সোনালী ব্যাংকের মূল্যায়ন : হলমার্কের বন্ধকী সম্পত্তির মূল্য মাত্র ৬শ’ কোটি টাকা



অর্থনৈতিক রিপোর্টার
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
হলমার্ক গ্রুপের পক্ষ থেকে সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা ২১৪৩ শতাংশ জমির মূল্য মাত্র ৬শ’ কোটি টাকা। অথচ বন্ধকের সময় এ সম্পত্তির মূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে বন্ধকী সম্পত্তির মূল্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বা প্রায় সাড়ে তিনগুণ বেশি দেখানো হয়েছিল। জমির বাজারদর মূল্যায়নে সোনালী ব্যাংকের গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এ কমিটির প্রতিবেদন সম্প্রতি ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে অবহিত করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চিঠি দেবে। একইসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের আর্থিক সঙ্কট কাটাতে সরকারের ভর্তুকির আওতায় টাকা চাওয়া হবে।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান এএইচএম হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেশিরভাগ পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্তসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির তথ্য ফাঁসের পর ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটি মর্টগেজ হিসেবে সাভারের হেমায়েতপুরের ২১৪৩ শতাংশ জমি রেখেছিল। এসব সম্পত্তির মূল্য মাত্র ৬শ’ কোটি টাকা। এছাড়া পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি আরও কিছু সম্পত্তি বন্ধক রেখেছিল; বর্তমানে তার মূল্যায়নের কাজ চলছে। আর প্রতিষ্ঠানটির আত্মসাত্ করা অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এই অর্থ আদায়ের কোনো সম্ভাবনা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখছে না। বৈঠকে পরিচালকরা বলেন, হলমার্কের বড় অংকের এই ঋণ জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে সোনালী ব্যাংক সমস্যায় পড়েছে। এতে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে, মূলধনে বড় অংকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের ভর্তুকির আওতায় অর্থ চাওয়া হবে। শিগগিরই এসব বিষয় চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
গত ১৯ মার্চ হলমার্ক গ্রুপের যাবতীয় সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের একটি বিবরণী এবং হলমার্ক গ্রুপের সম্পদ হতে কীভাবে সোনালী ব্যাংকের সব দায়দেনা নিয়মিত করে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা করা যায়—তা নিয়ে ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠির বিষয়ে সোনালী ব্যাংক পর্ষদের বৈঠক ডাকা হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত বেশিরভাগ পরিচালক হলমার্কের সঙ্গে নতুন করে ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপনের বিপক্ষে মত দেন। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশের জন্য সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বৈঠকটি ডাকা হয়। এ বৈঠকেও পরিচালকরা হলমার্কের সঙ্গে নতুন করে ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপনের বিপক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলমার্কের সম্পদের বিবরণীতে দেখা যায়, তাদের স্থাবর-অস্থাবর মোট ৫ হাজার ৬৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪ একর জমি রয়েছে, যার অধিকাংশ সাভারের হেমায়েতপুরে নদী তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এছাড়া ৯০টি টিনশেড, পাঁচটি ছয়তলা বিল্ডিং, একটি চারতলা বিল্ডিং, পাঁচটি তিনতলা ও তিনটি দোতলা বিল্ডিং রয়েছে। মেশিনারিজের মধ্যে ১০০ লাইন ওভেন, ২৫০টি নিটিং, ৪৫ টন ডাইং ও স্পিনিং এক্সেসরিজ এবং ৮৭টি বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব সম্পদের মূল্য নির্ধারণে হলমার্ক গ্রুপ কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেনি। প্রত্যেকটি সম্পদের মূল্য বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, হেমায়েতপুরের নিচু অঞ্চলের প্রতি শতাংশ জমি ২৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আবার ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় ক্রয় করা ৫ বিঘা জমির মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি শতাংশ ৪ কোটি টাকা। এদিকে ৮৭টি গাড়ির কোনো ধরনের বিশ্লেষণ ছাড়াই ৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হলমার্ক গ্রুপ যেসব জমি বন্ধক রেখেছে, তার প্রতি শতাংশের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকা। অথচ বন্ধকীতে মূল্য ধরা হয়েছে ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা করে। এতে করে সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা জমির মূল্য বাজারদরের চেয়ে ১৯ গুন বেশি দেখানো হয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়