ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপন্ন মানবতা : মর্মস্পর্শী আকুতি ‘বাঁচাও’



আসাদুজ্জামান সাগর
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
‘বাবা আমি জীবিত। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমরা সাতজন চারতলায় একটি পিলারের নিচে আটকে আছি। বাবা আমরা মরে যাচ্ছি। আমাদের বাঁচাও।’
এই করুণ আকুতি রংপুর থেকে আসা গার্মেন্টকর্মী ফাতেমার। ফাতেমার সেই কথাগুলো বলছিলেন তার হতভাগ্য বাবা মোজাম্মেল হোসেন। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে আটকেপড়া ফাতেমার সঙ্গে গতকাল সকালে মোবাইল ফোনে তার শেষ কথা হয়। মোজাম্মেল বলেন, তার মেয়ে ফাতেমা, তার তিন বোনের মেয়ে, দুই ভাইয়ের মেয়ে ও পাশের বাড়ির এক মেয়েসহ ‘সাত বান্ধবী’ একসঙ্গে একই রুমে কাজ করত। ভবন ধসের পরপরই মেয়ে তাকে ফোন দিয়ে শুধু বলেছে, ‘বাবা আমি মনে হয় আর বাঁচব না। কোথায় আছি কিছুই বলতে পারব না। চারদিকে শুধু অন্ধকার। আমাদের নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ তিনি জানান, রংপুর থেকে এখানে এসে পৌঁছানো পর্যন্ত মেয়ের সঙ্গে তার বহুবার কথা হয়েছে। তবে এখানে পৌঁছে ধসে যাওয়া ভবনের পাশে এসে ঢুকতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে মারধর করে।
তিনি বলেন, ‘আমি মার খেয়েও চারতলায় আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে যাব। একটু আগে থেকে মেয়েকে আর মোবাইলে পাচ্ছি না। মনে হয় মারা গেছে।’ এ কথা বলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে আবার বলেন, ‘সাত বান্ধবী একসঙ্গে থাকত, এখনও আছে। আমাকে তারা বলেছে, আমাকে দেখা করা ছাড়া তারা মরবে না। যদি তারা বেঁচে না থাকে, আমি তাহলে কী নিয়ে বাঁচব। সাতজনই ঢাকায় এলে আমাকে বাবা বলে ডাকে।’
মোজাম্মেল আর ফাতেমার এই মর্মস্পর্শী কাহিনীই শেষ নয়, নয় প্রথম কাহিনীও। এটি যেন এখন সাভারের অভিশপ্ত রানা প্লাজার সাধারণ দৃশ্য। ফাতেমার মতো একের পর এক অসহায় নারী- পুরুষের কণ্ঠ ভেসে আসছে। তাদের একটাই আকুতি—‘আমাকে বাঁচাও’।
সময় যত গড়াচ্ছে, সেই আকুতির তেজও ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকেপড়াদের জীবনের স্পন্দনও যেন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। প্রিয়জনের সঙ্গে শেষবার কথা বলার পর হয়তো কারও কারও দুঃসহ কষ্টের চিরঅবসান হয়েছে।
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে বেঁচে থাকা আরেকজনের নাম রোজিনা। বাড়ি ময়মনসিংহে। সকাল সাড়ে ৯টায় দিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনি বলছিলেন, ‘আমার হাতটা আটকে পড়ে আছে। দরকার হলে আমার হাতটা কেটেও আমাকে বাঁচাও।’
ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল তার কণ্ঠ। উপস্থিত লোকজন তার আকুতি শুনে এগিয়ে যান। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে উদ্ধার করা যাচ্ছিল না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তাকে উদ্ধার করতে গেলে ঝরে যেতে পারে আরও বহু প্রাণ। দমকল কর্মীরা জানান, সে এখনও সুস্থ। ইনজেকশন দিয়ে তার হাতটি অবশ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
কেন রোজিনাকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না—তার জবাব দেন রানা প্লাজার অপারেশন ইনচার্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সিদ্দিকুল আলম শিকদার। তিনি বলেন, রোজিনা যে বিমটির নিচে আটকা পড়েছে, সেটি সরিয়ে ফেললে বিমের নিচের অংশ ধসে পড়ে নিচে যারা আটকা আছে, তারাও মারা যেতে পারে। কাজেই এ মুহূর্তে এটি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।
প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয়ে জ্ঞান ফিরে গার্মেন্টকর্মী ইতি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে বলেন, ‘কারখানায় কাজ শুরুর ঘণ্টাখানেক পরই কিমুন জানি জোরে শব্দ হওয়া শুরু করল। মনে হইল গজব হইতাছে। সবাই কইতে লাগল, বাইর হ বাইর হ; বিল্ডিং ভাইঙ্গা যাইতাছে। আমি কিছু না ভাইব্বা নিচের দিকে দৌড় দেই। কয় সিঁড়ি নামছিলাম মনে নাই। তয় মনে হইল মাথার ওপর কিছু একটা ভাইঙ্গা পড়ছে। শেষ পর্যন্ত মনে হইল আমিতো মইরা যাইতাছি, মায়েরে ভাত দিব কেডা!’
তিনি বলেন, ‘পরে আর কী হইছে কইতে পারুম না।’ জ্ঞান ফেরার পর ইতি বলেন, ‘চোখ খুইল্লা দেখলাম আমি হাসপাতালে। একজনের পরে একজন আইতাছে। কারো হাত কাডা, কারো পা। আমি দেখলাম আমার হাত-পা সবই আছে। অগো লাইগা কেমন জানি লাগতেছে। আমারওতো এমন হইতে পারত।’
ভবনের ষষ্ঠতলায় ইথার টেক্সটাইল লিমিটেডে কাজ করছিলেন সেলিম। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। জীবন ফিরে পেয়ে তিনি বলেন, আমি ছয়তলায় কাজ করছিলাম। আমার ফ্লোরে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন আটকা পড়েছে। অন্য ফ্লোরেও লোক ছিল।
ভবনের সপ্তমতলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডে কাজ করছিলেন এক গার্মেন্টকর্মী। উদ্ধার হওয়ার পর তিনি জানান, তাদের কারখানাতেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কাজ করছিল। এখনও অনেক শ্রমিক আটকা পড়ে আছে। ধসে পড়ার সময় তারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাঁচার জন্য আহাজারি করছিলেন।
একই গার্মেন্টের শ্রমিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল পৌনে ৯টায় যখন ভবনটি ধসে পড়তে থাকে, তখন আমি তৃতীয় তলায় ছিলাম। বিকট শব্দ শুনে আমি দৌড়ে বের হতে সক্ষম হই। তবে ভবনের ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ তলায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার লোক ছিল। হাজার-বারশ’ বের হতে পেরেছে।’ তার আশঙ্কা—বাকিদের অধিকাংশই আটকা পড়েছে বা মৃত্যু হয়েছে। তিনি আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা জীবিতদের বাঁচান।’

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়