রাজনৈতিক মতলবে দাঙ্গা উসকে দেয়া হচ্ছে : হিন্দুবাড়ি পাহারা দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত



মাহমুদা ডলি ও রমিজ খান, লাকসাম থেকে ফিরে
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার একটি গ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বী দাসবাড়িতে অগ্নিসংযোগের নেপথ্যে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। তারা জানায়, দাস পরিবারটি মূলত বিএনপি সমর্থক। তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারার জন্য আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারীরা আগুন লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলার খবর প্রচার করেছে। দাস পরিবার বিষয়টি জানে বলেই ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে রাজি হয়নি তারা। অগত্যা পুলিশই বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
গত ৮ মার্চ লাকসামের উত্তরদা গ্রামের কুয়েত প্রবাসী রতন চন্দ্র দাসের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ওই পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে। দাস পরিবার জানিয়েছে, বাড়িতে নাশকতার ঘটনায় প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট, ১১ মণ ধান পুড়ে যাওয়াসহ ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিনযাপন করছে তারা।
দাস পরিবার জানিয়েছে, স্থানীয় জামায়াতকর্মীদের সঙ্গে তাদের সারাজীবনই সুসম্পর্ক রয়েছে। লাকসামের পুলিশও জানিয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ঘটনাটি জামায়াত-শিবির করেছে। বোঝা যাচ্ছে কেউ নাশকতা চালিয়ে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে।
সরেজমিন স্থানীয় এলাকাবাসী, পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র এবং দাস পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, স্থানীয় মুসলমান বা জামায়াত-শিবিরকর্মীরা উচ্ছৃঙ্খল নয়। শুধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতেই চক্রান্ত করে এ নাশকতা চালানো হয়েছে। নতুন করে যাতে কেউ নাশকতা চালাতে না পারে সেজন্য রাত জেগে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা পালাক্রমে সংখ্যালঘুদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম রাব্বানী মজুমদার, স্থানীয় সাংবাদিক নামধারী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম হীরা, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তাবারক উল্লাহ কায়েসসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর দিকে অভিযোগের আঙুল স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সাম্প্রদায়িক সংঘাত উসকে দিতেই নাশকতা : লাকসামের উত্তরদা গ্রামে দাসবাড়িতে সরেজমিন ঘুরে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা গেছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকানি দিতেই সাংবাদিক নামধারী স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ নাশকতা চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি আদৌ নাশকতা কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া এবং মামলা, তদন্ত ও পুলিশের কাছে দাসবাড়ির নালিশ দায়েরের আগেই এসব আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপি-জামায়াত নাশকতা চালিয়েছে উল্লেখ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
লাকসাম থানা পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ঘটনার আগে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে লাকসামে বিএনপি-জামায়াতের কোনো সহিংস ঘটনার নজির নেই। এমনকি ওই থানায় এসব দলের বিরুদ্ধে ও সাম্প্রতিক সময়ের সহিংস ঘটনায় কোনো মামলাও নেই। হরতালে বিএনপি কিংবা জামায়াত মাঠেও নামেনি। কিন্তু ইস্যু তৈরি এবং বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার হিসেবে এসব আওয়ামী নেতার উসকানিতেই ওই বাড়িতে নাশকতা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটাতে পারে সেজন্য পুলিশের উচিত সঠিকভাবে তদন্ত করে এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা উচিত। তারা জানান, ১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র দাসবাড়িতে সহিংসতা হয়েছিল। ওই একই কায়দায় এবারও নাশকতাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে দেখাতেই এ চক্রান্ত করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এ ধরনের চক্রান্তের ঘটনা রতন চন্দ্র দাসের পরিবার জানে বলেই তাদের ওপর পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা চাপ প্রয়োগ করেও জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে মামলা করাতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এমনকি লাকসাম পৌরশহর এলাকার বাসিন্দারা জানান, রতন চন্দ্রের বড় ভাই অ্যাডভোকেট নিতাই চন্দ্র দাস মামলা না করায় এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের ভয়ে তিনি লাকসামে নিজ চেম্বারে আসেন না।
রতন চন্দ্র দাসের পরিবারের কথা : রতন চন্দ্র দাসের বড় ভাই পল্লী চিকিত্সক ডা. গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস জানান, তাদের প্রতিবেশী মুসলমানরা বিশেষ করে স্থানীয় জামায়াতকর্মীদের সঙ্গে তাদের সারাজীবনই সুসম্পর্ক রয়েছে। এমনকি বাড়িতে আগুনের ঘটনায় সহযোগিতা চেয়ে যখন চিত্কার করছিলেন তখন প্রথমে স্থানীয় মুসলমান পরিবারগুলোই এগিয়ে এসেছে। এখনও তারা রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছেন। রতন চন্দ্রের স্ত্রী মিলন রানী দাস, তার বড় বৌদি কল্পনা রানী দাস, কাজল রানী দাস, ছোট বৌদি তনুশ্রি দাস আমার দেশ-কে বলেন, ‘আমাদের চারপাশের মুসলমানরা উচ্ছৃঙ্খল নয়, সব সময় যে কোনো কাজে সবার আগে তারাই সহযোগিতা করেন। আর এখনও নানাভাবে সহযোগিতা করছেন আমাদের। কে বা কারা প্রাণে মারার শত্রু হতে পারে তা আমরা বুঝি। কাজল রানী দাস বলেন, এটা তাদের বাড়ির চারপাশের কেউ করেনি। তারা দূরের কেউ। সারা দেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দোহাই দিয়ে কেউ চক্রান্ত করে এ কাজ করেছে, হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্বে নয়। বরং দাঙ্গা উসকে দিতেই করেছে বলেও জানান ওই বাড়ির নারীরা।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ব্যাপারে তারা বলেন, আমাদের কোনো চেয়ারম্যানের দরকার নেই। ঘটনার পর একবার এসেছিল সান্ত্বনা দিতে। আমাদের কোনো সান্ত্বনার দরকার নেই। এদের একজন বলেন, ‘আমগো তো সব শ্যাষ, হেতারা আইসে সান্ত্বনা দিয়ে কী করবে? দরকার নেই।’
পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য : লাকসাম থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। সরেজমিনে গেলে স্থানীয় থানার কর্মকর্তা আবুবকর, মোবারক হোসেন এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এখনও পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না যে কীভাবে আগুন লেগেছে। তবে নাশকতা যে চালানো হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে ঘটনাটি জামায়াত-শিবির করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেহজনকভাবে। সে কলেজছাত্র। কিন্তু তারও কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি। তবে বোঝা যাচ্ছে, কেউ নাশকতা চালিয়ে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। তদন্ত চলছে। যারাই জড়িত থাকুক বের করা হবে। তবে একটু কঠিন কাজ এবং সময় লাগবে বলেও জানান এসব পুলিশ কর্মকর্তা। দাস পরিবার কেন মামলা করেনি জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। আমরা পুলিশ, আর কী করব বলুন, মামলা তো করতেই হবে।
তবে এ ব্যাপারে কুমিল্লা পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান আমার দেশ-কে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের সবার ব্যাপারেই তদন্ত চলছে। সারা দেশের ঘটনার ধারাবাহিকতায় এ নাশকতা চালানো হয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক সহিংসতায় ঘটেছে তা এখনও বলব না, বলা কঠিন। তবে তদন্ত চলছে, রহস্য উদঘাটন হতে আরও সময় লাগবে।’
তবে ভিন্নমত পোষণ করে এ ব্যাপারে লাকসাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মজির আহমেদ আমার দেশ-কে বলেন, ‘এ নাশকতা বিএনপি কিংবা জামায়াত চালায়নি। এমনকি সারা দেশে যখন হরতালে পিকেটিং হয়েছে তখন লাকসাম নীরব। কোনো নেতাকর্মী মাঠে ছিল না। বিএনপি-জামায়াতকে ফাঁসানোর একটা ষড়যন্ত্র। এটা পুলিশও জানে, দাস পরিবারও জানে। কিন্তু সরকারের দৃষ্টিতে ভালো থাকার জন্য পুলিশ নীরব রয়েছে।’
মজির আহমদ বলেন, আর জানে বলেই দাস পরিবারকে দিয়ে কেউ মিথ্যে মামলা করাতে পারেনি। ওই পরিবারের অনেক সদস্য বিএনপির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলেও জানান তিনি। মজির আহমদ বলেন, স্থানীয় এমপি টিআর কাবিখার ১০ হাজার টাকা ওই পরিবারকে দিয়ে এসেছে। এরপর আর খোঁজখরব নেয়নি। তিনিও ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার এবং পরিবারের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান সরকারের প্রতি।
স্থানীয় আওয়ীমী লীগের বক্তব্য : দাসবাড়ির নাশকতার ঘটনায় অভিযুক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা আমার দেশ-কে বলেন, ওটা নাশকতাই। কারণ ’৯০ সালেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ওই বাড়িটিই ভাঙা হয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওই বাড়িটাতেই হামলা চালানোর কথা।
স্থানীয় উপজেলা যুবলীগের সভাপতি দৈনিক ভোরের কাগজ-এর প্রতিনিধি আ্যাাডভোকেট রফিকুল ইসলাম হীরা বলেন, ঘটনার আগের দিন মিছিলে বিএনপি বলেছিল, যে কোনো উপায়েই হোক দাড়ি-টুপির সম্মান রাখতে হবে। সুতরাং রাতের ঘটনা যে বিএনপিই ঘটিয়েছে তা স্পষ্ট। আর ওই বাড়ির ওপর ১৯৯০ সালেও হামলা হয়েছিল।
কিন্তু দাসবাড়ি কেন বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা করল না জানতে চাইলে কোনো জবাব দিতে পারেননি হীরা। ওই নাশকতার ঘটনায় রফিকুল ইসলাম হীরার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে জানালে তিনি বলেন, ‘দেখুন আমি শুধু আওয়ামী লীগ নেতাই নই, সাংবাদিকও। দাসবাড়িতে আমরা কেন নাশকতা চালাব? তারা তো আমাদের আওয়ামী লীগের লোক।’ একই অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। তারা আমাদের আওয়ামী লীগের লোক। তাদের ভালো চাই। কেন আমরা করব। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী আ্যাাডভোকেট নিতাই চন্দ্র দাস বিএনপি সমর্থিত নেতা জানালে গোলাম রাব্বানী বলেন, নিতাই একা বিএনপি পার্টি করে। আর বাকিরা করে আওয়ামী লীগ। দাসবাড়িতে গোলাম রাব্বানীর না যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, ‘গেলেই কি সব হয়ে যায়? কী যে করতেছি দাসবাড়ির জন্য তা তারা জানে না।’
মানবেতর দিনযাপন : পোশাক পরিচ্ছদ, ১১ মণ ধানসহ প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে এখন প্রায় নিঃস্ব দাস পরিবার। বর্তমানে মানবেতর দিন যাপন করছেন পরিবারের সদস্যরা। দুই শিশুসন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন মিলন রানী দাস। তিনি জানান, তার সহায়-সম্বল দিয়ে ঘরটা তুলেছিলেন কয়েক দিন আগে। মিলন রানী বুক চাপড়ে কাঁদেন। তিনি সহযোগিতা কামনা করেন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়