১০৭জন নিহত : জীবনমৃত্যু এখানে কন্ঠলগ্ন এটি রক্তপলাশের দেশ

ইনকিলাব,৪/১৩
মোবায়েদুর রহমান : আজকের কলাম লেখা প্রায় শেষ করে এনেছি। এমন সময় টেলিভিশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর নজরে এলো। খবরটিকে অধিকাংশ চ্যানেলেই ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে সম্প্রচার করেছে। খবরে বলা হয়েছে যে গতকাল অর্থাৎ সোমবার বাংলাদেশ সফররত ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জীর সাথে বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখা করার কথা ছিল। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বেগম খালেদা জিয়া ভারতীয় প্রেসিডেন্টের সাথে নির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল করেছেন। যে মূহূর্তে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দারুন অশান্ত, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পথ মাড়াচ্ছে, যখন বিরোধী দল আহুত ৭২ ঘণ্টা লাগাতার হরতাল দেশকে সংঘাত সংক্ষুব্ধ করে তুলেছে, তখন ভারতীয় প্রেসিডেন্টের সাথে বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেত্রীর পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক বাতিল একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। আমরা এই ব্যাপারে তাৎক্ষণিক মন্তব্য দেয়া থেকে বিরত রইলাম। তাই বিনা মন্তব্যে সংবাদটি এখানে পরিবেশন করা হলো। এখন ভিন্ন প্রসঙ্গ।
॥ দুই ॥
মন অসম্ভব বিক্ষিপ্ত। ব্যক্তিগতভাবে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। সারা দেশের পরিস্থিতি এতোই অশান্ত, এতোই টাল মাটাল যে লেখা যেখানে শুরু করছি সেখানে থেমে থাকছে না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। কখন কোথায় কি ঘটে যাবে সেটা কেউ আগাম বলতে পারছে না। আমার এই লেখাটি ছাপা হবে মঙ্গলবার। বিএনপির ভাষায় বর্তমান সরকারের ‘গণহত্যার’ প্রতিবাদে বেগম খালেদা জিয়া আহুত সকাল সন্ধ্যা হরতাল পালিত হচ্ছে আজ। যেহেতু বিগত বরিবার এই কলামটি লিখতে হয়েছে তাই আজ মঙ্গলবার কি ঘটবে সেটি বলা বোধগম্য কারণেই সম্ভব হচ্ছে না।
শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন চ্যানেলের খবরা খবর এবং টক শো শুনে বিছানায় যাই। পর দিন সকাল ৮টার কিছু আগে বগুড়া থেকে টেলিফোন পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি। শুনলাম, বগুড়ার শাহজাহান পুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেনা বাহিনী নামানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম যে পরিস্থিতি কত ভয়াবহ ছিল যে সেটি নিয়ন্ত্রের জন্য সেনা বাহিনীকে ডাকতে হয়েছে। 
কিন্তু বগুড়ায় সেনা মোতায়ন নিয়ে কিছুক্ষণ পর আমি গোলক ধাঁধায় পড়ে গেলাম। সকাল থেকেই ১৪/১৫টি চ্যানেলের স্ক্রলে অনবরত খবর পরিবেশন করা হলো যে বগুড়ার শাহজাহানপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়ন করা হয়েছে। যারা আর প্রাণহানি দেখতে চান না তাদের উৎকণ্ঠা কিছুটা কমে গেল। কিন্তু দুপুর বেলা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বললেন যে, সারা দেশের কোথাও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। এছাড়া সেনাবাহিনী মোতায়েন করার মতো পরিস্থিতিরও উদ্ভব ঘটেনি। তিনি আরো বলেন যে, ভবিষ্যতেও সেনাবাহিনী মোতায়ন করার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই স্পষ্ট বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবে বিভ্রান্ত হই। নিজেই নিজেকে শুধাই, ‘তাহলে এতোগুলো টেলিভিশন চ্যানেলে, এতোগুলো নিউজ বুলেটিনে, বগুড়ার শাহজাহানপুরে সেনাবাহিনী মোতায়নের কথা বলা হলো কেন? তাদের খবরের উৎস কি ছিল? অবশ্য আমার এই প্রশ্নের উত্তর পেতেও খুব বেশি দেরী করতে হলো না। কারণ এর কিছুক্ষণ পরেই অনেকগুলো টিভির স্ক্রলে আরেকটি খবর প্রচারিত হলো। খবরটি হলো, ‘বগুড়ার জেলা প্রশাসকের অনুরোধে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসনকে সাহায্য করার জন্য শাহজাহানপুরে দুই প্লাটুন সেনাবাহিনী মোতায়ন করা হয়েছে- আইএসপিআর।’ আইএসপিআর হলো- ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেসন্স। অর্থাৎ আন্তঃ সার্ভিসেস জনসংযোগ বিভাগ। এটি হলো সেনা বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ। তারা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই খবরটি প্রচার করেছে। ফলে আমি আরো বেশি বিভ্রান্ত হলাম। এখন তাহলে কার কথা বিশ্বাস করবো? টেলিভিশন বলছে এক কথা, আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে কথাটি খাড়া অস্বীকার করলেন। অন্যদিকে সেনা বাহিনীর তরফ থেকে অফিসিয়ালি যে খবরটি প্রচার করা হলো সেই খবরটির ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অর্থহীন হয়ে যায়। এই পটভূমিতে বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাই করার ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দিলাম।
॥ তিন ॥
যেহেতু বগুড়ায় আমার জন্মস্থান তাই বগুড়ার খবর শুনলে আমি কান খাড়া করি এবং উৎকর্ণ হয়ে শুনি। চেষ্টা করি, একাধিক সূত্র থেকে খবর নিতে যাতে করে সঠিক এবং নির্ভেজাল খবরটি পেতে পারি। কোথাও যখন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে এবং সেই খবরটি যখন এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে তখন সেই খবরটিতে অনেক ডাল পালা গজায়। জন্মস্থান বলেই বগুড়ায় আমার বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব আছে। তাই বগুড়ার ঘটনাবলী সম্পর্কে আমার কাছে যেমন খবর আসতে লাগলো তেমনি আমিও খবর নিতে লাগলাম। যেসব খবর পাওয়া গেল তার সারমর্ম নি¤œরূপ : 
সরকার এবং আওয়ামীপন্থী প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সারা দেশের বিক্ষোভ এবং ব্যাপক হত্যাকা-কে যতই দল বিশেষের তা-ব বলে প্রচার করুক না কেন, আসল ঘটনা হলো এই যে মওলানা দেলোয়ার হোসেইন সাঈদীর জনপ্রিয়তা সমগ্র উত্তরবঙ্গের মতো বগুড়া শহরেও অসাধারণ। তার অন্ধভক্তের সংখ্যা হাজার হাজার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি নির্বিশেষে সব দলমত এবং শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে তার ভক্ত ও অনুরক্ত। তার মৃত্যুদ-কে মহলবিশেষ ছাড়া কেউ মেনে নিতে পারেননি। তার প্রতি আবেগী আনুগত্য এতোটাই প্রবল ছিল যে টেলিভিশনে তার মৃত্যুদ-ের খবর শোনার সাথে সাথেই এক ব্যক্তি হার্টফেল করে মারা যান। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মওলানা সাঈদীর এই অসাধারণ জনপ্রিয়তার ব্যাপারে সরকার এবং আওয়ামী পক্ষ ছিল একেবারেই অন্ধ। আর বামপন্থীদের তো কোনো কথাই নাই। ওরা তো কেউ মাটি দিয়ে চলা ফেরা করে না। ওরা সব সময় আকাশ দিয়ে উড়ে বেড়ায়। তাই ওরা শেকড়ের সাথে সাঈদীর সম্পর্কের কথা জানেন না। 
রবিবার বিকেল পর্যন্ত প্রচারিত খবরে প্রকাশ, শুধু রবিবারেই সারা দেশে নিহত হয়েছেন ২৭ জন মানুষ। এদের মধ্যে শুধু বগুড়াতে ১০ জন, জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ৫ জন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৪ জন, ঝিনাইদহে ১ জন, গাজীপুরে ১ জন, সাতক্ষীরায় ১ জন। সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে এই পর্যন্ত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এরা নিহত হয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব এবং বর্ডার গার্ড বা বিজিবি’র গুলিতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও যুব লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই ১০০ মানুষের মধ্যে ৮ জন পুলিশ রয়েছেন। অবশিষ্ট ৯২ জনই সাঈদী সাহেবের ভক্ত, গ্রামবাসী এবং জামায়াত শিবিরকর্মী। এটি যদি তা-ব হতো তাহলে তা-বকারীরা দলে দলে মারা যেতো না। ৯২টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরেও যারা এক ফোঁটা সমবেদনা জানান না, বরং ৬ জন পুলিশ মরে যাওয়ায় ৯৬ জনের প্রাণ বিসর্জনকে জাস্টিফাই করে তারা সুনিশ্চিতভাবে একটি মতলবি গোষ্ঠীর লোক।
বগুড়ার মর্মান্তিক হত্যাকা-কে যারা দল বিশেষের তা-ব বলেন তারা মনে হয় বগুড়ার রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ যেমন প্রচ-ভাবে আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকা তেমনি বগুড়াও প্রচ-ভাবে বিএনপি প্রভাবিত এলাকা। গোপালগঞ্জ যেমন শেখ মুজিবের জন্মস্থান, তেমনি বগুড়া হলো জেনারেল জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর তার কন্যা শেখ হাসিনা যেমন বিগত ৩৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের হাল ধরে আছেন তেমনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার পতœী বেগম খালেদা জিয়াও বিগত ৩২ বছর ধরে বিএনপির হাল ধরে আছেন। গোপালগঞ্জ যেমন বিএনপি বিরোধী ও আওয়ামী পন্থী তেমনি বগুড়া হলো আওয়ামী লীগ বিরোধী ও বিএনপি পন্থী। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আওয়ামী লীগ বিরোধী বলেই বগুড়া জামায়াতপন্থী। তারপরেও বগুড়ায় মওলানা সাঈদীকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে। এর কারণ হলো এই যে সংগঠন হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর চেয়েও মওলানা সাঈদী অনেক অনেক জনপ্রিয়। যারা টেলিভিশনে ছবি দেখেছেন তারা দেখতে পেয়েছেন যে শত শত নয়, দুই এক হাজার নয়, হাজার হাজার মানুষ লাঠি সোটা নিয়ে মিছিল করেছে। টেলিভিশনে দেখা গেছে জনতা অগুনতি। নিশ্চয়ই এই হাজার হাজার মানুষ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বা সমর্থক নয়। এরা ইসলামী চিন্তাবিদ, মুফাস্সিরে কোরআন এবং জাদুকরী ও সম্মোহনী বক্তা দেলোয়ার হোসেইন সাঈদীর ভক্ত। ঠিক এই খানেই ভুল করেছেন ট্রাইব্যুনাল প্রধান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির। তিনি বলেছেন যে, তিনি আজকের প্রখ্যাত বক্তা সাঈদীর বিচার করছেন না, তিনি বিচার করছেন ৪০ বছর আগের তরুণ দেলোয়ার হোসেইন সাঈদীর।
এই কটি কথা বলে তিনি মওলানা সাঈদীর বিচারের রায় পড়া শুরু করেন। কিন্তু এই স্থানে তিনি যে ভুলটি করেন সেটি হলো এই যে যখন তিনি ফাঁসির রায় দিতে যাচ্ছেন তখন তিনি এমন এক ব্যক্তির ফাঁসির রায় দিতে যাচ্ছেন, সারা দেশে এবং বিদেশে যে ব্যক্তির রয়েছে লাখ লাখ ভক্ত। সেই ভক্তরাই আজ গর্জে উঠেছেন। বেগম খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে সাংবাদিক সম্মেলনে সরকারকে বলেছিলেন, আর যেনো একটি গুলিও না চলে। যদি এর পরেও গুলি করা হয় তাহলে জনগণ যেনো রাজপথে নেমে আসেন।
কিন্তু সরকার কারো কথা শোনেনি। এখনো আইনরক্ষা বাহিনী পাখী শিকারের মতো নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘আর যদি একটিও গুলি চলে তাহলে তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর। তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’। শেখ মুজিব তার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আরো বলেন, ‘বাঙ্গালীরা মরতে শিখেছে। যে জাতি মরতে শিখেছে সেই জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। রক্ত যখন দিয়েছি তখন আরো রক্ত দেবো তবুও এই জাতিকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ’। 
॥ চার ॥
শেখ মুজিবের ভাষণ উদ্ধৃত করার সময় আমি কিন্তু একটি বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছি যে তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। সেটি ছিল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। (আমি স্বাধীনতার আন্দোলন বলছি না, কারণ স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে)। তার পরেও শেখ মুজিবের দুইটি উক্তি বা বাণী চিরদিন আমোঘ সত্য হয়ে রইবে। সেটি হলো- কোনো রক্তই বৃথা যায় না। আরেকটি হলো, ‘রক্ত যখন দিয়েছি তখন এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ’। 
আমি আবার বলছি, এখানে আমার কাছে জামায়াত মুখ্য ফ্যাক্টর নয়। যে শতাধিক লোক নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে জনাআষ্টেক পুলিশ, অবশিষ্ট ৯০-এর বেশি মানুষ র‌্যাব, পুলিশ বা বিজিবি’র গুলিতে নিহত হয়েছেন। মাত্র তিনদিনে ১০৭ জন মানুষের নিহত হওয়ার খবর অতীতে কোনোদিন শোনা যায়নি। জীবনমৃত্যু যেখানে কন্ঠলগ্ন সেটি নাকি রক্তপলাশের দেশ। বলেছেন কিউবার এক বিপ্লবী নেতা।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়