স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বয়ান : আঙ্গুল চোষা-খুঁটি নাড়ানো অতপর...



মৌলবাদী বিএনপি সমর্থকরা স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করায় সাভারের ভবনটি ধসে পড়তে পারে : বিবিসিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

« আগের সংবাদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেছেন, মৌলবাদী বিএনপির কিছু ভাড়াটে হরতাল সমর্থক সাভারের ভবনটির ফাটল ধরা দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে সেটাও একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
বুধবার রাতে বিবিসিতে প্রচারিত সাক্ষাত্কারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করলে ভবনটি ধসে পড়তে পারে কিনা জানতে চাইলে বিবিসিকে মখা আলমগীর বলেন, ভবন ধসে পড়া সম্পর্কে আপনাকে একথাও মনে রাখতে হবে যে ধসে পড়া ভবনের কোনো অংশ নিয়ে নাড়াচাড়া করলে অন্য অংশের ওপর এর প্রতিক্রিয়া পড়ে।
তবে একইসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইমারত নির্মাণের নিয়ম কানুন যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি বলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এজন্য যারা ভবনের নকশা অনুমোদন করেছেন এবং যারা নির্মাণ তদারকি করেছেন তারাও দায়ি।
আগের দিনের ফাটলের পরেও সেখানে কাজ করতে যাওয়ার জন্য মাইকে ডাকা ঠিক হয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কতিপয় লোক সেখানে গেছেন এবং আমাকে বলা হয়েছে তারা তাদের মালামাল পুনরদ্ধারের জন্য সেখানে গেছেন। তবে মন্ত্রী স্বীকার করেন, আগের দিন ফাটল দেখা দেয়ার পর ব্যাংক ও দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মন্ত্রী জানান, তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রানা প্লাজার মালিক (যুবলীগ নেতা সোহেল রানা) স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় তার বিরদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলে মানুষের ধারণা-এমন প্রশ্ন করা মখা আলমগীর বলেন, তদন্তে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে কারো অবহেলার কারণে এখানে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে, মালিকের যে পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল তা তিনি নেননি। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে কোনো দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার আলোকে কিংবা নাশকতার ঘটনা ঘটে থাকলে কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। অপরাধী অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবে।
স্টালিন সরকার : ‘গাছের পাতা নড়েচড়ে তোমার কথা মনে পড়ে’ লেখা সম্বলিত ভিউকার্ড ছোটবেলায় বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে বিলি করেননি এমন মানুষ কমই আছে। গ্রাম বাংলার মেলায় এখনো এধরনের লেখা রুমাল, হাতপাখা, খেলনা বিক্রি হয়। গাছের পাতা নড়লে বন্ধুর কথা মনে পড়ে কিনা জানা না গেলেও ‘খুঁটি নাড়ালে বিল্ডিং ধসে পড়ে’ এটা জানা গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের কাছ থেকে। তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া বিবিসিকে এ তথ্য দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর ডক্টর এ মন্ত্রী জাতিকে এধরনের কত যে ‘বয়ান’ শুনিয়েছেন তার হিসেব নেই। তার কথাবার্তা শুনে তারই অধস্তন কর্মকর্তারাও লজ্জা পেয়েছেন এবং দলীয় নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তার হিসেব নেই। কিন্তু সবকিছুকে থোরাইকেয়ার করে ‘বকাউল্লা’ বকেই যাচ্ছেন। সাভার দুর্ঘটনা নিয়ে গোটা জাতি শোকাহত। স্মরণকালের এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা দুরূহ। বিল্ডিংয়ের নিচে চাপাপড়ে শত শত মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তুপের ভিতরে মানুষের বাঁচার আকুতিতে বাতাস যখন ভারি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ‘বয়ান’ মানুষকে অবাক করে দেয়। স্বজনহারাদের রাগ-ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেন তিনি। ক্ষমতাসীন দলের লোকজনও তার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বক্তব্যে হতবাক, কেউ কেউ বিরক্ত। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তার দেয়া বক্তব্য নিয়ে খোদ মন্ত্রীদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটিয়েছেন। বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ তাকে দায়িত্বহীন, কা-জ্ঞানহীন, অপ্রকৃতিস্থ, বিপজ্জনক, পাগল, অবিবেচক এবং ভারসাম্যহীন ব্যক্তি হিসেবে অবিহিত করেছেন। তিনি সাভারের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বিবিসিকে বলেন, দুর্ঘটনার আগে কিছু মৌলবাদী ও বিএনপির ভাড়াটে লোক সাভারের রানা প্লাজার গেট ও বিভিন্ন স্তম্ভ ধরে ‘নাড়াচাড়া’ করেছিল। ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে এটিকেও ‘একটি কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরনের বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সচিব মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, উল্টাপাল্টা কিছু বলবেন না। মখা আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, হরতালকারীদের ঝাঁকুনিতে বিল্ডিং ধসে গেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ দাবি হাস্যকর। মানুষ যখন শোকাহত তখন এ ধরনের কথাবার্তা মানুষের কষ্টকে আরো বাড়িয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বরখাস্তের দাবি জানিয়ে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার বলেন, তার মতো একজন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্র ও জনগণের জন্যে বিপজ্জনক। খুঁটি নাড়ালে যিনি মনে করেন একটি ভবন ধসে যায়Ñ এ ধরনের লোকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকা জাতির জন্যে লজ্জাজনক। বিশিষ্টজন, রাজনীতিক, পেশাজীবীদের অনেকেই তার বক্তব্যকে দায়িত্ব-জ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কয়েকবার অশালীন ও দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন। তার ‘উদোর পি-ি বুদোর ঘাড়ে’ চাপানোর কৌশল প্রশাসনকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। বিরোধী দলের হরতাল অবরোধ প্রতিহতের জন্য তিনি ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। অতপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাপাতির কোপে বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন ওরা ছাত্রলীগ নয়, জামায়াত। পরে বিশ্বজিতের হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পরও তিনি গ্রেফতার নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ যখন বলে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি; অথচ মখা আলমগীর দাবি করেন বিশ্বজিৎ হত্যাকা-ের অভিযোগে ১১ জন গ্রেফতার। কেরানীগঞ্জের পরাগ ম-ল অপহরণ মামলায় তার সঙ্গে র‌্যাবের বক্তব্যেও বিরোধ বাধে। র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানান ৫০ লাখ টাকা অপহরণকারীদের দিয়ে পরাগকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি কোনো মুক্তিপণ দেয়া হয়নি। এ নিয়েও তিনি আলোচিত-সমালোচিত হন। পুলিশ প্রশাসনের বার্ষিক পুরস্কার নিয়েও তিনি আলোচনায় আসেন। বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন আর রশিদকে পুলিশ পদক দেয়ার পর সমালোচনার ঝড় উঠে পুলিশ প্রশাসনে। তিনি জানান, মানিকমিয়া এভিনিউ এ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুককে প্রকাশ্যে পেটানোর জন্যই হারুন অর রশিদকে পুুলিশের জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকারীদের গ্রেফতার নিয়েও তিনি অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেন। বার বার সময় দিনক্ষণ বেঁধে দিয়েও তিনি খুনিদের গ্রেফতার করতে না পেরে হঠাৎ ঘোষণা দেন সাগর-রুনির ঘাতকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বক্ষব্যাধি হাসাপাতালের ডাক্তারকে যারা খুন করেছে তারাই সাগর-রুনির হত্যাকারী। পরে তার এ দাবি অসার প্রমাণ হয়। সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেফতার নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে সচিবালয়ে এক বৈঠকেও তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়েন। পরে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রক্ষা পান। শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশকে জেল থেকে গোপনে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও সৃষ্টি হয়। কিন্তু তিনি দাবি করেন আইন মেনেই বিকাশকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি ছাড়া পেয়েছেন আমার করার কিছুই নেই। কিছুদিন আগে সারাদেশে সহিংসতা ও পুলিশের গুলিতে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে। এছাড়াও হরতালকারীরা সন্ত্রাসী, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকা- গণবিরোধী, পিঠের চামড়া তুলে দেব, পা ভেঙে দেব, উচিত শিক্ষা দেব, রক্তাক্ত করে ছাড়বো, কাদের সিদ্দিকী রাজাকার, থানায় নিয়ে নির্যাতনের বদলে জামাই আদর করা হবে, ধোলাই দেব ইত্যাদি কথা বলে আলোচিত হন। সর্বশেষ তিনি সাভারের রানা প্লাজা ধস নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তার এ বক্তব্যে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও ত্যক্ত-বিরক্ত।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়