আর কত উলুখাগড়ার প্রাণ যাবে?
- Get link
- X
- Other Apps
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম | তারিখ: ১৯-০৪-২০১৩
প্রবচনের কথা যখন, রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুুখাগড়াদের প্রাণ যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই এ দেশে এক-দুবার মাত্র ঘটেনি; বাঙালির জীবনে এই অভিজ্ঞতা নিশ্চয় দীর্ঘদিনের। রাজারা রাজত্ব করতেন ক্ষমতার জোরে, নিজেদের মর্জিতে; উলুখাগড়াদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল শাসক ও শাসিতের, তাঁরা চলতেন উলুখাগড়াদের সম্মতি-অসম্মতির তোয়াক্কা না করে। রাজারা অনেকেই ছিলেন বহিরাগত দখলদার, অনেকে দেখতেন অন্য রাজ্য দখলদারির স্বপ্ন। ফলে যুদ্ধবিগ্রহ ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার, মৌসুমি পালা-পার্বণের মতো। তাতে ক্বচিৎ রাজারাও মারা পড়তেন, কিন্তু বেশি মরত উলুখাগড়ারা, অভিধানে যাদের বলা হচ্ছে গরিব মানুষ, নিরীহ প্রজা। আর এই মারা পড়া শুধু প্রাণপাখি দেহ ছেড়ে যাওয়া নয়, বরং ভাতে মরা, আয়-রুজিতে টান পড়ে মরা, অথবা ঘরবাড়ি হারিয়ে মরাও।
রাজরাজড়াদের দিন কবেই গেছে। একাত্তরে রাজাগোছের পাকিস্তানিদের আমরা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ভেবেছিলাম, এবার উলুখাগড়াদের দিন আসবে। কিন্তু আমাদের ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। ক্ষমতার আসনটাকে সিংহাসন ভেবে দু-এক শাসক রাজার মতোই আপন খেয়ালে আর পেশির জোরে দেশ শাসন করলেন। উলুখাগড়ারা আবার পড়ল বিপদে। বিপদ থেকে উদ্ধারের আশায় তারা রাস্তায় নামল। দেশে আবার গণতন্ত্র চালু হলো। দেশটার বয়স তত দিনে কুড়ি। উলুখাগড়ারা ভরসা করল ওই বয়সটার ওপর: একটি তরুণরাষ্ট্র নিশ্চয় তাদের পক্ষে থাকবে, নিম-রাজাদের হাতে দেশটা নিশ্চয় আর পড়বে না। ভরসার আরেকটা জায়গা ছিল: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার তৈরি হয় অধিকাংশ উলুখাগড়ার সম্মতিতে। যাদের সম্মতি নিয়ে সরকার বসে ক্ষমতায়, সেই সরকার আর যা-ই হোক, তাদের নিশ্চয়ই মারবে না। তা ছাড়া গণতন্ত্রে যুদ্ধ হয় না, তর্কাতর্কি হয়, বাগিবতণ্ডা হয় এবং সেসব হয় মহান সংসদের মেঝেতে।
আবারও আমাদের ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। আমরা দেখলাম, দেশ শাসনে গণতন্ত্রী দলগুলো রাজাদের মতোই আচরণ শুরু করল। তাদের মর্জিমতোই সবকিছু চলতে লাগল। প্রশাসন ও পুলিশ হয়ে দাঁড়াল তাদের আজ্ঞাবহ, পেশাজীবীরা হয়ে পড়লেন তাদের বাধ্য। বিরোধী দল দু-এক দিন সংসদে গিয়ে যখন টের পেল, ক্ষমতার কোথাও তারা নেই এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাঁচ বছরের অপেক্ষাও তাদের কাছে দুর্বিষহ মনে হতে লাগল, তারা রাস্তায় নেমে পড়ল। তারা সবকিছুতেই সরকারের বিরোধিতা করতে লাগল আর সরকার এক ধাপ এগিয়ে ‘বিরোধী’ কথাটার মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল। ফলে ক্ষমতার পাঁচ বছর সব সরকারবিরোধীকে আচ্ছামতো পেটাল। আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একবারের জন্য সরকার দেশের কোনো সমস্যা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসেছে এমন নজির নেই। উলুখাগড়াদের মতামত আমলে নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
এখন রাজায়-রাজায় আর যুদ্ধ হয় না, হয় সরকার ও বিরোধী দলে। যুদ্ধ মানে যুদ্ধ, একেবারে কামান-বন্দুক নিয়ে। এখন যুদ্ধের ময়দান হচ্ছে রাজপথ। ‘সরকারের পতন না ঘটিয়ে রাজপথেই থাকব’ এ রকম স্লোগান এখন এতই সাধারণ ও নৈমিত্তিক হয়ে গেছে যে এটি দিতে গিয়ে অনেক নেতা-কর্মীই হাই তোলেন। তবে এই যুদ্ধে তাঁরা মারা পড়েন না, মারা পড়ে উলুখাগড়ারা।
২.
২০১৩ নির্বাচনী বছর বলে রাজপথের উত্তাপ ভোটের দিন পর্যন্ত চলবে, এমন ধারণা সবারই ছিল। তবে অনেকেই ভেবেছিল, মূল যুদ্ধটা শুরু হবে ঈদের পরে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে। ২০১০-এ এ রকম এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিলের বক্তারা। কিন্তু আবারও এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। রাজপথের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল বছরের গোড়া থেকেই। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর বড় বড় কয়েকজন নেতার বিচার চলছে, দু-একজনের রায়ও হয়ে গেছে। তাঁদের বাঁচাতে দলটি মরিয়া এবং তারা যে এ জন্য একটা আন্দোলনে নামবে, এমনটিও ধারণা করা গিয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন যে এতটা সহিংস ও বিধ্বংসী হবে, গোয়েন্দা বিভাগও তা আঁচ করতে পারেনি। সেই আন্দোলনে নানা ছুতোয় যোগ দিয়েছে ধর্মভিত্তিক আরও কটি দল এবং দুঃখজনকভাবে বিএনপি। সরকার সহিংসতার মাত্রা দেখে প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল, পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যা করার করেছে। পুলিশকে গুলি চালাতে হয়েছে। এতে বেশ কিছু উলুখাগড়ার—অর্থাৎ গরিব ও নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে। কিন্তু উলুখাগড়ার যে আরেকটি অর্থ হচ্ছে বাজে লোক, তা প্রমাণ করে কিছু বাজে লোকও মরেছে, যারা গাড়িতে আগুন দিয়ে যাত্রী ও চালক পুড়িয়েছে, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে, ট্রেনে আগুন দিয়ে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে। এই বাজে লোকগুলোকে রাস্তায় নামিয়ে, সন্ত্রাসে উসকে দিয়ে বিরোধী দল আবারও প্রমাণ করল, সরকার পতনের জন্য প্রয়োজনে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তারা প্রস্তুত, তা না হলে ‘বিরোধী’ কথাটার মর্যাদা তো আর থাকে না। এই মর্যাদা রাখতে গিয়ে বিরোধী দল এখন হরতালের পর হরতাল দিচ্ছে, হরতালের ঘোষণা দিয়ে দুই দিন আগেই দিনদুপুরে রাস্তায় নেমে গাড়িতে আগুন দিচ্ছে। বিরোধীরা এখন শিক্ষার বিরুদ্ধেও নেমেছে। লাগাতার হরতালে এখন ভেসে যাচ্ছে এইচএসসি-এসএসসি পরীক্ষার সব আয়োজন। দু-তিন দিন ধরে দেখছি, এইচএসসিকে ‘হরতালের আওতামুক্ত’ বলে বিরোধীরা ঘোষণা দিচ্ছে, যেন এইচএসসি পরীক্ষা কোনো খাবারের দোকান অথবা ফার্মেসি। হরতালের বীভৎসতার মধ্য দিয়ে ককটেল-বোমা-কাঁদানে গ্যাস-গুলির মাঝখান দিয়ে আওতামুক্ত পরীক্ষা দিতে যাবে এ দেশের ছেলেমেয়েরা?
ডিম আগে না মুরগি আগে, এ নিয়ে যেমন অন্তহীন বিতর্ক হয়, তেমনি একটি চলমান বিতর্ক হচ্ছে: বিরোধীদের বিধ্বংসী আন্দোলনের জন্য কি সরকার হার্ডলাইনে গেছে, নাকি সরকারের একগুঁয়েমির জন্য বিরোধী দল হার্ডলাইনে নেমেছে? বিতর্কের কূটকচালি যা-ই থাক, বাস্তবের হিসাব হচ্ছে এই যে উভয় পক্ষই চলে গেছে অনমনীয় অবস্থানে। বিরোধী দল নেমেছে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে আর সরকার নেমেছে এই আন্দোলন দমনে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের নেতাদের এক বিশাল অংশকে জেলে পোরা হবে গাড়ি পোড়ানের মতো মামলায়, এটি কি ভাবা যায়? কিন্তু এই দুঃখজনক বিষয়টিও ঘটছে বাংলাদেশে। বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপির কোনো মুখপাত্রই এখন নিরাপদ নন, মির্জা ফখরুল-রিজভী হয়ে এখন সালাউদ্দিনও কারাগারে। দেশে হরতালের নামে মানুষ মরছে, তাণ্ডব হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি লাটে উঠছে, ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারার কাজে লাগানো হচ্ছে মানুষকে। এসবই চরম বাস্তব এবং কারা তা করছে, তাও দেশের মানুষ জানে। কিন্তু এই উত্তপ্ত সময়ে বিরোধী নেতাদের জেলে পুরলে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং সন্ত্রাস ও অরাজকতা আরও বাড়বে। এর ফলে মারা পড়বে ওই উলুখাগড়ারাই। আমরা এই অরাজকতার অবসান চাই। কিন্তু তা অশান্তির পথে পাওয়া যাবে না, যাবে শুধু মাথা ঠান্ডা করে, দেশের স্বার্থকে সবার আগে রেখে আলোচনায় বসলে।
স্কুলে পড়ার সময় রাস্তাঘাটে দুর্জন মানুষ ঝগড়াঝাঁটি শুরু করলে এক-দুজনকে তাদের উসকে দিতে দেখতাম। ‘হাত থাকতে মুখে কেন?’ তারা বলত, ঘুষি মেরে নাক ফাটাও মিয়ারা, ঝগড়া করে কী হবে? এখন সরকার ও বিরোধী দল যেন নিজেরাই সেই উসকানিদাতাদের জায়গায় নেমে গেছে। এদিকে জামায়াত সক্রিয় তার এজেন্ডা নিয়ে, হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমেছে ১৩ দফার দাবি নিয়ে। আর কিছু না হোক, এর ফলে সহিংসতা বাড়বে, আরও অনেক উলুখাগড়ার বুকের রক্ত ঝরবে।
একটি কাগজ লিখেছে, কয়েক দশকের অর্জন ধূলিসাৎ হতে চলেছে। এই অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এই অর্জন সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অনেক প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ ক্ষেত্রেও। এসব অর্জনের কৃতিত্ব দেশের মানুষের এবং বড় দুটি রাজনৈতিক দলেরও। এই অর্জন বিসর্জন দিয়ে সরকার পতনের এক দফা নিয়ে কি এগোতে থাকবে বিরোধী বিএনপি ও তার মিত্ররা এবং এই অর্জন বিসর্জন দিয়ে সরকার এগোবে বিরোধী দল তথা বিএনপিকে শায়েস্তা করে তার অধীনেই আগামী নির্বাচন মেনে নিতে তাকে বাধ্য করতে? যেভাবে দুটি পক্ষ চলছে, তাতে ওই বিসর্জনই যে আমাদের ভাগ্যে লেখা, তা তো পাড়ার মুদি দোকানদারও বলে দিতে পারেন।
পয়লা বৈশাখ সারা দেশটা ছিল উলুখাগড়াদের দখলে—ওই বাজে লোকগুলোকে বাদ দিয়ে। তারা সারা দিন পথে-মাঠে-মেলায় ঘুরে খুব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে কোনো পক্ষই ভোটের হিসাব-নিকাশ করতে পারবে না। তারা শান্তি চায়, সমৃদ্ধি চায়; স্বাভাবিক কর্মমুখর জীবন চায়। তারা হরতাল চায় না, হানাহানি চায় না। তারা আরও জানিয়ে দিল, নারীদের স্বাধীনতা তারা কাউকে কেড়ে নিতে দেবে না, সংস্কৃতিকে যারা ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, তাদেরও মেনে নেবে না। এদের কথা যারা শুনবে না, তারা নির্বাচনের হিসাবে একটা বড় ফাঁক রেখে দেবে।
পয়লা বৈশাখ জাসাসের একটি অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া একটি গানের সঙ্গে গলা মেলালেন, নাচ দেখে স্মিত হেসে প্রশংসা জানালেন। গণভবনে সেদিন অনুষ্ঠান হলে শেখ হাসিনাও তা-ই করতেন। পয়লা বৈশাখের চেতনা থেকে তাঁরা একে অপরকে নববর্ষের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। এখন আরেকটু এগিয়ে গিয়ে একটা আলোচনা শুরু করলে কেমন হয়? না, এখনই দুই নেত্রীকে টেবিলের দুই দিকে বসে যেতে হবে না। কিন্তু দুই দলের নেতারা বসলে কেমন হয়? বিএনপির খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে তাঁরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও ইঙ্গিত দিলেন, আলোচনা হতে পারে। আলোচনা যদি খোলা মন নিয়ে শুরু হয়, শেষটা নিশ্চয় ভালো হবে। তার আগে বিএনপির আটক সব নেতাকে ছেড়ে দিলে আলোচনাটা যে ফলপ্রসূ হবে, সে সম্পর্কে সন্দেহ সামান্যই।
নির্বাচন কীভাবে হবে, কোন ধরনের সরকারের অধীনে হবে, এই প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করতে না পারলে দুই দলের কোনো নেতা-নেত্রীরই আর উলুখাগড়াদের ভোট চাওয়ার অধিকার থাকবে না। অথচ এই উলুখাগড়াদের হাত ধরেই ওই কয়েক দশকের যত অর্জন। তারা এত এত সব কঠিন কাজ করে ফেললে নেতা-নেত্রীরা একটা আধা কঠিন কাজ কেন করতে পারবেন না?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজরাজড়াদের দিন কবেই গেছে। একাত্তরে রাজাগোছের পাকিস্তানিদের আমরা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ভেবেছিলাম, এবার উলুখাগড়াদের দিন আসবে। কিন্তু আমাদের ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। ক্ষমতার আসনটাকে সিংহাসন ভেবে দু-এক শাসক রাজার মতোই আপন খেয়ালে আর পেশির জোরে দেশ শাসন করলেন। উলুখাগড়ারা আবার পড়ল বিপদে। বিপদ থেকে উদ্ধারের আশায় তারা রাস্তায় নামল। দেশে আবার গণতন্ত্র চালু হলো। দেশটার বয়স তত দিনে কুড়ি। উলুখাগড়ারা ভরসা করল ওই বয়সটার ওপর: একটি তরুণরাষ্ট্র নিশ্চয় তাদের পক্ষে থাকবে, নিম-রাজাদের হাতে দেশটা নিশ্চয় আর পড়বে না। ভরসার আরেকটা জায়গা ছিল: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার তৈরি হয় অধিকাংশ উলুখাগড়ার সম্মতিতে। যাদের সম্মতি নিয়ে সরকার বসে ক্ষমতায়, সেই সরকার আর যা-ই হোক, তাদের নিশ্চয়ই মারবে না। তা ছাড়া গণতন্ত্রে যুদ্ধ হয় না, তর্কাতর্কি হয়, বাগিবতণ্ডা হয় এবং সেসব হয় মহান সংসদের মেঝেতে।
আবারও আমাদের ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। আমরা দেখলাম, দেশ শাসনে গণতন্ত্রী দলগুলো রাজাদের মতোই আচরণ শুরু করল। তাদের মর্জিমতোই সবকিছু চলতে লাগল। প্রশাসন ও পুলিশ হয়ে দাঁড়াল তাদের আজ্ঞাবহ, পেশাজীবীরা হয়ে পড়লেন তাদের বাধ্য। বিরোধী দল দু-এক দিন সংসদে গিয়ে যখন টের পেল, ক্ষমতার কোথাও তারা নেই এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাঁচ বছরের অপেক্ষাও তাদের কাছে দুর্বিষহ মনে হতে লাগল, তারা রাস্তায় নেমে পড়ল। তারা সবকিছুতেই সরকারের বিরোধিতা করতে লাগল আর সরকার এক ধাপ এগিয়ে ‘বিরোধী’ কথাটার মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল। ফলে ক্ষমতার পাঁচ বছর সব সরকারবিরোধীকে আচ্ছামতো পেটাল। আমাদের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একবারের জন্য সরকার দেশের কোনো সমস্যা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসেছে এমন নজির নেই। উলুখাগড়াদের মতামত আমলে নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
এখন রাজায়-রাজায় আর যুদ্ধ হয় না, হয় সরকার ও বিরোধী দলে। যুদ্ধ মানে যুদ্ধ, একেবারে কামান-বন্দুক নিয়ে। এখন যুদ্ধের ময়দান হচ্ছে রাজপথ। ‘সরকারের পতন না ঘটিয়ে রাজপথেই থাকব’ এ রকম স্লোগান এখন এতই সাধারণ ও নৈমিত্তিক হয়ে গেছে যে এটি দিতে গিয়ে অনেক নেতা-কর্মীই হাই তোলেন। তবে এই যুদ্ধে তাঁরা মারা পড়েন না, মারা পড়ে উলুখাগড়ারা।
২.
২০১৩ নির্বাচনী বছর বলে রাজপথের উত্তাপ ভোটের দিন পর্যন্ত চলবে, এমন ধারণা সবারই ছিল। তবে অনেকেই ভেবেছিল, মূল যুদ্ধটা শুরু হবে ঈদের পরে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে। ২০১০-এ এ রকম এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিলের বক্তারা। কিন্তু আবারও এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। রাজপথের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল বছরের গোড়া থেকেই। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর বড় বড় কয়েকজন নেতার বিচার চলছে, দু-একজনের রায়ও হয়ে গেছে। তাঁদের বাঁচাতে দলটি মরিয়া এবং তারা যে এ জন্য একটা আন্দোলনে নামবে, এমনটিও ধারণা করা গিয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন যে এতটা সহিংস ও বিধ্বংসী হবে, গোয়েন্দা বিভাগও তা আঁচ করতে পারেনি। সেই আন্দোলনে নানা ছুতোয় যোগ দিয়েছে ধর্মভিত্তিক আরও কটি দল এবং দুঃখজনকভাবে বিএনপি। সরকার সহিংসতার মাত্রা দেখে প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল, পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যা করার করেছে। পুলিশকে গুলি চালাতে হয়েছে। এতে বেশ কিছু উলুখাগড়ার—অর্থাৎ গরিব ও নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে। কিন্তু উলুখাগড়ার যে আরেকটি অর্থ হচ্ছে বাজে লোক, তা প্রমাণ করে কিছু বাজে লোকও মরেছে, যারা গাড়িতে আগুন দিয়ে যাত্রী ও চালক পুড়িয়েছে, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে, ট্রেনে আগুন দিয়ে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে। এই বাজে লোকগুলোকে রাস্তায় নামিয়ে, সন্ত্রাসে উসকে দিয়ে বিরোধী দল আবারও প্রমাণ করল, সরকার পতনের জন্য প্রয়োজনে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তারা প্রস্তুত, তা না হলে ‘বিরোধী’ কথাটার মর্যাদা তো আর থাকে না। এই মর্যাদা রাখতে গিয়ে বিরোধী দল এখন হরতালের পর হরতাল দিচ্ছে, হরতালের ঘোষণা দিয়ে দুই দিন আগেই দিনদুপুরে রাস্তায় নেমে গাড়িতে আগুন দিচ্ছে। বিরোধীরা এখন শিক্ষার বিরুদ্ধেও নেমেছে। লাগাতার হরতালে এখন ভেসে যাচ্ছে এইচএসসি-এসএসসি পরীক্ষার সব আয়োজন। দু-তিন দিন ধরে দেখছি, এইচএসসিকে ‘হরতালের আওতামুক্ত’ বলে বিরোধীরা ঘোষণা দিচ্ছে, যেন এইচএসসি পরীক্ষা কোনো খাবারের দোকান অথবা ফার্মেসি। হরতালের বীভৎসতার মধ্য দিয়ে ককটেল-বোমা-কাঁদানে গ্যাস-গুলির মাঝখান দিয়ে আওতামুক্ত পরীক্ষা দিতে যাবে এ দেশের ছেলেমেয়েরা?
ডিম আগে না মুরগি আগে, এ নিয়ে যেমন অন্তহীন বিতর্ক হয়, তেমনি একটি চলমান বিতর্ক হচ্ছে: বিরোধীদের বিধ্বংসী আন্দোলনের জন্য কি সরকার হার্ডলাইনে গেছে, নাকি সরকারের একগুঁয়েমির জন্য বিরোধী দল হার্ডলাইনে নেমেছে? বিতর্কের কূটকচালি যা-ই থাক, বাস্তবের হিসাব হচ্ছে এই যে উভয় পক্ষই চলে গেছে অনমনীয় অবস্থানে। বিরোধী দল নেমেছে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে আর সরকার নেমেছে এই আন্দোলন দমনে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের নেতাদের এক বিশাল অংশকে জেলে পোরা হবে গাড়ি পোড়ানের মতো মামলায়, এটি কি ভাবা যায়? কিন্তু এই দুঃখজনক বিষয়টিও ঘটছে বাংলাদেশে। বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপির কোনো মুখপাত্রই এখন নিরাপদ নন, মির্জা ফখরুল-রিজভী হয়ে এখন সালাউদ্দিনও কারাগারে। দেশে হরতালের নামে মানুষ মরছে, তাণ্ডব হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি লাটে উঠছে, ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারার কাজে লাগানো হচ্ছে মানুষকে। এসবই চরম বাস্তব এবং কারা তা করছে, তাও দেশের মানুষ জানে। কিন্তু এই উত্তপ্ত সময়ে বিরোধী নেতাদের জেলে পুরলে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং সন্ত্রাস ও অরাজকতা আরও বাড়বে। এর ফলে মারা পড়বে ওই উলুখাগড়ারাই। আমরা এই অরাজকতার অবসান চাই। কিন্তু তা অশান্তির পথে পাওয়া যাবে না, যাবে শুধু মাথা ঠান্ডা করে, দেশের স্বার্থকে সবার আগে রেখে আলোচনায় বসলে।
স্কুলে পড়ার সময় রাস্তাঘাটে দুর্জন মানুষ ঝগড়াঝাঁটি শুরু করলে এক-দুজনকে তাদের উসকে দিতে দেখতাম। ‘হাত থাকতে মুখে কেন?’ তারা বলত, ঘুষি মেরে নাক ফাটাও মিয়ারা, ঝগড়া করে কী হবে? এখন সরকার ও বিরোধী দল যেন নিজেরাই সেই উসকানিদাতাদের জায়গায় নেমে গেছে। এদিকে জামায়াত সক্রিয় তার এজেন্ডা নিয়ে, হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমেছে ১৩ দফার দাবি নিয়ে। আর কিছু না হোক, এর ফলে সহিংসতা বাড়বে, আরও অনেক উলুখাগড়ার বুকের রক্ত ঝরবে।
একটি কাগজ লিখেছে, কয়েক দশকের অর্জন ধূলিসাৎ হতে চলেছে। এই অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এই অর্জন সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অনেক প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ ক্ষেত্রেও। এসব অর্জনের কৃতিত্ব দেশের মানুষের এবং বড় দুটি রাজনৈতিক দলেরও। এই অর্জন বিসর্জন দিয়ে সরকার পতনের এক দফা নিয়ে কি এগোতে থাকবে বিরোধী বিএনপি ও তার মিত্ররা এবং এই অর্জন বিসর্জন দিয়ে সরকার এগোবে বিরোধী দল তথা বিএনপিকে শায়েস্তা করে তার অধীনেই আগামী নির্বাচন মেনে নিতে তাকে বাধ্য করতে? যেভাবে দুটি পক্ষ চলছে, তাতে ওই বিসর্জনই যে আমাদের ভাগ্যে লেখা, তা তো পাড়ার মুদি দোকানদারও বলে দিতে পারেন।
পয়লা বৈশাখ সারা দেশটা ছিল উলুখাগড়াদের দখলে—ওই বাজে লোকগুলোকে বাদ দিয়ে। তারা সারা দিন পথে-মাঠে-মেলায় ঘুরে খুব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে কোনো পক্ষই ভোটের হিসাব-নিকাশ করতে পারবে না। তারা শান্তি চায়, সমৃদ্ধি চায়; স্বাভাবিক কর্মমুখর জীবন চায়। তারা হরতাল চায় না, হানাহানি চায় না। তারা আরও জানিয়ে দিল, নারীদের স্বাধীনতা তারা কাউকে কেড়ে নিতে দেবে না, সংস্কৃতিকে যারা ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, তাদেরও মেনে নেবে না। এদের কথা যারা শুনবে না, তারা নির্বাচনের হিসাবে একটা বড় ফাঁক রেখে দেবে।
পয়লা বৈশাখ জাসাসের একটি অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া একটি গানের সঙ্গে গলা মেলালেন, নাচ দেখে স্মিত হেসে প্রশংসা জানালেন। গণভবনে সেদিন অনুষ্ঠান হলে শেখ হাসিনাও তা-ই করতেন। পয়লা বৈশাখের চেতনা থেকে তাঁরা একে অপরকে নববর্ষের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। এখন আরেকটু এগিয়ে গিয়ে একটা আলোচনা শুরু করলে কেমন হয়? না, এখনই দুই নেত্রীকে টেবিলের দুই দিকে বসে যেতে হবে না। কিন্তু দুই দলের নেতারা বসলে কেমন হয়? বিএনপির খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে তাঁরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও ইঙ্গিত দিলেন, আলোচনা হতে পারে। আলোচনা যদি খোলা মন নিয়ে শুরু হয়, শেষটা নিশ্চয় ভালো হবে। তার আগে বিএনপির আটক সব নেতাকে ছেড়ে দিলে আলোচনাটা যে ফলপ্রসূ হবে, সে সম্পর্কে সন্দেহ সামান্যই।
নির্বাচন কীভাবে হবে, কোন ধরনের সরকারের অধীনে হবে, এই প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করতে না পারলে দুই দলের কোনো নেতা-নেত্রীরই আর উলুখাগড়াদের ভোট চাওয়ার অধিকার থাকবে না। অথচ এই উলুখাগড়াদের হাত ধরেই ওই কয়েক দশকের যত অর্জন। তারা এত এত সব কঠিন কাজ করে ফেললে নেতা-নেত্রীরা একটা আধা কঠিন কাজ কেন করতে পারবেন না?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments