রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়



আর কয়েক দিন পরই বাঙালির গৌরবের কবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী। আর এর কয়েক মাস পরই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাইজ লাভের শতবর্ষ উদ্যাপনের জন্য যে সময় বাংলাদেশের মানুষের ব্যস্ত থাকার কথা, সেই সময় আমরা যে অবস্থায় বেঁচে আছি, এ অবস্থাকে কোনোমতেই একটি সভ্য দেশের মানুষের বেঁচে থাকা বলা যায় না। বরং বলা যায়, প্রাণটা বেরোচ্ছে না বলেই বেঁচে আছি।
প্রতিদিন রাস্তায় বেরোলে যানজট, ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর প্রতিনিয়ত লাফিয়ে চলা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে রোজগারের সঙ্গে হিসাব মেলাতে গিয়ে আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে। কম খেয়ে, পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেয়ে বিরামহীন অসুস্থতা আমাদের তাড়িত করছে। সুচিকিৎসার গ্যারান্টি নেই; আছে ভুয়া ডাক্তারের গলাকাটা ভিজিট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিবাণিজ্য আর কোচিং 'ডোনেশন'-এর খৰ ঝুলছে আমাদের মাথার ওপর। সর্বোপরি চাকরি ক্ষেত্রে 'কালো বিড়াল'দের দৌরাত্ম্য। একই বছর কয়বার তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়বে, তা স্বয়ং দেশের কর্তাব্যক্তিরাও আজ বলতে অপারগ। পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন দলের নেতা ও 'বড়ভাই'দের বিরক্তিকর অভিভাবকত্ব। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন নেতাকে ভক্তি-অর্ঘ্য দেব ভেবে যখন আমরা দিশেহারা, তখন এ রকম হাজারো সমস্যার দরিয়ায় বর্তমানে হাজির হয়েছে নতুন চমক খুন-গুম।
অবশ্য খুন-গুম এ দেশে কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে বর্তমানে তা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। অবৈধ অস্ত্রধারীরা অতীতে যেমন খুন-গুম করেছে এবং করছে, ঠিক তেমনি তা বৈধ অস্ত্রেও করা হয়েছে এবং বর্তমানে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিককালের এই 'খুন-গুম' সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানানোর জন্য যে হরতাল আহ্বান করা হচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় জীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
কয়েক দিন পরই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে এবং বর্তমানে সারা দেশে চলছে এইচএসসি পরীক্ষা। এ অবস্থায় হরতালের মতো কর্মসূচি যে কতটা ভয়ানক, তা বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আবার এটাও ভাবার বিষয়, মিডিয়া জগতের দুজন প্রথিতযশা সাংবাদিক দম্পতির মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনে প্রশাসন যেখানে ব্যর্থতা ও বালখিল্য প্রদর্শন করছে, সেখানে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টিও যে সাগর-রুনি দম্পতির মতো হবে না, তা-ই বা বলি কী করে। পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তাই বিরোধী দল এ দেশের প্রচলিত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিবাদের মাধ্যম হরতাল করতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু সাগর-রুনিই নয়, নিকট অতীতে এ রকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির 'গুম' বা অন্তর্ধান বিবেকবান মানুষের চিত্তকে নাড়া দেয় বৈকি! তাই আমরা যারা দেশের সাধারণ নাগরিক, যারা উলুখাগড়ার মতো, তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। এলাকার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা দুর্ঘটনার জন্য যেমন চেয়ারম্যান সাহেবদের ভূমিকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়, তেমনি দেশের সার্বিক অবস্থার জন্য কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও সরকারের দিকেই আমরা তাকিয়ে আছি। আপনারা যুদ্ধ যত পারেন করবেন, কেবল আমাদের মতো বেচারা উলুখাগড়াদের বিষয়টি মাথায় রেখে করবেন।
শরিফুল ইসলাম
বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ
পাংশা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
ডাকঘর-পাংশা, জেলা-রাজবাড়ী।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়