পথে পথে আপ্যায়িত নবীপ্রেমীরা


স্টাফ রিপোর্টার : মতিঝিলে জীবন বীমা ভবনের সামনে ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে হেফাজতের মহাসমাবেশে আসা মুসলমানদের মধ্যে কমলা দিচ্ছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি একজন ফল ব্যবসায়ী। ব্যবসার জন্য যে কমলা দোকানে ছিল তা এই মহাসমাবেশে সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়েছি। দূর-দূরান্ত থেকে যে সকল মুসলমান ইসলাম ও ঈমান রক্ষার জন্য এই মহাসমাবেশে অংশ নিয়েছেন, তাদের জন্য এটুকু করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি বলে জানান ফল বিক্রেতা রফিকুল। 
দনিয়া কলেজের সামনে ছোট মেয়েকে দিয়ে আলেমদের হাতে পানির বোতল তুলে দিচ্ছিলেন এক মহিলা। তিনি বলেন, আমি একজন মুসলমান। আমার বাসার সামনে দিয়ে সারারাত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, এটা দেখে আমি বাসায় বসে থাকতে পারিনি। তাই আমি, আমার স্বামী ও বাচ্চারা মিলে আলেমদের জন্য সামান্য পানি ও কলা-রুটির ব্যবস্থা করেছি। 
এদৃশ্য কেবল জীবন বীমা ভবন কিংবা দনিয়া কলেজের সামনে নয়, মতিঝিলের শাপলা চত্বরকে ঘিরে গোটা মহাসমাবেশ এবং এই মহাসমাবেশের প্রতিটি প্রবেশ পথেই ছিল এরকম দৃশ্য। রাজধানী ও এর আশপাশের অধিবাসীদের আন্তরিক আতিথেয়তা পেয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মহাসমাবেশে আশা মুসলমানরা। ইসলামের প্রতি দায়বদ্ধতায় ইসলাম ও ঈমান রক্ষার জন্য সমাবেশ স্থল থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশ পথে পানীয় ও শুকনা খাবারের পসরা সাজানো হয়েছিল। সমাবেশে যে যার মত করে পানি, শরবত, আখের রস, জুস, স্যালাইন, স্যালাইন পানি, কলা, শসা, গাজর, তরমুজ, আনারস, পেঁপে, বিস্কুট, চকলেট, কেক, পাউরুটি, মুুড়ি, মোয়া, চিড়া, চানাচুর, বিরিয়ানি, খিচুরিসহ বিভিন্ন খাবারের পসরায় লাখো লাখো মুসলমানরা পেয়েছেন আতিথেয়তা। তাই তো শত বাধা উপেক্ষা করে হেঁটে দূর-দূরান্ত থেকে আসা এ জন¯্রােতের মধ্যে কখনো কোন ধরনের অতৃপ্তি লক্ষ্য করা যায়নি। সমাবেশে আসা মুসলমানরা যেন একে অপরের সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। লাখো লাখো মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করে নিজেদেরও তৃপ্ত অনুভব করেছেন অনেক বিতরণকারী। তাদের মতে, মুসলমানদের প্রিয় নবী ও তার সম্মান রক্ষার্থে যে যার সাধ্যমত করে মুসলমানদের সেবায় নিয়োজিত করেছি। এখানে ছিল না কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। শুধু বিবেকের তাড়নায় এখানে আসা এবং এই খাবার বিতরণ।  
এছাড়া গতকাল লাখো লাখো মুসলমানের এ সমাবেশে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানারেও বিভিন্ন শুকনো খাবার ও পানীয় জাতীয় খাবার বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নগরীর প্রবেশমুখে বিভিন্ন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে সমাবেশ অভিমুখে আসা মিছিলকারীদের বিস্কুট, পাউরুটি, শসা, মিনারেল পানির বোতল দিয়েছেন। 
পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী রাহেল উদ্দিন জীবন নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব মনে করে সমাবেশে এসেছেন। তিনি শুধু একাই আসেননি সঙ্গে করে এলাকার বন্ধুদেরও নিয়ে এসেছেন। তাই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে আইসক্রিম কিনে তা মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করেন। সমাবেশে আসা মুসলমানদের জন্য কিছু করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবানও মনে করছেন বলে জানান তিনি। 
কারবালায় ইসলাম ও নবীর বংশ রক্ষার আন্দোলনে পানি পায়নি মুসলমানরা। তাই এবার আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। ইসলাম রক্ষায়, রাসূলের সম্মান রক্ষায় মুসলমানদের পানি দিতে পেরে নিজের কাছে ভালো লাগছে বলে মন্তব্য করেন পানি বিতরণকারী মো. আনোয়ার হোসেন। কোনো সওয়াবের বা রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে নয়, নিজের বিবেকের দায়ে এখানে এসেছি। তার মতে, কেয়ামতের দিন যদি আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, তোমার সামনে ইসলাম রক্ষার আন্দোলন হয়েছে তুমি কি করেছো। তখন বলতে পারবো, হে আল্লাহ আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যা পেরেছি তাই করেছি। আনোয়ার হোসেনের মতো আশরাফুল ইসলাম শরিফও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিতরণ করছে স্যালাইন পানি ও শুকনা খাবার। 
মো. সাইদুল ইসলাম নামের অপর এক ব্যক্তিকে দেখা গেছে, রিকশায় করে কলা ও রুটি নিয়ে সমাবেশে যোগ দিতে। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন ছোট ব্যবসায়ী। আমার নিজের অর্থে এই খাবার নিয়ে এসেছি। নিজের কাছে ভালো লাগছে যে, মুসলমানদের খাবার দিতে পারছি। ফজল আহমদ নামে মৌলভীবাজারের অপর এক ব্যবসায়ী জানান, আল্লাহ-রাসূল (সা.) ও তার উম্মতের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। তিনি পুরো সমাবেশস্থলে ভ্যানে করে সমাবেশে আসা মুসলমানদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট সরবরাহ করেন। 
লক্ষ্মীপুর থেকে এসেছেন কাজী ইকবাল হোসেন। তিনি কাজী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ লক্ষ্মীপুরের চেয়ারম্যান। নিজ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সমাবেশস্থলে হেঁটে হেঁটে মুসলমানদের মধ্যে খাবার স্যালাইন বিতরণ করেছেন। এদিকে বায়তুল মোকাররম হকার্স মার্কেটের কিছু দোকানি নিজ উদ্যোগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শশা, শরবতসহ পানীয় জাতীয় খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। এছাড়া সমাবেশের আশপাশে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ব্যক্তিই খাবার ও পানি বিতরণ করছেন। একই সঙ্গে মহাসমাবেশে প্রায় ৩০ হাজার লোক স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করেন। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা থেকে শুরু করে, মুসল্লিদের পানি ও শুকনা খাবার সরবরাহ করেছেন। লংমার্চের স্বেচ্ছাসেবক আসাদুজ্জামান বলেন, ইসলাম রক্ষায় আসা তৌহিদী জনতার থাকা-খাওয়ার সমস্যা হয় না। আল্লাহ তার বান্দাদের দিয়ে এসব খাবার পাঠিয়েছেন। 
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় লোকজন শুকনা খাবার ও পানি নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই মহাসড়ক থেকে যারাই আসছেন তাদের শুকনা খাবার ও পানি দিয়ে আপ্যায়ন করছেন। এ সময় রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে পানি সরবরাহ করতে দেখা গেছে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন  শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের। অনেক গৃহিণীকে তাদের রান্না করা খাবার আর পানি তাদের ছোট বাচ্চাকে দিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমদের হাতে তুলে দেয়ার দৃশ্যও চোখে পড়ে। অনেকে আবার লেবুর শরবতের দোকানদারকে সারাদিনের জন্য ভাড়া নিয়ে আলেমদের শরবত খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করেছেন। লংমার্চে অংশ নেয়া আলেমদের পানি খাওয়ানো শ্যামপুরের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ (৪০) বলেন, আমি সামান্য একটি চাকরি করি। বেতন কম। আমার টাকা-পয়সা নেই। তাই ৫০০ টাকা দিয়ে আলেমদের পানি খাওয়ানো ব্যবস্থা করেছি। সামর্থ্য থাকলে দুপুরের খাবারেরও ব্যবস্থা করতাম। 
এছাড়া হেফাজত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমাবেশে শুক্রবার রাত থেকে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিরানি সরবরাহ করছেন। এছাড়া  মতিঝিল এলাকায় হেফাজতের পক্ষ থেকে ৫০টিরও বেশি ভ্যান ও ট্রাক দিয়ে সমাবেশে আশা লোকজনকে পানি পান করানো হয়। বিভিন্ন লোকজন নিজস্ব^ভাবে পানি এনে মুসল্লিদের পানি পান করাচ্ছেন। প্রচ- গরমে মুসলমানরা যাতে অসুস্থ না হয়ে পরে এজন্য তারা এ ব্যবস্থা করেছেন। অনেকে আবার শুকনা খাবারও এনেছেন তাদের জন্য। হেফাজতের নেতারা বলেছেন, তাদের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে শুকনো খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শুভাকাক্সক্ষীরাও খাবার সরবরাহ করেছেন।
জাতীয় পার্টির পানি সরবরাহ
পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি সমাবেশে আগত মুসলমানদের পানি সরবরাহ করেছেন। দলটির স্বেচ্ছাসেবকরা গাড়িতে করে পানি নিয়ে এবং ঢাকার বিভিন্ন রাস্তার মুখে ৪২টি স্থানে তাঁবু বসিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পানি পান করিয়েছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিভিন্ন স্থানে খাবার পানি বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন।
ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ীদের খাবার পরিবেশন
হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ও সমাবেশে আসা মুসলমানদের জন্য ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ীরা খাবার পরিবেশন করেছেন। ইসলামপুর পাটুয়াটুলীর কাপড় ব্যবসায়ী আবদুল হালিম বলেন, ইসলামকে ধ্বংস করছে একটি গোষ্ঠী। তৌহিদী জনতা ইসলাম রক্ষা করতে মতিঝিলে কষ্ট করছে। আমরা সাধারণ মুসলমান, কোন দলের নয়। তিনি আরও বলেন, প্রায় তিন শতাধিক কাপড় ব্যবসায়ী নিজ অর্থায়নে মুসলিম ভাইদের জন্য পানি, কলা, পাউরুটি, তরমুজ, জুসসহ প্রায় ৫০ হাজার টাকার খাবার বিতরণ করেছি। ও সময় তিনি সকলকে আল্লাহর পথে খরচ করার আহ্বান জানান। এছাড়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পার্টি, মুসলিম লীগ ও লেবার পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানিসহ বিভিন্ন খাবার সামগ্রী সরবরাহ করেছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়