হেফাজতের হরতালে আ.লীগের সন্ত্রাস : চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লায় গুলিবিদ্ধ শতাধিক হেফাজতের অহিংস অবরোধে অচল দেশ
স্টাফ রিপোর্টার
| পরের সংবাদ» |
হেফাজতে ইসলামের হরতালে অহিংস অবরোধে গতকাল অচল হয়ে পড়ে দেশ। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও কুমিল্লায় ব্যাপক সন্ত্রাস চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা। হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর বেপরোয়া গুলি ও বোমা নিক্ষেপে চট্টগ্রামে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন কমপক্ষে তিনজন। সারাদেশে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শতাধিক। জায়নামাজ বিছিয়ে জিকিরের সঙ্গে শত শত হেফাজতকর্মী সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এ সরকারের আমলে এই প্রথম কোনো হরতালে পুলিশি গুলির ভয় উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে দিনভর রাস্তা আটকে সমাবেশ হয় গতকাল। তবে চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে ছাত্রলীগ ক্যাডার ও পুলিশ যৌথ হামলা এবং গুলি চালায় হরতাল সমর্থকদের ওপর। বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা।
সারাদেশেই পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের বিক্ষিপ্ত হামলা, সংঘর্ষ, রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে হরতাল পালিত হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী হেফাজতে ইসলামের ডাকা এই হরতালে তেমন কোনো ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। জায়নামাজ বিছিয়ে হাতে তসবিহ আর মুখে আল্লাহর জিকিরের সঙ্গে সড়ক অবরোধ করে রাখে আলেম ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। অনেক জায়গায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা গায়ে জাতীয় পতাকা আর হাতে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে হরতালের সমর্থনে মিছিল করেন। তবে শান্তিপূর্ণ এই অবস্থান সত্ত্বেও ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা, গাজীপুর, হবিগঞ্জসহ বেশকিছু জায়গায় হেফাজতে ইসলামের মিছিল-সমাবেশে পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা বেপরোয়া হামলা ও গুলি চালায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে একজন নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী এবং পুলিশের হামলায় হেফাজতে ইসলামের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা কাটা রাইফেল, শটগান, দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায় হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর। কয়েকটি স্থানে গুলি চালিয়েছে পুলিশও। পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের হামলায় সারাদেশে দেড় শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে। ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় হেফাজতে ইসলাম নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে পুলিশ এবং সাংবাদিকসহ ৫০ জন আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয় ৮ জন। চট্টগ্রামের পটিয়ায় মসজিদ ও এতিমখানায় হামলা ও ভাংচুর চালায় ছাত্রলীগ। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। কুষ্টিয়ায় হেফাজতের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। সেখান থেকে সংগঠনের জেলা আহ্বায়ককে গ্রেফতার করা হয়। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে গেলে সেখান থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
রাজধানীতে হরতালের সমর্থনে বেশ সক্রিয় ছিল হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। দফায় দফায় পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে নগরীর পল্টন, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল ও সমাবেশ করে সংগঠনটি। লালবাগ মাদরাসা দিনভর অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। তবে মোহাম্মদপুরের বসিলা-কেরানীগঞ্জ সড়কে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ছাড়াও দলমত নির্বিশেষে ধর্মপ্রাণ মানুষের কড়া পিকেটিং ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে পিকেটিংয়ে বাধা দিলেও জনতার প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা নীরবতা পালন করে। তবে পুরানা পল্টনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর-পূর্ব পাশে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয় মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদী হাসান। এ সময় সেখানকার পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া রাজধানীর বংশাল, নয়াবাজার, গোড়ান, আজিমপুর তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, রমনা, পল্টন, রামপুরাসহ অন্তত ২০টি স্পটে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং করে।
হরতালে সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আখাউড়ায় ৪ ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করে রাখে হেফাজের নেতাকর্মীরা। অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় জায়নামাজ বিছিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। ভাংচুর কিংবা জ্বালাও পোড়াওয়ের মতো কোনো পিকেটিং না হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে হরতাল। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। নগরীতে কিছু লোকাল বাস, সিএনজি ও রিকশা চলাচল করলেও লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। বড় বড় মার্কেট, দোকান, বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সব ছিল বন্ধ।
লংমার্চে বাধা দেয়ার প্রতিবাদ এবং রাসুলের (সা.) অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যুদণ্ডের আইন পাসসহ ১৩ দফা দাবিতে গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে হরতালের এ কর্মসূচি ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইসঙ্গে মাসব্যাপী বিভিন্ন বিভাগ ও বড় শহরে শানে রিসালাত কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঈমানি দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান নেতারা।
এদিকে গতকাল বিকালে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনকারীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানান হেফাজতে ইসলামের নেতারা।
১৩ দফা দাবি আদায়ে ঘোষিত মাসব্যাপী শানে রিসালাত কর্মসূচির পাশাপাশি আগামী শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভ ও দোয়া দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা।
চট্টগ্রামে হেফাজতের স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল : বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সশস্ত্র হামলা সংঘর্ষ, আহত শতাধিক : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী এবং পুলিশের হামলায় হেফাজতে ইসলামের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা কাটা রাইফেল, শটগান, দেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচার গুলি চালায় হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর। কয়েকটি স্থানে গুলি চালিয়েছে পুলিশও। নগরীর ওয়াসা মোড়ে যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে ও কাউন্সিলর এএফএম কবির মানিকের নির্দেশে সশস্ত্র হামলায় আহত হয়েছেন ৩১ জন। এর মধ্যে ২০ জনই গুলিবিদ্ধ। এখানে ছাত্রলীগ ও হেফাজত কর্মীদের মধ্যে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ সময় এ এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। আনোয়ারা উপজেলার পারকি বাজারে পুলিশ- ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী। এখানে সংঘর্ষের সময় ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ফটিকছড়ির জাহানপুরে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে হেফাজতে ইসলামের মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালালে ৩ হেফাজত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। একই উপজেলার রাঙামাটিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় ৮ হেফাজত কর্মী আহত হয়েছে। রাউজান সদরের মুন্সিরঘাটা ও দাইয়ারপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী এবং গহিরা এলাকায় ২০ জনসহ মোট ৩০ জন। তবে রাউজানে আরও বেশি সংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি হেফাজতের। এখানে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, হরতালের সমর্থনে ভোর থেকেই নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং শুরু করেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। নগরীর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, কালামিয়া বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, ওয়াসা মোড়, অলঙ্কার মোড়, ইপিজেড মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। এর ফলে গোটা নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রিকশা ও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বেবিট্যাক্সি-টেম্পো ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন রাস্তায় বের হয়নি। হেফাজত কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবেই এসব এলাকায় পিকেটিং করেন। হেফাজতে ইসলামের হরতালে গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম। অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। অধিকাংশ দোকানপাট, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট বন্ধ ছিল। ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন হয়নি। হেফাজত কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ছিল হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়।
হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর লালখান বাজার এলাকায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কর্মকর্তাসহ উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
হরতাল শুরুর পর নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে সড়কের এক পাশে হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। সড়কের অপর পাশে অবস্থান নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এফআই কবির মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে উভয়পক্ষে সংঘর্ষ ঘটে। তা থেমে থেমে চলতে থাকে দিনভর।
হরতালের শুরুতে ফজরের নামাজের পর পর হেফাজতে ইসলামের কয়েকশ’ নেতাকর্মী নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইসলামী চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর সেখানে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি তারা জিকির-আজকার করে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শুরু করেন। সকাল ৯টার পরে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহারসহ অন্যরা বক্তব্য রাখছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর হঠাত্ করে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ের দিক থেকে কয়েকশ’ সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র, দা, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে আসতে থাকে। হেফাজত কর্মীরা তাদের বাধা দিতে এগিয়ে এলে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমাবেশের দিকে যেতে থাকে।
এ সময় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রাথমিক অবস্থায় পিছু হটে পরবর্তীকালে পাল্টা ধাওয়া দেন ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের। এতে তারা পিছু হটে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে অবস্থান নেয়। প্রথমে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও পরে তারা কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দু’পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া অনেক নেতাকর্মী হরতালবিরোধী মিছিল থেকে ছোড়া বোমার স্পিল্গন্টার, পাথরের আঘাত এবং রামদার কোপে গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাকিদের নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে যুবলীগ ক্যাডার ও এক সময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী দিদারুল আলম মাসুম তার সহযোগীদের নিয়ে নিরস্ত্র হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। এ সময় মাসুমের হাতে দেখা যায় পুলিশ ব্যবহার করে এমন একটি শটগান। সে এই অস্ত্রটি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি চালাতে থাকে। তার সহযোগী আরও বেশ কয়েক সন্ত্রাসীর হাতে এ সময় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। পুলিশ মাসুমকে একবারও আটক করার চেষ্টা করেনি। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, পুলিশের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট ব্যবহার করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালায়। দিদারুল আলম মাসুমের ব্যবহার করা শটগানটি পুলিশের কি-না জানতে চাইলে এডিসি (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমদ পাল্টা জানতে চান সাংবাদিকরা অস্ত্রটির ছবি তুলেছে কি-না। কয়েকজন সাংবাদিক ওই অস্ত্রের ছবি পেয়েছেন বলে জানালে এডিসি মোস্তাক বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। গুলিবর্ষণের সময় নিজেদের গুলিতেই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী আহত হয়। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুদ্দিন রুহী অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র , হেলমেট ও জ্যাকেট নিয়ে তাদের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়।
এদিকে পিছু হটার পর হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ পর আবারও কয়েক দফা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার চেষ্টা করে। হেফাজতে ইসলামের শক্ত প্রতিরোধ এবং পুলিশের অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে দুপুর ১২টার দিকে বাগমনিরাম স্কুলের গলি থেকে হঠাত্ করে ৪-৫ যুবক বের হয়ে এসে হেফাজতের সমাবেশে বেশ কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে স্পিল্গন্টারের আঘাতে হেফাজতের তিন কর্মী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া সারাদিন বেশ কয়েকবার ইসলামী চত্বর (ওয়াসা মোড়ের) হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চোরাগোপ্তা হামলার চেষ্টা করে হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের ক্যাডাররা। তবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সাধারণ জনগণ যোগ দিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তা সম্ভব হয়নি।
হেফাজতে ইসলাম নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী জানান, ওয়াসার মোড়ে তাদের ৩১ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন গুলিবিদ্ধ। এদের অধিকাংশই লালখান বাজার মাদরাসার ছাত্র। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ সাদেক, কামরুল ও ওমর ফারুকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজনই লালখান বাজার মাদরাসার শিক্ষার্থী। রুহী জানান, গতকাল পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় তাদের শতাধিক কর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অনেকেই সেখানে নিখাঁজ রয়েছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বাধায় রাউজান যাওয়া সম্ভব কর্মীদের মধ্যে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ সময় এ এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। আনোয়ারা উপজেলার পারকি বাজারে পুলিশ- ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী। এখানে সংঘর্ষের সময় ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ফটিকছড়ির জাহানপুরে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে হেফাজতে ইসলামের মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালালে ৩ হেফাজত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। একই উপজেলার রাঙামাটিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় ৮ হেফাজত কর্মী আহত হয়েছে। রাউজান সদরের মুন্সিরঘাটা ও দাইয়ারপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী এবং গহিরা এলাকায় ২০ জনসহ মোট ৩০ জন। তবে রাউজানে আরও বেশি সংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি হেফাজতের। এখানে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, হরতালের সমর্থনে ভোর থেকেই নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং শুরু করেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। নগরীর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, কালামিয়া বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, ওয়াসা মোড়, অলঙ্কার মোড়, ইপিজেড মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। এর ফলে গোটা নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রিকশা ও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বেবিট্যাক্সি-টেম্পো ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন রাস্তায় বের হয়নি। হেফাজত কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবেই এসব এলাকায় পিকেটিং করেন। হেফাজতে ইসলামের হরতালে গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম। অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। অধিকাংশ দোকানপাট, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট বন্ধ ছিল। ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন হয়নি। হেফাজত কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ছিল হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়।
হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর লালখান বাজার এলাকায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কর্মকর্তাসহ উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
হরতাল শুরুর পর নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে সড়কের এক পাশে হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। সড়কের অপর পাশে অবস্থান নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এফআই কবির মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে উভয়পক্ষে সংঘর্ষ ঘটে। তা থেমে থেমে চলতে থাকে দিনভর।
হরতালের শুরুতে ফজরের নামাজের পর পর হেফাজতে ইসলামের কয়েকশ’ নেতাকর্মী নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইসলামী চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর সেখানে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি তারা জিকির-আজকার করে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শুরু করেন। সকাল ৯টার পরে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহারসহ অন্যরা বক্তব্য রাখছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর হঠাত্ করে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ের দিক থেকে কয়েকশ’ সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র, দা, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে আসতে থাকে। হেফাজত কর্মীরা তাদের বাধা দিতে এগিয়ে এলে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমাবেশের দিকে যেতে থাকে।
এ সময় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রাথমিক অবস্থায় পিছু হটে পরবর্তীকালে পাল্টা ধাওয়া দেন ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের। এতে তারা পিছু হটে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে অবস্থান নেয়। প্রথমে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও পরে তারা কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দু’পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া অনেক নেতাকর্মী হরতালবিরোধী মিছিল থেকে ছোড়া বোমার স্পিল্গন্টার, পাথরের আঘাত এবং রামদার কোপে গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাকিদের নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে যুবলীগ ক্যাডার ও এক সময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী দিদারুল আলম মাসুম তার সহযোগীদের নিয়ে নিরস্ত্র হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। এ সময় মাসুমের হাতে দেখা যায় পুলিশ ব্যবহার করে এমন একটি শটগান। সে এই অস্ত্রটি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি চালাতে থাকে। তার সহযোগী আরও বেশ কয়েক সন্ত্রাসীর হাতে এ সময় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। পুলিশ মাসুমকে একবারও আটক করার চেষ্টা করেনি। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, পুলিশের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট ব্যবহার করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালায়। দিদারুল আলম মাসুমের ব্যবহার করা শটগানটি পুলিশের কি-না জানতে চাইলে এডিসি (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমদ পাল্টা জানতে চান সাংবাদিকরা অস্ত্রটির ছবি তুলেছে কি-না। কয়েকজন সাংবাদিক ওই অস্ত্রের ছবি পেয়েছেন বলে জানালে এডিসি মোস্তাক বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। গুলিবর্ষণের সময় নিজেদের গুলিতেই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী আহত হয়। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুদ্দিন রুহী অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র , হেলমেট ও জ্যাকেট নিয়ে তাদের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়।
এদিকে পিছু হটার পর হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ পর আবারও কয়েক দফা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার চেষ্টা করে। হেফাজতে ইসলামের শক্ত প্রতিরোধ এবং পুলিশের অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে দুপুর ১২টার দিকে বাগমনিরাম স্কুলের গলি থেকে হঠাত্ করে ৪-৫ যুবক বের হয়ে এসে হেফাজতের সমাবেশে বেশ কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে স্পিল্গন্টারের আঘাতে হেফাজতের তিন কর্মী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া সারাদিন বেশ কয়েকবার ইসলামী চত্বর (ওয়াসা মোড়ের) হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চোরাগোপ্তা হামলার চেষ্টা করে হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের ক্যাডাররা। তবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সাধারণ জনগণ যোগ দিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তা সম্ভব হয়নি।
হেফাজতে ইসলাম নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী জানান, ওয়াসার মোড়ে তাদের ৩১ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন গুলিবিদ্ধ। এদের অধিকাংশই লালখান বাজার মাদরাসার ছাত্র। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ সাদেক, কামরুল ও ওমর ফারুকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজনই লালখান বাজার মাদরাসার শিক্ষার্থী। রুহী জানান, গতকাল পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় তাদের শতাধিক কর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অনেকেই সেখানে নিখাঁজ রয়েছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বাধায় রাউজান যাওয়া সম্ভব বিএনপির ডাকা হরতালের সময় কিছু যানবাহন চলাচল করলেও গতকাল হেফাজতের ডাকা হরতালে রিকশা, হোন্ডা এমনকি বাইসাইকেল পর্যন্ত চলেনি। হেফাজতের জিরি মাদরাসা শাখা ফজরের নামাজের পর থেকেই আরাকান সড়কের ভেল্লাপাড়া ও শান্তিরহাটজুড়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। অপরদিকে পটিয়া জামেয়া মাদরাসার কর্মী ও মুসল্লিরা সারাদিন আরাকান সড়কে মিছিল করেছে। তারা রাস্তার ওপর জোহরের নামাজ আদায় করে। বিকালে পটিয়া ডাকবাংলো মোড়ে আল জামেয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। মাদরাসার মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুফতি মোজাফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে অন্য নেতারা বক্তব্য রাখেন।
রাজপথে সহিংস ছাত্রলীগ : হেফাজতের হরতাল প্রতিরোধে গতকাল রাজপথে সহিংস হয়ে উঠেছিল শাহবাগী হরতালের পিকেটার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। রাজধানীতে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র মহড়ায় ছিল তারা। চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ এবং ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। পরে পুলিশ এসেও গুলি চালায় তৌহিদি জনতার ওপর। এতে কমপক্ষে ৩০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হন।
গত শুক্র ও শনিবার শাহবাগীদের অবরোধ এবং ঘাদানিকের হরতালে সারাদেশে যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ পিকেটারের ভূমিকায় ছিল, গতকাল তারা হরতাল প্রতিরোধে হাতে অস্ত্র নিয়ে নামে।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে জড়ো হয়ে হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। ঢাকা কলেজ, তীতুমির কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা বিক্ষোভ করে। হাতে লাঠি নিয়ে হরতালবিরোধী নানা স্লোগান দেয় তারা। পুরনো ঢাকায় ঘাট শ্রমিক লীগ লাঠি মিছিল বের করে। সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, কৃষক লীগ, মুজিব সেনা ঐক্য লীগ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ আরও কয়েকটি সংগঠন হরতালের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। এতে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হাজী মো. সেলিম, ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক বলরাম পোদ্দারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তৃতা করেন।
রাজধানীর হরতাল চিত্র : পল্টনে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশি বাধা : হরতালের সমর্থনে সকাল থেকেই রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও পাশের পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অফিসের সামনে জড়ো হয় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে ওই এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেয় ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ। সকাল সাড়ে ৮টার সময় হেফাজতের ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমীর নেতৃত্বে সুরমা টাওয়ারের সামনে থেকে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তরগেট ও পল্টন মোড় হয়ে আবার সুরমা টাওয়ারের কাছে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। সেখানে নেতাকর্মীরা বেশ কিছুক্ষণ রাস্তা অবরোধ করে স্লোগান দেয়।
সমাবেশে আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা ভাংচুরের মতো অন্যায় করতে পারি না। তবে শরীয়তের বিধান হলো—অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। এ হরতাল হবে শান্তিপূর্ণ ও অনুকরণীয় আদর্শ। ১৩ দফা দাবি না পূরণ হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন সংগঠনের ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, হুমায়ুন কবির, মাওলানা নোমান মাজহারী, অধ্যাপক আবদুল করিম, আবু সাঈদ নোমান, অলিউল্লাহ আরমান, তোফায়েল গাজালী প্রমুখ। এদিকে সমাবেশের একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে এবং রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় নেতাকর্মীরা গলির মুখে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। তবে ওই সমাবেশস্থলে বাইরে থেকে নেতাকর্মীদের প্রবেশে বাধা দেয় পুলিশ। কিছুক্ষণ বক্তব্য চলার পর সেখানেও চড়াও হয় পুলিশ। সকাল পৌনে ১০টার দিকে মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পথসভায় বাধা দেয়। একপর্যায়ে হামলার হুমকি দিয়ে হেফাজত কর্মীদের সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়। এরইমধ্যে সেখানে পানিকামান নিয়ে হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল পুলিশ। এ ঘটনায় হেফাজত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে নেতাকর্মীরা খেলাফত মজলিসে ও গেটে অবস্থান নেয়। মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ শাহবাগিদের তুলে দিতে না পারলেও ক্ষমতার জোরে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে বেলা আড়াইটার দিকে খেলাফত মজলিসের অফিস থেকে হরতালের সমর্থনে আরেকটি মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাতেও বাধা দেয়। বাধা উপেক্ষা করে মিছিল শুরু করলে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ সামনে ও পেছনে অবস্থান নেয়। মিছিলটি নোয়াখালী টাওয়ার-হাউজবিল্ডিং মোড় দিয়ে বায়তুল মোকাররমে উত্তর গেট হয়ে আবার খেলাফত মজলিস অফিসের সামনে এসে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে হেফাজতে ইসলামের মহানগর নেতারা বক্তব্য রাখেন।
লালবাগে মিছিলে পুলিশি বাধা : বাদ ফজর থেকেই হরতালের সমর্থনে স্লোগান-মিছিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকা। জামেয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া মাদরাসা ও লালবাগ শাহী মসজিদের সিঁড়িতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। পরে দু’শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তৃতা করেন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর নায়েবে আমির মুফতি মো. তৈয়্যব, আইন সেলের প্রধান মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ। তারা বলেন, গাড়ি ভাংচুর ও হামলার সঙ্গে হেফাজতের কোনো সম্পর্ক নেই। আওয়ামী লীগই এটা করেছে। আগামী ৫ মে’র মধ্যে ১৩ দফা দাবি পূরণ না হলে বর্তমান নাস্তিক-মুরতাদ সরকারের পতন হবে। তবে রাস্তায় পিকেটিং করতে না পারলেও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রিকশা ও দু’একটা সিএনজি ছাড়া কোনো যানবাহন চলেনি।
কামরাঙ্গীরচর : সকাল ৬টা থেকে বুড়িগঙ্গা ঘেঁষা কামরাঙ্গীরচর মেইন রোডে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে হরতাল সমর্থকরা। পরে পুলিশ বাধা দিলে কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নুরীয়া ইসলামিয়া মাদরাসার ভেতরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে খেলাফত আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। সেখানে বসে ৫০-৬০ জন হরতাল সমর্থককে আমার দেশ পত্রিকা পড়তে দেখা গেছে। সাড়ে ১০টার দিকে দু’শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে রাস্তায় বেরুনোর চেষ্টা করলে পুলিশি বাধা পেয়ে মাদরাসার সামনেই সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে তারা। বক্তব্য রাখেন খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা আহমদুল্লাহ আশরাফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান হামিদী প্রমুখ। আশরাফ বলেন, নাস্তিক-মুরতাদদের পৃষ্ঠপোষক এই সরকার ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। নাস্তিকরা দিনের পর পুলিশ প্রহরায় মিছিল-সমাবেশ করলেও নবী প্রেমিকদের বাধা দেয়া হচ্ছে। ইসলাম নিয়ে কটূক্তির জন্য ইনু-মেননদের জিহ্বা টেনে ছিড়তে হবে যোগ করেন তিনি।
মোহাম্মদপুর : ভোর ৬টা থেকে লালমাটিয়া, টাউনহল, ধানমন্ডি, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে প্রায় সহস্রাধিক হেফাজতকর্মী মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড চৌরাস্তায় অবস্থান নিয়ে হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ করেন। এ সময় সরকার বিরোধী মিছিল-স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা। ৭-৮ প্লাটুন পুলিশ-র্যাব তাদের চতুর্দিক ঘিরে রাখে। হেফাজতের মোহাম্মাদপুর জোনের আহ্বায়ক মাওলানা জালাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন, হেফাজতের যুগ্ম আহ্বায়ক মুফতি মাহফুজুল হক, মাওলানা আতাউল্লাহ, মাওলানা ফয়সাল প্রমুখ। এ সময় বাসস্ট্যান্ড থেকে কোনো গাড়ি চলাচল করেনি। দুপুর পর থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
এমন হরতালচিত্র দেখেনি কেরানীগঞ্জবাসী : ভোর ৬টার পর থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেরানীগঞ্জ সড়কে জমায়েত হয় হরতাল সমর্থকরা। মোহাম্মাদপুর বসিলা ব্রিজ এলাকা থেকে কেরানীগঞ্জ সড়কের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ও ইট ফেলে অবরোধ করে তারা। এলাকাবাসী জানায়, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত কর্মীরা সবাই এ পিকেটিং-এ অংশ নেয়। শক্ত পিকেটিংয়ের কারণে ওই এলাকায় বাস-ট্রাক তো দূরের কথা কোনো রিকশা-সিএনজিও চলেনি। মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল চালকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয় পিকেটাররা। কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের মদ্দেরচর এলাকায় পিকেটিং হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সকাল ৮টার দিকে আর্টিবাজার শহীদনগর এলাকা থেকে দুই হরতাল সমর্থককে আটক করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। তারপর থেকে পুলিশ-র্যাবকে আর প্রবেশ করতে দেখা যায়নি ওই এলাকায়। বিকাল ৩টায় দিকে শাক্তা ইউনিয়নে বিশাল মিছিল বের হয়। কেরানীগঞ্জবাসী আবদুল মালেক বলেন, এমন হরতালচিত্র এরআগে দেখেনি কেরানীগঞ্জবাসী। এরআগে বিএনপি-আ.লীগ কিংবা জামায়াত হরতাল ডাকলেও সেসব হরতালে বাস-ট্রাক ও বিভিন্ন গাড়ি চলেছে অন্যদিনের মতোই। কিন্তু গতকালের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। ২-৩ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে ছিল শুধুই গাছের গুঁড়ি আর ইটের পর ইট। হরতালের বিরোধিতা করা তো দূরের কথা রাস্তা অবরোধ ও যানচলাচলে বিঘ্ন নিয়ে কাউকে কোনো প্রতিবাদও করতে দেখা যায়নি ওই এলাকায়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিকেটিংয়ে অংশ নেয় এলাকাবাসী। তারা বলেন, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, ইসলামের পক্ষের শক্তির হরতাল। তাই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিকেটিংয়ে অংশ নিয়েছে।
ফার্মগেট কারওয়ানবাজার ধানমন্ডি : হরতালে রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার ও ধানমন্ডির চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এসব এলাকায় হরতালের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিং করতে দেখা না গেলেও গাড়িঘোড়া চলেছে অন্যদিনের হরতালের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশ-র্যাবের কড়া উপস্থিতি।
যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ : হেফাজতে ইসলামের ডাকা গতকালের হরতালে যাত্রবাড়ী এলাকায় কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। কুতুবখালীর ফ্লাইওভারের কাছে সকাল সাড়ে ৬টায় শতাধিক হেফাজতে ইসলামেরকর্মী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা একটি পথসভা করে। পথসভায় তারা অবিলম্বে নাস্তিকদের ফাঁসি দাবি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যায়। পরে পুলিশ হরতালকারীদের আটক করতে সেখানের বিভিন্ন বাড়িতে ও দোকানে অভিযান চালায়। এতে পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হরতালে যাত্রবাড়ী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল। পথচারীদের রিকশা ও ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে যেতে দেখা গেছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। যাত্রাবাড়ী এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ।
কাঁচপুরে রাস্তা অবরোধ আটক ২ : নারায়ণগঞ্জ কাঁচপুরের নয়াবাড়ির ইউনাইটেড ফিলিং স্টেশনের সামনের রাস্তা সোয়া ৭টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা শাহবাগি নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা একটি বাসের কাচ ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বললে উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। তখন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। সেখান থেকে পুলিশ দুজনকে আটক করে। তখন হেফাজতের নেতাকর্মীরা আটক দুই নেতাকর্মীকে পুলিশের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে থানায় একটি মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মিরপুরে হেফাজতের অবস্থান গুলশান-মহাখালীতে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল : হরতালে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা মিরপুরে রাস্তা অবরোধ ও সমাবেশ করেছে। কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই গাবতলী, আগারগাঁও, গুলশান ও মহাখালীতে হরতাল পালিত হয়। গুলশানে হরতালের সমর্থনে দুটি মিছিল বের হয়। কাজীপাড়ায় একটি মিছিল বের হলেও তারা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তবে মিরপুর ১ নম্বরে রাস্তায় বসেই সমাবেশ করেন তারা। সরকার সমর্থক মালিকদের কিছু পাবলিক বাস রাস্তায় বের হলেও কোনো প্রাইভেট গাড়ি বের হয়নি। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ ছাড়া হেফাজতের কর্মীরা কোনো ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে যায়নি।
মুগদা-কদমতলী : মুগদার গোলাপবাগ মোড়ে সকাল সোয়া ৭টায় হরতালের সমর্থনে হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যায়। কদমতলীর সাদ্দাম মার্কেটের সামনে সকাল পৌনে ৭টায় হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ময়মনসিংহে হেফাজতে ইসলাম-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ, পুলিশ সাংবাদিকসহ আহত ৫০ বিএনপি অফিসে আগুন, বিজিবি মোতায়েন : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহ শহরের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় হেফাজতে ইসলাম ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ-সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। এদিকে হরতাল বিরোধীরা নতুনবাজার এলাকায় বিএনপি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় কমপক্ষে ৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়। শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকালে শহরের চরপাড়া এলাকা থেকে হরতালের সমর্থনে হেফাজতে ইসলামের একটি মিছিল গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় এসে আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিলের মুখোমুখি হলে সংঘর্ষ বেধে যায়। হেফাজত কর্মীদের ইট-পাটকেলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিছু হটে শিববাড়ি দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয়। হেফাজত কর্মীরা কমপক্ষে ২০ মিনিট আওয়ামী লীগ অফিস লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং দোকানপাট ভাংচুর করে। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইট-পাটকেলের আঘাতে ইত্তেফাকুল ওলামার নেতা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা মফিজুল ইসলাম, মুফতি আবদুল খালেক, মাওলানা আবদুল হান্নান, মাওলানা জানেআলম, মাওলানা জুবায়ের, মাওলানা আবু ইউসুফ, মাওলানা সাইফুল্লাহ, মাওলানা শফিউল্লাহ, মাওলানা ফরিদ, মাওলানা আতাউর রহমান, মাওলানা আবদুল্লাহ, মাওলানা নাজমুল আলম, মাওলানা আবু সালমান, রফিকুল ইসলাম, সেলিম আহমেদ, কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আবু মোহাম্মদ ফজলুল করিম, ওসি তদন্ত মাজেদুল ইসলাম, গাজী টিভির কাজী মুন্না, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের হোসাইন শাহিদ, একাত্তর টিভির ক্যামেরাপারসন নুরুজ্জামানসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে হরতাল বিরোধীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নতুনবাজার এলাকায় বিএনপি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। শহরের ওল্ড পুলিশ ক্লাব রোডের একটি রেস্তোরাঁয়ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে আগুন নেভায়। শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ইত্তেফাকুল ওলামার নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেন। ইত্তেফাকুল ওলামা নেতা মাওলানা মুহিবুল্লাহ জানান, বিনা উসকানিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করে। পুলিশের গুলিতে ৮ জন আহত হয়েছে।
এদিকে বিকালে ১৪ দলের নেতারা সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেন, হেফাজতের নামে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা আওয়ামী লীগের অফিসে হামলার চেষ্টা করে। ইট-পাটকেলের আঘাতে আমাদের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়। এ সময় পুলিশের ভূমিকা সন্দেহজনক ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ময়মনসিংহে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আহমদ আল মামুন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিভাগীয় শহরগুলোতে হরতাল : নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে গতকাল সারা দেশের মতো বিভাগীয় শহরগুলোতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, যতদিন ইসলামবিরোধী সরকারের পতন না হবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিলেট রাজপথ ছিল হরতাল সমর্থকদের দখলে : বাদ ফজর থেকেই নগরীর রাজপথ দখলে রাখে হরতাল সমর্থকরা।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগরীর কেন্দ্রস্থল কোর্ট পয়েন্ট দখলে রাখে হেফাজত কর্মীরা। সেখানে ইসলামী ছাত্র মজলিস ও জমিয়ত কর্মীরা অবস্থান নেয়। কর্মীরা রাস্তায় বসে হরতালের সমর্থনে নানামুখী স্লোগানের সঙ্গে নাস্তিক-মুরতাদদের ফাঁসির দাবি জানায়। সকাল ৭টায় মাদানী কাফেলার মাওলানা রুহুল আমীন নগরীর নেতৃত্বে মেজরটিলা-টিলাগড় এলাকায় মিছিল বের হয়। সাড়ে ৯টায় হেফাজতে ইসলাম ৫নং টুলটিকর ইউনিয়নের একটি মিছিল ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোড অতিক্রম করে। দুপুর সাড়ে ১২টায় আম্বরখানা থেকে একটি মিছিল বের করে ইসলামী ছাত্র মজলিস। এছাড়া হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ছাত্র জমিয়তসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনভর নগরীতে মিছিল বের করা হয়। সিলেট নগরীতে রিকশা তো দূরের কথা, ঠেলাগাড়িও চলেনি। সিলেট থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবরোধের কারণে ট্রেন চলাচলও বিঘ্নিত হয়। নগরীতে র্যাব-পুলিশের সতর্ক টহল অব্যাহত ছিল। নগরীর রাজপথে লেখা হয়, ‘নাস্তিক-মুরতাদদের ফাঁসি চাই’ স্লোগান।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম : জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। ১৩ দফা বাস্তবায়ন না করে জমিয়ত কর্মীরা ঘরে ফিরবে না। সিলেট জেলা ও মহানগর জমিয়তের মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী এ কথা বলেন। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বন্দরবাজার পত্রিকা পয়েন্টে মহানগর জমিয়তের সভাপতি হাফিজ মাওলানা মনছুরুল হাসান রায়পুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শায়খ আতাউর রহমান কোম্পানীগঞ্জী, মহানগর জমিয়ত নেতা প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আলী নূর, মাওলানা শফীউল আলম, মাওলানা আসরার আহমদ প্রমুখ।
খেলাফত মজলিস : খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী নেতারা বলেছেন, ইসলামের বিরুদ্ধে কটাক্ষকারী নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের শাস্তির দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। হরতাল চলাকালে খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী শাখার উদ্যোগে নগরীর কোর্টপয়েন্টে আয়োজিত মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে নেতারা এ কথা বলেন। খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী সহসভাপতি শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন মহানগরী সহসভাপতি আবদুল হান্নান তাফাদার, সহ-সেক্রেটারি মাওলানা রওনক আহমদ, মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান, কে এম আবদুল্লাহ আল-মামুন, জেলা প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আবদুল্লাহ আল-হাদী, প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা ইমদাদুল হক নোমানী, সহ-বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা মুহি উদ্দীন, মহানগর প্রচার সম্পাদক মাওলানা জুনায়েদ আহমদ প্রমুখ।
বাংলদেশ খেলাফত মজলিস : হেফাজতে ইসলামের ডাকা গতকাল সোমবারের হরতাল সমর্থনে বাংলদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট নগরীতে বেশ কয়েকটি মিছিল ও পথসভা করেছে। সকাল ১১টায় মহানগর শাখার উদ্যোগে এক বিশাল মিছিল সিলেট সিটি পয়েন্ট থেকে শুরু করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে আম্বরখানা পয়েন্টে এক পথসভায় মিলিত হয়। মহানগর সভাপতি আলহাজ মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিরাজীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা সহসভাপতি হাফিজ মাওলানা সৈয়দ শামীম আহমদ, মহানগর সহসভাপতি মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ, মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা এমরান আলম, জেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।
আমার দেশ বন্ধ হলে অসহযোগ আন্দোলন : হরতালে জনজীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে সকাল ৭টায়। মহানগরীতে হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সভাপতি মাওলানা আবদুস সামাদের নেতৃত্বে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তারা সরকারকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নাস্তিক্যবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ঈমানি দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সত্য প্রকাশের কারণে যদি দৈনিক আমার দেশ বন্ধ কিংবা সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে কোনো ধরনের হয়রানি করা হয়, তাহলে সরকার পতনে এক দফার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে। যতদিন ইসলামবিরোধী এ সরকারের পতন না হবে, ততদিন আন্দোলন চলবে। ফলে সরকারের উচিত অবিলম্বে ১৩ দফা মেনে নিয়ে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৭টায় মহানগরীর মালোপাড়া দারুল উলুম হাফেজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা থেকে হেফাজতে ইসলাম একটি বিশাল বিক্ষোভ বের করে। মিছিলটি মালেপাড়া থেকে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ কামারুজ্জামান চত্বরে সমাবেশ করে। এ সময় বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সভাপতি মাওলানা আবদুস সামাদ, হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সদস্য সচিব মাওলানা হাফিজুর রহমান, মহানগর কমিটির উপদেষ্টা মাওলানা সলিম উদ্দিন আহম্মেদ ও সহসভাপতি মুফতি আবদুল মান্নান প্রমুখ। এদিকে হরতাল চলাকালে সকাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অঘোষিত ছুটি চলেছে।
হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের নজিরবিহীন হরতাল : হাটহাজারীতে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়েছে। সকালে কয়েক হাজার তৌহিদি জনতা চট্টগ্রাম-নাজিরহাট সড়কের হাটহাজারী রেলস্টেশনে জমায়েত হয়ে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। সড়কে কোনো যানবাহন চলতে দেয়া হয়নি। দূরপাল্লার যানবাহন মালিকরা নিজেরাই গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখে। হেফাজতে ইসলামের তৌহিদি জনতার মিছিলে মিছিলে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়।
হরতালকারীরা সড়কে গাছের রদ্দা ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রাখে। এ সময় তাদের হাতে তসবিহও দেখা যায়।
বিকালে উপজেলার বিভিন্ন১ এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে তৌহিদি জনতা হাটহাজারী বাসস্টেশন চত্বরে এসে জমায়েত হয়।
সারাদেশেই পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের বিক্ষিপ্ত হামলা, সংঘর্ষ, রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের মাধ্যমে হরতাল পালিত হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী হেফাজতে ইসলামের ডাকা এই হরতালে তেমন কোনো ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। জায়নামাজ বিছিয়ে হাতে তসবিহ আর মুখে আল্লাহর জিকিরের সঙ্গে সড়ক অবরোধ করে রাখে আলেম ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। অনেক জায়গায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা গায়ে জাতীয় পতাকা আর হাতে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে হরতালের সমর্থনে মিছিল করেন। তবে শান্তিপূর্ণ এই অবস্থান সত্ত্বেও ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা, গাজীপুর, হবিগঞ্জসহ বেশকিছু জায়গায় হেফাজতে ইসলামের মিছিল-সমাবেশে পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা বেপরোয়া হামলা ও গুলি চালায়। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে একজন নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী এবং পুলিশের হামলায় হেফাজতে ইসলামের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীরা কাটা রাইফেল, শটগান, দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায় হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর। কয়েকটি স্থানে গুলি চালিয়েছে পুলিশও। পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের হামলায় সারাদেশে দেড় শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে। ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় হেফাজতে ইসলাম নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে পুলিশ এবং সাংবাদিকসহ ৫০ জন আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয় ৮ জন। চট্টগ্রামের পটিয়ায় মসজিদ ও এতিমখানায় হামলা ও ভাংচুর চালায় ছাত্রলীগ। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। কুষ্টিয়ায় হেফাজতের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। সেখান থেকে সংগঠনের জেলা আহ্বায়ককে গ্রেফতার করা হয়। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে গেলে সেখান থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
রাজধানীতে হরতালের সমর্থনে বেশ সক্রিয় ছিল হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। দফায় দফায় পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে নগরীর পল্টন, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল ও সমাবেশ করে সংগঠনটি। লালবাগ মাদরাসা দিনভর অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। তবে মোহাম্মদপুরের বসিলা-কেরানীগঞ্জ সড়কে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ছাড়াও দলমত নির্বিশেষে ধর্মপ্রাণ মানুষের কড়া পিকেটিং ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে পিকেটিংয়ে বাধা দিলেও জনতার প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা নীরবতা পালন করে। তবে পুরানা পল্টনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর-পূর্ব পাশে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয় মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদী হাসান। এ সময় সেখানকার পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া রাজধানীর বংশাল, নয়াবাজার, গোড়ান, আজিমপুর তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, রমনা, পল্টন, রামপুরাসহ অন্তত ২০টি স্পটে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং করে।
হরতালে সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আখাউড়ায় ৪ ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করে রাখে হেফাজের নেতাকর্মীরা। অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় জায়নামাজ বিছিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। ভাংচুর কিংবা জ্বালাও পোড়াওয়ের মতো কোনো পিকেটিং না হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে হরতাল। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। নগরীতে কিছু লোকাল বাস, সিএনজি ও রিকশা চলাচল করলেও লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। বড় বড় মার্কেট, দোকান, বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সব ছিল বন্ধ।
লংমার্চে বাধা দেয়ার প্রতিবাদ এবং রাসুলের (সা.) অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যুদণ্ডের আইন পাসসহ ১৩ দফা দাবিতে গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে হরতালের এ কর্মসূচি ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইসঙ্গে মাসব্যাপী বিভিন্ন বিভাগ ও বড় শহরে শানে রিসালাত কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঈমানি দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান নেতারা।
এদিকে গতকাল বিকালে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনকারীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানান হেফাজতে ইসলামের নেতারা।
১৩ দফা দাবি আদায়ে ঘোষিত মাসব্যাপী শানে রিসালাত কর্মসূচির পাশাপাশি আগামী শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভ ও দোয়া দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা।
চট্টগ্রামে হেফাজতের স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল : বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সশস্ত্র হামলা সংঘর্ষ, আহত শতাধিক : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী এবং পুলিশের হামলায় হেফাজতে ইসলামের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা কাটা রাইফেল, শটগান, দেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচার গুলি চালায় হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর। কয়েকটি স্থানে গুলি চালিয়েছে পুলিশও। নগরীর ওয়াসা মোড়ে যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে ও কাউন্সিলর এএফএম কবির মানিকের নির্দেশে সশস্ত্র হামলায় আহত হয়েছেন ৩১ জন। এর মধ্যে ২০ জনই গুলিবিদ্ধ। এখানে ছাত্রলীগ ও হেফাজত কর্মীদের মধ্যে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ সময় এ এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। আনোয়ারা উপজেলার পারকি বাজারে পুলিশ- ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী। এখানে সংঘর্ষের সময় ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ফটিকছড়ির জাহানপুরে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে হেফাজতে ইসলামের মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালালে ৩ হেফাজত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। একই উপজেলার রাঙামাটিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় ৮ হেফাজত কর্মী আহত হয়েছে। রাউজান সদরের মুন্সিরঘাটা ও দাইয়ারপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী এবং গহিরা এলাকায় ২০ জনসহ মোট ৩০ জন। তবে রাউজানে আরও বেশি সংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি হেফাজতের। এখানে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, হরতালের সমর্থনে ভোর থেকেই নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং শুরু করেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। নগরীর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, কালামিয়া বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, ওয়াসা মোড়, অলঙ্কার মোড়, ইপিজেড মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। এর ফলে গোটা নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রিকশা ও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বেবিট্যাক্সি-টেম্পো ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন রাস্তায় বের হয়নি। হেফাজত কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবেই এসব এলাকায় পিকেটিং করেন। হেফাজতে ইসলামের হরতালে গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম। অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। অধিকাংশ দোকানপাট, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট বন্ধ ছিল। ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন হয়নি। হেফাজত কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ছিল হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়।
হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর লালখান বাজার এলাকায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কর্মকর্তাসহ উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
হরতাল শুরুর পর নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে সড়কের এক পাশে হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। সড়কের অপর পাশে অবস্থান নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এফআই কবির মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে উভয়পক্ষে সংঘর্ষ ঘটে। তা থেমে থেমে চলতে থাকে দিনভর।
হরতালের শুরুতে ফজরের নামাজের পর পর হেফাজতে ইসলামের কয়েকশ’ নেতাকর্মী নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইসলামী চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর সেখানে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি তারা জিকির-আজকার করে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শুরু করেন। সকাল ৯টার পরে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহারসহ অন্যরা বক্তব্য রাখছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর হঠাত্ করে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ের দিক থেকে কয়েকশ’ সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র, দা, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে আসতে থাকে। হেফাজত কর্মীরা তাদের বাধা দিতে এগিয়ে এলে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমাবেশের দিকে যেতে থাকে।
এ সময় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রাথমিক অবস্থায় পিছু হটে পরবর্তীকালে পাল্টা ধাওয়া দেন ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের। এতে তারা পিছু হটে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে অবস্থান নেয়। প্রথমে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও পরে তারা কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দু’পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া অনেক নেতাকর্মী হরতালবিরোধী মিছিল থেকে ছোড়া বোমার স্পিল্গন্টার, পাথরের আঘাত এবং রামদার কোপে গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাকিদের নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে যুবলীগ ক্যাডার ও এক সময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী দিদারুল আলম মাসুম তার সহযোগীদের নিয়ে নিরস্ত্র হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। এ সময় মাসুমের হাতে দেখা যায় পুলিশ ব্যবহার করে এমন একটি শটগান। সে এই অস্ত্রটি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি চালাতে থাকে। তার সহযোগী আরও বেশ কয়েক সন্ত্রাসীর হাতে এ সময় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। পুলিশ মাসুমকে একবারও আটক করার চেষ্টা করেনি। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, পুলিশের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট ব্যবহার করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালায়। দিদারুল আলম মাসুমের ব্যবহার করা শটগানটি পুলিশের কি-না জানতে চাইলে এডিসি (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমদ পাল্টা জানতে চান সাংবাদিকরা অস্ত্রটির ছবি তুলেছে কি-না। কয়েকজন সাংবাদিক ওই অস্ত্রের ছবি পেয়েছেন বলে জানালে এডিসি মোস্তাক বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। গুলিবর্ষণের সময় নিজেদের গুলিতেই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী আহত হয়। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুদ্দিন রুহী অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র , হেলমেট ও জ্যাকেট নিয়ে তাদের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়।
এদিকে পিছু হটার পর হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ পর আবারও কয়েক দফা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার চেষ্টা করে। হেফাজতে ইসলামের শক্ত প্রতিরোধ এবং পুলিশের অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে দুপুর ১২টার দিকে বাগমনিরাম স্কুলের গলি থেকে হঠাত্ করে ৪-৫ যুবক বের হয়ে এসে হেফাজতের সমাবেশে বেশ কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে স্পিল্গন্টারের আঘাতে হেফাজতের তিন কর্মী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া সারাদিন বেশ কয়েকবার ইসলামী চত্বর (ওয়াসা মোড়ের) হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চোরাগোপ্তা হামলার চেষ্টা করে হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের ক্যাডাররা। তবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সাধারণ জনগণ যোগ দিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তা সম্ভব হয়নি।
হেফাজতে ইসলাম নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী জানান, ওয়াসার মোড়ে তাদের ৩১ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন গুলিবিদ্ধ। এদের অধিকাংশই লালখান বাজার মাদরাসার ছাত্র। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ সাদেক, কামরুল ও ওমর ফারুকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজনই লালখান বাজার মাদরাসার শিক্ষার্থী। রুহী জানান, গতকাল পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় তাদের শতাধিক কর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অনেকেই সেখানে নিখাঁজ রয়েছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বাধায় রাউজান যাওয়া সম্ভব কর্মীদের মধ্যে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ সময় এ এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। আনোয়ারা উপজেলার পারকি বাজারে পুলিশ- ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী। এখানে সংঘর্ষের সময় ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ফটিকছড়ির জাহানপুরে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে হেফাজতে ইসলামের মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালালে ৩ হেফাজত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়। একই উপজেলার রাঙামাটিয়া এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় ৮ হেফাজত কর্মী আহত হয়েছে। রাউজান সদরের মুন্সিরঘাটা ও দাইয়ারপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হয়েছে ১০ হেফাজত কর্মী এবং গহিরা এলাকায় ২০ জনসহ মোট ৩০ জন। তবে রাউজানে আরও বেশি সংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি হেফাজতের। এখানে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, হরতালের সমর্থনে ভোর থেকেই নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং শুরু করেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। নগরীর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, কালামিয়া বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, ওয়াসা মোড়, অলঙ্কার মোড়, ইপিজেড মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। এর ফলে গোটা নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রিকশা ও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বেবিট্যাক্সি-টেম্পো ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন রাস্তায় বের হয়নি। হেফাজত কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবেই এসব এলাকায় পিকেটিং করেন। হেফাজতে ইসলামের হরতালে গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম। অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। অধিকাংশ দোকানপাট, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট বন্ধ ছিল। ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন হয়নি। হেফাজত কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ছিল হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হয়।
হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর লালখান বাজার এলাকায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কর্মকর্তাসহ উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
হরতাল শুরুর পর নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে সড়কের এক পাশে হেফাজত কর্মীরা অবস্থান নেন। সড়কের অপর পাশে অবস্থান নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এফআই কবির মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে উভয়পক্ষে সংঘর্ষ ঘটে। তা থেমে থেমে চলতে থাকে দিনভর।
হরতালের শুরুতে ফজরের নামাজের পর পর হেফাজতে ইসলামের কয়েকশ’ নেতাকর্মী নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইসলামী চত্বরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর সেখানে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি তারা জিকির-আজকার করে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শুরু করেন। সকাল ৯টার পরে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহারসহ অন্যরা বক্তব্য রাখছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর হঠাত্ করে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ের দিক থেকে কয়েকশ’ সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র, দা, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে আসতে থাকে। হেফাজত কর্মীরা তাদের বাধা দিতে এগিয়ে এলে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমাবেশের দিকে যেতে থাকে।
এ সময় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রাথমিক অবস্থায় পিছু হটে পরবর্তীকালে পাল্টা ধাওয়া দেন ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের। এতে তারা পিছু হটে লালখান বাজার ইস্পাহানী মোড়ে অবস্থান নেয়। প্রথমে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও পরে তারা কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দু’পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া অনেক নেতাকর্মী হরতালবিরোধী মিছিল থেকে ছোড়া বোমার স্পিল্গন্টার, পাথরের আঘাত এবং রামদার কোপে গুরুতর আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাকিদের নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে যুবলীগ ক্যাডার ও এক সময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী দিদারুল আলম মাসুম তার সহযোগীদের নিয়ে নিরস্ত্র হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। এ সময় মাসুমের হাতে দেখা যায় পুলিশ ব্যবহার করে এমন একটি শটগান। সে এই অস্ত্রটি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি চালাতে থাকে। তার সহযোগী আরও বেশ কয়েক সন্ত্রাসীর হাতে এ সময় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। পুলিশ মাসুমকে একবারও আটক করার চেষ্টা করেনি। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, পুলিশের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট ব্যবহার করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালায়। দিদারুল আলম মাসুমের ব্যবহার করা শটগানটি পুলিশের কি-না জানতে চাইলে এডিসি (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমদ পাল্টা জানতে চান সাংবাদিকরা অস্ত্রটির ছবি তুলেছে কি-না। কয়েকজন সাংবাদিক ওই অস্ত্রের ছবি পেয়েছেন বলে জানালে এডিসি মোস্তাক বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। গুলিবর্ষণের সময় নিজেদের গুলিতেই এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী আহত হয়। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুদ্দিন রুহী অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মানিক ও যুবলীগ ক্যাডার দিদারুল আলম মাসুমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পুলিশের হাত থেকে অস্ত্র , হেলমেট ও জ্যাকেট নিয়ে তাদের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়।
এদিকে পিছু হটার পর হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ পর আবারও কয়েক দফা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার চেষ্টা করে। হেফাজতে ইসলামের শক্ত প্রতিরোধ এবং পুলিশের অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে দুপুর ১২টার দিকে বাগমনিরাম স্কুলের গলি থেকে হঠাত্ করে ৪-৫ যুবক বের হয়ে এসে হেফাজতের সমাবেশে বেশ কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে স্পিল্গন্টারের আঘাতে হেফাজতের তিন কর্মী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া সারাদিন বেশ কয়েকবার ইসলামী চত্বর (ওয়াসা মোড়ের) হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চোরাগোপ্তা হামলার চেষ্টা করে হরতালবিরোধী আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের ক্যাডাররা। তবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সাধারণ জনগণ যোগ দিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তা সম্ভব হয়নি।
হেফাজতে ইসলাম নেতা মাঈনুদ্দিন রুহী জানান, ওয়াসার মোড়ে তাদের ৩১ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন গুলিবিদ্ধ। এদের অধিকাংশই লালখান বাজার মাদরাসার ছাত্র। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ সাদেক, কামরুল ও ওমর ফারুকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনজনই লালখান বাজার মাদরাসার শিক্ষার্থী। রুহী জানান, গতকাল পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় তাদের শতাধিক কর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অনেকেই সেখানে নিখাঁজ রয়েছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বাধায় রাউজান যাওয়া সম্ভব বিএনপির ডাকা হরতালের সময় কিছু যানবাহন চলাচল করলেও গতকাল হেফাজতের ডাকা হরতালে রিকশা, হোন্ডা এমনকি বাইসাইকেল পর্যন্ত চলেনি। হেফাজতের জিরি মাদরাসা শাখা ফজরের নামাজের পর থেকেই আরাকান সড়কের ভেল্লাপাড়া ও শান্তিরহাটজুড়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। অপরদিকে পটিয়া জামেয়া মাদরাসার কর্মী ও মুসল্লিরা সারাদিন আরাকান সড়কে মিছিল করেছে। তারা রাস্তার ওপর জোহরের নামাজ আদায় করে। বিকালে পটিয়া ডাকবাংলো মোড়ে আল জামেয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। মাদরাসার মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মুফতি মোজাফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে অন্য নেতারা বক্তব্য রাখেন।
রাজপথে সহিংস ছাত্রলীগ : হেফাজতের হরতাল প্রতিরোধে গতকাল রাজপথে সহিংস হয়ে উঠেছিল শাহবাগী হরতালের পিকেটার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। রাজধানীতে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র মহড়ায় ছিল তারা। চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ এবং ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। পরে পুলিশ এসেও গুলি চালায় তৌহিদি জনতার ওপর। এতে কমপক্ষে ৩০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হন।
গত শুক্র ও শনিবার শাহবাগীদের অবরোধ এবং ঘাদানিকের হরতালে সারাদেশে যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ পিকেটারের ভূমিকায় ছিল, গতকাল তারা হরতাল প্রতিরোধে হাতে অস্ত্র নিয়ে নামে।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে জড়ো হয়ে হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। ঢাকা কলেজ, তীতুমির কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা বিক্ষোভ করে। হাতে লাঠি নিয়ে হরতালবিরোধী নানা স্লোগান দেয় তারা। পুরনো ঢাকায় ঘাট শ্রমিক লীগ লাঠি মিছিল বের করে। সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, কৃষক লীগ, মুজিব সেনা ঐক্য লীগ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ আরও কয়েকটি সংগঠন হরতালের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। এতে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হাজী মো. সেলিম, ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক বলরাম পোদ্দারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তৃতা করেন।
রাজধানীর হরতাল চিত্র : পল্টনে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশি বাধা : হরতালের সমর্থনে সকাল থেকেই রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও পাশের পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অফিসের সামনে জড়ো হয় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে ওই এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেয় ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ। সকাল সাড়ে ৮টার সময় হেফাজতের ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমীর নেতৃত্বে সুরমা টাওয়ারের সামনে থেকে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তরগেট ও পল্টন মোড় হয়ে আবার সুরমা টাওয়ারের কাছে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। সেখানে নেতাকর্মীরা বেশ কিছুক্ষণ রাস্তা অবরোধ করে স্লোগান দেয়।
সমাবেশে আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা ভাংচুরের মতো অন্যায় করতে পারি না। তবে শরীয়তের বিধান হলো—অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। এ হরতাল হবে শান্তিপূর্ণ ও অনুকরণীয় আদর্শ। ১৩ দফা দাবি না পূরণ হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন সংগঠনের ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, হুমায়ুন কবির, মাওলানা নোমান মাজহারী, অধ্যাপক আবদুল করিম, আবু সাঈদ নোমান, অলিউল্লাহ আরমান, তোফায়েল গাজালী প্রমুখ। এদিকে সমাবেশের একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে এবং রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় নেতাকর্মীরা গলির মুখে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। তবে ওই সমাবেশস্থলে বাইরে থেকে নেতাকর্মীদের প্রবেশে বাধা দেয় পুলিশ। কিছুক্ষণ বক্তব্য চলার পর সেখানেও চড়াও হয় পুলিশ। সকাল পৌনে ১০টার দিকে মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পথসভায় বাধা দেয়। একপর্যায়ে হামলার হুমকি দিয়ে হেফাজত কর্মীদের সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়। এরইমধ্যে সেখানে পানিকামান নিয়ে হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল পুলিশ। এ ঘটনায় হেফাজত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে নেতাকর্মীরা খেলাফত মজলিসে ও গেটে অবস্থান নেয়। মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ শাহবাগিদের তুলে দিতে না পারলেও ক্ষমতার জোরে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে বেলা আড়াইটার দিকে খেলাফত মজলিসের অফিস থেকে হরতালের সমর্থনে আরেকটি মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাতেও বাধা দেয়। বাধা উপেক্ষা করে মিছিল শুরু করলে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ সামনে ও পেছনে অবস্থান নেয়। মিছিলটি নোয়াখালী টাওয়ার-হাউজবিল্ডিং মোড় দিয়ে বায়তুল মোকাররমে উত্তর গেট হয়ে আবার খেলাফত মজলিস অফিসের সামনে এসে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে হেফাজতে ইসলামের মহানগর নেতারা বক্তব্য রাখেন।
লালবাগে মিছিলে পুলিশি বাধা : বাদ ফজর থেকেই হরতালের সমর্থনে স্লোগান-মিছিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকা। জামেয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া মাদরাসা ও লালবাগ শাহী মসজিদের সিঁড়িতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। পরে দু’শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তৃতা করেন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর নায়েবে আমির মুফতি মো. তৈয়্যব, আইন সেলের প্রধান মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ। তারা বলেন, গাড়ি ভাংচুর ও হামলার সঙ্গে হেফাজতের কোনো সম্পর্ক নেই। আওয়ামী লীগই এটা করেছে। আগামী ৫ মে’র মধ্যে ১৩ দফা দাবি পূরণ না হলে বর্তমান নাস্তিক-মুরতাদ সরকারের পতন হবে। তবে রাস্তায় পিকেটিং করতে না পারলেও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রিকশা ও দু’একটা সিএনজি ছাড়া কোনো যানবাহন চলেনি।
কামরাঙ্গীরচর : সকাল ৬টা থেকে বুড়িগঙ্গা ঘেঁষা কামরাঙ্গীরচর মেইন রোডে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করে হরতাল সমর্থকরা। পরে পুলিশ বাধা দিলে কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নুরীয়া ইসলামিয়া মাদরাসার ভেতরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে খেলাফত আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। সেখানে বসে ৫০-৬০ জন হরতাল সমর্থককে আমার দেশ পত্রিকা পড়তে দেখা গেছে। সাড়ে ১০টার দিকে দু’শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে রাস্তায় বেরুনোর চেষ্টা করলে পুলিশি বাধা পেয়ে মাদরাসার সামনেই সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে তারা। বক্তব্য রাখেন খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা আহমদুল্লাহ আশরাফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান হামিদী প্রমুখ। আশরাফ বলেন, নাস্তিক-মুরতাদদের পৃষ্ঠপোষক এই সরকার ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। নাস্তিকরা দিনের পর পুলিশ প্রহরায় মিছিল-সমাবেশ করলেও নবী প্রেমিকদের বাধা দেয়া হচ্ছে। ইসলাম নিয়ে কটূক্তির জন্য ইনু-মেননদের জিহ্বা টেনে ছিড়তে হবে যোগ করেন তিনি।
মোহাম্মদপুর : ভোর ৬টা থেকে লালমাটিয়া, টাউনহল, ধানমন্ডি, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে প্রায় সহস্রাধিক হেফাজতকর্মী মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড চৌরাস্তায় অবস্থান নিয়ে হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ করেন। এ সময় সরকার বিরোধী মিছিল-স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা। ৭-৮ প্লাটুন পুলিশ-র্যাব তাদের চতুর্দিক ঘিরে রাখে। হেফাজতের মোহাম্মাদপুর জোনের আহ্বায়ক মাওলানা জালাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন, হেফাজতের যুগ্ম আহ্বায়ক মুফতি মাহফুজুল হক, মাওলানা আতাউল্লাহ, মাওলানা ফয়সাল প্রমুখ। এ সময় বাসস্ট্যান্ড থেকে কোনো গাড়ি চলাচল করেনি। দুপুর পর থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
এমন হরতালচিত্র দেখেনি কেরানীগঞ্জবাসী : ভোর ৬টার পর থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেরানীগঞ্জ সড়কে জমায়েত হয় হরতাল সমর্থকরা। মোহাম্মাদপুর বসিলা ব্রিজ এলাকা থেকে কেরানীগঞ্জ সড়কের প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ও ইট ফেলে অবরোধ করে তারা। এলাকাবাসী জানায়, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত কর্মীরা সবাই এ পিকেটিং-এ অংশ নেয়। শক্ত পিকেটিংয়ের কারণে ওই এলাকায় বাস-ট্রাক তো দূরের কথা কোনো রিকশা-সিএনজিও চলেনি। মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল চালকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয় পিকেটাররা। কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের মদ্দেরচর এলাকায় পিকেটিং হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সকাল ৮টার দিকে আর্টিবাজার শহীদনগর এলাকা থেকে দুই হরতাল সমর্থককে আটক করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। তারপর থেকে পুলিশ-র্যাবকে আর প্রবেশ করতে দেখা যায়নি ওই এলাকায়। বিকাল ৩টায় দিকে শাক্তা ইউনিয়নে বিশাল মিছিল বের হয়। কেরানীগঞ্জবাসী আবদুল মালেক বলেন, এমন হরতালচিত্র এরআগে দেখেনি কেরানীগঞ্জবাসী। এরআগে বিএনপি-আ.লীগ কিংবা জামায়াত হরতাল ডাকলেও সেসব হরতালে বাস-ট্রাক ও বিভিন্ন গাড়ি চলেছে অন্যদিনের মতোই। কিন্তু গতকালের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। ২-৩ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে ছিল শুধুই গাছের গুঁড়ি আর ইটের পর ইট। হরতালের বিরোধিতা করা তো দূরের কথা রাস্তা অবরোধ ও যানচলাচলে বিঘ্ন নিয়ে কাউকে কোনো প্রতিবাদও করতে দেখা যায়নি ওই এলাকায়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিকেটিংয়ে অংশ নেয় এলাকাবাসী। তারা বলেন, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, ইসলামের পক্ষের শক্তির হরতাল। তাই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিকেটিংয়ে অংশ নিয়েছে।
ফার্মগেট কারওয়ানবাজার ধানমন্ডি : হরতালে রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার ও ধানমন্ডির চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এসব এলাকায় হরতালের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিং করতে দেখা না গেলেও গাড়িঘোড়া চলেছে অন্যদিনের হরতালের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশ-র্যাবের কড়া উপস্থিতি।
যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ : হেফাজতে ইসলামের ডাকা গতকালের হরতালে যাত্রবাড়ী এলাকায় কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। কুতুবখালীর ফ্লাইওভারের কাছে সকাল সাড়ে ৬টায় শতাধিক হেফাজতে ইসলামেরকর্মী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা একটি পথসভা করে। পথসভায় তারা অবিলম্বে নাস্তিকদের ফাঁসি দাবি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যায়। পরে পুলিশ হরতালকারীদের আটক করতে সেখানের বিভিন্ন বাড়িতে ও দোকানে অভিযান চালায়। এতে পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হরতালে যাত্রবাড়ী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল। পথচারীদের রিকশা ও ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে যেতে দেখা গেছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। যাত্রাবাড়ী এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ।
কাঁচপুরে রাস্তা অবরোধ আটক ২ : নারায়ণগঞ্জ কাঁচপুরের নয়াবাড়ির ইউনাইটেড ফিলিং স্টেশনের সামনের রাস্তা সোয়া ৭টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা শাহবাগি নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা একটি বাসের কাচ ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বললে উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। তখন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। সেখান থেকে পুলিশ দুজনকে আটক করে। তখন হেফাজতের নেতাকর্মীরা আটক দুই নেতাকর্মীকে পুলিশের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে থানায় একটি মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মিরপুরে হেফাজতের অবস্থান গুলশান-মহাখালীতে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল : হরতালে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা মিরপুরে রাস্তা অবরোধ ও সমাবেশ করেছে। কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই গাবতলী, আগারগাঁও, গুলশান ও মহাখালীতে হরতাল পালিত হয়। গুলশানে হরতালের সমর্থনে দুটি মিছিল বের হয়। কাজীপাড়ায় একটি মিছিল বের হলেও তারা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তবে মিরপুর ১ নম্বরে রাস্তায় বসেই সমাবেশ করেন তারা। সরকার সমর্থক মালিকদের কিছু পাবলিক বাস রাস্তায় বের হলেও কোনো প্রাইভেট গাড়ি বের হয়নি। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ ছাড়া হেফাজতের কর্মীরা কোনো ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে যায়নি।
মুগদা-কদমতলী : মুগদার গোলাপবাগ মোড়ে সকাল সোয়া ৭টায় হরতালের সমর্থনে হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যায়। কদমতলীর সাদ্দাম মার্কেটের সামনে সকাল পৌনে ৭টায় হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ময়মনসিংহে হেফাজতে ইসলাম-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ, পুলিশ সাংবাদিকসহ আহত ৫০ বিএনপি অফিসে আগুন, বিজিবি মোতায়েন : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহ শহরের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় হেফাজতে ইসলাম ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ-সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। এদিকে হরতাল বিরোধীরা নতুনবাজার এলাকায় বিএনপি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় কমপক্ষে ৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়। শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকালে শহরের চরপাড়া এলাকা থেকে হরতালের সমর্থনে হেফাজতে ইসলামের একটি মিছিল গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় এসে আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিলের মুখোমুখি হলে সংঘর্ষ বেধে যায়। হেফাজত কর্মীদের ইট-পাটকেলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিছু হটে শিববাড়ি দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয়। হেফাজত কর্মীরা কমপক্ষে ২০ মিনিট আওয়ামী লীগ অফিস লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং দোকানপাট ভাংচুর করে। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইট-পাটকেলের আঘাতে ইত্তেফাকুল ওলামার নেতা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা মফিজুল ইসলাম, মুফতি আবদুল খালেক, মাওলানা আবদুল হান্নান, মাওলানা জানেআলম, মাওলানা জুবায়ের, মাওলানা আবু ইউসুফ, মাওলানা সাইফুল্লাহ, মাওলানা শফিউল্লাহ, মাওলানা ফরিদ, মাওলানা আতাউর রহমান, মাওলানা আবদুল্লাহ, মাওলানা নাজমুল আলম, মাওলানা আবু সালমান, রফিকুল ইসলাম, সেলিম আহমেদ, কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আবু মোহাম্মদ ফজলুল করিম, ওসি তদন্ত মাজেদুল ইসলাম, গাজী টিভির কাজী মুন্না, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের হোসাইন শাহিদ, একাত্তর টিভির ক্যামেরাপারসন নুরুজ্জামানসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে হরতাল বিরোধীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নতুনবাজার এলাকায় বিএনপি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। শহরের ওল্ড পুলিশ ক্লাব রোডের একটি রেস্তোরাঁয়ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে আগুন নেভায়। শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ইত্তেফাকুল ওলামার নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেন। ইত্তেফাকুল ওলামা নেতা মাওলানা মুহিবুল্লাহ জানান, বিনা উসকানিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করে। পুলিশের গুলিতে ৮ জন আহত হয়েছে।
এদিকে বিকালে ১৪ দলের নেতারা সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেন, হেফাজতের নামে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা আওয়ামী লীগের অফিসে হামলার চেষ্টা করে। ইট-পাটকেলের আঘাতে আমাদের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়। এ সময় পুলিশের ভূমিকা সন্দেহজনক ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ময়মনসিংহে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আহমদ আল মামুন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিভাগীয় শহরগুলোতে হরতাল : নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে গতকাল সারা দেশের মতো বিভাগীয় শহরগুলোতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, যতদিন ইসলামবিরোধী সরকারের পতন না হবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিলেট রাজপথ ছিল হরতাল সমর্থকদের দখলে : বাদ ফজর থেকেই নগরীর রাজপথ দখলে রাখে হরতাল সমর্থকরা।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগরীর কেন্দ্রস্থল কোর্ট পয়েন্ট দখলে রাখে হেফাজত কর্মীরা। সেখানে ইসলামী ছাত্র মজলিস ও জমিয়ত কর্মীরা অবস্থান নেয়। কর্মীরা রাস্তায় বসে হরতালের সমর্থনে নানামুখী স্লোগানের সঙ্গে নাস্তিক-মুরতাদদের ফাঁসির দাবি জানায়। সকাল ৭টায় মাদানী কাফেলার মাওলানা রুহুল আমীন নগরীর নেতৃত্বে মেজরটিলা-টিলাগড় এলাকায় মিছিল বের হয়। সাড়ে ৯টায় হেফাজতে ইসলাম ৫নং টুলটিকর ইউনিয়নের একটি মিছিল ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোড অতিক্রম করে। দুপুর সাড়ে ১২টায় আম্বরখানা থেকে একটি মিছিল বের করে ইসলামী ছাত্র মজলিস। এছাড়া হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ছাত্র জমিয়তসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনভর নগরীতে মিছিল বের করা হয়। সিলেট নগরীতে রিকশা তো দূরের কথা, ঠেলাগাড়িও চলেনি। সিলেট থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবরোধের কারণে ট্রেন চলাচলও বিঘ্নিত হয়। নগরীতে র্যাব-পুলিশের সতর্ক টহল অব্যাহত ছিল। নগরীর রাজপথে লেখা হয়, ‘নাস্তিক-মুরতাদদের ফাঁসি চাই’ স্লোগান।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম : জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। ১৩ দফা বাস্তবায়ন না করে জমিয়ত কর্মীরা ঘরে ফিরবে না। সিলেট জেলা ও মহানগর জমিয়তের মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী এ কথা বলেন। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বন্দরবাজার পত্রিকা পয়েন্টে মহানগর জমিয়তের সভাপতি হাফিজ মাওলানা মনছুরুল হাসান রায়পুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শায়খ আতাউর রহমান কোম্পানীগঞ্জী, মহানগর জমিয়ত নেতা প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আলী নূর, মাওলানা শফীউল আলম, মাওলানা আসরার আহমদ প্রমুখ।
খেলাফত মজলিস : খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী নেতারা বলেছেন, ইসলামের বিরুদ্ধে কটাক্ষকারী নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের শাস্তির দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। হরতাল চলাকালে খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী শাখার উদ্যোগে নগরীর কোর্টপয়েন্টে আয়োজিত মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে নেতারা এ কথা বলেন। খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগরী সহসভাপতি শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন মহানগরী সহসভাপতি আবদুল হান্নান তাফাদার, সহ-সেক্রেটারি মাওলানা রওনক আহমদ, মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান, কে এম আবদুল্লাহ আল-মামুন, জেলা প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা আবদুল্লাহ আল-হাদী, প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা ইমদাদুল হক নোমানী, সহ-বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা মুহি উদ্দীন, মহানগর প্রচার সম্পাদক মাওলানা জুনায়েদ আহমদ প্রমুখ।
বাংলদেশ খেলাফত মজলিস : হেফাজতে ইসলামের ডাকা গতকাল সোমবারের হরতাল সমর্থনে বাংলদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট নগরীতে বেশ কয়েকটি মিছিল ও পথসভা করেছে। সকাল ১১টায় মহানগর শাখার উদ্যোগে এক বিশাল মিছিল সিলেট সিটি পয়েন্ট থেকে শুরু করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে আম্বরখানা পয়েন্টে এক পথসভায় মিলিত হয়। মহানগর সভাপতি আলহাজ মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিরাজীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা সহসভাপতি হাফিজ মাওলানা সৈয়দ শামীম আহমদ, মহানগর সহসভাপতি মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ, মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা এমরান আলম, জেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।
আমার দেশ বন্ধ হলে অসহযোগ আন্দোলন : হরতালে জনজীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে সকাল ৭টায়। মহানগরীতে হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সভাপতি মাওলানা আবদুস সামাদের নেতৃত্বে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তারা সরকারকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নাস্তিক্যবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ঈমানি দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সত্য প্রকাশের কারণে যদি দৈনিক আমার দেশ বন্ধ কিংবা সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে কোনো ধরনের হয়রানি করা হয়, তাহলে সরকার পতনে এক দফার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে। যতদিন ইসলামবিরোধী এ সরকারের পতন না হবে, ততদিন আন্দোলন চলবে। ফলে সরকারের উচিত অবিলম্বে ১৩ দফা মেনে নিয়ে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৭টায় মহানগরীর মালোপাড়া দারুল উলুম হাফেজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা থেকে হেফাজতে ইসলাম একটি বিশাল বিক্ষোভ বের করে। মিছিলটি মালেপাড়া থেকে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ কামারুজ্জামান চত্বরে সমাবেশ করে। এ সময় বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সভাপতি মাওলানা আবদুস সামাদ, হেফাজতে ইসলাম রাজশাহী বিভাগের সদস্য সচিব মাওলানা হাফিজুর রহমান, মহানগর কমিটির উপদেষ্টা মাওলানা সলিম উদ্দিন আহম্মেদ ও সহসভাপতি মুফতি আবদুল মান্নান প্রমুখ। এদিকে হরতাল চলাকালে সকাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অঘোষিত ছুটি চলেছে।
হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের নজিরবিহীন হরতাল : হাটহাজারীতে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়েছে। সকালে কয়েক হাজার তৌহিদি জনতা চট্টগ্রাম-নাজিরহাট সড়কের হাটহাজারী রেলস্টেশনে জমায়েত হয়ে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। সড়কে কোনো যানবাহন চলতে দেয়া হয়নি। দূরপাল্লার যানবাহন মালিকরা নিজেরাই গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখে। হেফাজতে ইসলামের তৌহিদি জনতার মিছিলে মিছিলে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়।
হরতালকারীরা সড়কে গাছের রদ্দা ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রাখে। এ সময় তাদের হাতে তসবিহও দেখা যায়।
বিকালে উপজেলার বিভিন্ন১ এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে তৌহিদি জনতা হাটহাজারী বাসস্টেশন চত্বরে এসে জমায়েত হয়।
Comments