নির্বাচনী গণতন্ত্রও হারিয়ে যাচ্ছে!



শাহ্দীন মালিক | তারিখ: ২০-০৪-২০১৩
মাঝেমধ্যে ভোটাভুটি খেলা করে হলেও আমরা একে অপরের পিঠ চাপড়িয়ে বলতাম—আমাদের গণতন্ত্র বেশ আছে!
ভোটাভুটি খেলার নিয়ম আমরা পাল্টাচ্ছি, তবে আইসিসির থেকে কোনোক্রমেই ধীরগতিতে না। আইসিসি যেমন টেস্ট, তারপর ওয়ানডে, তারপর টি-টোয়েন্টি—অর্থাৎ ক্রিকেটের নিয়মকানুন গত এক যুগে পাল্টাচ্ছে বেশ ঘন ঘন। মাঝে কিছুদিন ‘সিক্স এ সাইড’ও চলেছিল, তবে কল্কে পায় নাই।
আইনে আমরা ল্যাটিন শব্দ ব্যবহার করে বলি ‘এক্স পারটে’ অর্থাৎ একতরফা মামলা। সাধারণত দেওয়ানি মামলায় আদালত মারফত বারবার খবর দেওয়া সত্ত্বেও এক পক্ষ যখন হাজির হয় না, তখন যে পক্ষ হাজির আছে, শুধু তার কথা শুনে যখন রায় দেওয়া হয়, তখন আমরা বলি ‘এক্স পারটে জাজমেন্ট’ বা একতরফা রায়।
ভোটাভুটি খেলা একতরফা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে এরশাদ সাহেবের সংসদ নির্বাচনে। বড় দলগুলো ভোটাভুটির দিন হাজির না থাকলেও দু-চারটা ‘পার্টি’ পাওয়া গিয়েছিল। সেই সংসদ টিকেছিল বছর দুয়েক, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকার বিতাড়িত হওয়া পর্যন্ত। তারপর একতরফা ভোটাভুটি হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। সেই একতরফা ভোটাভুটি খেলায় সংসদ টিকেছিল সপ্তাহ ছয়েক।
সামনে আরেকটা একতরফা ভোটাভুটি খেলার প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। ভোটাভুটি একতরফাই হবে। তাই ইস্যু একটাই: একতরফার সংসদ কত দিন থাকবে?
সর্বশেষ একতরফা ভোটাভুটির আয়োজন ভীষণ জোরালোভাবে চলেছিল ২০০৬ সালের শেষে। বেগম খালেদা জিয়া তখন প্রায় দিনরাত বা রাতদিনই বলতেন—সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানই আসল। কেউ নির্বাচনে আসল কি আসল না, সেটা মুখ্য না। ভোটাভুটি খেলাটাই মুখ্য। সেই খেলার তারিখ যত দূর মনে পড়ে, নির্ধারিত ছিল ২২ জানুয়ারি ২০০৭। কিন্তু তার আগেই খেলাটা ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল।
আবারও একতরফা ভোটের পায়তারা চলছে, চলুক। তবে অধমের আফসোস—আরও কিছু ভোটাভুটি তো হতে পারত। আরও কিছু ভোটাভুটির খেলা খেলে আমরা তো তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারতাম। বলতে পারতাম, দেখো দেখো আমাদের গণতন্ত্র কত ভালো। আমরা প্রায়ই ভোটাভুটি খেলি।

২.
অনেক আগে একবার লিখেছিলাম—গণতন্ত্র আছে কি না, তার আসল মাপকাঠি হলো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র আছে কি না, সেটা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক থাকতে পারে। তবে ওই দেশে ৯৯ শতাংশ অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত থাকে। ইংল্যান্ডে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সেটা জানিয়ে, কোন দিন তাঁকে কোন আদালতে যেতে হবে ইত্যাদি সব বয়ান করে, প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে খোদ থানা থেকেই পুলিশ জামিন দিয়ে দেয়।
আমাদের ব্যবস্থা অনেক ভালো—পাইকারি হারে ধরো, রিমান্ডে নিয়ে খোঁজ-খবর নাও কী অপরাধ করেছে, মারধর করো এবং মামলা সাজাও। তারপর অনির্দিষ্টকাল কারাগারে বসবাস। শেষতক ছাড়া অবশ্যই পাওয়া যাবে—বেকসুর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে। এই প্রক্রিয়ায় সর্বাধিক লাভবান গোষ্ঠী হলো পুলিশ, তারপর আমার নিজস্ব সম্প্রদায়—আইনজীবী। কোনো জজ সাহেবই যে হালুয়া-রুটির ভাগ পান না, তা কে হলফ করে বলতে পারে! মন্ত্রী-সাংসদেরাও পান। কম-বেশি।
এত কিছুর সঙ্গে গণতন্ত্রের কী সম্পর্ক, সেটা বুঝতে হলে শ দুয়েক বছর আগের পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্রের প্রথম জমানার বিরাট বিরাট দার্শনিকের মোটা মোটা বই পড়তে হবে। সেই সময় তো আমাদের নাই। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার যেসব নীতি-আদর্শ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি, তা থেকে আমাদের আইন আর উচ্চ আদালতের আইনের ব্যাখ্যা অনেক আগেই অনেক দূরে চলে গেছে।
যে আমলে যত বেশি লোক কারণে-অকারণে জেলে থাকবে, সে আমলে গণতন্ত্র তত কম। যেমন সামরিক শাসনামলে ফরমান জারি করা হয়—আমরা জেলে ঢোকাব। ইচ্ছামতো জেলে ঢোকানোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকাই হলো সামরিক শাসন, অর্থাৎ গণতন্ত্রহীনতা।
এত তত্ত্বকথায় কাজ নাই। তাই বলছিলাম, নিদেনপক্ষে ভোটাভুটির খেলা খেলেও তো যতটুকু গণতন্ত্র রাখা যেত, তা-ও ইদানীং আর হচ্ছে না। ভোটাভুটি খেলাটাও এখন বন্ধ প্রায়।

৩.
ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বন্ধ প্রায় বছর দেড়েক। যে বিচারপতি সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন, এটাও তাঁর আদেশ। ইদানীং তিনি আপিল বিভাগে গেছেন। বিচারপতি নিয়োগের বেলায় সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির মতামত মুখ্য। যোগ্যতার বিচারে প্রধান বিচারপতির মাপিকাঠি কী, তা জানতে পারলে জাতি উপকৃত হতো। অন্তত যে চারজন বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে গেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কতগুলো রায় এখনো অসম্পূর্ণ আছে, তার একটা তালিকা পাওয়া গেলে মন্দ হতো না। প্রধান বিচারপতি হয়তো জানেন—যেটা আমরা জানি না—এই চারজন বিচারপতির কোনো রায়ই ‘পেন্ডিং’ নাই অথবা থাকলেও খুব বেশি না—দশ-বিশটা।
অবশ্য আমরা আইনজীবীরা যেহেতু দলে দলে রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছি, সেহেতু প্রধান বিচারপতি এখন চাইলেও ‘দলহীন’ আইনজীবী খুঁজে পাবেন না বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। আইনজীবীরা অবশ্য প্রতিবছরই ভোটাভুটি খেলা খেলেন। মোটামুটিভাবে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ৬৪ জেলা, তার ওপর সুপ্রিম কোর্ট মিলিয়ে ৬৫টা আইনজীবী সমিতির নিয়মিত নির্বাচন হয় প্রতিবছর। এবারের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নিরঙ্কুশ জয় হয়েছে। তাই আজকাল মধ্যাহ্ন বিরতির সময় সুপ্রিম কোর্টের বার বিল্ডিংয়ের বারান্দায় প্রায় প্রতিনিয়ত স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে: ‘... চামড়া, তুলে নেব আমরা’। আমরা, অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবীগণ!
অবশ্য এতে আওয়ামীপন্থী বিজ্ঞ আইনজীবীদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ নাই। আগামী নির্বাচনে জিতলে তাঁরাও স্লোগান দিতে পারবেন: ‘... চৌদ্দগুষ্টির চামড়া, তুলে নেব আমরা’।
এত কিছু সত্ত্বেও ভোটাভুটি তো হচ্ছে। ভালো নেতৃত্ব আসার পন্থা একটাই—সুষ্ঠু নির্বাচন। নির্বাচনের কোথাও কোনো বিকল্প নাই।

৪.
কিন্তু ভোটাভুটি তো হতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যবসায়ী ও অন্যান্য কিছু পেশাজীবী সংগঠন যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ অনেকেরই ভোটাভুটি হয় এবং প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ভিত্তিতে। হোক। কিন্তু পেশাজীবী কিছু সংগঠনের বাইরেও তো ভোটাভুটি দরকার। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন বর্তমান গণতান্ত্রিক আমলে হয়েছে বলে শুনি নাই। অর্থাৎ আমরা ধরেই নিয়েছি যে আমাদের সন্ত্রাসী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ছাত্রদের মধ্য থেকে আসবে আমাদের আগামী নেতৃত্ব। কারণ ছাত্রছাত্রীরা তো ভোটাভুটি খেলা খেলতে পারছে না। ভোটাভুটি খেলতে খেলতেই গণতন্ত্রের ভিত তৈরি হবে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। ধরেই নিচ্ছি, সেখানেও আপাতত ভোটাভুটি হবে না। সরকারের প্রশাসকেরাই চালাবেন। অবশ্য কুমিল্লা আর রংপুরে ভোট হয়েছে। তবে ঢাকা বাদ দিলেও বেশ কয়েকটা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগতপ্রায়। উপজেলা নির্বাচন আইনগতভাবে এ বছরের সেপ্টেম্বরের পর থেকে পরবর্তী ছয় মাসের যেকোনো সময়ে করার কথা। উপজেলাকে তো সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, অথচ স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন বা নির্বাচন কিছুই দরকার নাই—এমন বুলি আর ধোপে টিকবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ভোটাভুটি হবে না। সংসদে ভোটাভুটির দরকার নাই। কারণ আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংসদে অত্যধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অনায়াসে জিতবেন। এতে আপত্তির কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে হবেন, সেটা নিয়ে তো দলীয় পর্যায়ে ভোটাভুটি হতে পারে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিঃসন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু এত বড় আওয়ামী লীগে কি দ্বিতীয় কোনো যোগ্য ব্যক্তি নাই? দলের ভেতরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের, অর্থাৎ প্রার্থী কে হবেন, সেটার ফোরাম কী? পার্লামেন্টারি পার্টি, কার্যকরি বা নির্বাহী কমিটি, উপদেষ্টামণ্ডলী, নাকি প্রধানমন্ত্রীর আমলা-উপদেষ্টা—কে নির্ধারণ করবেন এই প্রার্থিতা?
নাকি আসল কথাটা স্পষ্ট করে, খোলামেলাভাবে বলাই উত্তম—ভোটাভুটি যত কম হবে, আমাদের গণতন্ত্র তত বেশি পোক্ত হবে? গণতন্ত্র আরও বেশি সুসংহত হবে, যখন সর্বময় ক্ষমতা এক এক ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে? সবকিছুর হর্তাকর্তা হয় বেগম খালেদা জিয়া, না হয় শেখ হাসিনা, আর একইভাবে স্বীয় দলে এরশাদ। প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক সর্বোচ্চ চার-পাঁচজন ব্যক্তি।
প্রচুর ভোটাভুটি হয়, অথচ সংঘাত, সংঘর্ষ, অস্থিরতার অবসান ঘটে না—এমন দেশের কথা চিন্তাভাবনা করে মনে পড়ছে না। অন্যদিকে ভোটাভুটি হয় না বা হলেও সম্পূর্ণ একতরফা, যেমন হতো পূর্ব ইউরোপের বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, অথচ সংঘাত-সংঘর্ষ নাই এমন উদাহরণও বিরল।
তাই গণতন্ত্রের প্রতি আসলেই যদি কিছুটা হলে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে দলের মধ্যে ভোটাভুটি হোক। আর বিএনপির কাউন্সিলের নাকি সময় হয়ে গেছে। ওই দলে কস্মিনকালে কোনো ভোটাভুটি হয়েছে—দলটির এমন সমালোচনা কি করতে পারবেন? আর তাই ধরেই নিচ্ছি, বেগম খালেদা জিয়া আর যত দিন কান্ডারি থাকবেন, তত দিন দলে ভোটাভুটি হবে না।
তবু আমরা সবাই গণতন্ত্রের কথা বলব। বক্তৃতা দেব। আন্দোলন-হরতাল হবে। মানুষ মারা যাবে, আশঙ্কা হয় আগামী দু-তিন মাসে অনেক বেশি।
তবু ভোটাভুটি যত কম করে পারা যায়, তাই হবে। আর অতীতের মতো বর্তমান ক্ষমতাধরেরাও ভাবছে যে একতরফা নির্বাচন দিয়ে অনেক দিন দেশ চালানো যাবে।
সাধারণ লোকেরা ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। আর বেশি চালাক যারা, তারা পুরোনো ভুলটি নতুনভাবে পুনরাবৃত্তির পন্থা খুঁজে বের করে।
 ড. শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়