ধন্য লাকীর সাহসিকতার



সুব্রত সাহা, গোপালগঞ্জ | তারিখ: ১৭-০৪-২০১৩
নবজাতক কোলে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় বোনের বাড়িতে লাকী বিশ্বাস
নবজাতক কোলে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় বোনের বাড়িতে লাকী বিশ্বাস
প্রথম আলো
প্রসব বেদনা ওঠার পরও ঘরে বসে থাকেনি সে। সাহস নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে গেছে। পরীক্ষা শুরুর পর একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় মেয়েটি। এর পরও ক্ষান্ত হয়নি সে। পরীক্ষা শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরেছে। গত সোমবার গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া এস কে কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
পরীক্ষার্থীর নাম লাকী বিশ্বাস (১৮)। সে উপজেলার দূর্বাশুর গ্রামের পরিমল বিশ্বাসের স্ত্রী। এবার কাশিয়ানী উপজেলার রাজপাট ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে লাকী। গত সোমবার তার পৌরনীতির পরীক্ষা ছিল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তার। কিন্তু বখাটের উত্ত্যক্ত করার কারণে নবম শ্রেণীতেই বিয়ে হয়ে যায়। তবে স্বামীর বাড়িতে গিয়েও লেখাপড়া চালিয়ে যায় সে। এরপর উপজেলার দূর্বাশুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। ভর্তি হয় রাজপাট ডিগ্রি কলেজে। অসুস্থতার কারণে কেন্দ্রের পাশে গোপালপুরে বড় বোনের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে সে। সেখান থেকে সোমবার পরীক্ষা কেন্দ্রে আসে লাকী। সঙ্গে স্বজন, চিকিৎসক ও সেবিকাও ছিল।
রামদিয়া এস কে কলেজের অধ্যক্ষ বলাই চাঁদ দে বলেন, ‘পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে সন্তান প্রসবের জন্য যখন অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমরা ভাবতে পারিনি লাকী কেন্দ্রে ফিরে আসবে। কিন্তু সন্তান জন্মের আধা ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রে ফিরে এসে সে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, লাকী দেখিয়েছে ইচ্ছা থাকলে শিক্ষার জন্য দারিদ্র্য, পারিবারিক ও সামাজিক বাধা কোনো সমস্যাই না। সে সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক অনুপ কুমার মজুমদার বলেন, লাকী স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসব করায় এবং মানসিকভাবে পূর্ব প্রস্তুতি থাকায় দ্রুত পরীক্ষার কেন্দ্রে ফিরে যেতে পেরেছে।
লাকী বলে, ‘আমার বিশ্বাস ছিল, যে প্রস্তুতি আমি নিয়েছি তাতে এক ঘণ্টা পর পরীক্ষায় বসলেও ভালো ফল করব। এরপরও ৮৯ নম্বরের উত্তর দিয়েছি।’ প্রসব বেদনা ওঠার পরও কীভাবে পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে জানতে চাইলে সে বলে, ‘কীভাবে সব বাধা-বিপত্তি জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে হয় তা কৃষক বাবার কাছ থেকে শিখেছি। কষ্ট যতই হোক, যখন আমি আমার সন্তানের মুখ দেখেছি তখন নতুন করে লড়াইয়ের জোর পেয়েছি। ওর মুখ না দেখলে হয়তো পরীক্ষা দিতে পারতাম না।’
লাকী যে কক্ষে পরীক্ষা দিয়েছে সে কক্ষে কর্তব্যরত শিক্ষক মন্মথ নাথ পাঠক জানান, পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট পর লাকির প্রসব বেদনা ওঠে। এর ১০ মিনিটের মধ্যে সে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার ৩০ মিনিট পর সে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বসে।
লাকীর স্বামী পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘পরিবারের সব কাজ সামলে লাকী ঠিকমতো পড়াশোনা করত। বোন না থাকায় বাবা-মা ওকে নিজের মেয়ের মতো দেখেন। সব ক্ষেত্রেই আমি ওকে উৎসাহ দিয়েছি।’

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়