আবেদন মঞ্জুর করে আমাকে জামিন দিতে পারবেন না। আবার রিমান্ডও বাতিল করতে পারবেন না। আপনার হাত-পা বাঁধা। সরকারের নির্দেশের বাইরে গিয়ে স্বাধীন বিচারিক মানসিকতা থেকে বিচার করার সুযোগ নেই। আমি আইনজীবী নিয়োগ করলে যা হবে, না করলেও একই ফল হবে।’
গণমাধ্যমে মাহমুদুর রহমানের এই বক্তব্য পাঠ করে অভিভূত হয়েছি। উদ্বেলিত হয়েছি। সঞ্জীবিত হয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার পর থেকে ৪২ বছর ধরে যে সত্যনিষ্ঠ, সাহসী মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে, সেই মানুষ যেন কলরব করে ওঠলো মাহমুদুর রহমানের কণ্ঠে। পাপের কাছে, অন্যায়ের কাছে, জুলুমের কাছে, স্বার্থের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে যারা অন্যদেরও তাদের মতো সুবিধাবাদী হতে বলে, তাদের কাছে মাহমুদুর রহমানের এই ভাষা নিশ্চয়ই অসহনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ মাহমুদুর রহমানের এই উচ্চারণের মাধ্যমে বহু বহু দিন পর আবার নতুন করে ফিরে পেল তার হারানো গৌরব। আর মাহমুদুর রহমান নিজেকে নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়।
আমি বাংলা ভাষার একজন সামান্য কবি হিসেবে, একজন সাংবাদিক হিসেবে তাকে জানাচ্ছি অভিনন্দন :
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

আসছে এবার অনাগত প্রলয় নেশার নৃত্যপাগল,
সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙলো আগল।
মৃত্যুগহন অন্ধকূপে
মহাকালের চণ্ডরূপে—
ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর—
ওরে ঐ হাসছে ভয়ংকর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

দুই.
আমি গর্ববোধ করছি মাহমুদুর রহমানের মহীয়সী মা মাহমুদা বেগমের জন্যও। মাহমুদুর রহমানকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছে সেই ডিবি অফিসের উল্টো পাশের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এই মমতাময়ী জননীর ‘বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন’ আমরা শুনলাম। এবং অশ্রুসিক্ত চোখের অশ্রুর সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে গেল আমাদের সবার অন্তর্গত সব শুভ কামনা। না, তিনি কোনো জুলুমের কাছে হাত পাতেননি। মাথা নত করেননি কোনো ফ্যাসিস্ট শাসকের কাছে। বীর পুত্রের বীর জননীর মতোই তিনি চোখের পানিকে গভীর গহীন বেদনার্ত বার্তার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর দিকে। বলেছেন, ‘আমার ছেলেটা সংগ্রামী; মানুষের অধিকারের জন্য লড়ে যাচ্ছে। এজন্য তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। আমার বাচ্চাটাকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিতে পৃথিবীর কাছে অনুরোধ করি।’
আমার মনে হচ্ছিল কারবালা রণাঙ্গনে কাশেমের জননীর কথা। মনে হচ্ছিল মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলীর জননী ‘বি আম্মা বেগমের’ কথা। যে মাকে সারা উপমহাদেশ সে সময় ‘আম্মা’ হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদ যে মাকে অকুণ্ঠ চিত্তে বার বার জানিয়ে গেছেন গভীর শ্রদ্ধা। বি আম্মা বেগম বলতেন, ‘আমার শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলীকে কওমের খেদমতের জন্য আল্লাহর নামে উত্সর্গ করেছি। পরাধীন দেশের অপমান ও বেদনা দূর করার জন্যই, হে আমার প্রতিপালক, তারা জীবনবাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে। তুমি তাদেরকে দৃঢ়চিত্ত রাখো। কামিয়াব কর।’

তিন.
মাহমুদুর রহমানের আজকের অবস্থান ও ভূমিকার অনেক আগে ১৯২২ সালে আরও একজন সম্পাদক স্বদেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রথমবারের মতো রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এদেশে। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তার কবি খ্যাতি ও সঙ্গীতের বিশালত্বের নিচে চাপা পড়ে গেছে আরও অনেক পরিচয়।
নজরুল ছিলেন বাংলাদেশের গণমুখী সাংবাদিকতার জনক। নজরুলের আগে সংবাদপত্র বলতে যা ছিল তা ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজা-জমিদারদের। তারা আজকের বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যম মালিকের মতোই ঔপনিবেশবাদী, সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের পা চেটে জীবন ধন্য করতেন। সংবাদ বলতে যা ছিল তার প্রায় পুরোটা জুড়েই থাকতো সরকারের স্তুতি এবং নিজেদের নানান কীর্তির বর্ণনা। সাধারণ মানুষের জন্য সেখানে কোনো সুযোগ থাকতো না। ক্ষেত্রবিশেষে তারা ছিলেন ব্রাত্য। প্রবেশের অধিকার বঞ্চিত। ফলে তাদের কষ্ট, যাতনা, শোষণ, বঞ্চনার কোনো ছাপই থাকতো না পত্রিকার পাতায়। আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে কথা বলা তো তাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। এই অচলায়তনের দরজা ভেঙে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো নজরুল প্রবেশ করেন সাংবাদিকতায়। সেই ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশ করেন অবিস্মরণীয় ‘ধূমকেতু’। সাধারণ মানুষ উঠে এলেন সত্যিকারের নায়কের মর্যাদায়। তাদের রক্ত, ঘাম আর দাহ জায়গা নিল পাতায় পাতায়। পরাধীনতার বিরুদ্ধে কলমকে তরবারির মতো ব্যবহার শুরু করলেন নজরুল। আমাদের আজকের দিনের আত্মরতিতে মগ্ন বুদ্ধিজীবীদের মতো, শাস্ত্রীয় শকুনদের মতো, সেদিনের কলকাতার পোঁদ পাকা, পকস্ফ কেশ বুদ্ধিজীবীরাও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলেন। তবে সে অস্বস্তি গোপন করে দোহাই পাড়লেন নীতিকথার, ব্যাকরণের। এর নাম কি সাংবাদিকতা? নজরুল বললেন, ‘জামা ধরা ধামা ধরা মরণ ভীতু চুপ রহ।’ তারপর সগৌরবে, অতি উচ্চকণ্ঠে সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘোষণা করলেন উপমহাদেশের স্বাধীনতা। বললেন, ‘কোন স্বরাজ টরাজ বুঝি না। ধূমকেতু চায় ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা। এ দেশের এক ইঞ্চি জমিও থাকবে না পর পদানত।’
মাথায় যেন বাজ পড়লো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের। তারা গ্রেফতার করলেন নজরুলকে। বন্ধ করে দিলেন ধূমকেতু।
কিন্তু অকুতোভয় নজরুল থোরাই পরোয়া করলেন সেসব। বিচারক সুইনহোর কোর্টে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি করলেন নতুন এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। সেই ইতিহাসের নাম ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। বাংলাদেশ তো বটেই, সমগ্র বিশ্বেও তুলনা নেই ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’র। বললেন, আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।
এক ধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর জন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। রাজার পক্ষে—নিযুক্ত রাজবেতনভোগী রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে—সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অন্তকাল ধরে সত্য—জাগ্রত ভগবান।
আমি জানি এবং দেখেছি— আজ এই আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় একা আমি দাঁড়িয়ে নেই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্যসুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। যুগে যুগে তিনি এমনি নীরবে তাঁর রাজবন্দী সত্য-সৈনিকের পশ্চাতে এসে দণ্ডায়মান হন। রাজনিযুক্ত বিচারক সত্য বিচারক হতে পারে না। এমনি বিচার-প্রহসন করে যেদিন খ্রিস্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হল, গান্ধীকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল, সেদিনও ভগবান এমনি নীরবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের পশ্চাতে। বিচারক কিন্তু তাঁকে দেখতে পায়নি, তার আর ভগবানের মধ্যে তখন সম্রাট দাঁড়িয়েছিলেন, সম্রাটের ভয়ে তার বিবেক, তার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গেছিল। নইলে সে তার ঐ বিচারাসনে ভয়ে বিস্ময়ে থর্থর্ করে কেঁপে উঠত, নীল হয়ে যেত, তার বিচারাসন সমেত সে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
বিচারক জানে আমি যা বলেছি, যা লিখেছি তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু তবু হয়ত সে শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য।
এই ঘটনার ৯১ বছর পর প্রায় একই রকমভাবে সত্যের পক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন মাহমুদুর রহমান। নজরুলের সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। আর মাহমুদুর রহমানের সংগ্রাম হলো স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। তার ‘জেল থেকে জেলে’, তার ‘আমার দেশ’ এই সংগ্রামের স্মারক।
মাহমুদুর রহমানও নজরুলের মতোই ভোগ করেছেন কারা নিগ্রহ। এখন আছেন আরেক জুলুমের মুখে। পরশ্রীকাতর ছোটলোকদের কাছ থেকে তাকেও সইতে হয়েছে ‘চান্স এডিটর’-এর অপবাদ।
কিন্তু সবাই জানে ইতিহাস যেমন নজরুলকে দান করেছে অমরত্ব, তেমনি ইতিহাস মাহমুদুর রহমানেরও পক্ষে।

চার.
স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রিয়জনদের একজন ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। এরশাদের কবিতা নিয়ে এসে ‘শামসুর রাহমান মনোনীত কবিতা’ শিরোনামে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নিয়মিত ছাপাতেন তিনি। এরশাদের উদ্যোগেই বাংলাদেশের একমাত্র কবি হিসেবে দিল্লির রাইসা হিলে অর্থাত্ প্রেসিডেন্ট ভবনে ‘শামসুর রাহমানের একক কবিতা’র আসর বসেছিল। এ সৌভাগ্য বাংলাদেশের আর কোনো কবির হয়নি।
কবি সৈয়দ আলী আহসান, কবি শামসুর রাহমান, কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখের চেষ্টায়, এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ কবিতা কেন্দ্র’। এরশাদ সাহেব ধানমন্ডিতে একটি বাড়িও দান করেছিলেন কবিতা কেন্দ্রকে।
পরে এই কবিতা কেন্দ্র নিয়েই ঝামেলা বাধে কবিদের মধ্যে। ধীরে ধীরে এ থেকে সরে যান শামসুর রাহমান। মওকা বুঝে সটকে পড়েন সৈয়দ শামসুল হকও।
তো এমনি এক পর্যায়ে শামসুর রাহমান রচনা করেন তার বহুল আলোচিত কবিতা ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। এরশাদ যত খারাপই হোক, তবুও একথা হলফ করে বলা যায়, ১ মাসে ২ শ’ লোককে গুলি করে হত্যা করেনি তার সরকার। অনেক অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানা তিনি করেছেন। কিন্তু উন্নয়নমূলক কিছু কাজও করেছিলেন। তারপরও আমরা সবাই তার শাসনামলকে ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ বলে গালাগাল করেছি। বলেছি তিনি স্বৈরশাসক।
এখন শেখ হাসিনার শাসনামলের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই এরশাদকে স্বৈরশাসক বা অগণতান্ত্রিক শাসক বলে গাল দিতে অনেকেই ইতস্তত করবেন। কারণ এরশাদের চাইতে কমপক্ষে দুইশ’ গুণ বেশি অপকর্ম করে বসে আছে এই সরকার। সচল-সজীব চলমান প্রাণবন্ত বাংলাদেশকে শেখ হাসিনার সরকার পরিণত করেছে দলিত-মথিত মাংসপিণ্ডে। এটা এখন দক্ষিণ এশিয়ার কসাইখানা। উদ্ভট উট তো দূরের কথা, কোনো কুিসত বিশেষণেই আর এখনকার বাংলাদেশের প্রকৃত দুরবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতির এতই অবনতি ঘটেছে যে, মনুষ্যরচিত কোনো ভাষায়ই এর আসল চিত্র ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। বাংলাদেশকে এই সরকার ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা, হিংস্রতা, হানাহানি, বিভেদ, বিভক্তি, অশ্রদ্ধার ভাগাড়ে পরিণত করেছে।
এরকম একটি দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে বসে ড. আসিফ নজরুল যখন বলেন, ‘মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারের আক্রোশ দীর্ঘদিনের। তিনি সরকারের সব দুর্নীতি, অনাচার ও দেশবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দেশের সবচেয়ে সোচ্চার ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ। তাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন তাই সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক ও গণবিরোধী নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। যে সরকার সংসদ সদস্যের নিজের পিস্তলের গুলিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে গ্রেফতার করে না, শটগান উঁচিয়ে গুলি করা বা দুর্নীতির প্রামাণ্য অভিযোগে অভিযুক্ত দলের নেতাদের আটক করে না, নির্মম খুনি ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা প্রদান করেন—তার মুখে একজন সম্পাদককে এভাবে গ্রেফতার করা আইনের শাসন, এটি শুনলে হাস্যকরই শোনায়। মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী একটি পদক্ষেপ। আমি তার গ্রেফতার ও তাকে ১৩ দিনের রিমান্ড প্রদানের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আমি দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাসও প্রকাশ করছি যে, মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারে যেসব সম্পাদক ও সাংবাদিক দিনরাত টিভিতে প্রকাশ্যে প্ররোচনা দিয়েছেন এবং যারা সরকারের গণবিরোধী পদক্ষেপের প্রচারণায় নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের চেয়ে মাহমুদুর রহমান অনেক বেশি শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন।’
ড. আসিফ নজরুলকে এখন ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করি কোন মুখে। আমরা বরং প্রার্থনা করি এই আকালের দিনে সব মানুষের মধ্যে শুভ বুদ্ধি বিপুল-বিশাল শক্তি নিয়ে জেগে উঠুক।

a_hyesekder@yahoo.com

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়