রাজিয়া আপা : আমাদের কুসুমিত ইস্পাত



আবদুল হাই শিকদার
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
আমি হলফ করে বলছি প্রফেসর ডক্টর ইউ এ বি রাজিয়া আখতার বানুকে যতবার দেখেছি ততবারই আমার মনে হয়েছে প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্যের একটা অনন্যসাধারণ মিশ্রণ মিহি জোছনার মতো তার অবয়ব থেকে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। জ্ঞান যেমন তাকে বিনয়ী করেছিল, তেমনই বিনয় তাকে অন্য সবার মাঝখানে আলাদা করে বড় করে তুলে ধরেছিল। ‘নিজেকে করিতে গৌরবদান’ জাতীয় রুচিহীন অহঙ্কার কখনোই তার স্নিগ্ধতার কারুকাজ করা চরিত্রের ওপর ধূলির আঁচড় লাগাতে পারেনি। এজন্যই হয়তো আমাদের মতো কাদামাটিতে প্রতিনিয়ত গড়াগড়ি খাওয়া মানুষের কাছে তার ছিল ভিন্ন মাত্রা। বিশেষ ধরনের মর্যাদা। তিনি কখনোই চাননি, চেয়ে নিজেকে ছোট করার মতো দীনতা, সত্যিকার অর্থেই ছিল তার প্রতিপক্ষ, তিনি অবলীলায় আদায় করে নিয়েছিলেন আমাদের সমীহ।
সতত শুভ কামনা ও কল্যাণবোধকেই জীবনের অঙ্গীকার করে নিয়েছিলেন তিনি। তাও আবার কষ্ট করে নয়, এটা পুরোপুরি ছিল তার স্বভাবজাত। এই মানসিকতার অন্তরের অন্তঃস্থলে ছিল তার মাতৃভূমি, তার মানুষের প্রতি মমতা। কৃত্রিম তন্ু্ততে বোনা লোকদেখানো আবেগ নয়, বাংলাদেশের পাললিক মৃত্তিকার মতো সচ্ছল, ভাদরের নদীর মতো আদর তার অণুতে অণুতে। এজন্যই হয়তো যে কর্মে দেশের অমঙ্গল তা তিনি সইতে পারতেন না। আবার অন্যদের মতো গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাপিত্যেশ করে সময় অপচয় করার মতো সময় তার ছিল না। ছিল না বলেই তিনি যতটুকু পারতেন যেভাবে পারতেন নিজের সামর্থ্যটুকু নিয়ে অবলীলায় রুখে দাঁড়িয়েছেন। দাঁড়িয়েছেন ভাঙনের বিরুদ্ধে। হানাহানির বিরুদ্ধে। ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে। অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে। অশিক্ষা আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
সঙ্গত কারণেই খুব পরিষ্কারভাবে বলা যায়, আমাদের ভান ধরা, বকধার্মিক এবং স্বার্থান্ধ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের একেবারে ভেতর বাড়িতে বাস করেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আশ্চর্য ব্যতিক্রম। পঙ্কের সরোবরে যথার্থ অর্থেই তিনি পঙ্কজ হয়ে জীবনযাপন করে গেছেন। না, তিনি কোনোভাবেই মিথ্যাবাদী নিরপেক্ষ ছিলেন না। তার পক্ষপাতের মধ্যে কোনো আড়াল আবডাল ছিল না। তিনি তার অবস্থান, তার কর্ম সম্পাদন প্রক্রিয়া দ্বারাই শনাক্ত করিয়ে গেছেন। এখন এই অবস্থান কারও ভালো লাগল কি লাগল না—এসব নিয়ে তিনি মোটেই মাথা ঘামাননি। মাথা ঘামানোর দরকারও হয়নি তার। কারণ দেশ ও জাতির স্বার্থে তিনি ছিলেন নির্দ্বিধ। সারাক্ষণ যারা মাঠে-ময়দানে বড় বড় গলাবাজি করে এসে, তারপর মওকা বুঝে একটু আড়ালের সুযোগে খ্যাতি ও প্রতিপত্তির কাছে অকাতরে ঢেলে দেন ইজ্জত ও আত্মা, রাজিয়া আপা তো কস্মিনকালেও তাদের দলভুক্ত ছিলেন না। ছিলেন না বলেই অদ্ভুত উদ্বেগহীন, ভ্রূক্ষেপহীন, কুণ্ঠাহীন, প্রকৌশলহীনভাবে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন তার জাতির খেদমতে। সহজ, সরল এবং সাবলীল তার চলার ভঙ্গি।
‘অঙ্গীকার’ বলতে একটা শব্দ আছে। এই শব্দের অন্তর্নিহিত জ্যোতি তার জীবনে সত্য হয়েছিল। তাই বলে অঙ্গীকারের দোকানদারি করে পাড়া মাথায় নেননি কখনও। শরীরের ভেতরে যেরকমভাবে দৃশ্যান্তরে থেকেও অবলীলায় বয়ে যায় রক্তের ধারা, দুধের সঙ্গে সাদা রঙ যেভাবে মিশে থাকে, ঠিক সেরকম তার জীবন ও কর্মের সঙ্গে মিশে থেকেছে অঙ্গীকার। অথবা তার পুরো জীবনটাই পরিণত হয়েছিল অঙ্গীকারে। সে অঙ্গীকারের বাইরের দিকটা আপাতদৃষ্টিতে কোমল মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তা ছিল সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দৃঢ়। কবির ভাষায় ‘কুসুমিত ইসপাত’। আর এই দ্রব্যটির অভাবেই আমাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ডুবতে বসেছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি এই কারণে যে, না চাইতেই তার অনেক স্নেহ বর্ষিত হয়েছে আমার ওপরে, যা আমার যোগ্যতার মাপকাঠিকেও হয়তো ছাড়িয়ে গেছে। কিংবা অসাধারণ এক মাতৃত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল হৃদয় নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন বলেই বোধকরি, ঘরে বসে হাতিঘোড়া না মেরে মাঠে যারা কাজ করে তাদের প্রতি তার অকৃপণ পক্ষপাতিত্ব সবসময় লক্ষ করেছি। মায়ের মমতা আর অভিভাবকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে তিনি যেমন তার ছাত্রদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য, তেমনি মাঠের মানুষের কাছে ছায়াতরু। এই স্নেহময়ী ছায়াতরুর প্রস্থানে তাইতো আমাদের জীবনের অনেকটা অঞ্চল আজ শুকিয়ে গেছে। আর আমরা যারা তার গুণমুগ্ধ ছিলাম, হয়েছি বাক্যহারা। এভাবে এমনভাবে এত তাড়াতাড়ি তিনি চলে যাবেন এটা যেমন জাতীয় অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামানকে করেছে তড়িতাহত, তেমনি আমাদের মতো আমজনতাকেও করেছে স্তম্ভিত। এজন্যই তার অনুপস্থিতির শূন্যতা আজ বিরাট করে বাজছে বুকে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ কবিতায় বলেছেন :
‘জ্ঞানের লক্ষ্মী গানের লক্ষ্মী শস্য লক্ষ্মী নারী,
সুষমা লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী’
আমার ধারণা, জাতীয় কবির এই পঙক্তিদ্বয় রাজিয়া আপার জীবনে সত্য হয়েছিল। এই সত্য অজর, অমর, অক্ষয়। রাজিয়া আপা আজ আমাদের মধ্যে না থাকলেও তার রেখে যাওয়া এই সত্যের প্রতাপ আমাদের দিশা এবং আলো দুই-ই বিতরণ করবে বহু দিন। বহু বহু দিন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়