বিশ্ববাসীর কাছে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি গোপন করছে সরকার-সুলতানা কামাল


স্টাফ রিপোর্টার : হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ’র আহ্বায়ক ও আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আশক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেছেন, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ৪৬২টি আর গুম হয়েছেন ১৫৬ জন। তবে, এসব গুমের মাত্র ২৮ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সরকার গোপন করছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন,  জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকার এসব বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে কথা অস্বীকার করেছে। অথচ সরকারের সামান্য সদিচ্ছা থাকলেই এসব হত্যাকা- বন্ধ করা সম্ভব ছিল। 
গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা এবং হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ’র প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল এ কথা বলেন। আগামী ২৯ এপ্রিল জাতিসংঘে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে। তাই ‘হিউম্যান রাইটস  ফোরাম বাংলাদেশ’ বাংলাদেশ-২ নামে জাতিসংঘের সর্বজনীন পুনর্বীক্ষণ পদ্ধতি’র (ইউপিআর) আলোকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। একই দিনে বাংলাদেশ-২ নামের এ প্রতিবেদন সেখানে জমা দিবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল গণমাধ্যমের সামনে বাংলাদেশ-২ প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ তুলে ধরেন। 
হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের আহ্বায়ক সুলতানা কামাল বলেন, সীমান্ত হত্যাকা- বন্ধ করার ব্যাপারে ভারত বরাবরই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। এরপরও তা বন্ধ করেনি ভারত। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র গুলিতে ২৭০ জন নিরীহ বাংলদেশি হত্যার শিকার হয়। সুলতানা কামাল জানান, বাংলাদেশের কারগারগুলোর মোট ধারণ ক্ষমতা ৩০ হাজার ৬৩০ জন। অথচ ২০১২ সালের মে মাস পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দীর সংখ্যা রয়েছে ৭২ হাজার ৩ জন। এর ফলে বন্দীরা মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। তারা সেখানে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অহরহ। এসব ঘটনা মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের ব্যার্থতাকেই আরও নগ্নভাবে তুলে ধরে। বিরোধী দলের সভা সমাবেশে সরকারের বাধা দেয়া ও গণ গ্রেফতার, তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা কমিটি এবং পোশাক শ্রমিকদের র‌্যালিতে বাধা দেয়ার ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়া আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে সরকারের নেতিবাচক মনোভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ। তবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষার অধিকার ও নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবর্তনগুলোকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার মানবাধিকারের বিষয়টি চেপে গেলেও আমরা আন্তর্জাতিক পরিম-লে তা তুলে ধরবো। যা বাস্তব ঘটনা প্রতিবেদনে তা তুলে ধরছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সরকারই গঠন করেছে। তবে, একে কাজ করতে হবে সরকারের বাইরে এসে। এ কমিশনকে আমরা সব রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেখতে চাই। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত আইন শৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। 
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, আমাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সত্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিচার বহির্ভূত হত্যাককান্ডের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। অথচ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা অস্বীকার করছে। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কিছু বিষয়ে সরকারের সাথে সমঝোতা করছে। তবে, কিছু বিষয়ে স্বচ্ছতা রয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, তৃণমূল থেকে তথ্য নিয়ে নিয়ে সত্য তুলে ধরার জন্য তারা প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন। আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সরকার পার্বত্য ভূমিকমিশন গঠন না করায় আদিবাসীরা জমির ওপর তাদের অধিকার হারাচ্ছে। এছাড়া শান্তি চুক্তিও সরকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন হিউম্যান রাইটস ফোরামের সদস্য সালেহ আহমেদ।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়