তৌহিদী জনতার দখলে ঢাকা
ইনকিলাব
বিশেষ সংবাদদাতা : যানবাহন বন্ধ, পথে পথে বাধা, দাঁড়ি-টুপি দেখলেই ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা, পুলিশি জুলুম-নির্যাতনের পরও তৌহিদী জনতার দখলে রাজধানী ঢাকা। ব্লগারদের অবরোধ আর ঘাদানিকের হরতাল গতকাল রাজধানীর মতিঝিলমুখী মানুষের শ্রোত ঠেকাতে পারেনি। ঢাকার প্রবেশ পথে লংমার্চে কাফেলা প্রতিহত করতে পুলিশের মারমুখী আচরণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের বাধা এবং হরতাল অবরোধকারীদের যৌথ প্রতিহতের চেষ্টা তৌহিদী জনতার ‘প্রতিরোধে’ তারা পিছু হয়ে যায়। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য, অভূতপূর্ব মহাজাগরণ। পিঁপড়ার সারির মতো হেঁটে শ্লোগান দিতে দিতে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করে। মুখে আল্লাহু আকবর শ্লোগান, হাতে জায়নামাজ ও তাসবিহ নিয়েই লংমার্চে আসেন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। রাসূল (সাঃ)-কে নিয়ে কটাক্ষকারীদের বিচারের দাবিতে তৌহিদী জনতার কাতারে পথে পথে শামিল হন লাখ লাখ আমজনতা। হেঁটে তৌহিদী জনতার কাতারে শামিল হওয়ার পাশাপাশি তারা খাবার বিতরণ করেন। কেউ চিকিৎসা দেন। কেউ বা ক্ষেতের তরমুজ-খিরাই, দোকানের চিড়া-গুড় তুলে দেন নবীপ্রেমীদের হাতে। স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা যেমন টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তৌহিদী জনতার খাবারের জন্য দেন তেমনি দোকারিরাও নিজেদের ব্যবসা বন্ধ রেখে নিজ খরচে খাবার নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুকনো খাবার পানীয় বিতরণ করেন। মহাসমাবেশে আসা কয়েকজন বৃদ্ধ জানান, স্বাধীনতার পর ৪২ বছরেও এতো মানুষের সমাবেশ ঢাকায় হয়নি। এ মহাসমাবেশ ঐতিহাসিক মর্যাদা পাবে বলেও তারা জানান।
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে লাখো জনতা ফজরের নামাজের পর পরই হাজির হন। আর সকাল ৮টার পর শুরু হয় ঢাকার মতিঝিলমুখী তৌহিদী জনতার ঢল। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মঞ্চ ঘিরে দিলকুশা হয়ে উত্তরে আরামবাগের রোড ধরে নটরডেম, ফকিরাপুল হয়ে নয়াপল্টনস্থ জোনাকী মার্কেট, পশ্চিমে দৈনিক বাংলা, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, পল্টন মোড় হয়ে হাইকোর্টের সামনের কদমফুল ফোয়ারা, পূর্ব দক্ষিণে বঙ্গভবন-ইনকিলাব-ইত্তেফাক ভবন দিয়ে টিকাটুলি, রাজধানী মার্কেট সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি হয়ে শনিরআখড়া ব্রিজ পর্যন্ত তৌহিদী জনতার ঢল ছড়িয়ে যায়। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নির্দেশনা মেনে মাইকের ব্যবহার করায় লাখ লাখ মানুষ মহাসমাবেশের বক্তাদের কোনো বক্তৃতা শুনতে পাননি। তারপরও প্রখর রোদে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন। বিকেল পৌনে ৫টায় যখন সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় তখনো ঢাকামুখী জনতার শ্রোত থামেনি। পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ, ধোলাইখাল এলাকা, ফার্ম গেট, মহাখালী, মিরপুর, শ্যামলী এলাকায় হাজার হাজার মানুষ হেঁটে আসায় মহাসমাবেশ স্থলে পৌঁছাতে না পারায় সেখানেই বসেন রাস্তার ওপর। সবার মুখে এক আওয়াজ ‘নাস্তিকদের ঠাঁই নাই ওলি-আউলিয়ার বাংলায়’। মহাসমাবেশে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলে মহাসড়কের আশপাশে বসবাসরত মহিলারা বাসার ছাড়ে, বিল্ডিংয়ের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তৌহিদী জনতাকে হাত নেড়ে নিজেদের সমর্থন জানান। অনেকেই রান্না করা খাবার সমাবেশে আসা তৌহিদী জনতার জন্য পরিবারের লোকজনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। ইসলামের মহাজাগরণ সমাবেশ থেকে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সময় বেঁধে দেয়া হয়।
পরিবহন বন্ধ রাখা এবং পুলিশের বর্বরোচিত আচরণে সারাদেশ থেকে তৌহিদী জনতা ঢাকায় পৌঁছাতে না পারায় বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অবস্থান নেয়ায় কয়েকটি জেলায় সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ইসলামের মহাজাগরণ মহাসমাবেশে বক্তৃতা করেন সারা দেশ থেকে আসা ১০২ জন আলেম-ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ। জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ, বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাদেক হোসেন খোকা, বিকল্পধারা, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনের নেতারা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদাকালো দলের ৫০ জন শিক্ষক মহাসমাবেশের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী, ইসলামী চিন্তাবিদ, ব্যবসায়ী হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। লাখ লাখ লোকের সমাবেশ অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে সম্পন্ন হয়। তৌহিদী জনতাকে উদ্দেশ্য করে হেফাজতের ইসলামের আমীর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, হিম্মত করে বাতিলকে রুখে দাঁড়ান বাতিল অপশক্তি আপনাদের পায়ের নিচে মাথা নত করতে বাধ্য হবে। ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের ধৃষ্টতার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে নাস্তিক-মুরদাতরা ইসলামের নিদর্শনাবলীকে চরমভাবে অবমাননা করেছে। সরকারকে নাস্তিকদের সমর্থক হিসেবে অবিহিত করে তিনি বলেন, সরকার দাঁড়ি-টুপি দেখলেই তাদের উপর চড়াও হয়। কোরআন সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতি, ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি আইন পাস করেছে। জাতীয় মসজিদে নামাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। মসজিদের ঈমাম, খতিব, আলেম-ওলামাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, হুমকি-ধমকি, হামলা-মামলা করে তাদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কাদিয়ানী এনজিওসহ ইসলাম বিরোধী অপশক্তিকে বিভিন্নভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতি ধ্বংস করে বিজাতীয় সংস্কৃতি বেহায়াপনা বেলেল্লাপনা আমদানি করছে। জঙ্গিবাদের নামে ইসলামকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করছে।
হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত ইসলাম রক্ষার ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে তৌহিদী জনতা শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকা আসা শুরু করে। তৌহিদী জনতার এ সমাবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য সরকার নানামুখী কৌশল গ্রহণ করে। প্রথমে সমাবেশ করতে দেয়া নিয়ে তালবাহানা করা হয়। অতঃপর মতিঝিলে ১২ শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হলেও নির্ধারিত জায়গার বাইরে মাইক টানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অনেক চেষ্টা করেও পুলিশের মাইক টানানোর ব্যাপারে পুলিশের মন গলানো যায়নি। ফলে সারাদেশ থেকে শত শত মাইল হেঁটে এবং নানাভাবে ঢাকায় পৌঁছিলেও লাখ লাখ মানুষ সমাবেশের বক্তাদের বক্তৃতা শুনতে পাননি। একাধিক টেলিভিশন সরাসরি বক্তৃতা প্রচার করা শুরু করলেও মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশ থেকে জানানো হয় সরকারের নির্দেশে কয়েকটি স্যাটেলাইট টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। মহাসমাবেশে আগতরা জানান, পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের হামলা এবং বিভিন্ন বাধার কারণে যানবাহন না পেয়ে হেঁটে তারা মিছিল নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিভিন্ন প্রবেশ পথে সরকার সমর্থকরা তাদের বাধা দেয়। রাজধানীতে প্রবেশের সময় ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা ঢাকা প্রবেশের বিভিন্ন মোড়ে গতিরোধ করে। আগতদের গাড়ি থেকে নামিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বিভিন্নভাবে নাজেহাল করা হয়। রাজধানীর বাইরে পলিশ মারমুখী আচরণ করলে সমাবেশে লাখ লাখ তৌহিদী জনতার উপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আবার পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ তৌহিদী জনতার মধ্যে বিরতণ করা খাবার গ্রহণ করেন। পুলিশের কঠোর প্রহরায় কিছু ব্লগার ও তাদের সমর্থক কিছু ব্যক্তি শাহবাগে অবস্থান করলে ঢাকার চারদিকে তাদের লোকজন কথিত ‘অবরোধ মঞ্চ’ ফেলে পালিয়ে যায়। মহাখালীতে তাদের ওপর চড়াও হয় স্থানীয় জনতা। আর জনতা তৌহিদী ঢল দেখে হরতালের সমর্থনে পল্টন মোড়ে অবস্থান নেয়া ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ার কবির, মুনতাসিন মামুন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ভোর হওয়ার আগেই সঁটকে পড়েন। মতিঝিলের তৌহিদী জনতার মহাজাগরণ ঠেকাতে গতকালও ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। রাজধানীর আভ্যন্তরীণ সকল রুটসহ ঢাকার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক, রেল ও নৌপথ বন্ধ ছিল। ফলে সারা দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল রাজধানী। শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ব্লগাররা মঞ্চ বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেটের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এতে শতাধিক মালবাহী ট্রাক আটকা পড়ে। নবীনগর থেকে ঢাকামুখী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ সদস্যরা। তারা দেশীয় অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে মহাসড়কে পাহারা বসায়। সকাল ৯টার দিকে বাইপাইল থেকে একটি মাদ্রাসার ২০ থেকে ২৫ জন ছাত্র-শিক্ষক ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ফেরত পাঠান। এছাড়াও সকালে আরও শতাধিক লোক লংমার্চের উদ্দেশে রওনা হলে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। বুড়িগঙ্গা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেতুতে ভোররাত থেকেই সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে করে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কেরানীগঞ্জ, দোহার, নবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেতু বন্ধ থাকায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরাসহ সাধারণ মানুষ হেঁটেই মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এছাড়াও বুড়িগঙ্গা নদীর বেশিরভাগ খেয়ানৌকাসহ যাত্রী পরিবহনের সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সূত্রে জানা যায়, গত দুদিনে দক্ষিণাঞ্চল থেকে মাত্র আটটি লঞ্চ ঢাকায় এসেছে। আর ঢাকা থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে দুটি লঞ্চ। হরতাল ও অবরোধের কারণে কেরানীগঞ্জ ও ফরাশগঞ্জ ঘাটে যাত্রী নামিয়েছে লঞ্চগুলো। তবে সকাল ৯টার দিকে হেফাজতে ইসলামের প্রায় ২০ হাজার নেতা-কর্মীর একটি দল বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হয়ে ঢাকার মতিঝিলে আসে। দুপুরে দুই দফায় প্রায় ৫০ হাজার তৌহিদী জনতা একই পথে হেঁটে শ্লোগান দিতে দিতে ঢাকায় প্রবেশ করে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া-কাওরাকান্দি নৌপথে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে কোনো বাস চলাচল করেনি। এমনকি মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌপথেও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়। নরসিংদী শহরের জেলখানা মোড়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সকালে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা জড়ো হন। সেখানে তারা অবস্থান নিয়ে শ্লোগান, বক্তৃতা করেন। ঢাকার মতিঝিলে মহাসমাবেশে অংশ নিতে শুক্রবার রাত থেকে সিলেট ও হবিগঞ্জ থেকে হেঁটে হাজার হাজার তৌহিদী জনতা শনিবার সকালে নরসিংদী পৌঁছান। রাস্তায় কোনো গাড়ি না থাকায় তারা জেলখানা মোডে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে কিছু সময় বিশ্রামের পর তাঁরা আবারও ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। তবে তারা ঢাকায় পৌঁছার আগেই সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে লংমার্চে আসা ৮০ বছর বয়সের এক বৃদ্ধ জানালেন, তিনি জীবনে বহু সমাবেশে উপস্থিত হয়েছেন, কিন্তু মতিঝিলের সমাবেশের মতো কোনো সমাবেশে লোক সমাগম দেখেননি। বললেন, ইসলামের পথে দেশের মানুষ যেভাবে নেমেছে কোনো ইসলাম বিদ্বেষী আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী মতিঝিলের সমাবেশমঞ্চে এসে উপস্থিত হন বেলা পৌনে ৩টায়। শাহ শফীকে বহনকারী গাড়ির সামনে অর্ধশতাধিক মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা ও অন্তত ১০টি ট্রাক ছিল। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে অশীতিপর ইসলামী চিন্তাবিত শিক্ষাভবনে পুলিশের বাধায় পড়েন। অতঃপর বঙ্গবাজার হয়ে মতিঝিলে আসেন। লিখিত বক্তৃতায় শাহ আহমদ শফী বলেন, হাজারো বাধা প্রতিবন্ধকতা জাল ছিন্নভিন্ন করে সকল অপশক্তির রক্তচক্ষু এবং তাদের তাবৎ ষড়যন্ত্র, বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজকের এই মহা জনসমুদ্রে উপস্থিত হয়েছেন দেশের ওলামা-মাশায়েখ, ছাত্র-শিক্ষক ও নবীপ্রেমী তৌহিদী জনতা। সত্যের কথা বললে, ন্যায় ও ইনসাফের কথা বললে বাতিল অপশক্তির গাত্রদাহ শুরু হয়। সত্যের টুঁটি চেপে ধরে হত্যা করার অপচেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাতিল অপশক্তি কোনকালেই সত্যের কাছে টিকে থাকতে পারেনি। অত্যন্ত গ্লানিকর অবস্থায় তাদের পরাজয় হয়েছে। ইতিহাস তার জ্বলন্ত সাক্ষী। এখনো কোন বাতিল শক্তি এদেশে টিকে থাকতে পারবে না। তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেই। বিজয় হবে সত্যবাদীদের এই বিশ্বাস আমাদের আছে। কেননা, আল্লাহর ইরশাদ : সত্য সমাগত মিথ্যা অপসৃত নিশ্চয় মিথ্যা অপসৃয়মান। এই বাণী অচিরেই বাংলার মাটিতে বাস্তবায়িত হবে- ইনশাআল্লাহ! আপনারা হিম্মত করে বাতিলকে রুখে দাঁড়ান, বাতিল অপশক্তি আপনাদের পায়ের নিচে মাথানত করতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, শয়তান হযরত আদম (আ.)কে মিথ্যার পথে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। হযরত আদম (আ.) শয়তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই শয়তান হয়েছে অভিশপ্ত, লানতপ্রাপ্ত ও বিতাড়িত। হযরত নূহ (আ.) সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলেই তার বিপথগামী জাতি ধ্বংস হয়েছিল। হযরত লুত (আ.) হযরত ইউনুস (আ.) সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বলেই তাদের বিজয় অর্জিত হয়েছে। হযরত মূসা (আ.) সত্যের পতাকা বহন করেছিলেন বলেই ফেরাউন তার বাহিনী সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.) সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বলেই আগুন তাকে জ্বালাতে পারেনি। বরং একটি সামান্য মশার আক্রমণে নমরুদের অপমানজনক মৃত্যু হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী আবরাহা আল্লাহর ঘর ধ্বংস করতে বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসলে তাকে এবং তার বাহিনীকে ছোট পাখির দ্বারা আল্লাহ তা’আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যের আহ্বানকে স্তিমিত করার হীন মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল আবু জাহল, আবু লাহাবসহ আরবের কাফের-মুশরিক চক্র। কিন্তু তারাই পৃথিবীর আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আর ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্ব-জাহানে। তিনি এরপর বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দেয়ার। কিন্তু ইসলামের আলো নেভাতে পারেননি ইসলামের দুশমনরা। সত্যের পতাকাবাহীরা বাতিল শক্তিকে চুরমার করে দিয়ে তাদের ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন যুগে যুগে। সেই ইতিহাস সবার জানা। বাতিলের এই আক্রমণ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সাময়িক সফলতার আস্ফালন দেখালেও চূড়ান্ত সফলতা মুসলামনদেরই হবে। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের মুসলমানরা বাতিলের ভয়ঙ্কর থাবায় আক্রান্ত। সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস মুছে দিয়ে ফিরাউনী ও নমরুদী শাসনব্যবস্থা কায়েমের অপচেষ্টা দেশকে খোদায়ী গজব অনিবার্য করে তুলছে। আল্লাহকে কটাক্ষ করার মত দুঃসাহস দেখানো হচ্ছে। নবী (সা.) এবং ধর্ম ইসলামের অবমাননা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করার কারণে তার শাস্তির ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেয়া হলেও আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের শাস্তির আওতায় আনার কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এ বিষয়টি সহযোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গেলে তার বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ব্লগার রাজিবকে শহীদ আখ্যা দেয়া হয়েছে। সংসদে তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগের নাস্তিক-ব্লগারদের ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া হয়েছে। তারা ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে স্পীকারকে স্মারকলিপি দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এভাবে ইসলামের নির্দেশনাবলীকে অবমাননা করা হয়েছে। এই ইসলামী চিন্তাবিদ বলেন, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী নারীনীতি, ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি পাস করা হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন মসজিদে নামাজের সময় বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আলেম, ইমাম, খতীবদের হককথা বলায় তাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এমনকি হত্যা, হুমকি-ধমকি, হামলা-মামলার মাধ্যমে তাদের দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে এবং কাউকে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। কাদিয়ানী এনজিওসহ ইসলামবিরোধী অপশক্তিকে বিভিন্নভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ও বেহায়াপনা-বেলেল্লাপনা আমদানী করা হচ্ছে। মঙ্গল প্রদীপ-প্রজ্জ্বলন, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনসহ শেরেকি কর্মকা-ের মাধ্যমে মুসলিম এ দেশকে অগ্নিপূজার ও মূর্তিপূজারিদের দেশ বানানোর চক্রান্ত হচ্ছে। ইসলামের কথা বললেই তাকে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের অপবাদ দিয়ে এদেশ থেকে চিরতরে ইসলাম উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনের নামে ইসলাম নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিদেশি সৈনিকদের এদেশে ডেকে আনার পাঁয়তারা চলছে। এদেশের কোটি কোটি তৌহিদী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে হেফাজতে ইসলাম শান্তিপূর্ণ উপায়ে দেশ ও ইসলামবিরোধী এসব অপতৎপরতা বন্ধে বদ্ধপরিকর। কোন অপশক্তিই হেফাজতে ইসলামকে তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দমাতে পারবে না। এলক্ষ্যে হেফাজতে ইসলাম ও দেশ ঈমান রক্ষার তাগিদে সুস্পষ্ট ১৩ দফা দাবি পেশ করে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এসব দাবি কোন রাজনৈতিক দাবি নয়। ক্ষমতা থেকে কাউকে সরানো বা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর দাবি নয়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে হলে এসব দাবি মেনেই থাকতে হবে। আবার ক্ষমতায় যেতে হলেও এসব দাবি মেনেই যেতে হবে। তিনি বলেন, বারবার বলছি আমাদের আন্দোলন ঈমান ও দেশ রক্ষার অহিংস আন্দোলন। এ আন্দোলনকে দমানো অপচেষ্টা করা হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। সরকার নির্বাচনের আগে ইসলামবিরোধী কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোন কাজ না করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এখন তারা সুস্পষ্ট ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকার আমাদের দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্ণপাত না করে দেশের কোটি কোটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের আজকের এই লংমার্চ কর্মসূচিকে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও সরকার লক্ষ-কোটি জনতার এই কর্মসূচি বানচালের সব প্রচেষ্টাই চালিয়েছে। সরকারের সহযোগী নাস্তিক-মুরতাদদের ঘাদানি কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, পরিকল্পনা মন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং শাহবাগি নাস্তিক-মুরতাদদের তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে হরতাল অবরোধ দিয়ে আমাদের শান্তিুপূর্ণ এই কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তারপরও এই মহাসমুদ্র প্রমাণ করে এদেশে নাস্তিক-মুরতাদদের ইসলাম বিরোধীদের ঠাঁই নেই। ঈমানদার জনতাই এদেশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখেন। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে মহাগণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন আরো তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করবে। যে আন্দোলনের তোড়ে এই ইসলামবিরোধী সরকারের পরিণতি হবে ফেরাউন, নমরুদ, সাদ্দাদ, হামান, আবু জাহল, আবু লাহাবের চেয়েও আরো ভয়াবহ। তাই এখনো সময় আছে আল্লাহর গজব আসার আগেই আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে নিজেরাও বাঁচুন, দেশকে ও দেশের জনগণকে বাঁচান। তিনি আরো বলেন, ঢাকার এই জনসমুদ্র প্রমাণ করেছে এদেশ চলবে আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতার কথায়। নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের কথায় নয়। জীবনবাজি রেখে লংমার্চে অংশগ্রহণ করে আজকের এই মহাজনসমুদ্রকে নিজের অর্থ, শ্রম খরচ করে সশরীরে হাজির হয়ে ঈমানি দায়িত্ব পালন করার জন্য হেফাজতের ইসলামের সকল নেতাকর্মী, অন্যান্য সংগঠন, দল দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশয়েখ, ইসলামী চিন্তশীল ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, মাদরাসা, স্কুল, ভার্সিটির ছাত্র শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। যুবক তরুণ তোমরা ইসলামের মূল শক্তি। তাবৎ বাতিল জাগরণ স্তিমিত করার জন্য আজকের মত ভবিষ্যতেও জীবনবাজি রেখে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চলের মানুষের লংমার্চ কাফেলাকে সার্বিক সহযোগিতার জন্যও আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। ঈমান রক্ষার দেশ রক্ষার যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছে মানযিলে মাকসুদে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমাদের আর ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
Comments