কারবালায় পারিনি, মতিঝিলে এসেছি



স্টাফ রিপোর্টার : কারবালায় ইসলাম রক্ষায় ইমাম হোসেনের (রা:) আন্দোলনে পানি পায়নি মুসলমানরা। কিন্তু এবার আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। ইসলাম রক্ষায়, রাসূলের সম্মান রক্ষায় মুসলমানদের পানি দিতে পেরে নিজের কাছে ভালো লাগছে। গতকাল শাপলা চত্বরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পানি বিতরণকারী মো. আনোয়ার হোসেন এমন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, কোনো সাওয়াবের বা রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে না, নিজের বিবেকের দায়ে এখানে এসেছি। কেয়ামতের দিন যদি আল¬াহ জিজ্ঞেস করেন, তোমার সামনে ইসলাম রক্ষার আন্দোলন হয়েছে তুমি কি করেছো। তখন বলতে পারবো, হে আল্লাহ আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যা পেরেছি তাই করেছি।
আনোয়ার হোসেনের মতো আশরাফুল ইসলাম শরিফও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিতরণ করছে স্যালাইন পানি ও শুকনা খাবার। মো. সাইদুল ইসলাম নামের অপর এক ব্যক্তিকে দেখা যায়, রিকশায় করে কলা ও রুটি নিয়ে সমাবেশে যোগ দিতে। তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি একজন ছোট ব্যবসায়ী। আমার নিজের অর্থে এই খাবার নিয়ে এসেছি। নিজের কাছে ভালো লাগেছে যে, মুসলমানদের খাবার দিতে পারছি। এছাড়া সমাবেশের আশপাশে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ব্যক্তিই খাবার ও পানি বিতরণ করেছেন। 
তুমি কে, আমি কে, মুসলমান-মুসলমান 
হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের এক প্রান্ত চলে যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কদম ফোয়ারা পর্যন্ত। সেখানে পুলিশের কঠোর নজরদারীর মধ্যে বসে থেকে বিভিন্ন স্লে¬াগান দিচ্ছিলেন লংমার্চে অংশ নেয়া মুসলমানরা। সেখানে শ্লোগান ছিল এমন যে, তুমি কে আমি কে মুসলমান মুসলমান। তোমার আমার ঠিকানা মক্কা-মদিনা। আল-কুর আনের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান। নাস্তিকের আস্তানা- শাহবাগীদের আস্তানা ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও।
নাস্তিকদের ফাঁসির দাবিতে লাখো স্বাক্ষর
মতিঝিলের আরামবাগে নটরডেম কলেজের সামনে বড় সাদা ব্যানারে ব¬øগার নাস্তিকদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করছে হেফাজতের কর্মীরা। সেখানে দায়িত্বরত হেফাজতের কর্মীরা জানালেন, জনগণ গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে। এছাড়াও শাপলা চত্বর, টিকাটুলি মোড়, দৈনিক বাংলা মোড়, বায়তুল মোকাররমের সামনে, পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে নাস্তিক ব¬øগারের ফাঁসির দাবিতে গণস্বাক্ষর নেয়া হয়।
নারীরা ঘরে বসে রোজা রেখেছেন
ঈমানের প্রশ্নে কারও সঙ্গে কোনো আপোস নেই। মুসলমান একে অন্যের ভাই। নবী করিম (সঃ)-এর অবমাননা মেনে নিতে পারেন না দুনিয়ার কোনো মুসলিম নর-নারী। আমরা এসেছি লংমার্চে যোগ দিতে। শুধু পুরুষই নয়, ইসলামের আদর্শের নারীরাও এতে নিজস্ব অবস্থানে থেকেই অংশ নিচ্ছেন। তারা আল¬øাহর নামে আজ শনিবার রোজা রেখেছেন। মহান আল¬øাহর কাছে নাস্তিক ব্লগারদের বিচার কামনা এবং এ পাপ থেকে আমাদের জাতিকে রক্ষার জন্যই এ রোজা রাখছেন তারা। গতকাল রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ডাকা লংমার্চে গাজীপুর থেকে যোগ দিতে আসা আশিকুর রহমান এসব কথা জানান। তিনি আরও জানান, প্রায় পাঁচ হাজার লোকের বহর গাজীপুর থেকে রওনা হয়ে পায়ে হেঁটে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এসে পৌঁছেছে।
‘নাস্তিক মন্ত্রীদের’ অপসারণ দাবি
সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে ‘নাস্তিকদের’ বের করে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ থেকে। এছাড়া নাস্তিকতার অভিযোগে শাহরিয়ার কবির, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও ইমরান এইচ সরকারসহ আরো বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন তারা। সমাবেশের প্রায় সব বক্তাই কথিত নাস্তিকদের বিচার চেয়ে বক্তব্য দেন।
হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক বলেন, আমরা শেখ হাসিনাকে বলছি, নাস্তিক মেনন, ইনু ও একে খন্দকারকে নৌকা থেকে নামিয়ে দেন। না হলে আপনার নৌকা পানিতে তলিয়ে যাবে।
অপর নেতা আহমেদ সাইফুল¬øাহ বলেন, নাস্তিকদের পক্ষ নিয়ে যারা সংসদে বক্তব্য রেখেছেন তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। হেফাজতের আরেক নেতা নুরুল ইসলাম ওলিপুরি বলেন, নাস্তিকদের যতদিন পর্যন্ত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো না হবে- ততোদিন আন্দোলন চলবে।
লড়াই হবে ময়দানে, দেখা হবে জান্নাতে
শনিবার গভীর রাতে শাপলা চত্বরে এসে  রাস্তার ওপর অবস্থান নেন হেফাজত কর্মীরা। সেখানে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার জামিয়া ইমদাদিয়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্র নাঈম বিন হারুন (১৯) প¬ø্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় বসে আছেন, তাতে লেখা, ‘লড়াই হবে ময়দানে, দেখা হবে জান্নাতে’।
প¬ø্যাকার্ডের বিষয়ে জানতে চাইতে নাঈম বলেন, আমরা তো শহীদ হওয়ার জন্যই এখানে এসেছি। শহীদ হলে জান্নাতবাসী হতে পারবো। তাই এই প¬ø্যাকার্ড। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে লড়াই করতে হবে। লড়াইয়ে শহীদ হলে আমাদের জন্য জান্নাত অপেক্ষা করছে।
নাঈমের সঙ্গে ওই মাদ্রাসা থেকে আসা আরো  দুই শতাধিক ছাত্রের মুখেও একই কথা, ইসলামকে রক্ষা করার জন্য শহীদ হতেই আমরা এসেছি। এদের মধ্যে জামিল ও রবিউল বলেন, আমরা ইসলাম রক্ষা করার জন্যে এখানে এসেছি। আমাদের এই মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে আমরা শহীদ হব। আর শহীদ হলেই জান্নাতে যাব। শফী হুজুরের নির্দেশে শহীদ হতেই এখানে এসেছি।
ড্যাব, ডিএনএফ ও খেলাফত মজলিসের স্বাস্থ্য সেবা
সমাবেশে আগতদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে ডক্টর’স এসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), ন্যাশনাল ডক্টর’স ফোরাম (ডিএনএফ) ও খেলাফত মজলিস। ড্যাবের পক্ষ থেকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে ছয়টি স্পটে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়েছে আর ডিএনএফের পক্ষ থেকে চারটি স্পটে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়েছে। খেলাফত মজলিশের পক্ষেও দুইটি স্পটে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে। 
হে আল্ল¬াহ এই সরকারকে ধর, নাস্তিকদের খতম কর
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা ও বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি আব্দুর রহমান দোয়া করে বলেন, হে আল¬øাহ এই সরকারকে ধর, নাস্তিকদের খতম কর। বয়োবৃদ্ধ এই নেতা বলেন, যত চেষ্টাই করা হোক ইসলামকে কেউ নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। যারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তারাই একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ
লংমার্চ পরবর্তি সমাবেশে আগতদের হাতে দেয়া হয় বিক্ষন্ন ধরনের লিফলেট। এর মধ্যে মুসলিম জনতার ব্যানারে দেয়া লিফলেটে বাম রাজনীতিবিদদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ নাস্তিক ব্ল¬গারদের ও যুদ্ধাপরাধীদের একই মঞ্চে ফাঁসি দেয়া, রাতে শাহবাগে মদপানসহ সব অনৈতিক কাজ বন্ধ করা এবং নিহত ব¬øগার রাজীবের নামের সঙ্গে শহীদ শব্দ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। অপর একটি লিফলেটে ইসলাম এবং আওয়ামী লীগের পার্থক্য তুলে ধরা হয়। সেভ রিলিজিওন, সেভ বাংলাদেশ নামে অপর একটি লিফলেটে হেফাজতে ইসলামের নিকট জাতির প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়।
৪০ পয়েন্টে ছিল না নাস্তিকরা
গতকাল সকাল সাতটার পর থেকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীর ৪০টি পয়েন্টে নাস্তিকরা অবস্থান করবেন বলে ঘোষণা থাকলেও কয়েকটি এলাকা ঘুরে এবং বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে বাস্তবে এই কর্মসূচি কোথাও দেখতে পায়নি কেউ। তবে শাহবাগ ছাড়া ঢাকার পাঁচটি প্রবেশপথে পুলিশ-র‌্যাব সদস্যদের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সমাবেশের চেষ্টা করেছে নাস্তিকরা। 
ডিশ ছিল না কাওরান বাজারে
গতকাল সকাল সোয়া দশটা থেকে টিভিতে ডিশ-ক্যাবল সংযোগ ছিল না রাজধানীর মিডিয়াপল্লীখ্যাত কাওরান বাজার এলাকায়। নাস্তিক ব¬øগারদের ফাঁসির দাবিতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ শুরুর পর বিভিন্ন টিভি চ্যানেল শাপলা চত্বর থেকে সরাসরি সম্প্রচারের পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় এ এলাকার ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ক্যবল অপারেটর শহিদ জানান, কাওরান বাজার এলাকায় সকালে ডিশ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে তিনি এর বেশি কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান। 
দৌড়ে সেলুনে আশ্রয় নিলেন শাহরিয়ার কবীর
ঘাদানিকের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও সহসভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ইসলাম বিরোধী বক্তব্য দেয়ার সময় হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের তাড়া খেয়ে পালিয়েছিলেন পুলিশের সহায়তায়। এসময় তাদের সাথে থাকা কয়েকজন কর্মীও অবস্থা বেগতিক দেখে সটকে পড়ে। এসময় একটি সেলুনে আশ্রয় নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবীর। কিন্তু অপর নেতা মুনতাসির মামুন কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তা জানা যায়নি। গতকাল সকাল আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে মহাখালীর ফ্লাইওভারের নিচে অস্থায়ী গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মতিঝিলে লংমার্চে অংশগ্রহণকারী আলেম-ওলামা ও সাধারণ জনতাকে বাঁধা দেয়া এবং সেই সাথে ইসলাম বিরোধী বক্তব্য দেয়া হচ্ছিল। বাধা টপকিয়ে জনগণ যখন মতিঝিলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন আবারও বাধা দিলে হেফাজতের মিছিল থেকে তাড়া দেয়া হয়। ওই সময় জনতার তাড়া খেয়ে পাশে অবস্থিত টুডে হেয়ার ড্রেসার নামক সেলুনে দৌড় দিয়ে পালান কবির। আর মামুন দৌড় দিয়ে কোনদিকে পালিয়েছেন তা জানা যায়নি। এরপর উত্তেজিত জনতা অস্থায়ী গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়।
বনানী থানার এসআই জাকির হোসেন বলেন, সমাবেশ চলাকালে হেফাজতের মিছিল যাচ্ছিল, এ সময় সমাবেশে মিছিলবিরোধী বক্তব্য শুনে হেফাজতের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ক’জন উত্তেজিত হয়ে হামলা চালিয়ে চেয়ার-টেবিল ভাঙে এবং ব্যানার ছিঁড়ে দেয়। এসময় একজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়। আহত পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। হামলাকারীদের ঢিল তার চোখের নিচে আঘাত করে।
সাহস থাকলে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করুন
সরকারের সাহস থাকলে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে দেখুন বলে আল্টিমেটাম দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম মহাসমাবেশের মঞ্চ। বক্তারা বলেন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে বের করে আনা হবে। গতকাল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ থেকে বক্তারা এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বক্তারা বলেন, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কিছু হলে দেশ অচল করে দিতে বাধ্য হবো।
সমাবেশের নিরাপত্তায় দুই হাজার পুলিশ
মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের নিরাপত্তায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দুই হাজার সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। সমাবেশস্থল ছাড়াও আশপাশের এলাকায় সতর্ক ছিলেন তারা। এ ব্যাপারে পুলিশের  মতিঝিল বিভাগের ডিসি নাজমুল হোসেন জানান, সমাবেশকারীদের কাজে বাধা দেয়া তাদের উদ্দেশ্যে নয়। বরং তারা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে পারে সেজন্যই কাজ করছে পুলিশ সদস্যরা।
তিনি বলেন, তাদের সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হোক সেটাই আমরা চাই।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়