কামরাঙ্গীরচরে জুমা’র নামাজে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল আসরের নামাজ চলছিল মসজিদে। এসময় কামরাঙ্গীরচর থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি সাইদুল মাতবরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের একটি দল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু সেøাগান দিয়ে হঠাৎ করে মসজিদ এবং কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট নিক্ষেপ শুরু হয়। এসময় মুহুর্মুহু ককটেলেরও বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে হামলাকারীরা। এসময় মসজিদের অদূরে অবস্থান নেয়া পুলিশ হামলাকারীদের সরিয়ে দিতে অবস্থান নিতে শুরু করে। এরই মধ্যে নামাজ শেষ হয়ে গেলে মুসুল্লীরাও নারায়ে তাকবীর স্লোগান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকেন। মসজিদে হামলাকারীরা এসময় কিছুটা দুরে সরে গিয়ে অবস্থান নেয়। পুলিশ তাদেরকে আরো দুরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করেও ইট এবং ককটেল সেই সাথে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এসময় পুলিশ উভয় পক্ষের মধ্যে পড়ে আতœরক্ষার্থে হামলাকারীদের দিকে ফাকা গুলিবর্ষণ করতে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
পরে হামলাকারীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে মসজিদের দিকে আটকে পড়া মুসুল্লীদের সহায়তায় ছুটে আসা লোকদের উপরও চাপাতি দিয়ে হামলা চালায় এবং দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকদের দেখলেই আঘাত করতে থাকে। এসময় তাদের হামলায় প্রায় ৩০ জন রক্তাক্ত জখম হয়।
মাদ্রাসার একজন শিক্ষক জানান, আমাদের মাদ্রাসা বেশ কিছুদিন যাবত বন্ধ থাকায় বড় কোন অঘটন ঘটেনি। জুমার নামাজের পর সোয়া ৩টা পর্যন্ত হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ চলে। এরপর সবাই চলে যায়। তবে হামলাকারীরা মসজিদ এবং মাদ্রাসাসহ হাফেজ্জী হুজুরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ীতে হামলা করে সবগুলো স্থাপনার জানালার সব কাচ ভেঙে দিয়ে গেছে এবং বহু ক্ষয়ক্ষতি করেছে। হয়তো তাদের লক্ষ্য ছিল সম্মানিত আলেমদের হত্যা করা।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা শহীদুল ইসলাম (৩৬), ইকবাল হোসেন (৩২), নূর ইসলাম (২২), মনির খান ও বজলু বাবুর্চীকে (৪৭) উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শহীদকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানায় নিহত শহীদুল ইসলাম কামরাঙ্গীরচর খলিফাঘাট এলাকায় বাস করতেন। তার বাবার নাম আফসারউদ্দিন হাওলাদার। গ্রামের বাড়ী মাদারীপুর জেলার হজপুর গ্রামে। আফসার হাওলাদার হাসপাতাল মর্গে তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেছেন। হাসপাতাল সুত্র জানায়, শহিদুল ইসলামের বাম পাঁজরে গুলি লাগে। অন্যরা পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন।
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ অভিযোগ করেন, তাঁরা আসরের নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা ও বোমা বিস্ফোরণ করেন। সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিল। হামলায় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি আরাফাত রহমান সাংবাদিকদের জানান, সংঘর্ষ থামানোর জন্য পুলিশ গুলি ও লাঠিচার্জ করেছে। তবে আওয়ামী লীগ কর্মী শহীদ পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন কিনা সে ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্থানীয় এমপি ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান। এ সময় আহত ইকবাল হোসেন নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় দিয়ে আইন প্রতিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন, আমি এতো কইলাম, আমি ছাত্রলীগ করি। তাও পুলিশ আমারে গুলি করল।
সংঘর্ষে আহত ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনির খান অভিযোগ করেন, পুলিশের গুলিতেই আওয়ামী লীগ কর্মী শহীদুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর সামনেই পুলিশ শহীদুল ইসলামকে মারধর করে গুলি করেছে। শহীদুলকে বাঁচাতে গেলে পুলিশ তাঁকেও (মনির খান) গুলি করে। এতে তিনি আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, গুলি করার আগে পুলিশ শহীদুল ইসলামকে লাথি মারে ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারধর করে।
হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, পুলিশের গুলিতেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, আজ (গতকাল) ওই এলাকায় মহানগর আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ কর্মসূচি ছিল। সেখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে পুলিশের গুলি চালাতে হলো। তবু আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার হারুনুর রশিদ বলেন, ওই এলাকায় সমাবেশের জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। এ সময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। তিনি বলেন, সেখানে দুই পক্ষ এত মারমুখী ছিল যে পুলিশ গুলি না চালালে শত শত লোক মারা যেত। পুলিশ সেখানে ব্ল্যাংক ফায়ার করেছে, এতে হতাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে নিহত শহীদুল ইসলামের বাবা আফসারউদ্দিন জানান, শহীদুল ইসলাম স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। তিনি ফলের ব্যবসা করতেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এলাকার পরিস্থিতি থমথমে। ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
Comments