আইনবিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া : মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার সংবিধান পরিপন্থী



আলমগীর হোসেন
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন দেশের সিনিয়র আইনজীবীরা। তারা মনে করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বাকস্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে। দমন-নিপীড়ননীতি দ্বারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার অশুভ পাঁয়তারা করছে। তারই নিকৃষ্টতম প্রতিফলন মাহমুদুর রহমানের মতো একজন সাহসী বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিককে গ্রেফতার করা। তারা বলেন, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও নির্যাতন সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক ও গণবিরোধী নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। যে সরকার সংসদ সদস্যের নিজের পিস্তলের গুলিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে গ্রেফতার করে না, শর্টগান উঁচিয়ে গুলি করা বা দুর্নীতির প্রমাণ্য অভিযোগে অভিযুক্ত দলের নেতাদের আটক করে না, নির্মম খুনি ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা প্রদান করেন, তার মুখে একজন সম্পাদককে এভাবে গ্রেফতার করা আইনের শাসন এটি শুনলে হাস্যকরই শোনায়। পত্রিকার অফিসে হামলা চালিয়ে একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। এটা সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের আঘাত সংবিধান ও আইনবিরোধী। একজন সম্পাদককে ১৩ দিনের রিমান্ড নেয়া নজিরবিহীন। তাকে রিমান্ডে নেয়া সম্পূর্ণ আইনবিরোধী।
বিশিষ্ট আইনবিশেষঞ্জ ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেন, সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা আইনসঙ্গত হয়নি। পত্রিকার অফিসে হামলা চালিয়ে একজন সম্পাদককে গ্রেফতার করা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। এটা সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন, সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের হামলা সংবিধান ও আইনবিরোধী।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বাকস্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। দমন নিপীড়ননীতি দ্বারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার অশুভ পাঁয়তারা করছে। তারই নিকৃষ্টতম প্রতিফলন মাহমুদুর রহমানের মতো একজন সাহসী বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিককে গ্রেফতার করা। তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানকে এর আগে গ্রেফতার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি তারপর তার নীতি-আদর্শ থেকে সড়ে দাঁড়াননি। আমি বিশ্বাস করি, মাহমুদুর রহমানকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে দেশে গণতান্ত্রিক অবস্থা ও এবং সংবাদপত্রের অধিকার থেকে ক্ষান্ত করা যাবে না। অবিলম্বে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করেন খন্দকার মাহবুব।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী গতকাল এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, সরকার অসাংবিধানিকভাবে সংবাদমাধ্যমের মত প্রকাশের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই আমার দেশ সম্পাদককে গ্রেফতার করেছে। সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া আছে। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সরকার তা লঙ্ঘন করে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারের আক্রোশ দীর্ঘদিনের। তিনি সরকারের সব দুর্নীতি, অনাচার ও দেশবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দেশের সবচেয়ে সোচ্চার ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ। তাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন তাই সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক ও গণবিরোধী নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। যে সরকার সংসদ সদস্যের নিজের পিস্তলের গুলিকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে গ্রেফতার করে না, শর্টগান উঁচিয়ে গুলি করা বা দুর্নীতির প্রমাণ্য অভিযোগে অভিযুক্ত দলের নেতাদের আটক করে না, নির্মম খুনি ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা প্রদান করেন, তার মুখে একজন সম্পাদককে এভাবে গ্রেফতার করা আইনের শাসন, এটি শুনলে হাস্যকরই শোনায়। তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী একটি পদক্ষেপ। আমি তার গ্রেফতার ও তাকে ১৩ দিনের রিমান্ড প্রদানের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাসও প্রকাশ করছি যে মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারে যেসব সম্পাদক ও সাংবাদিক দিন-রাত টিভিতে প্রকাশ্যে প্ররোচনা দিয়েছেন এবং যারা সরকারের গণবিরোধী পদক্ষেপের প্রচারণায় নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের চেয়ে মাহমুদুর রহমান অনেক বেশি শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তেজগাঁও থানায় যে মামলা হয়েছে, তা যদি আমরা সত্য ধরে নিই, তাহলে তিনি কোনো অপরাধ করেননি। কারণ, এ আইনে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা যায় না। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরে স্কাইপ সংলাপ প্রকাশ করেছিল, সেটার দায়দায়িত্ব নিয়ে বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেছেন। যেসব বিষয়ে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল, তাতে বিচারপতি, কোনো কোনো মন্ত্রী, দেশে- বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি তা অস্বীকার করেননি। তা ছাড়া এসব তথ্য ব্রিটেনের ইকোনমিস্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সুতরাং এটা ধরে নেয়া যায়, মাহমুদুর রহমানকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার সংবিধানের ৩৯ ধারা পরিপন্থী। ব্যারিস্টার রাজ্জাক মাহমুদুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরোদ্দজা বাদল বলেন, মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারের খবরে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। কোনো কিছু বলার ভাষা আমার নেই। বিশিষ্ট আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, আমার দেশ-এর সম্পাদককে গ্রেফতার আবারও সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্র প্রমাণ করল। তিনি বলেন, একজন সম্পাদককে ১৩ দিনের রিমান্ড দেয়া নজিরবিহীন। মাহমুদুর রহমান চোর কিংবা ডাকাত নন, তিনি সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। তাকে রিমান্ডে নেয়া সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। তাজুল ইসালাম বলেন, মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিনের রিমান্ড দিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা ৫৫ ডিএল আর ভঙ্গ করা হয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়