মালিকের জন্য দায়মুক্তি জাতির জন্য শোক!
- Get link
- X
- Other Apps
ফারুক ওয়াসিফ | তারিখ: ২৫-০৪-২০১৩
জীবনের চেয়ে মৃতু্যর শক্তি যেখানে বেপরোয়া, সেখানে মৃতরা কাঠামোগত গণহত্যার হিসাবহীন জনপুঞ্জ
শান্তি: সাভারে যাঁরা মরেছেন, তাঁরা ‘আমাদের’ কেউ নন। তাজরীনের ওরাও ‘আমাদের’ কেউ নন। তাই তাঁদের লাশ গোনার দরকার কী? সচক্ষে শত মানুষের লাশ দেখার পরও জানার আগ্রহ নেই, উদ্ধারকাজ শেষে সংখ্যাটা কত দাঁড়াবে, তিন শ, পাঁচ শ, হাজার? যখন নিয়মিতভাবে শ্রমিক মারা যান, তখন কোনবার কতজন মারা গেলেন তার থেকে বড় সত্য, মৃত্যুই তাঁদের জন্যবরাদ্দ, জীবন কেবলআমাদের; যারা মধ্য থেকে উচ্চের দিকের মানুষ।
বাংলাদেশে গরিব মানুষের মৃত্যু আর সংখ্যার বিষয় নয়, এটা এক গুণগত মাত্রা অর্জন করে ফেলেছে। তাঁদের হত্যার ধারাবাহিকতার যোগফল বেশুমার। যাঁরা মরে গেছেন, তাঁদের মরে যাওয়ারই কথা অনিরাপদ কারখানায়, নিষ্ঠুর পরিচালনায়, শ্রম নিংড়ে নেওয়া মজুরিপনায়, উপেক্ষার ব্যবস্থাপনায়। যাঁরা মরেননি, তাঁরা পরে মরবেন। যাঁরা বিছানায় পিঠ রেখে মরার সৌভাগ্য পাবেন, তাঁদের বেঁচে থাকা প্রাকৃতিক নিয়ম আর অসম্ভব প্রাণশক্তির কুদরত। জীবনের চেয়েমৃত্যুর শক্তি যেখানে বেপরোয়া, সেখানে মৃতরা কাঠামোগত গণহত্যার হিসাবহীন জনপুঞ্জ, জীবিতরা জিন্দা লাশ।
লাখো জিন্দা লাশের মিছিল সাভারে উপচে পড়ছে। অধিকাংশ গ্রামীণ তরুণ-তরুণী এবং অধিকাংশই অপুষ্টিজাত খাটো খাটো মানুষ। এঁরা আর দেশের কর্তাশক্তি আর তাঁদের ভাইবেরাদর এক জাতি নয়, এক সমাজ নয়, এক শ্রেণী নয়। এখানে জাতির ভেতর জাত, দেশের ভেতর দ্যাশ, মানুষের মধ্যে না-মানুষ। তাঁরা এই নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। তাঁদের জন্য শোক ছাড়া আর কী-ই বা দেওয়ার আছে আমাদের?
আমাদের জন্য বেঁচে থাকার শান্তি, তাঁদের জন্য শোক। প্রতীকী নয়, নিরঙ্কুশ, আদি ও অকৃত্রিম স্বজন হারানোর শোক। দুই বোন হারানো যুবক আওলাদ মাটিতে আছাড়ি-পিছাড়ি দিয়ে ডাকছেন, ‘ও আল্লাহ, বোন দুইটারে মায়ের বুকে দিয়া যা, আমারে তুই নিয়া যা।’ ধামরাইয়ের আওলাদের বোনের নাম তো শিউলি আর সীমাই হবে। শিউলির বিয়ে হয়েছে দুই মাস আগে। এখনো স্বামীর বাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়নি।
দেখতে দেখতে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। কার কে মারা গেছেন বা নিখোঁজ আছেন, জানতে ভুলে যাই। বলি, কার কয়জন? বগুড়ার রিজিয়া ডুকরে উঠে বলেন, ‘আমার তিনজন: আজিজ, মনিকা, রেহানা।’ আজিজ তাঁর স্বামী, রেহানা বোনের মেয়ে, মনিকাও আত্মীয়। মামুন হাসপাতালে ঝোলানো তালিকায়খুঁজছেন চারজনকে: আতাউর, অরপুন, ফরহাদ ও সুজন। ভাতিজা, ভাগিনা, জামাই সম্পর্কের মানুষ তাঁরা। লিটন খুঁজছেন তাঁর ভাবি কল্পনাকে। হায়, কল্পনা! তাজরীনের নিহতের তালিকায় কয়েকজনকে পেয়েছিলাম, যাঁদের নাম কল্পনা।
আটতলা রানা প্লাজার ছাদের পর ছাদ যেন পাউরুটির পর পাউরুটির টুকরার মতো সেঁটে আছে। তারই একটা ফোকর দিয়ে এক মধ্যবিত্ত চেহারার মানুষ চিৎকার করে ডাকছেন, রা-শে-দ, সা-দ্দা-ম, সা-মা-দ, ইক-বা-ল বলে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইকবালের ফোনে অস্পষ্ট কণ্ঠ শোনা গিয়েছিল। এখন আর কারও সাড়া নেই।
রানা প্লাজার মালিকের নাম সোহেল রানা। তাঁর বাবা খালেক কলু নামে পরিচিত। ঘানির তেলের ব্যবসা ছিল তাঁর। জনশ্রুতি আছে, তাঁর পরিবারের মালিকানায় ধসে পড়া রানা প্লাজার মতো চার-পাঁচটি ভবন আছে। ধনী হওয়ার গতির সমান্তরালে রানা নেতাও হয়েছেন। এখন তিনি শহর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। কিন্তু শ্রমিকেরা তাঁকে নেতা মানতেন না, বলতেন মালিক। এই মালিক আগের দিন শ্রমিকদের বলেছিলেন, ফাটল-টাটল কিছু না। প্লাস্টার খসছে, বিল্ডিংয়ের কিছু হবে না। এই কিছু হবে না তিনি বলতে পেরেছেন কারণ, তিনি তাঁর দলীয় মুরোদ জানতেন। তা-ই প্রমাণ করলেন সাভারের সাংসদ মুরাদ জং। মুরাদ তাঁকে সশরীরে এসে উদ্ধার করেন। আহত-নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের রোষানলে পিষ্ট হওয়ার ভয় থেকে। কিছু হয়নি তাঁর, কিছুই হবে না তাঁর! কিছু হবে না সাভারের উপজেলা নির্বাহীকর্মকর্তার। তিনি বলেছিলেন, ভবনের ফাটল তেমন কিছু নয়।
নারায়ণগঞ্জের প্যানটেক্স গার্মেন্টের মালিকের কিছু হয়নি। চট্টগ্রামে আগুনে অঙ্গার অজস্র শ্রমিকের মালিকেরও কিছু হয়নি। তাঁরা দেশের মালিক, আইনের মালিক, এমনকি অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিক। রাষ্ট্র কেবল এই জীবন-মৃত্যুর মালিকদের ম্যানেজার। তাই মালিকদের কিছু হয় না। কিন্তু মানিকগঞ্জের মুল্লি বেগম ভাঙা হাত নিয়ে বোবা হয়ে যাবেন। যতই বলি, কতজন ছিলেন তখন, ততই তাঁর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ বাড়তে থাকে। এই বোবা যন্ত্রণা আর ক্রোধের ভাষা উদ্ধার করার মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র যদি পেতাম! যদি জানতে পারতাম, কত তীব্র ধিক্কার আর বিচারের ফরিয়াদ সেখানে গুমরাচ্ছে! যদি পারতাম, সেই যন্ত্রণার চিৎকার সরাসরি সম্প্রচার করে সারা দেশের মানুষকে শোনাতে!
সাভার থেকে ফেরার পথে পানির জন্য থামি। দোকানের টেলিভিশনে দেখি, সংসদে সরকারের বিভিন্ন সফলতার বয়ান হচ্ছে। বয়ান যিনি দিচ্ছেন, আর যাঁরা শুনছেন, সবার মুখ হাসি হাসি। সব শান্তি আর হাসি তাঁদের মুখে যেন বর্ষিত, আর শ্রমিকদের জীবনের ওপর ধসে পড়ছে ভবন, পুড়ে যাচ্ছে দেহ। তাঁদের মুখে হাসি নেই। গত কয়েক মাসে আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে শত শত শ্রমিক পুড়ে মরেছেন। তবু সাভারের রাস্তাজুড়ে লাখ লাখ মানুষ। না, মানুষ নন, শ্রমিক। লাখ লাখ শ্রমিক আর তাঁদের স্বজনেরা সাভারজুড়ে। তাঁরা রাস্তায়, তাঁরা রাস্তার পাশে, তাঁরা সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ফটকে। তাঁরা যে যা পারেন করছেন। কেউ মানুষকে পানি খাওয়াচ্ছেন। কেউ খাবার দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাস ভর্তি করে ছাত্রছাত্রীরা এসেছেন রক্ত দিতে এনাম হাসপাতালে। এমনকি আশপাশের মাদ্রাসাছাত্ররাও দাঁড়িয়েছেন রক্তদানের সারিতে, সাহায্যের সারিতে। সাভারে দেখে এলাম, সমাজ যা পারে করছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ। এবংএই রাষ্ট্রযন্ত্র এমনই এক যন্ত্র, যা বাঁচাতে পারে না, মৃত্যুর বন্দোবস্ত দিতে পারে, দিতে পারে চিরদায়মুক্তি। এমনকি সাভার এলাকায় বেসরকারি এনাম হাসাপাতাল ভিন্ন অন্য কোনো সরকারি হাসাপাতাল পর্যন্ত নেই। যেখানে প্রায়ই গণমৃত্যুহয়, সেখানে নেই উদ্ধারের দক্ষ বাহিনী। অথচ ঠিকই রয়েছেশিল্পাঞ্চল পুলিশ, রয়েছেআলিশান ক্লাব।
উদ্ধারকাজে গতি নেই। যেন তারা জানে না কী করতে হবে। ভাঙা ভবনের ভেতর থেকে একটা টর্চ চেয়ে চিৎকার করে গেলেন একজন অনেকক্ষণ। সেই টর্চ পাওয়া গেল না। ঢাকা থেকে একদল দমকলকর্মী গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু কী করতে হবে জানা নেই। এক কথায়, অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা আর বিশৃঙ্খলা। এক ভবন ধসলে যদি এই হয়, তাহলে ভূমিকম্প হলে কী করব আমরা?
সাভারের লাখ লাখ শ্রমিকের মনের এক সুর: ভয়। নীলফামারীর আলমের মা ফোন করে বলেছেন, বাবা চলে আয়। আলমের ‘আর কাজই করতে মন চায় না’। জাহিদের কথা, ‘জীবনটা তামা তামা হইল রে ভাই।’ তাঁরা যেখানে ফিরে যাচ্ছেন, সেই কারখানা কিংবা সেই বস্তি এখন ভয়ের আখড়া। আগুনে পুড়ে বা ধসে মরতে চান না তাঁরা কেউ। কিন্তু দিন যাবে ভয় কমবে; বাড়বে ক্ষুধার চিন্তা, টাকার চিন্তা। তাঁদের জীবন পেটে বাঁধা, পেটের টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা কাজ করে যাবেন মৃত্যুর কারখানায়।
কিন্তু মালিকদের জীবন পেটে বাঁধা নয়, তাঁদের জীবন বাঁধা বিত্তবিলাসের খাসলতে। টাকা বানানোর নেশায় সেই খাসলত তাঁদের অমানুষ করে তুলবে। সাভারের সোহেল রানার মতো ছয়তলার ভিতের ওপর তাঁরা দশতলা ভবন বানাবেন। দোকান দেওয়ার উপযোগী ভবনে কারখানা বানিয়ে দু-তিন টন ওজনের অনেক মেশিন বসাবেন। ভবন আপনা-আপনি ধসে না। এসবের ওজনের ভারে, মালিকের মুনাফার ভারে, বিজিএমইএর ভয়াবহ স্বার্থপরতার ভারে, সরকারযন্ত্র আর রাজনীতির রাজা-রানিদের নির্দয়তার ভারে তাঁরা মরে যান। সাধারণ মানুষ কেবল বিপদ এলেই আহা-উহু প্রতিবাদ করবেন, তারপর ভুলে যাবেন। প্রতিকারে কঠোর হবেন না কেউই। চলতে থাকবে মৃত্যুর ম্যানেজারি।
তাঁদের জন্য কেউ হরতাল দেবেন না, তাঁদের জীবন রক্ষার সফলতার বয়ান কেউ সংসদে গর্ব করে জানাবেন না। বরং হাসিমুখে জাতীয় শোক ঘোষণা করবেন। যাবতীয় শোক আর লজ্জা বহন করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত হয়ে উড়বে বাংলার আকাশে। শোকের দায়, ব্যথার দায়, লজ্জার দায় কেবল পতাকার। বাকি সবার দায়মুক্তি দেওয়া হোক। পোশাকশিল্পে গণহত্যার জন্য দায়ী মালিকেরা আর তাঁদের সংগঠন বিজেএমইএ যে দায়মুক্তির ঐতিহ্য ভোগ করে আসছে, রানা প্লাজার মালিকদেরও সেই দায়মুক্তি প্রাপ্য। এক দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না।
কিন্তু আমাদের যাদের চোখের রেটিনায় যে মাংসপিণ্ডরূপ মানুষের ছবি, আমাদের কী হবে? তাজরীন থেকে ফেরার পর কয়েক দিন নাকে লেগে ছিল পোড়া মাংসের ঘ্রাণ। সাভার থেকে ফেরার পর টের পাচ্ছি মৃত্যুর সোঁদা গন্ধ। এক বন্ধুর প্রশ্ন শুনে নির্বাক হয়ে গেলাম: ‘আপনারা তো সব দেখেছেন, আপনাদের কী হবে?’ কীভাবে ভুলব আহত-নিহত-যন্ত্রণার্ত মানুষের মুখ? ভুলে যাওয়াই কি আমাদের দুঃসহ স্মৃতির নিরুপায় উপায়?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
farukwasif@yahoo.com
বাংলাদেশে গরিব মানুষের মৃত্যু আর সংখ্যার বিষয় নয়, এটা এক গুণগত মাত্রা অর্জন করে ফেলেছে। তাঁদের হত্যার ধারাবাহিকতার যোগফল বেশুমার। যাঁরা মরে গেছেন, তাঁদের মরে যাওয়ারই কথা অনিরাপদ কারখানায়, নিষ্ঠুর পরিচালনায়, শ্রম নিংড়ে নেওয়া মজুরিপনায়, উপেক্ষার ব্যবস্থাপনায়। যাঁরা মরেননি, তাঁরা পরে মরবেন। যাঁরা বিছানায় পিঠ রেখে মরার সৌভাগ্য পাবেন, তাঁদের বেঁচে থাকা প্রাকৃতিক নিয়ম আর অসম্ভব প্রাণশক্তির কুদরত। জীবনের চেয়েমৃত্যুর শক্তি যেখানে বেপরোয়া, সেখানে মৃতরা কাঠামোগত গণহত্যার হিসাবহীন জনপুঞ্জ, জীবিতরা জিন্দা লাশ।
লাখো জিন্দা লাশের মিছিল সাভারে উপচে পড়ছে। অধিকাংশ গ্রামীণ তরুণ-তরুণী এবং অধিকাংশই অপুষ্টিজাত খাটো খাটো মানুষ। এঁরা আর দেশের কর্তাশক্তি আর তাঁদের ভাইবেরাদর এক জাতি নয়, এক সমাজ নয়, এক শ্রেণী নয়। এখানে জাতির ভেতর জাত, দেশের ভেতর দ্যাশ, মানুষের মধ্যে না-মানুষ। তাঁরা এই নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। তাঁদের জন্য শোক ছাড়া আর কী-ই বা দেওয়ার আছে আমাদের?
আমাদের জন্য বেঁচে থাকার শান্তি, তাঁদের জন্য শোক। প্রতীকী নয়, নিরঙ্কুশ, আদি ও অকৃত্রিম স্বজন হারানোর শোক। দুই বোন হারানো যুবক আওলাদ মাটিতে আছাড়ি-পিছাড়ি দিয়ে ডাকছেন, ‘ও আল্লাহ, বোন দুইটারে মায়ের বুকে দিয়া যা, আমারে তুই নিয়া যা।’ ধামরাইয়ের আওলাদের বোনের নাম তো শিউলি আর সীমাই হবে। শিউলির বিয়ে হয়েছে দুই মাস আগে। এখনো স্বামীর বাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়নি।
দেখতে দেখতে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। কার কে মারা গেছেন বা নিখোঁজ আছেন, জানতে ভুলে যাই। বলি, কার কয়জন? বগুড়ার রিজিয়া ডুকরে উঠে বলেন, ‘আমার তিনজন: আজিজ, মনিকা, রেহানা।’ আজিজ তাঁর স্বামী, রেহানা বোনের মেয়ে, মনিকাও আত্মীয়। মামুন হাসপাতালে ঝোলানো তালিকায়খুঁজছেন চারজনকে: আতাউর, অরপুন, ফরহাদ ও সুজন। ভাতিজা, ভাগিনা, জামাই সম্পর্কের মানুষ তাঁরা। লিটন খুঁজছেন তাঁর ভাবি কল্পনাকে। হায়, কল্পনা! তাজরীনের নিহতের তালিকায় কয়েকজনকে পেয়েছিলাম, যাঁদের নাম কল্পনা।
আটতলা রানা প্লাজার ছাদের পর ছাদ যেন পাউরুটির পর পাউরুটির টুকরার মতো সেঁটে আছে। তারই একটা ফোকর দিয়ে এক মধ্যবিত্ত চেহারার মানুষ চিৎকার করে ডাকছেন, রা-শে-দ, সা-দ্দা-ম, সা-মা-দ, ইক-বা-ল বলে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ইকবালের ফোনে অস্পষ্ট কণ্ঠ শোনা গিয়েছিল। এখন আর কারও সাড়া নেই।
রানা প্লাজার মালিকের নাম সোহেল রানা। তাঁর বাবা খালেক কলু নামে পরিচিত। ঘানির তেলের ব্যবসা ছিল তাঁর। জনশ্রুতি আছে, তাঁর পরিবারের মালিকানায় ধসে পড়া রানা প্লাজার মতো চার-পাঁচটি ভবন আছে। ধনী হওয়ার গতির সমান্তরালে রানা নেতাও হয়েছেন। এখন তিনি শহর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। কিন্তু শ্রমিকেরা তাঁকে নেতা মানতেন না, বলতেন মালিক। এই মালিক আগের দিন শ্রমিকদের বলেছিলেন, ফাটল-টাটল কিছু না। প্লাস্টার খসছে, বিল্ডিংয়ের কিছু হবে না। এই কিছু হবে না তিনি বলতে পেরেছেন কারণ, তিনি তাঁর দলীয় মুরোদ জানতেন। তা-ই প্রমাণ করলেন সাভারের সাংসদ মুরাদ জং। মুরাদ তাঁকে সশরীরে এসে উদ্ধার করেন। আহত-নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের রোষানলে পিষ্ট হওয়ার ভয় থেকে। কিছু হয়নি তাঁর, কিছুই হবে না তাঁর! কিছু হবে না সাভারের উপজেলা নির্বাহীকর্মকর্তার। তিনি বলেছিলেন, ভবনের ফাটল তেমন কিছু নয়।
নারায়ণগঞ্জের প্যানটেক্স গার্মেন্টের মালিকের কিছু হয়নি। চট্টগ্রামে আগুনে অঙ্গার অজস্র শ্রমিকের মালিকেরও কিছু হয়নি। তাঁরা দেশের মালিক, আইনের মালিক, এমনকি অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুরও মালিক। রাষ্ট্র কেবল এই জীবন-মৃত্যুর মালিকদের ম্যানেজার। তাই মালিকদের কিছু হয় না। কিন্তু মানিকগঞ্জের মুল্লি বেগম ভাঙা হাত নিয়ে বোবা হয়ে যাবেন। যতই বলি, কতজন ছিলেন তখন, ততই তাঁর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ বাড়তে থাকে। এই বোবা যন্ত্রণা আর ক্রোধের ভাষা উদ্ধার করার মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র যদি পেতাম! যদি জানতে পারতাম, কত তীব্র ধিক্কার আর বিচারের ফরিয়াদ সেখানে গুমরাচ্ছে! যদি পারতাম, সেই যন্ত্রণার চিৎকার সরাসরি সম্প্রচার করে সারা দেশের মানুষকে শোনাতে!
সাভার থেকে ফেরার পথে পানির জন্য থামি। দোকানের টেলিভিশনে দেখি, সংসদে সরকারের বিভিন্ন সফলতার বয়ান হচ্ছে। বয়ান যিনি দিচ্ছেন, আর যাঁরা শুনছেন, সবার মুখ হাসি হাসি। সব শান্তি আর হাসি তাঁদের মুখে যেন বর্ষিত, আর শ্রমিকদের জীবনের ওপর ধসে পড়ছে ভবন, পুড়ে যাচ্ছে দেহ। তাঁদের মুখে হাসি নেই। গত কয়েক মাসে আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে শত শত শ্রমিক পুড়ে মরেছেন। তবু সাভারের রাস্তাজুড়ে লাখ লাখ মানুষ। না, মানুষ নন, শ্রমিক। লাখ লাখ শ্রমিক আর তাঁদের স্বজনেরা সাভারজুড়ে। তাঁরা রাস্তায়, তাঁরা রাস্তার পাশে, তাঁরা সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ফটকে। তাঁরা যে যা পারেন করছেন। কেউ মানুষকে পানি খাওয়াচ্ছেন। কেউ খাবার দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাস ভর্তি করে ছাত্রছাত্রীরা এসেছেন রক্ত দিতে এনাম হাসপাতালে। এমনকি আশপাশের মাদ্রাসাছাত্ররাও দাঁড়িয়েছেন রক্তদানের সারিতে, সাহায্যের সারিতে। সাভারে দেখে এলাম, সমাজ যা পারে করছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ। এবংএই রাষ্ট্রযন্ত্র এমনই এক যন্ত্র, যা বাঁচাতে পারে না, মৃত্যুর বন্দোবস্ত দিতে পারে, দিতে পারে চিরদায়মুক্তি। এমনকি সাভার এলাকায় বেসরকারি এনাম হাসাপাতাল ভিন্ন অন্য কোনো সরকারি হাসাপাতাল পর্যন্ত নেই। যেখানে প্রায়ই গণমৃত্যুহয়, সেখানে নেই উদ্ধারের দক্ষ বাহিনী। অথচ ঠিকই রয়েছেশিল্পাঞ্চল পুলিশ, রয়েছেআলিশান ক্লাব।
উদ্ধারকাজে গতি নেই। যেন তারা জানে না কী করতে হবে। ভাঙা ভবনের ভেতর থেকে একটা টর্চ চেয়ে চিৎকার করে গেলেন একজন অনেকক্ষণ। সেই টর্চ পাওয়া গেল না। ঢাকা থেকে একদল দমকলকর্মী গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু কী করতে হবে জানা নেই। এক কথায়, অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা আর বিশৃঙ্খলা। এক ভবন ধসলে যদি এই হয়, তাহলে ভূমিকম্প হলে কী করব আমরা?
সাভারের লাখ লাখ শ্রমিকের মনের এক সুর: ভয়। নীলফামারীর আলমের মা ফোন করে বলেছেন, বাবা চলে আয়। আলমের ‘আর কাজই করতে মন চায় না’। জাহিদের কথা, ‘জীবনটা তামা তামা হইল রে ভাই।’ তাঁরা যেখানে ফিরে যাচ্ছেন, সেই কারখানা কিংবা সেই বস্তি এখন ভয়ের আখড়া। আগুনে পুড়ে বা ধসে মরতে চান না তাঁরা কেউ। কিন্তু দিন যাবে ভয় কমবে; বাড়বে ক্ষুধার চিন্তা, টাকার চিন্তা। তাঁদের জীবন পেটে বাঁধা, পেটের টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা কাজ করে যাবেন মৃত্যুর কারখানায়।
কিন্তু মালিকদের জীবন পেটে বাঁধা নয়, তাঁদের জীবন বাঁধা বিত্তবিলাসের খাসলতে। টাকা বানানোর নেশায় সেই খাসলত তাঁদের অমানুষ করে তুলবে। সাভারের সোহেল রানার মতো ছয়তলার ভিতের ওপর তাঁরা দশতলা ভবন বানাবেন। দোকান দেওয়ার উপযোগী ভবনে কারখানা বানিয়ে দু-তিন টন ওজনের অনেক মেশিন বসাবেন। ভবন আপনা-আপনি ধসে না। এসবের ওজনের ভারে, মালিকের মুনাফার ভারে, বিজিএমইএর ভয়াবহ স্বার্থপরতার ভারে, সরকারযন্ত্র আর রাজনীতির রাজা-রানিদের নির্দয়তার ভারে তাঁরা মরে যান। সাধারণ মানুষ কেবল বিপদ এলেই আহা-উহু প্রতিবাদ করবেন, তারপর ভুলে যাবেন। প্রতিকারে কঠোর হবেন না কেউই। চলতে থাকবে মৃত্যুর ম্যানেজারি।
তাঁদের জন্য কেউ হরতাল দেবেন না, তাঁদের জীবন রক্ষার সফলতার বয়ান কেউ সংসদে গর্ব করে জানাবেন না। বরং হাসিমুখে জাতীয় শোক ঘোষণা করবেন। যাবতীয় শোক আর লজ্জা বহন করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত হয়ে উড়বে বাংলার আকাশে। শোকের দায়, ব্যথার দায়, লজ্জার দায় কেবল পতাকার। বাকি সবার দায়মুক্তি দেওয়া হোক। পোশাকশিল্পে গণহত্যার জন্য দায়ী মালিকেরা আর তাঁদের সংগঠন বিজেএমইএ যে দায়মুক্তির ঐতিহ্য ভোগ করে আসছে, রানা প্লাজার মালিকদেরও সেই দায়মুক্তি প্রাপ্য। এক দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না।
কিন্তু আমাদের যাদের চোখের রেটিনায় যে মাংসপিণ্ডরূপ মানুষের ছবি, আমাদের কী হবে? তাজরীন থেকে ফেরার পর কয়েক দিন নাকে লেগে ছিল পোড়া মাংসের ঘ্রাণ। সাভার থেকে ফেরার পর টের পাচ্ছি মৃত্যুর সোঁদা গন্ধ। এক বন্ধুর প্রশ্ন শুনে নির্বাক হয়ে গেলাম: ‘আপনারা তো সব দেখেছেন, আপনাদের কী হবে?’ কীভাবে ভুলব আহত-নিহত-যন্ত্রণার্ত মানুষের মুখ? ভুলে যাওয়াই কি আমাদের দুঃসহ স্মৃতির নিরুপায় উপায়?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
farukwasif@yahoo.com
- Get link
- X
- Other Apps
Comments