মন্তব্য প্রতিবেদন : পশ্চিমা দুনিয়ার ইসলাম ফোবিয়া এবং বাংলাদেশের রাজনীতি
মাহমুদুর রহমান
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
আগামীকাল শেষ কিস্তি
(দ্বিতীয় কিস্তি)
বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হলে বিশ্ব ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংক্ষিপ্ত বয়ান প্রথম কিস্তিতেই করেছি। তারপর প্রায় পাঁচ দশকব্যাপী শীতল যুদ্ধের অবসানে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়লে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। এশিয়া মহাদেশে চীন এই সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চমত্কারিত্বে সবাইকে তাক লাগাতে পারলেও বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তির বিচারে এখনও দ্বিতীয় সারিতেই রয়েছে। বিশ্বের অনেক অর্থনীতিবিদই ধারণা করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যেই মার্কিনিদের হটিয়ে এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিরূপে চীনের উত্থান ঘটতে চলেছে।
ব্যবসায়িক সক্ষমতায় চীনের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে অধিকাংশ মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি গত দুই দশকে চীনে বিপুল অংকের বিনিয়োগও করেছে। ফলে চীনের অর্থনীতি বিষয়ক সমৃদ্ধিতে এখন মার্কিন স্বার্থও জড়িত হয়ে পড়েছে। তবে এসবই অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনা। সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি এক বিষয় নয়। সামরিক শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষতা অর্জনে চীনকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। সুতরাং, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে সক্ষম কোনো শক্তির আবির্ভাবের সম্ভাবনা আপাতত নজরে পড়ছে না। এমন একটি ভারসাম্যহীন বিশ্ব ব্যবস্থাতে বসবাস করেও তিনটি মাঝারি এবং একটি অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র মার্কিন ভ্রূকুটির তোয়াক্কা না করে বিস্ময়করভাবে টিকে রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলা প্রবল ক্ষমতাধর প্রতিবেশীকে দীর্ঘদিন ধরে একরকম উপেক্ষাই করেছে। দেশটির সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুগো শ্যাভেজ ক্যান্সারের কাছে পরাজয় বরণ করার আগ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গেছেন। অনেক ধরনের কসরত করেও সিআইএ তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। সিআইএ পরিচালিত ক্যু দেতায় একবার সাময়িকভাবে ক্ষমতা হারালেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে হুগো শ্যাভেজ ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজিত করেছিলেন, সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী ফ্রেডরিক ফোরসাইথের (Frederick Forsyth) ফিকশনকেও হার মানিয়েছে।
শ্যাভেজের অকাল মৃত্যুর পর দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভেনিজুয়েলার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দেখা যাক, দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট মার্কিন আধিপত্যের কাছে এবার আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হন কিনা। শ্যাভেজেরই পরম বন্ধু ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদিনেজাদও স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নীতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে সে দেশের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির আদর্শ দৃঢ়তার সঙ্গে অনুসরণ করে চলেছেন এবং এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার মার্কিনি চাপ ও হুমকি উপেক্ষা করতে পেরেছেন।
রহস্যময় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির শিরঃপীড়ার কারণ হওয়া ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে। দেশটিতে প্রায়ই তীব্র খাদ্য সঙ্কটের কথা শোনা গেলেও সামরিক শক্তির বিচারে উত্তর কোরিয়াকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা, সেই কিম ইল সুং-এর সময় থেকেই রাষ্ট্রটির মতিগতি এতই অনিশ্চয়তায় ঘেরা যে, পঞ্চাশের দশকের পর থেকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষেই সেখানে যুদ্ধ বাধানোর ঝুঁকি নেয়া সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ কিউবা প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্য থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরের অতি ক্ষুদ্র এই ক্যারিবীয় দ্বীপ সম্পর্কে অন্যান্য দেশের অধিবাসীরা বিশেষ কিছু না জানলেও প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নাম জানে না, বিশ্বে এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। সারা পৃথিবীতে অনন্য-সাধারণ ব্যক্তিগত ইমেজে যে ক’জন রাষ্ট্রনায়ক তাদের রাষ্ট্রের পরিচিতিকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো অন্যতম। সেই ১৯৬০ সাল থেকে তাকেও সিআইএ’র হন্তারকরা বিভিন্ন পন্থায় অসংখ্যবার হত্যা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফিদেল আজও কিউবার অবিসংবাদিত নেতার আসনটি ধরে রেখেছেন।
চীন, রাশিয়া এবং যে চারটি তুলনামূলক ক্ষুদ্র দেশের কথা উল্লেখ করলাম, তাদেরকে বিবেচনার বাইরে রাখলে সমগ্র বিশ্বই বলতে গেলে আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। মানব ইতিহাসের কোনো সহস্রাব্দেই এত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব মিলবে না। আমার এই মন্তব্যে অনেক দেশের নাগরিকেরই হয়তো আত্মসম্মানে ঘা লাগবে, তারা আহতও বোধ করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানের এককেন্দ্রিক বিশ্বে এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই একপেশে বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে অতিশয় ক্ষুদ্র, দুর্বল বাংলাদেশের অবস্থানটা এবার পর্যালোচনা করা যাক।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি
১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন অবস্থায় পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৌশলগত সখ্য বিদ্যমান ছিল। সেই সময় বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে অবধারিত পরাজয় আন্দাজ করতে পেরে যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও এশিয়ার জঙ্গলাকীর্ণ রহস্যময় দেশটি থেকে যত দ্রুত সম্ভব তাদের আপনজনদের দেশে ফিরিয়ে নিতে নিক্সন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন ভিয়েতকং বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হওয়ার জন্য চীনের মধ্যস্থতা মার্কিনিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তান, মার্কিন-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলাতে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করছিল। এই অবস্থায় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের চটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন প্রদান আদৌ সম্ভব ছিল না। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে শীতল যুদ্ধ তখন চরমে। ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। কৌশলগত কারণেই ভারতকে কেন্দ্র করে সোভিয়েত লবিভুক্ত দেশগুলো দল বেঁধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়াল। অর্থাত্ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
অধিকাংশ মুসলমান রাষ্ট্র সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় নাস্তিক্যবাদী নীতির কারণে তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো। অপরদিকে পশ্চিমা জনগোষ্ঠী মূলত সেমেটিক ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের সম্পর্কে এক ধরনের নৈকট্য বোধও মুসলমানদের মধ্যে ছিল। এদিকে শীতল যুদ্ধে মিত্র বাড়ানোর লক্ষ্যে পশ্চিমা শাসকশ্রেণীর মনে যাই থাক না কেন, তখনও তারা আজকের মতো সরাসরি ইসলাম-বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়নি। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পশ্চিমাদের মিত্রতার প্রেক্ষাপট এভাবেই তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সমাজতান্ত্রিক কিউবায় পাটজাত দ্রব্যের একটি চালান রফতানি করা হলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। পারস্পরিক তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হলে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে।
শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তারই দীর্ঘদিনের যে সহকর্মী তিন মাসেরও কম সময়ের জন্য সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সেই খোন্দকার মোশতাক আহমদও আওয়ামী লীগে মার্কিনপন্থী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। আগস্ট ট্রাজেডির ছয় মাস আগে জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে দেশে একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। মস্কোপন্থী সব বাম সংগঠন বাকশালে একীভূত হওয়ায় বাংলাদেশ সোভিয়েত বলয়ে আরও ঝুঁকে পড়ে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে শীতল যুদ্ধের একটি পক্ষে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশ চরম অজনপ্রিয় সমাজতান্ত্রিক একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তক ও সমর্থক একই বাম রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা সময়ের বিবর্তনে এখন আবার দল বেঁধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হয়েছে। মূলত চরম ইসলাম-বিদ্বেষই পরষ্পরবিরোধী গোষ্ঠীর এই সুবিধাবাদী ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সেতু হিসেবে কাজ করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রেক্ষিতে পশ্চিমের নতুন শত্রু আবিষ্কার
এদিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন আরম্ভ হলে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতির ভিত্তিতে ইসলামিক বিশ্বের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা আফগান মুজাহিদদের অস্ত্র এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ আরম্ভ করে। ওসামা বিন লাদেনও সোভিয়েতবিরোধী জেহাদে অংশ নিতে সৌদি আরব থেকে আফগানিস্তানে ঘাঁটি গাড়েন। পশ্চিমা লেখকদেরই বিভিন্ন বই থেকে জানা গেছে যে, সৌদি ধনকুবের পরিবারের সন্তান ওসামার আফগানিস্তান অভিযানে সিআইএ’র প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। আফগানিস্তান যুদ্ধে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর পরাজয় এবং শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নই ভেঙে গেলে মার্কিনিদের কাছে জেহাদি মুসলমানদের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে।
শুধু তাই নয়, পশ্চিমের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা কালবিলম্ব না করে নতুন শত্রুর সন্ধান শুরু করে দেন। ভাবখানা এমন ছিল যে লাল পতাকা এবং কাস্তে-হাতুড়ি তো গেল, এবার পুঁজিবাদের শত্রু কে? পশ্চিমের জনগণের কাছে এইসব তাত্ত্বিকরা ইসলামকে এক ভয়ঙ্কর বিপদরূপে হাজির করলেন। সমাজতান্ত্রিক লালের শূন্যস্থান ইসলামী সবুজ দ্বারা পূরণ করা হলো। তারা বলতে লাগলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর এবং ব্যাপক রূপ ধারণ করবে। এই সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের প্রথমদিকের মুসলিম-বিদ্বেষী তাত্ত্বিকদের মধ্যে বার্নার্ড লুইস ছিলেন অন্যতম। ১৯৯০ সালে তার লেখা প্রবন্ধ ‘দি রুটস অব মুসলিম রেইজ’-এ তিনি ক্রুদ্ধ, সভ্যতা ধ্বংসকারী এবং যুক্তিহীন একদল সহিংস মানুষরূপে বিশ্বের তাবত্ মুসলমানদের চিত্রিত করেন। স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘দি ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ লিখতে গিয়ে বার্নার্ড লুইস দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলেন। পশ্চিমের জায়নবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারমাধ্যম সাংবাদিকতার তাবত্ ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে এইসব লেখার ওপর যথাসম্ভব রঙ চড়াতে শুরু করে।
মিথ্যা প্রচারণার উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলোহামা সিটিতে বোমা হামলার ঘটনার উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। ১৯৯৫ সালের ১৯ এপ্রিল টিমোথি ম্যাকভে (Timothy Mcveigh) নামে প্রথম ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক হতাশাগ্রস্ত মার্কিন সৈনিক ওকলোহামা সিটির একটি ভবনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে ১৬৮ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয় এবং ৫৮০ জন আহত হয়। অথচ বোমা হামলার সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রকার তথ্যপ্রমাণ এবং অনুসন্ধান ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরাইলের প্রচারমাধ্যমে কথিত মুসলমান সন্ত্রাসীদের দায়ী করা হতে থাকে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পশ্চিমের সর্বত্র রব তোলা হয়, মুসলমানরা আবার আঘাত হেনেছে। অথচ সত্য উদঘাটিত হলে দেখা গেল, এই হামলার সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সংশ্রবই ছিল না। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী একাধিক মার্কিন নাগরিক মিলে ওই সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তীব্র মুসলমান বিদ্বেষের আলোচনার এই পর্যায়ে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাস জেনে নেয়াটা পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে দুঃখজনক হত্যার প্রসঙ্গ আগেই উল্লেখ করেছি। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর একাংশের অপর এক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে বিএনপির নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন ১৯৯০ সালে। জনসংখ্যার নিরিখে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও পশ্চিমাদের নজর দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির দিকে তখন পর্যন্ত তেমন একটা পড়েনি। নিয়মিত বন্যা এবং ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড়ের দেশ হিসেবে আমাদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের জনগণের এক প্রকার করুণামিশ্রিত অবজ্ঞা ছিল। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে আছে কেবল অসংখ্য মানবসন্তান, উর্বর জমি, সুপেয় পানি এবং কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র। অবশ্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ শুরু হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘে অন্তত বাংলাদেশের গুরুত্ব ততদিনে খানিকটা বেড়েছে। ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনাকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যথেষ্ট উত্সাহের সঙ্গেই স্বাগত জানিয়েছিল।
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের আগে মিডিয়াতে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল। শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের একটি পত্রিকায় সাক্ষাত্কার প্রদানকালে বিএনপি বড়জোর গোটা দশেক আসন পাবে বলে বেগম খালেদা জিয়াকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন। এরশাদ জামানার শেষের দিকে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি তেমন একটা ভালো ফলাফল করতে না পারার প্রেক্ষাপটে ভারতের সমর্থনপুষ্ট শেখ হাসিনার মনোবল তখন তুঙ্গে। আমি সে সময় চট্টগ্রামে একটি ব্রিটিশ বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিচালক পদে চাকরি করছি। রাতে টেলিভিশনের সামনে বসে সস্ত্রীক নির্বাচনের ফলাফল দেখছিলাম। ঘটনাচক্রে আমার স্ত্রী পারভীনের পিতাও বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। সুতরাং ফলাফল জানার জন্য তারও উত্সাহের ঘাটতি ছিল না। যতদূর স্মরণে পড়ছে, রাত ন’টা নাগাদ ফলাফল দেয়া শুরু হলে প্রথম দিকে কেবলই আওয়ামী লীগের জয়ের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল। মাঝ রাতে আমার স্ত্রী বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত ধারণা করে অনেকটা হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জেগেই রইলাম।
রাত যত গভীর হতে লাগলো, পাশার দানও পাল্টাতে শুরু করলো। কী এক রহস্যজনক কারণে বিএনপি যেসব অঞ্চলে ভালো করেছিল সেই সংবাদ প্রচারে বিলম্ব হচ্ছিল। ভোরের দিকে স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানালাম বেগম খালেদা জিয়াই বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ঘুম ও বিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই বললাম, তার পিতাও ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। নির্বাচনের পর অনেক ভেবেছিলাম, কেন বিএনপির এই অপ্রত্যাশিত বিজয়? এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আবারও অতীতের বাংলাদেশে ফিরতে হবে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কুখ্যাত রক্ষীবাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র-যুব ও শ্রমিক সংগঠনের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। লুটপাট, দখল আর খুনের মহোত্সবে শিউরে উঠে দেশবাসী একে অপরকে প্রশ্ন করতেন, এই জন্যই কি এত রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হলো? একদিকে তত্কালীন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে জনগণের ওপর লাল ঘোড়া দাবড়ানোর হুঙ্কার দিতেন, অন্যদিকে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগের সভাপতি আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে গঠিত লাল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা প্রকৃতই তাণ্ডব চালিয়ে বেড়াত। মনে আছে, ১৯৭৩ সালে আমার চোখের সামনেই সেই লাল বাহিনী জাতীয় প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকে অবস্থিত ন্যাপ (মোজাফফর) অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ডাকসাইটে নেত্রী, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তখন সেই মস্কোপন্থী রাজনৈতিক দল ন্যাপের (মোজাফফর) শীর্ষ নেতৃবৃন্দেরই একজন ছিলেন। শ্রমিক নেতা মান্নানের লাল বাহিনীর হাত থেকে সেই ভীতিকর সন্ধ্যায় কেমন করে জীবন বাঁচিয়েছিলেন, সেটা মতিয়া চৌধুরীই ভালো বলতে পারবেন। আমি তখন বুয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। গায়ে লাল শার্ট আর কপালে লাল কাপড়ের ফেটি বাঁধা সন্ত্রাসী লাঠিয়াল বাহিনীর বেপরোয়া ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা যে ক’জন বন্ধুর সঙ্গে সভয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, তাদের মধ্যে সিভিলের মোয়াজ্জেম আর কেমিক্যালের জহিরের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। শেরেবাংলা হলে আমরা একই কক্ষে থাকতাম। এক ভয়ঙ্কর ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরব্যাপী ব্যর্থ শাসনের পতনের পর তারই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাথী খন্দকার মোশতাকের আড়াই মাসের সামরিক শাসনেরও অন্ত ঘটে ক্যু, কাউন্টার ক্যু-এর মাধ্যমে এবং ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন—মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষক, বীর সেনানী এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।
তরুণ, সুদর্শন, স্মার্ট সেনা অফিসার জিয়া কেবল আবরণেই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাতেও পরিবর্তন আনলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর তিনি দেশের মেধাবী, সত্ ও দক্ষ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করলেন। আমি যে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি, সেখানকার চারজন প্রখ্যাত অধ্যাপক জেনারেল জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বুয়েটের সাবেক ভিসি ড. ইকবাল মাহমুদ এবং আইবিএ’র সাবেক পরিচালক ড. মোজাফফর আহমেদ আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এরপর জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হলে সত্, শিক্ষিত এবং মেধাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের সেই নবীন দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রধানত পেশাদার রাজনীতিকদের দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্যান্য পেশায় সফলকাম হয়ে রাজনীতিতে পরে প্রবেশকারী ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত নতুন ধারার দল বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাঙালি-বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ছাড়াও এ দেশের সমাজে এক ভিন্ন ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টি করে। সমালোচকরা বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টে জন্মলাভকারী সুবিধাবাদীদের দল বলে অপবাদ দিলেও বাকশালী দুর্নীতি ও অপশাসনে অতিষ্ঠ জনগণের মধ্যে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়।
অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবনে প্রবাদপ্রতিম সততার অধিকারী এবং অসম্ভব কর্মঠ জেনারেল জিয়াউর রহমানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক বাহিনীর কুচক্রীদের হাতে ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার এক দশক পরের সাধারণ নির্বাচনেও বিএনপির জয়ের পেছনের অন্যতম কারণ ছিল জেনারেল জিয়ার সেই ঈর্ষণীয় ব্যক্তি-ইমেজ। অবশ্য জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আশির দশকব্যাপী যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থেকেছে, সেই আন্দোলনে দৃঢ়তার সঙ্গে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর ইমেজের বাইরেও জনমনে একটি নিজস্ব লড়াকু, দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হতে তখনও বছর দশেক বাকি রয়েছে। অবশ্য সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শেষে মুষ্টিমেয় বাংলাদেশী স্বেচ্ছাসেবক ইসলামিক বিপ্লবের বীজ মস্তিষ্কে ধারণ করে আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরতে আরম্ভ করেছেন। সেই আলোচনা আগামীকালের তৃতীয় ও শেষ কিস্তির জন্য রেখে বিদায় নিচ্ছি।
admahmudrahman@gmail.com
(দ্বিতীয় কিস্তি)
বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হলে বিশ্ব ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংক্ষিপ্ত বয়ান প্রথম কিস্তিতেই করেছি। তারপর প্রায় পাঁচ দশকব্যাপী শীতল যুদ্ধের অবসানে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়লে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। এশিয়া মহাদেশে চীন এই সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চমত্কারিত্বে সবাইকে তাক লাগাতে পারলেও বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তির বিচারে এখনও দ্বিতীয় সারিতেই রয়েছে। বিশ্বের অনেক অর্থনীতিবিদই ধারণা করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যেই মার্কিনিদের হটিয়ে এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিরূপে চীনের উত্থান ঘটতে চলেছে।
ব্যবসায়িক সক্ষমতায় চীনের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে অধিকাংশ মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি গত দুই দশকে চীনে বিপুল অংকের বিনিয়োগও করেছে। ফলে চীনের অর্থনীতি বিষয়ক সমৃদ্ধিতে এখন মার্কিন স্বার্থও জড়িত হয়ে পড়েছে। তবে এসবই অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনা। সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি এক বিষয় নয়। সামরিক শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষতা অর্জনে চীনকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। সুতরাং, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে সক্ষম কোনো শক্তির আবির্ভাবের সম্ভাবনা আপাতত নজরে পড়ছে না। এমন একটি ভারসাম্যহীন বিশ্ব ব্যবস্থাতে বসবাস করেও তিনটি মাঝারি এবং একটি অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র মার্কিন ভ্রূকুটির তোয়াক্কা না করে বিস্ময়করভাবে টিকে রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলা প্রবল ক্ষমতাধর প্রতিবেশীকে দীর্ঘদিন ধরে একরকম উপেক্ষাই করেছে। দেশটির সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুগো শ্যাভেজ ক্যান্সারের কাছে পরাজয় বরণ করার আগ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গেছেন। অনেক ধরনের কসরত করেও সিআইএ তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। সিআইএ পরিচালিত ক্যু দেতায় একবার সাময়িকভাবে ক্ষমতা হারালেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে হুগো শ্যাভেজ ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজিত করেছিলেন, সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী ফ্রেডরিক ফোরসাইথের (Frederick Forsyth) ফিকশনকেও হার মানিয়েছে।
শ্যাভেজের অকাল মৃত্যুর পর দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভেনিজুয়েলার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দেখা যাক, দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট মার্কিন আধিপত্যের কাছে এবার আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হন কিনা। শ্যাভেজেরই পরম বন্ধু ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদিনেজাদও স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নীতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে সে দেশের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির আদর্শ দৃঢ়তার সঙ্গে অনুসরণ করে চলেছেন এবং এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার মার্কিনি চাপ ও হুমকি উপেক্ষা করতে পেরেছেন।
রহস্যময় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির শিরঃপীড়ার কারণ হওয়া ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে। দেশটিতে প্রায়ই তীব্র খাদ্য সঙ্কটের কথা শোনা গেলেও সামরিক শক্তির বিচারে উত্তর কোরিয়াকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা, সেই কিম ইল সুং-এর সময় থেকেই রাষ্ট্রটির মতিগতি এতই অনিশ্চয়তায় ঘেরা যে, পঞ্চাশের দশকের পর থেকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষেই সেখানে যুদ্ধ বাধানোর ঝুঁকি নেয়া সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ কিউবা প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্য থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরের অতি ক্ষুদ্র এই ক্যারিবীয় দ্বীপ সম্পর্কে অন্যান্য দেশের অধিবাসীরা বিশেষ কিছু না জানলেও প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নাম জানে না, বিশ্বে এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। সারা পৃথিবীতে অনন্য-সাধারণ ব্যক্তিগত ইমেজে যে ক’জন রাষ্ট্রনায়ক তাদের রাষ্ট্রের পরিচিতিকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো অন্যতম। সেই ১৯৬০ সাল থেকে তাকেও সিআইএ’র হন্তারকরা বিভিন্ন পন্থায় অসংখ্যবার হত্যা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফিদেল আজও কিউবার অবিসংবাদিত নেতার আসনটি ধরে রেখেছেন।
চীন, রাশিয়া এবং যে চারটি তুলনামূলক ক্ষুদ্র দেশের কথা উল্লেখ করলাম, তাদেরকে বিবেচনার বাইরে রাখলে সমগ্র বিশ্বই বলতে গেলে আসমুদ্র হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। মানব ইতিহাসের কোনো সহস্রাব্দেই এত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব মিলবে না। আমার এই মন্তব্যে অনেক দেশের নাগরিকেরই হয়তো আত্মসম্মানে ঘা লাগবে, তারা আহতও বোধ করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানের এককেন্দ্রিক বিশ্বে এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই একপেশে বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে অতিশয় ক্ষুদ্র, দুর্বল বাংলাদেশের অবস্থানটা এবার পর্যালোচনা করা যাক।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি
১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন অবস্থায় পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৌশলগত সখ্য বিদ্যমান ছিল। সেই সময় বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে অবধারিত পরাজয় আন্দাজ করতে পেরে যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও এশিয়ার জঙ্গলাকীর্ণ রহস্যময় দেশটি থেকে যত দ্রুত সম্ভব তাদের আপনজনদের দেশে ফিরিয়ে নিতে নিক্সন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু কমরেড হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন ভিয়েতকং বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হওয়ার জন্য চীনের মধ্যস্থতা মার্কিনিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তান, মার্কিন-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলাতে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করছিল। এই অবস্থায় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের চটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন প্রদান আদৌ সম্ভব ছিল না। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে শীতল যুদ্ধ তখন চরমে। ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। কৌশলগত কারণেই ভারতকে কেন্দ্র করে সোভিয়েত লবিভুক্ত দেশগুলো দল বেঁধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়াল। অর্থাত্ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
অধিকাংশ মুসলমান রাষ্ট্র সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় নাস্তিক্যবাদী নীতির কারণে তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো। অপরদিকে পশ্চিমা জনগোষ্ঠী মূলত সেমেটিক ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের সম্পর্কে এক ধরনের নৈকট্য বোধও মুসলমানদের মধ্যে ছিল। এদিকে শীতল যুদ্ধে মিত্র বাড়ানোর লক্ষ্যে পশ্চিমা শাসকশ্রেণীর মনে যাই থাক না কেন, তখনও তারা আজকের মতো সরাসরি ইসলাম-বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়নি। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পশ্চিমাদের মিত্রতার প্রেক্ষাপট এভাবেই তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সমাজতান্ত্রিক কিউবায় পাটজাত দ্রব্যের একটি চালান রফতানি করা হলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। পারস্পরিক তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হলে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে।
শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তারই দীর্ঘদিনের যে সহকর্মী তিন মাসেরও কম সময়ের জন্য সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সেই খোন্দকার মোশতাক আহমদও আওয়ামী লীগে মার্কিনপন্থী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। আগস্ট ট্রাজেডির ছয় মাস আগে জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে দেশে একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। মস্কোপন্থী সব বাম সংগঠন বাকশালে একীভূত হওয়ায় বাংলাদেশ সোভিয়েত বলয়ে আরও ঝুঁকে পড়ে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে শীতল যুদ্ধের একটি পক্ষে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশ চরম অজনপ্রিয় সমাজতান্ত্রিক একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তক ও সমর্থক একই বাম রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা সময়ের বিবর্তনে এখন আবার দল বেঁধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হয়েছে। মূলত চরম ইসলাম-বিদ্বেষই পরষ্পরবিরোধী গোষ্ঠীর এই সুবিধাবাদী ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সেতু হিসেবে কাজ করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রেক্ষিতে পশ্চিমের নতুন শত্রু আবিষ্কার
এদিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন আরম্ভ হলে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতির ভিত্তিতে ইসলামিক বিশ্বের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা আফগান মুজাহিদদের অস্ত্র এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ আরম্ভ করে। ওসামা বিন লাদেনও সোভিয়েতবিরোধী জেহাদে অংশ নিতে সৌদি আরব থেকে আফগানিস্তানে ঘাঁটি গাড়েন। পশ্চিমা লেখকদেরই বিভিন্ন বই থেকে জানা গেছে যে, সৌদি ধনকুবের পরিবারের সন্তান ওসামার আফগানিস্তান অভিযানে সিআইএ’র প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। আফগানিস্তান যুদ্ধে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর পরাজয় এবং শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নই ভেঙে গেলে মার্কিনিদের কাছে জেহাদি মুসলমানদের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে।
শুধু তাই নয়, পশ্চিমের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা কালবিলম্ব না করে নতুন শত্রুর সন্ধান শুরু করে দেন। ভাবখানা এমন ছিল যে লাল পতাকা এবং কাস্তে-হাতুড়ি তো গেল, এবার পুঁজিবাদের শত্রু কে? পশ্চিমের জনগণের কাছে এইসব তাত্ত্বিকরা ইসলামকে এক ভয়ঙ্কর বিপদরূপে হাজির করলেন। সমাজতান্ত্রিক লালের শূন্যস্থান ইসলামী সবুজ দ্বারা পূরণ করা হলো। তারা বলতে লাগলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর এবং ব্যাপক রূপ ধারণ করবে। এই সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের প্রথমদিকের মুসলিম-বিদ্বেষী তাত্ত্বিকদের মধ্যে বার্নার্ড লুইস ছিলেন অন্যতম। ১৯৯০ সালে তার লেখা প্রবন্ধ ‘দি রুটস অব মুসলিম রেইজ’-এ তিনি ক্রুদ্ধ, সভ্যতা ধ্বংসকারী এবং যুক্তিহীন একদল সহিংস মানুষরূপে বিশ্বের তাবত্ মুসলমানদের চিত্রিত করেন। স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘দি ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ লিখতে গিয়ে বার্নার্ড লুইস দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলেন। পশ্চিমের জায়নবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারমাধ্যম সাংবাদিকতার তাবত্ ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে এইসব লেখার ওপর যথাসম্ভব রঙ চড়াতে শুরু করে।
মিথ্যা প্রচারণার উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলোহামা সিটিতে বোমা হামলার ঘটনার উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। ১৯৯৫ সালের ১৯ এপ্রিল টিমোথি ম্যাকভে (Timothy Mcveigh) নামে প্রথম ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক হতাশাগ্রস্ত মার্কিন সৈনিক ওকলোহামা সিটির একটি ভবনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে ১৬৮ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয় এবং ৫৮০ জন আহত হয়। অথচ বোমা হামলার সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রকার তথ্যপ্রমাণ এবং অনুসন্ধান ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরাইলের প্রচারমাধ্যমে কথিত মুসলমান সন্ত্রাসীদের দায়ী করা হতে থাকে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পশ্চিমের সর্বত্র রব তোলা হয়, মুসলমানরা আবার আঘাত হেনেছে। অথচ সত্য উদঘাটিত হলে দেখা গেল, এই হামলার সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সংশ্রবই ছিল না। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী একাধিক মার্কিন নাগরিক মিলে ওই সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় তীব্র মুসলমান বিদ্বেষের আলোচনার এই পর্যায়ে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাস জেনে নেয়াটা পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে দুঃখজনক হত্যার প্রসঙ্গ আগেই উল্লেখ করেছি। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর একাংশের অপর এক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে বিএনপির নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন ১৯৯০ সালে। জনসংখ্যার নিরিখে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও পশ্চিমাদের নজর দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির দিকে তখন পর্যন্ত তেমন একটা পড়েনি। নিয়মিত বন্যা এবং ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড়ের দেশ হিসেবে আমাদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের জনগণের এক প্রকার করুণামিশ্রিত অবজ্ঞা ছিল। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে আছে কেবল অসংখ্য মানবসন্তান, উর্বর জমি, সুপেয় পানি এবং কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র। অবশ্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ শুরু হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘে অন্তত বাংলাদেশের গুরুত্ব ততদিনে খানিকটা বেড়েছে। ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনাকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যথেষ্ট উত্সাহের সঙ্গেই স্বাগত জানিয়েছিল।
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের আগে মিডিয়াতে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল। শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের একটি পত্রিকায় সাক্ষাত্কার প্রদানকালে বিএনপি বড়জোর গোটা দশেক আসন পাবে বলে বেগম খালেদা জিয়াকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন। এরশাদ জামানার শেষের দিকে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি তেমন একটা ভালো ফলাফল করতে না পারার প্রেক্ষাপটে ভারতের সমর্থনপুষ্ট শেখ হাসিনার মনোবল তখন তুঙ্গে। আমি সে সময় চট্টগ্রামে একটি ব্রিটিশ বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিচালক পদে চাকরি করছি। রাতে টেলিভিশনের সামনে বসে সস্ত্রীক নির্বাচনের ফলাফল দেখছিলাম। ঘটনাচক্রে আমার স্ত্রী পারভীনের পিতাও বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। সুতরাং ফলাফল জানার জন্য তারও উত্সাহের ঘাটতি ছিল না। যতদূর স্মরণে পড়ছে, রাত ন’টা নাগাদ ফলাফল দেয়া শুরু হলে প্রথম দিকে কেবলই আওয়ামী লীগের জয়ের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল। মাঝ রাতে আমার স্ত্রী বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত ধারণা করে অনেকটা হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জেগেই রইলাম।
রাত যত গভীর হতে লাগলো, পাশার দানও পাল্টাতে শুরু করলো। কী এক রহস্যজনক কারণে বিএনপি যেসব অঞ্চলে ভালো করেছিল সেই সংবাদ প্রচারে বিলম্ব হচ্ছিল। ভোরের দিকে স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানালাম বেগম খালেদা জিয়াই বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ঘুম ও বিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই বললাম, তার পিতাও ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। নির্বাচনের পর অনেক ভেবেছিলাম, কেন বিএনপির এই অপ্রত্যাশিত বিজয়? এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আবারও অতীতের বাংলাদেশে ফিরতে হবে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কুখ্যাত রক্ষীবাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র-যুব ও শ্রমিক সংগঠনের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। লুটপাট, দখল আর খুনের মহোত্সবে শিউরে উঠে দেশবাসী একে অপরকে প্রশ্ন করতেন, এই জন্যই কি এত রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হলো? একদিকে তত্কালীন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে জনগণের ওপর লাল ঘোড়া দাবড়ানোর হুঙ্কার দিতেন, অন্যদিকে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগের সভাপতি আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে গঠিত লাল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা প্রকৃতই তাণ্ডব চালিয়ে বেড়াত। মনে আছে, ১৯৭৩ সালে আমার চোখের সামনেই সেই লাল বাহিনী জাতীয় প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকে অবস্থিত ন্যাপ (মোজাফফর) অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ডাকসাইটে নেত্রী, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তখন সেই মস্কোপন্থী রাজনৈতিক দল ন্যাপের (মোজাফফর) শীর্ষ নেতৃবৃন্দেরই একজন ছিলেন। শ্রমিক নেতা মান্নানের লাল বাহিনীর হাত থেকে সেই ভীতিকর সন্ধ্যায় কেমন করে জীবন বাঁচিয়েছিলেন, সেটা মতিয়া চৌধুরীই ভালো বলতে পারবেন। আমি তখন বুয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। গায়ে লাল শার্ট আর কপালে লাল কাপড়ের ফেটি বাঁধা সন্ত্রাসী লাঠিয়াল বাহিনীর বেপরোয়া ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা যে ক’জন বন্ধুর সঙ্গে সভয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, তাদের মধ্যে সিভিলের মোয়াজ্জেম আর কেমিক্যালের জহিরের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। শেরেবাংলা হলে আমরা একই কক্ষে থাকতাম। এক ভয়ঙ্কর ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরব্যাপী ব্যর্থ শাসনের পতনের পর তারই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাথী খন্দকার মোশতাকের আড়াই মাসের সামরিক শাসনেরও অন্ত ঘটে ক্যু, কাউন্টার ক্যু-এর মাধ্যমে এবং ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন—মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষক, বীর সেনানী এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।
তরুণ, সুদর্শন, স্মার্ট সেনা অফিসার জিয়া কেবল আবরণেই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাতেও পরিবর্তন আনলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর তিনি দেশের মেধাবী, সত্ ও দক্ষ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করলেন। আমি যে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি, সেখানকার চারজন প্রখ্যাত অধ্যাপক জেনারেল জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বুয়েটের সাবেক ভিসি ড. ইকবাল মাহমুদ এবং আইবিএ’র সাবেক পরিচালক ড. মোজাফফর আহমেদ আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এরপর জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হলে সত্, শিক্ষিত এবং মেধাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের সেই নবীন দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রধানত পেশাদার রাজনীতিকদের দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্যান্য পেশায় সফলকাম হয়ে রাজনীতিতে পরে প্রবেশকারী ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত নতুন ধারার দল বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাঙালি-বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ছাড়াও এ দেশের সমাজে এক ভিন্ন ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টি করে। সমালোচকরা বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টে জন্মলাভকারী সুবিধাবাদীদের দল বলে অপবাদ দিলেও বাকশালী দুর্নীতি ও অপশাসনে অতিষ্ঠ জনগণের মধ্যে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়।
অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবনে প্রবাদপ্রতিম সততার অধিকারী এবং অসম্ভব কর্মঠ জেনারেল জিয়াউর রহমানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক বাহিনীর কুচক্রীদের হাতে ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার এক দশক পরের সাধারণ নির্বাচনেও বিএনপির জয়ের পেছনের অন্যতম কারণ ছিল জেনারেল জিয়ার সেই ঈর্ষণীয় ব্যক্তি-ইমেজ। অবশ্য জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আশির দশকব্যাপী যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থেকেছে, সেই আন্দোলনে দৃঢ়তার সঙ্গে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর ইমেজের বাইরেও জনমনে একটি নিজস্ব লড়াকু, দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হতে তখনও বছর দশেক বাকি রয়েছে। অবশ্য সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শেষে মুষ্টিমেয় বাংলাদেশী স্বেচ্ছাসেবক ইসলামিক বিপ্লবের বীজ মস্তিষ্কে ধারণ করে আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরতে আরম্ভ করেছেন। সেই আলোচনা আগামীকালের তৃতীয় ও শেষ কিস্তির জন্য রেখে বিদায় নিচ্ছি।
admahmudrahman@gmail.com
Comments