কিংবদন্তির নাদেরা বেগম



কুর্রাতুল-আইন-তাহ্মিনা | তারিখ: ১৯-০৪-২০১৩
বাঁ দিক থেকে টিবলু, দিশা, নাদেরা বেগম ও গোলাম কিবরিয়া—মস্কো, ১৯৭২
বাঁ দিক থেকে টিবলু, দিশা, নাদেরা বেগম ও গোলাম কিবরিয়া—মস্কো, ১৯৭২
হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারতেন না। বসে বসেই যুদ্ধ পরিচালনা করে বাসা পাল্টানোর জন্য বাঁধাছাঁদা প্রায় সেরে ফেলেছিলেন নাদেরা বেগম।
শরীর তখন খুবই অসুস্থ। কিন্তু কাতর হয়ে বসে থাকা তাঁর ধাতে নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মেজো সন্তান যখন মাকে দেখতে ছুটে আসছে, ফোনে ছেলেকে তিনি বরাবরের মতোই বীজ আনতে বলেন। শসা, স্কোয়াশ, জুকিনি, চেরি, টমেটো আর যমঝাল জ্যালাপিনো মরিচের বীজ।
এই হচ্ছেন নাদেরা বেগম—আজীবন জীবনবিকাশে একাগ্র, জেদি, স্বনির্ভর, অকুতোভয়, ন্যায়-নীতির প্রশ্নে নিরাপস রাগী, প্রাণোচ্ছল, সংবেদনশীল এবং দীর্ঘ যাত্রাপথের অভিমান আর ক্ষয়ক্ষতিকে আত্মস্থ করে মানুষকে ভালোবেসে বাঁচার প্রয়াসী। 
ভাষা আন্দোলনের উন্মেষপর্বে এই সত্তাই আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠে কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে।

২.
উম্মে হেনা নাদেরা বেগমের জন্ম ১৯২৯ সালের ২ আগস্ট বগুড়ায়। ব্রিটিশ রাজের পদস্থ কর্মকর্তা আবদুল হালিম চৌধুরী ও আফিয়া বেগমের ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। আমার তিনি বড় খালা। 
আমার নানা নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ধর্ম, শিক্ষা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে কড়া কিন্তু বিরল কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘আব্বা’ এবং নরম, বিদ্যানুরাগী ‘আম্মা’র স্নেহছায়ায় হেনা বড় হয়েছেন। আব্বা নিজে বাড়িতে পড়াতেন। বড় দুই ভাই কবীর চৌধুরী—‘মানিক ভাই’ ও শহীদ মুনীর চৌধুরীর সুবাদে বাড়িতে আধুনিক বইপত্র ও চিন্তাচেতনার খোলা হাওয়া বইত।
বোরকা পরা হেনা স্কুলে ভর্তি হন নবম শ্রেণীর শেষ দিকে। বরিশাল সদর বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে তিনি মুসলমান মেয়েদের মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন। একই ফলসহ কলকাতার ‘পর্দা-কলেজ’ লেডি ব্রেবোর্ন থেকে তিনি আইএ পাস করেন। তারপর ইংরেজিতে বিএ সম্মান পাস করে ১৯৪৮ সালে ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে এমএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হন।
প্রতিটি ধাপে বাবা চাপ দিয়েছেন বিয়ে করতে, আর মেয়ে জেদ ধরেছে আগে পড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য। জিতেছে প্রতিবার মেয়েই, বড় ভাইদের কুশলী সহায়তায়। 

৩.
এর আগে বাবার মুখের ওপর হেনাকে বোরকামুক্ত করেছিলেন তাঁর ‘মানিক ভাই’। এবার মুনীর ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রী সংঘ সংগঠিত করার কাজে নামলেন নাদেরা বেগম। 
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন শুরু হলে সেটাতে যোগ দেওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। তিনি লিখে গেছেন, ‘...প্রথম যে ছোটখাটো মিছিলটির ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ হয়, তার সামনে ছিলাম আমরা মেয়েরা।’ তবে মেয়েই ছিল তখন কম, মুসলমান মেয়ে প্রায় অনুপস্থিত।
১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলনে নাদেরাও সক্রিয় ছিলেন—‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তখন সরকারের নির্দেশে যে কজন ছাত্রকে বহিষ্কার করেন, তাঁর মধ্যে আমি ছিলাম একমাত্র মেয়ে।’
নাদেরার নামে তত দিনে হুলিয়া বেরিয়েছে। তিনি পালিয়ে পালিয়ে পিকেটিং-মিটিং-মিছিলে অংশ নিচ্ছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুবার তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের হাত পিছলে বেরিয়ে যান। একবার পুলিশের হাতে রয়ে গিয়েছিল তাঁর বেণির ফিতা, আরেকবার পরনের শাড়ি। 
তারপর তিনি ধরা পড়েন এবং ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ঢাকা আর রংপুর জেলে থাকেন। তখন সহবন্দীদের সঙ্গে রাজবন্দীর অধিকারের দাবিতে একবার ২৮ দিন, আরেকবার ৫৮ দিন অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। নাদেরা মুক্তি পেয়েছিলেন বিনা শর্তে।

৪.
১৯৫২ সালে তিনি তাঁর আবাল্য সুহূদ ও খালাতো ভাই গোলাম কিবরিয়াকে বিয়ে করেন, যিনি আবার আমার বড় কাকা। বড় কাকা একই আন্দোলনে জেলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আগেই রাজনীতি ছাড়ার মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। বড় খালাও রাজনীতি ছেড়ে দেন।
যত দূর জেনেছি-বুঝেছি, বিশেষত বড় কাকা তখনকার কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিছু ধারা মানতে পারেননি। তা ছাড়া তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বড় খালা সেরা ফল করে ইংরেজিতে এমএ পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে স্বামীর চাকরিসূত্রে ঠাঁই বদল হলে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একটি মেয়েদের কলেজে পড়াতেন। সে সময় রেডিওতে খবরও পড়তেন। ঘুরেফিরে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শেষে ১৯৮৮ সালে তিনি অবসর নেন।
সংসারের পাশাপাশি আর তিনি করেছেন বাগান, যখন যেখানে যেভাবে পেরেছেন। সাবেক অর্থসচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক আমার বড় কাকা ছিলেন অকৃত্রিম জ্ঞানান্বেষী। এ দুটি মানুষের বড় যোগসূত্র ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত পড়াশোনা এবং আলোকিত ধর্মবিশ্বাস ও ন্যায়নিষ্ঠতা।
ননদ মালেকা বেগম লেগে থেকে নাদেরাকে দিয়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে দু-একটি স্মৃতিকথা লিখিয়েছেন, সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। কিন্তু অন্তরঙ্গ পরিসরের বাইরে এসব কথা জাহির করায় তীব্র অনীহা ছিল বড় খালার। বরং যে প্রতিবাদী মূল্যবোধ তাঁকে আন্দোলনে টেনে নিয়েছিল, সেটা জীবনে চর্চা করতে চেষ্টা করেছেন।

৫.
বড় ছেলে বিকাল (মাহমুদ কিবরিয়া) মায়ের সঙ্গে থাকত। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও অন্যান্য সমস্যার শেষ ধাপে পৌঁছে বড় খালা হাসপাতালে যেতে চাননি। কিন্তু মেজো ছেলে টিবলু (মাসুদ কিবরিয়া) ঢাকায় এলে ছেলেদের কথা বিবেচনা করে তিন দিন হাসপাতালে ছিলেন।
তখন প্রায়ই তাঁর চিন্তা ও কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। পরিষ্কার মুহূর্তগুলোয় টিবলু তাঁকে নানা প্রশ্ন করে সজাগ করতে চাইত। যেমন ‘আম্মা, তুমি আওয়ামী লীগ, না বিএনপির সমর্থক?’ বড় খালার সটান জবাব ছিল ‘তুমি কুয়ার ব্যাং’। তারপর একটু থেমে বলেছিলেন, যে পক্ষই জীবন, গাছ আর প্রকৃতির পক্ষে কাজ করবে, তিনি সেই পক্ষ নেবেন।
তিনি বলেছিলেন, টিবলুর মাথাভর্তি গোবর। ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাসায় সবার সঙ্গে প্রাণখোলা গল্প করেছিলেন। টিবলু জানতে চেয়েছিল, ‘আম্মা, এখনো কি আমার মাথায় গোবর?’ আম্মার উত্তর, সেটা চারা গজালে বোঝা যাবে!
টিবলু সে রাতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে প্লেনে ওঠে। শেষ রাতে বড় খালা চলে যান। পাশে ছিলেন ননদ লিলি, বিকাল ভাই, কন্যা স্নেহে পালিত সাথী আর পরিচারিকা পেয়ারা। একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী দিশা কিবরিয়া এসে পৌঁছাতে পারেনি।

৬.
২০১১ সালের আগস্টে স্বামী গত হওয়ার পর বড় খালা তাঁর মানিক ভাইসহ তিন ভাইকে হারিয়েছেন। অকালে চলে গেছে ভ্রাতুষ্পুত্র মিশুক মুনীর। বিষাদের স্রোত এসেছে, কিন্তু তিনি তলিয়ে যাননি।
উত্তরায় ভাড়াবাসার ছাদে আর বারান্দায় শাকসবজি-ফল-ফুল ফলাতেন, সেলাই করতেন, বই পড়তেন। বাংলা একাডেমীর জন্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের লেখা মুনীর চৌধুরী বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। বোনঝি লালীকে ভার্জিনিয়া উলফের কয়েকটি লেখা বাংলা অনুবাদ করে দিলেন। 
খাতায় খাতায় মুক্তোর মতো হরফে লেখা রয়েছে ভাষান্তরিত আর স্বরচিত বেশ কিছু কবিতা। পুরোনো হিসাবের খাতায় থাকা একটা কবিতার শেষ স্তবক:
ডাইনির হাঁড়িতে চালাবে হাতা, 
ঘুঁটবে সাপের লেজ, গিরগিটির মাথা;
ক্ষণ-আনন্দ, নিষ্পাপ সুখস্বপ্ন
ব্যর্থ আকুতি, ভয়, হতাশা, দীর্ণ বেদনা—
হারিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া...
রেকর্ড করা আবৃত্তিতে বড় খালার গলাটা এখানে একটু ভাঙা ভাঙা, একটু ক্লান্ত। কিন্তু আশ্চর্য জীবন্ত আর নবীন।
কুর্রাতুল-আইন-তাহিমনা: সাংবাদিক।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়