মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৫ : ৫২টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গণধর্ষিত ১৯ নারী ও শিশু



স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার জানিয়েছে, মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে ৭৫ জন নিহত হয়েছে। এ সময় ৫২টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে মার্চে ১০ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। অধিকার জানায়, এ সময় নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মার্চে ১৫ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় ৬৬ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মার্চে ১৯ নারী ও শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। গতকাল অধিকার প্রকাশিত মাসিক রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।অধিকারের তথ্য অনুযায়ী মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৫ জন নিহত এবং তিন হাজার ৫৫ জন আহত হয়েছে। মার্চে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত হয়েছে দুজন ও আহত হয়েছে ৩৮০ জন। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৯৯ জন আহত হয়েছেন।
অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ দুজন বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ ছাড়া বিএসএফ চারজনকে নির্যাতন করে, একজনকে গুলি করে ও একজনকে ককটেল নিক্ষেপ করে আহত করেছে। একই সময় বিএসএফের হাতে অপহৃত হয়েছে ১৬ জন, যাদের মধ্যে ছয়জনই ছিল শিশু। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
অধিকার জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দিলে জামায়াতে ইসলামী সহিংস বিক্ষোভ শুরু করে। এতে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি চালালে বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব বিক্ষোভকারী জনতার ওপর সাবমেশিনগানসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে এবং নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ জনকে হত্যা করে। হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মানুষ থানা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি স্থাপনা ঘেরাও ও সেগুলোয় হামলা করে। এই সময় একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকারকর্মীদের বিভিন্ন জেলা থেকে পাঠানো তথ্যে জানা যায়, গুলিতে নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ ছাত্র-কৃষক-জনতা এবং তারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
উল্লেখ্য, সাঈদীর রায় ঘোষণা হলে এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই অর্ধ শতাধিক জামায়াত-শিবিরের সমর্থক নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী।
অধিকার জানায়, মার্চে ৫২টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে (মাওলানা সাঈদীর রায়-পরবর্তী মৃত্যুসহ)। এর মধ্যে ৪৭টি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের নির্বিচার গুলিতে। এ ছাড়া পাঁচটি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে দুটি র্যাব কর্তৃক, তিনটি পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে।
অধিকার বলছে, বিক্ষোভকারী ব্যক্তিদের সরাসরি গুলি করার নির্দেশের দায়-দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপরই বর্তায়। ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানি এড়াতে হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অপসারণ প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি ও হত্যার দায় নিয়ে অবিলম্বে পদত্যাগ না করলে সমাজে যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা বাড়তে থাকবে এবং এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।
রিপোর্টে অধিকার বলেছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতা যেখানে গিয়ে পৌঁঁছেছে, তাকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা বাড়বে এবং প্রশাসন ভেঙে পড়বে। এরই মধ্যে বহু জেলায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়েছে এবং সমাজ যেভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে, সেই বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে হলে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে অবিলম্বে পক্ষপাতহীন হয়ে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোকে বিচার না করে মানবিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে তার দায়-দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো অর্থপূর্ণ সংলাপের পরিবেশ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার।
রিপোর্টে বলা হয়, মার্চে ১০ জন ব্যক্তি গণপিটুনিতে মারা গেছে। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অস্থিরতার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় মানুষের নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
অধিকারের তথ্য অনুযায়ী মার্চে ২১ জন সাংবাদিক আহত, সাতজন হুমকির সম্মুখীন এবং চারজন লাঞ্ছিত হয়েছেন। মার্চে তৈরি পোশাকশিল্প কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের অসন্তোষের ঘটনায় ৭৫ জন শ্রমিক আহত হন। বেশির ভাগ বিক্ষোভের ঘটনাগুলো শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সংঘটিত হয়।
ভয়াবহ নারী নির্যাতন : অধিকার বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতা এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মার্চে ২৭ জন নারী যৌতুক-সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে চারজন বাল্যবিবাহের শিকার। তাদের মধ্যে ১৫ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং ১১ জন বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া যৌতুকের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ১৬ বছরের এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মার্চে ৬৬ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩ জন নারী ও ৪১ জন মেয়ে শিশু। ওই ২৩ জন নারীর মধ্যে দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৯ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৪১ জন মেয়েশিশুর মধ্যে চারজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় মোট ৪২ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন তিনজন নারী। এ ছাড়া বখাটে কর্তৃক আহত হয়েছেন দুজন, ১৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, দুজন অপহরণের শিকার হয়েছেন, দুজন লাঞ্ছিত হয়েছেন ও ১৭ জন নারী বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটে বা তাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রমণে একজন পুরুষ নিহত ও ২৩ জন পুরুষ আহত হয়েছেন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়