আমারে লয়ে যে কী খেলা খেলিছ...’
সি রা জু র র হ মা ন
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
সেই কবে গদিতে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে শেখ হাসিনার সরকার। অত্যন্ত উদারভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে এবং দলের নেত্রী শেখ হাসিনা যে গদিতে গেলে তারা দশ টাকা কেজি দরে চাল দেবেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করবেন। কৃষকদের বিনা মূল্যে সার দেবেন, জাদুবলে বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন, দেশ থেকে দুর্নীতিকে নির্বাসনে পাঠাবেন এবং মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সহায়-সম্পদের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা হবে, যাতে মানুষ দেখতে পারে তারা দুর্নীতি করছেন কিনা।
ভাবখানা এই যে, ‘যাহা চাও তাহা লও।’ প্রতিশ্রুতি দিতে কার্পণ্য করেনি আওয়ামী লীগ। তারা জানত, সেসব প্রতিশ্রুতি ছেলেভোলানো কথা, সেসব প্রতিশ্রুতি পালনের ইচ্ছা আদৌ তাদের ছিল না। কোনোমতে গদিতে বসতে পারাই ছিল উদ্দেশ্য। একবার গদি পেলে সে গদি আর ছাড়া হবে না। বাকশালী স্বৈরতন্ত্র চালু করে সে গদি ধরে রাখা হবে। তারপর সাধারণ মানুষ যদি অভিযোগ করে করুক, যদি বিশ্বাসঘাতক বলে বলুক।
পুলিশ, প্রশাসন আর বিচার বিভাগকে দলীয়করণের পরিকল্পনা তারা আগেই তৈরি করে রেখেছিল। সে লক্ষ্যে সরকারের গোড়ার দিন থেকে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিন্দু সম্প্রদায়ের সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী পদগুলোতে নিযুক্ত করা হয়েছে, কয়েকশ’ অভিজ্ঞ সিনিয়র কর্মকর্তাকে আজ অবধি ওএসডি করে রাখা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি জেলার ডেপুটি কমিশনার এবং পুলিশের বহু নির্বাহী পদে এখন নিয়োজিত আছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অফিসাররা। পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এককালে পাকিস্তানিরা এ রকম করেই নিয়ন্ত্রক পদগুলোতে পাঞ্জাবি অফিসার নিয়োগ করত। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হচ্ছে এবং কট্টর আওয়ামী লীগপন্থীদের দিয়ে বিচার বিভাগ ঠেসে দেয়া হয়েছে। বিতর্কিত একটা রায়ের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়েছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে, যদিও সে বিতর্কিত রায়েও পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে পরিচালনার সুপারিশ ছিল। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল, এতসবের পর তাদের আর জনমতের তোয়াক্কা করতে হবে না।
কোন প্রতিশ্রুতিটা পালন করেছে এই সরকার? নমুনা হিসেবে দুর্নীতির বিষয়টাই বিবেচনা করা যাক। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সহায়-সম্পদের হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি সরকারিভাবেই পরিত্যক্ত হয়েছে। পরিবর্তে সেসব বিবরণ তাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেসব বিবরণ ধরে রেখেছেন। কোনো মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য তার কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করলে, কিংবা সামান্যতম অবাধ্যতা দেখালে তাদের জমা দেয়া নথির ভিত্তিতে দুর্নীতির দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। শেখ হাসিনা নিশ্চিত ছিলেন যে পিতার নির্দেশিত পথে তিনি বাকশালী পন্থায় আজীবন গদিতে আসীন থাকবেন।
নাকের বদলে নরুন
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যার যা খুশি দুর্নীতি করছেন। নিজেদের সততা ও স্বাধীনতা বিক্রির ক্ষতি তারা সুদে-আসলে পূরণ করে নিচ্ছেন দুর্নীতি করে। সোয়া চার বছর ধরে তার আলামতই দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। ভবিষ্যত্ আর্থিক নিরাপত্তার আশায় ৩৫ লাখ ছাপোষা মধ্যবিত্ত তাদের যত্সামান্য সঞ্চয় শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছিলেন। আওয়ামীদের গদি পাওয়ার প্রথম ধাক্কাতেই সরকারের পৃষ্ঠপোষক কুমিররা খেয়ে ফেলল সে সঞ্চয়। এই ৩৫ লাখ লগ্নিকারী আর তাদের আনুমানিক সোয়া কোটি পোষ্য বলতে গেলে পথে বসলেন। আজ অবধি তারা মাঝে মাঝে প্রতিবাদের চেষ্টা করেন, সরকারের পুলিশ আর র্যাবের লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস আর রাবার বুলেটের অপঘাতে ছত্রছান হয়ে যেতে বাধ্য হন।
হাজার হাজার কোটি টাকার ঠিকা দেয়া হলো কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের নামে। অথচ কী আশ্চর্য! কোনো রকম টেন্ডার ডাকা হলো না, দরদাম যাচাই করা হলো না। জানা গেল যে, সেসব ঠিকা পেয়েছে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতাদের পারিবারিক ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো। মোট অর্থের কত ভাগ তারা চুরি করেছে, আর কতটা কাজে লেগেছে, বলতে পারব না, তবে সাধারণ মানুষ তাদের সাদা চোখে দেখছে—বিদ্যুতের সঙ্কট যেখানে ছিল প্রায় সেখানেই আছে।
পদ্মা নদীর ওপর সুরম্য সেতু তৈরির নকশা অনুমোদন করেছিল বিশ্বব্যাংক। প্রশস্ত সেতুতে মোটরযান চলাচল করবে, নিচে চলবে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন। পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলাদেশের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সনাতনী বিভাজন দূর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। তাতে গোটা দেশের আর্থিক ও অন্যান্য লাভ কত হবে বিশেষজ্ঞরা হিসাব করতে বসলেন। কলকাতার স্বপ্নদ্রষ্টারা ঠিক করে ফেললেন, সকালবেলা নিজ বাড়িতে প্রাতরাশ খেয়ে গাড়ি চড়ে বেরুবেন। দুপুরে ঢাকায় মধ্যাহ্নভোজন করে চাটগাঁ গিয়ে ডিনার খাবেন।
বিশ্বব্যাংক মোট ব্যয়ের সিংহভাগ দিতে রাজি হয়েছিল। অর্থ সাহায্য নিয়ে আরও এগিয়ে এলো এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। বিশেষজ্ঞরা যখন লাভের হিসাব করছিলেন, কলকাতার ওরা যখন স্বপ্ন দেখছিলেন, মন্ত্রী ও আমলাপাড়ার এখানে-সেখানে তখন হিসেব-নিকেশ শুরু হয়ে গেছে বরাদ্দ অর্থের কত কোটি ডলার কে নেবেন, কিংবা কাকে কত সেলামী দেবেন। গাছে না উঠতেই এক কান্দি! বিশ্বব্যাংক প্রমাদ গুনল। বরাদ্দ অর্থ নিয়ে যদি আগে থাকতেই হরির লুট শুরু হয়ে যায়, তাহলে নির্মাণকাজে অর্থের টান পড়বে, মাঝপথেই সেতু নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যাংক বলল, প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাও, নাহলে আমরা টাকা দেব না।
সোয়া ছয় কিলোমিটার সেতু চুরি
সরকার বেকায়দায় পড়ল। সরকারি আশীর্বাদে কিংবা প্রক্সিতে যারা দুর্নীতি করেছে তাদের শাস্তি দেয়া হলে তারাই বা ছাড়বে কেন? তারা কি ওপরের দিকের জারিজুরি আর বখরাবাজির রহস্য ফাঁস করে দেবে না? অনেক ধাক্কাজুরির পরে সবকিছু আটকে গেল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে ঘিরে। সরকার (অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী) কিছুতেই তার সম্বন্ধে তদন্ত করতে দেবে না। অন্যদিকে তার বিচার না হলে বিশ্বব্যাংকও টাকা দেবে না। এই প্রকল্পটা নিয়ে অনেক বাগাড়ম্বর করেছিল সরকার। আশা করেছিল, অমন সুন্দর একটা সেতু দেখাতে পারলে দেশের দয়ালু মানুষ তাদের হাজার ব্যর্থতাও মাফ করে দেবে। কিন্তু পদ্মার ওপর সোয়া ছয় কিলোমিটারের সেতুর চেয়েও বড় হয়ে গেলেন একজন বহু-নিন্দিত মন্ত্রী।
পদ্মা সেতু আটকে আছে সেখানে। অথচ নির্বাচন সামনে। শুরু হয়ে গেল মানুষকে হাইকোর্ট দেখানোর (বোকা বানানো, ঠকানো) কসরত। বিকল্প পুঁজির উত্স হিসেবে এর-ওর-তার নাম উচ্চারিত হতে লাগল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতো উদারভাবে। আজ মালয়েশিয়া, কাল অমুক, পরশু তমুক সূত্র সেতু তৈরির টাকা দেবে বলে মন্ত্রীরা এবং সরকারের বশংবদ মিডিয়া ঢাক পেটাতে শুরু করলেন। কিছুদিন ‘নিজস্ব সম্পদ’ থেকে, কিছুদিন ‘চাঁদা তুলে’ সেতু তৈরি হবে বলে ভাঁওতা দেয়া হলো সাধারণ মানুষকে।
ফলাও করে প্রচার হলো যে নদীশাসনের (মাটি কাটা, বালি তোলা) কাজ শুরু হয়ে গেছে। এখন আবার বলা হচ্ছে, টাকা দেবে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)। খাঁটি কথাটা হলো সাধারণ নির্বাচনের তারিখ দ্রুত এগিয়ে আসছে। নির্বাচনে মানুষের ভোট পেতে হবে। সুতরাং তাদের বলা হচ্ছে, তোমরা ধৈর্য ধরে থাকো, আজ পেটে পাথর বাঁধো, কাল বাদ দিয়ে পরশু শুধু রুটিই নয়, তার ওপর মাখন এবং জ্যাম-জেলি খেতে দেয়া হবে। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরই এই হচ্ছে অবস্থা।
সরকারের গোড়ার দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে এমন তীব্র মিথ্যা প্রচারণা শুরু হলো যে কোনো অনভিজ্ঞ বিদেশি বাংলাদেশে এলে মনে করতে পারত—আওয়ামী লীগই বিরোধী দল, তারা একটা জঘন্য সরকারেরই সমালোচনা করছে। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের তারপর মনে পড়ল, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির জন্য একযোগে আন্দোলন করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি তারা দেখেছেন। সুতরাং বিএনপি-জামায়াত সমঝোতা ভাঙতে হবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এবং ফ্যাসিবাদী সহিংসতা ব্যবহার করে তাদের ধ্বংস করতে হবে। শুরু হয়ে যায় ধরপাকড় এবং তথাকথিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের তথাকথিত বিচার।
অপপ্রচার এবং বাস্তবতা
সরকারের প্রচারযন্ত্র বিশেষ করে বিদেশে এ ধারণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে যে জামায়াতের মতো বিএনপিও যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধী। প্রকৃত সত্য অনেক দূরে। বিচার দেশের মানুষ চায়, বিএনপিও চায়। কিন্তু সে বিচার আওয়ামী বিচার হলে চলবে না, হতে হবে ন্যায্য এবং নিরপেক্ষ বিচার। রামকে বাদ দিয়ে রহিমের বিচার হলেও চলবে না। যেসব যুদ্ধাপরাধী মুজিব কোট পরে আওয়ামী লীগার হয়ে গেছেন, এমনকি সে দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা করেছেন এবং মন্ত্রীও হয়েছেন, কাঠগড়ায় তাদেরও দাঁড় করাতে হবে। বিচারের প্রক্রিয়াও হতে হবে আইনসিদ্ধ, ন্যায্য ও নিরপেক্ষ। সরকারের নির্দেশে এবং স্কাইপে বিদেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে যে ‘বিচার’ হয়, সব ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিই সে বিচার মেনে নিতে অস্বীকার করবেন।
শহীদ রুমি আমার আত্মীয়। সম্পর্কে ভাগ্নে হতো। তার জন্মের সময় থেকে তাকে আমি চিনতাম। তার নামে শাহবাগে গুটিকয়েক সন্দেহজনক চরিত্রের তরুণ ‘আমরণ অনশন’ করছে। কত ঘণ্টার জন্য কে জানে? সাধারণ মানুষকে এ ধারণা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে যেন শহীদ রুমি নিজেই জামায়াত-শিবির এবং অন্য সব ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্যে আন্দোলনে নেমেছে। রুমিকে আমরা সবাই খুবই বুদ্ধিমান আর সুবিবেচক বলে জানতাম। বেঁচে থাকলে রুমি যে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের টুঁটি টিপে মারার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি করত, সেটা এই অর্বাচীনরা কী করে ধরে নিল?
এখন আর কারও জানতে বাকি নেই যে, ডুবন্ত নৌকার মাঝিরা প্রাণপণে খড়কুটো খুঁজছে, কতগুলো ভাড়াটে দুর্বৃত্তকে দেশবাসীর প্রতীক বলে জাহির করার জন্য শাহবাগে একটা সার্কাস খুলেছে। গোড়ায় কিছু আবেগপরায়ণ তরুণ-তরুণীকে তারা বিভ্রান্ত করেছে, কিন্তু এই ধর্মদ্রোহী ও ইসলামের অপমানকারীদের পরিচয় এখন সবার জানা হয়ে গেছে। সরকার যে লক্ষ্যহীন, ইস্যুহীন দেউলিয়া হয়ে গেছে, শাহবাগ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
বলার যখন কিছু থাকে না, পথহারানো উদ্ভ্রান্ত ব্যক্তি তখন উল্টোপাল্টা কথা বলে, সোজা কথায় বাজে বকে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা সেরকমই উল্টোপাল্টা কথাবার্তা বলছেন ইদানীং। সংলাপের কথাই ধরুন। দেশের সব বুদ্ধিমান মানুষ এবং সব বিদেশি পর্যবেক্ষক বলছেন প্রধান দুই দলের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করা উচিত। বিএনপি গোড়া থেকেই বলে রেখেছে, একটা নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসতে তারা যে কোনো সময়েই প্রস্তুত আছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, তার দল বিনা শর্তে আলোচনায় রাজি আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিও আলোচনায় সম্মতি দিয়েছেন, তবে সেইসঙ্গে একটা লেংচি মেরে দিয়েছেন তিনি; বলেছেন, বিএনপি নাকি আলোচনায় সম্মত নয়।
সংলাপে ওরা কেন ভীত
সংলাপ যাতে হতে না পারে সেজন্যে সব রকম চেষ্টা করে যাচ্ছেন অন্য কয়েকজন। দেশে-বিদেশে সবাই বলছে, সরকার এখন সব বিরোধিতা চুরমার করে দিতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। সবাই এও জানে যে, চোর অন্যদের দিকে আঙুল তুলে ‘চোর চোর’ বলে চিত্কার শুরু করে। এঁরাও সে রকম বিএনপির দিকে আঙুল তুলে ‘সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী’ বলে চিত্কার জুড়ে দিয়েছে। সৈয়দ আশরাফের সহকারী মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে সংলাপ নয়। ফালতু কথার বাদশাহ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বুদ্ধিজীবীদের মতামতকে বলেন, ‘রাবিশ’, ‘বোগাস।’ তিনি বলেছেন, হরতালকারীরা সন্ত্রাসী, খালেদা জিয়া সন্ত্রাসী নেতা, তার সঙ্গে সংলাপ সম্ভব নয়। বিরোধী দলে থাকাকালে আওয়ামী লীগ কত দিন হরতাল করেছে, কত মানুষ মেরেছে আর কত নাশকতা করেছে, মুহিতের বোধ হয় মনে ছিল না। নইলে তিনি বুঝতে পারতেন, তার উক্তি বুমেরাং হয়ে আওয়ামী লীগকেই বেশি আঘাত করবে।
বদমেজাজি খুকুমণি বেকায়দায় পড়লে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আবোল-তাবোল চিত্কার করতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার হয়েছে সে অবস্থা। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘আর জ্বালাবেন না।’ তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী দলের এবং ১৮ দলের জোটের নেত্রীকে তিনি ‘পেয়ারের পাকিস্তানে’ চলে যেতে বলেছেন। কেন পাকিস্তানে যাবেন খালেদা জিয়া? তিনি তো পাকিস্তানকে করিডোর দেননি, বাংলাদেশের সড়ক, রেল, নদী ও বন্দরগুলো এবং সেইসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেননি! তুলে দিয়েছেন শেখ হাসিনা ভারতের হাতে। ‘চলো চলো, দিল্লি চলো’ বলে সদলবলে তারই তো ভারতে চলে যাওয়া উচিত।
বগুড়ায় ৩ মার্চ জনসাধারণের বিরুদ্ধে পুলিশের আগ্রাসনের সময় সেনাবাহিনী শিবির থেকে বেরিয়ে এসেছিল, কিন্তু গোলাগুলি না করে তারা আবার শিবিরে ফিরে গেছে। খালেদা জিয়া ২৪ মার্চ বগুড়ায় তার জনসভায় সেজন্য সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেছেন। বলতে চেয়েছেন, আমাদের সেনাবাহিনী দেশে-দেশে শান্তি রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকছে, প্রয়োজনবোধে দেশের শান্তি রক্ষাতেও তারা মূল্যবান অবদান রাখতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী ও তার অনুগতরা লাফিয়ে উঠলেন, মনে করলেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিরল একটা ইস্যু হাতে পেয়ে গেছেন তারা।
সেনাবাহিনী নিয়ে রাজনীতির অপচেষ্টা
তার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল আবোল-তাবোল আক্রমণ। অভিযোগ শুরু হয়ে গেল যে খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহের উস্কানি দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। প্রধানমন্ত্রীর চিন্তার দৌড়ও সীমিত। পুরনো দিনের কথাগুলো তিনি সুবিধাজনকভাবে ভুলে যান। ১৯৮২ সালে তিনি লে. জে. এরশাদের অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, সমর্থন দিয়ে নয় বছর এরশাদকে গদিতে রেখেছিলেন। ১৯৯৬ সালের ২০ মে ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টায় সেনাপ্রধান জেনারেল এএসএম নাসিমকে দিয়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন তিনি। সৌভাগ্যবশত কয়েকজন দেশপ্রেমিক অফিসারের সতর্কতার ফলে সে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। শেখ হাসিনার নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে ২০০৭ সালের বর্ণচোরা সামরিক সরকারও ছিল তার আন্দোলনেরই ফসল। এসব কারণে তার প্রথমেই মনে আসে যে খালেদা জিয়াও তার মতো সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর করে পেছনের দরোজা দিয়ে ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
হঠাত্ করে প্রধানমন্ত্রী গিয়ে হাজির হলেন সেনাকুঞ্জে। জেনারেলদের অনেক নসিহত করলেন তিনি। আমার মনে পড়ল ১৯৯০ সালের নভেম্বরে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠেছে তখন একরাতে রাষ্ট্রপতি এরশাদ জেনারেলদের বৈঠক ডেকে পাঁচ দফা হুমকি আর প্রলোভন দিলেন। কোনো সহৃদয় সেনাকর্মকর্তা সে রাতেই পরিচয় গোপন করে শেরাটন হোটেলে আমাকে টেলিফোন করলেন এবং এরশাদের বক্তব্যগুলো আমাকে বলে দিলেন। আমার ডায়েরিতে সেগুলো এখনও লেখা আছে।
শেখ হাসিনা অনেক নসিহত করেছেন জেনারেলদের। ‘সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দেবে না’, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে’, ‘ধারাবাহিকতা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে’—ইত্যাদি ইত্যাদি। গণতন্ত্রকে হত্যা করার চক্রান্ত তো করছেন হাসিনা এবং তার সরকার, যেমন করে হত্যা করেছিলেন তার বাবা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাকশালী স্বৈরতন্ত্র চালু করে। সেনাবাহিনী সে ব্যাপারে সতর্ক থাকলে তো খুশির কথা। আর ধারাবাহিকতা বলতে হাসিনা অবশ্যই বোঝাতে চেয়েছেন আওয়ামী লীগকে গদিতে রাখা। সেনাবাহিনীকে যদি রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয় (যেটা আদর্শ হওয়া উচিত বলেই আমরা মনে করি) তাহলে তারা কী করে গণতন্ত্র রক্ষা করবে, আর কী করেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে হাসিনাকে গদিতে চিরস্থায়ী করবে?
এসব পরস্পরবিরোধী নসিহতে সেনাবাহিনী অবশ্যই বিব্রতবোধ করবে। বলার অধিকার থাকলে সেনাবাহিনী হয়তো বলত, ‘আমারে লয়ে যে কী খেলা খেলিল...’। বর্তমান সরকার বহু খেলা খেলেছে সেনাবাহিনীকে নিয়ে। বিডিআর বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর ৫৭ পদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সে বিদ্রোহ কারা কী উদ্দেশ্যে ঘটিয়েছে, আজ অবধি তার তদন্ত এড়িয়ে গেছে সরকার। সে বিদ্রোহের জের ধরে সেনাবাহিনীর পরিপূরক বিডিআরকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে গণবিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আগে জাতীয় দিবসগুলোতে সেনাবাহিনী মনোরম কুচকাওয়াজ করত (যেটা সব দেশেই হয়), জাতি সেটা উপভোগ করত। কিন্তু সরকার স্বাধীনতা ও সংবিধানের ধারক ও বাহক এই বাহিনীকে এখন পর্দার আড়ালে সরিয়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়। (লন্ডন, ৩১.০৩.১৩)
serajurrahman34@gmail.com
Comments