ছাত্রলীগের অস্ত্রের মহড়া


চট্টগ্রাম ব্যুরো : বন্দর নগরী চট্টগ্রামের রাজপথে গতকাল সোমবার প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেখিয়েছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে বেলা ১১টায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে প্রকাশ্যে শটগান উঁচিয়ে গুলি করেছে মাসুম নামে ছাত্রলীগের এক ক্যাডার। সেখানে আরও কয়েকজন ক্যাডারকে বন্দুক ও রিভলবার নিয়ে হেফাজত কর্মীদের উপর নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। অনেকের হাতে ছিল ধামা, রামদা, চাপাতিসহ দেশীয় অস্ত্র। পুলিশ, র‌্যাব এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্য এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনেই তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুঁড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব সদস্য অস্ত্রধারীদের গ্রেফতারের কোন উদ্যোগ নেয়নি। বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরায় এই ছবি ধারণ করা হয়েছে। আশপাশের ভবন থেকে অস্ত্রের মহড়ার এ দৃশ্য ধারণ করেছেন বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ। জানা যায়, নিজ অস্ত্রের গুলিতে গুরুতর আহত হয় এক ছাত্রলীগ ক্যাডার।
এদিকে বিকেল ৫টায় নাসিমন ভবনস্থ দলীয় কার্যালয় থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের মুক্তির দাবিতে বিএনপির একটি বিক্ষোভ মিছিল জুবিলী রোড হয়ে তিনপোলের মাথায় গেলে সেখানে আগে থেকে অপেক্ষমাণ ছাত্রলীগ কর্মীরা মিছিলকারীদের ধাওয়া করে। সেখানে এক ছাত্রলীগ ক্যাডার রিভলবার উঁচিয়ে বিএনপি কর্মীদের উপর গুলি ছুঁড়ে। এ দৃশ্যও ধারণ করেছে কয়েকটি টিভি ক্যামেরার সাংবাদিকরা। সেখানেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও ছিলেন নীরব দর্শক। চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে গতকাল প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের রাজপথে সরকারি দলের ক্যাডারদের এ অস্ত্রের মহড়া এবং অস্ত্রবাজির ঘটনায় উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার প্রকৌশলী বনজ কুমার মজুমদার ইনকিলাবকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ছাত্রলীগের গুলি : আহত ২০ 
চট্টগ্রাম ব্যুরো : ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর কিংবা জ্বালাও-পোড়াও ছাড়াই বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হেফাজত ইসলাম আহূত সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে নগরীর দামপাড়া ওয়াসা মোড়ে হেফাজতে ইসলামের মিছিলে গুলি করেছে ছাত্রলীগ। সশস্ত্র ছাত্রলীগ ক্যাডারদের প্রতিরোধ করতে লাঠিসোঁটা, ইটপাটেকল নিয়ে হেফাজত কর্মীদের সাথে নেমে আসে সাধারণ জনতা। দু’পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পুলিশ। এতে দুই পুলিশ এক ছাত্রলীগ কর্মীসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। 
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী দাবি করেছেন, তিনিসহ ছাত্রলীগের হামলায় তাদের সংগঠনের ৬০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেও জানান তিনি। গুলিবিদ্ধ হেফাজতে ইসলামের কর্মী মাওলানা বশির আহমদ, ওমর ফারুক, শেহাবুদ্দিন, আমজাদ হোসেন, মো. কুতুবুদ্দিন, জিয়াউর রহমান, মো. মুসা, মো. আবদুল্লাহ ও মো. জাহেদ হোসনেকে বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। সালাউদ্দীন নামে ছাত্রলীগের এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হেফাজতে ইসলামের মিছিলে গুলি করতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়। বিকালে ওয়াসা মোড়ে এক বিশাল সমাবেশ থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারী ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে। 
ফজরের নামাজের পর থেকে হেফাজতে ইসলামের কয়েক হাজার নেতাকর্মী ওয়াসা মোড়ে অবস্থান নিয়ে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সরকাল ১০টার পর ছাত্রলীগ ইস্পাহানী মোড়ে মাইক বাজিয়ে সমাবেশ শুরু করে। বেলা পৌনে ১১টায় উভয়পক্ষের মিছিল থেকে ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে বন্দুক উঁচিয়ে হেফাজত কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। গুলির মুখে পিছু না হটে হেফাজত কর্মীরা ইটপাটকেল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করে। হেফাজত কর্মীদের সাথে যোগ দেয় বেশকিছু সাধারণ মানুষ। ছাত্রলীগ কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র দামা, কিরিচ, লাঠিসোঁটা নিয়ে হেফাজত কর্মীদের ধাওয়া করে। জনতার ধাওয়া খেয়ে ছাত্রলীগ পিছু হটে গেলে হেফাজত কর্মীদের হটাতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও বিজিবি উভয়পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয়। বেলা সাড়ে ১১টায় ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষের পরও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সন্ধ্যা পর্যন্ত ওয়াসা মোড়ে অবস্থান করে হরতালের সমর্থনে মিছিল সমাবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ চলাকালেই ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা বাগমনিরাম স্কুল ও ইস্পাহানী মোড়ে জমায়েত হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বিষয়টি জেনেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ প্রথমে নীরব থাকে। পরে ছাত্রলীগ পিছু হটলে পুলিশ কর্মকর্তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। হেফাজতে ইসলামের নেতারা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের মদদেই ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। 
এছাড়া নগরীর আন্দরকিল্লা এবং বহদ্দারহাটেও দিনভর অবস্থান করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। হরতাল চলাকালে নগরীতে ৬ প্লাটুন বিজিবি, বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
এদিকে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ছাত্রলীগের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বিকালে ওয়াসা মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম। সমাবেশে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার করে সুষ্ঠু বিচার করা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। তারা বলেন, সরকার হেফাজতে ইসলাম ও তৌহিদী জনতার সঙ্গে ভাঁওতাবাজি শুরু করেছে। একদিকে নবীপ্রেমিক জনতার ১৩ দফা বাস্তবায়ন ও বিবেচনার আশ্বাস, অন্যদিকে দলীয় গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে নিরস্ত্র কর্মীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করা হচ্ছে। সরকার যদি শক্তির ভাষায় কথা বলতে চায়, জনতার শক্তি কি জিনিস তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে। 
৬ এপ্রিল দেশের লক্ষ কোটি জনতা দেখিয়ে দিয়েছে এদেশে ইসলামের ওপর আঘাত এলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাস্তিক-মুরতাদদের পক্ষে অবস্থান নিলে সমগ্র দেশে সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে আসবে এবং বাড়াবাড়ি করা হলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। 
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুইনুদ্দিন রুহী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, অর্থ সম্পাদক মাওলানা কাতেব ইলিয়াস ওসমানী, সাহিত্য ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি আবদুল ওয়াহহাব, মাওলানা শেহাবুদ্দিন নানুপুরী, মাওলানা আহমদুল্ল¬াহ, মাওলানা ইকবাল খলিল, মাওলানা কুতুবুদ্দিন, মুহাম্মদ ইউনুস, আনোয়ার হোসাইন রব্বানী, মুফতি মুহাম্মদ হাসান, কারী ইসমাইল, মাওলানা মাহবুবুর রহমান, আবদুল কাদের, মুহাম্মদ ইমরান, মুহাম্মদ আরিফ, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
নেতৃবৃন্দ সর্বাত্মক হরতাল সফল করায় দেশবাসী ও নবীপ্রেমিক তৌহিদী জনতাকে অভিনন্দন জানান। এছাড়া নগরীর বহদ্দারহাট, কর্ণফুলী সেতু এলাকা, মুরাদপুর, চকবাজার, আন্দরকিল্ল¬া, জামালখান, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ চৌমুহনী হালিশহর প্রভৃতি এলাকায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা ফজরের নামাজের পর থেকে পিকেটিং ও মিছিল শুরু করে। এসব এলাকায় রিকশা পর্যন্ত চলতে দেয়নি হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। মাওলানা লোকমান হাকিমের নেতৃত্বে নতুন ব্রিজ, রাজাখালী এলাকায় পিকেটিং করা হয়।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়