যেসব কারণে ওরা জামায়াতের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত


আমার দেশ 

জঃআজঃঢাকা, বুধবার ২০ মার্চ ২০১৩, ৬ চৈত্র ১৪১৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২টা

সি রা জু র র হ মা ন
« আগের সংবাদপরের সংবাদ»
ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে লেখা এক কলামে আবারও একটা সুপরামর্শ দিয়েছিলাম সরকারকে। লিখেছিলাম, ‘জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে যাবেন না, ছাত্রশিবিরকে বেশি ঘাঁটাবেন না, তাদের প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দেবেন না, তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।’ কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিয়ে আরও লিখেছিলাম, ‘নির্যাতন দিয়ে রাজনীতিকে নিস্তব্ধ করে দেয়া যায় না।’ দেখা যাচ্ছে, এ সরকারকে সত্ পরামর্শ দেয়া উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতোই পণ্ডশ্রম।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা হয়েছে গ্রিক ট্র্যাজেডি নাটকগুলোর মতো। সেগুলোর অন্তত দুটি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে বিবিসি থেকে প্রচার করেছিলাম আশির দশকে। সবাই জানেন কী ঘটতে যাচ্ছে, পরিণতি কী হবে। কিন্তু সে পরিণতি ঠেকানোর চেষ্টা কেউ করছে না। নায়ক-নায়িকারা অন্ধ দার্শনিক টাইরেসিয়াস কিংবা অন্য কোনো বিজ্ঞজনের পরামর্শ শুনছেন না। শেষে অনিবার্য সর্বনাশ নেমে এলো। অন্ধকারে ডুবে গেল দেশ।
বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতিদৃষ্টে আপনাদের কি সে রকমই মনে হচ্ছে না? আমার উপরোক্ত কলামটি লেখার দু’দিন পরে সরকারের অবৈধ সন্তানের জন্ম হলো শাহবাগের মোড়ে। সে সন্তান দুরন্ত, দুর্বিনীত। কারও কথাই শোনে না। এমনকি বাবা-মায়ের কথাও না। তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল ভয় দেখিয়ে বিচারকদের সরকারের হুকুম মেনে চলতে আর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের সবাইকে চটজলদি ফাঁসির হুকুম দিতে বাধ্য করতে। কিন্তু বোতল থেকে বেরিয়েই সে দানব হাঁউ-মাউ-খাঁউ বলে চারদিকে হাত বাড়াতে শুরু করল।
বাংলাদেশ এখন বহু মহলের বহু এজেন্ডার দেশ। ভাগাড়ে মরা গরু ফেলে দিয়ে গেলে দেখতে না দেখতেই কাক-শকুন আর শেয়ালেরা এসে ভিড় করে, গোরুর লাশ নিয়ে রীতিমতো কামড়াকামড়ি পড়ে যায়। শাহবাগেও সে রকমই শুরু হয়ে গেল। সরকার বলেছিল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিতে হবে। সে দাবি তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হলো সব অভিযুক্তের ফাঁসির দাবি। তারপর এলো ‘শিবির ধরো, জবাই করো।’ কী আশ্চর্য! কে শিবির আর কে শিবির নয়, তারও প্রমাণ পেতে হবে না? যারা শিবিরের সদস্য, তাদের কপালে কি শিবির কথাটা লেখা থাকে? ছাত্রলীগওয়ালারা ঢাকায় শিবির বলে এক হিন্দু যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা শিবির বলে হিন্দু মাস্টার্সের ছাত্রকে বেধড়ক পিটিয়েছে। ঢাকার পুলিশ কমিশনার এবং শেখ হাসিনার কোলাবোরেটর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, কাউকে জামায়াত কিংবা শিবির বলে শনাক্ত করা সহজ নয়। তাতে কী এসে যায়? যাকে পার তাকে মারো! বর্তমান সরকার আর শাহবাগে তাদের অবৈধ সন্তানদের এখন এই হচ্ছে রাজনীতি।
যেন ব্যূহ তৈরি করে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মন্ত্রীরা জানেন, কার অনুপ্রেরণায় এবং কার নির্দেশে শাহবাগ সার্কাস বসেছে। সুতরাং সেখানকার হুঙ্কারের প্রতিধ্বনি করা তাদের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো। তাদের কথাবার্তায় মনে হতে লাগল, যেন কাল বাদ দিয়ে পরশু দিনই জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। ততক্ষণে শাহবাগ থেকে নতুন স্লোগান উঠল, ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করো। মন্ত্রীপাড়ায় নতুন চাঞ্চল্য। কী তাত্পর্য এ দাবির? যারা দাড়ি রাখে, টুপি পরে আর নামাজ পড়তে মসজিদে যায়, তারা রাজনীতি করতে পারবে না? একটু পরে শাহবাগের ওপর যেন অ্যাটম বোমা ফাটল। জানাজানি হয়ে গেল সে সার্কাসের উদ্যোক্তাদের বেশ কয়েকজন নাস্তিক, ধর্মদ্রোহী এবং তাদের কেউ কেউ ব্লগে আল্লাহ, রসুল আর ইসলাম নিয়ে পর্নোগ্রাফি প্রচার করছিলেন।
যা হওয়ার তাই হলো। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ক্রোধে ফেটে পড়ল। দেশের সর্বত্র প্রতিবাদ মিছিল আর সভা-সমাবেশ শুরু হয়ে গেল। গ্রিক ট্র্যাজেডির রাজা ইডিপাস কারও পরামর্শ না শুনে বাবাকে খুন করে মাকে বিয়ে করেছিলেন। সে রকম করেই রাইফেলের জোরে দেশের মানুষের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেয়ার হুকুম গেল পুলিশ, র্যাব আর বর্ডার গার্ড বাহিনীর কাছে। সেইসঙ্গে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার আর ছাত্রলীগের গুণ্ডারা তো ছিলই। একদিনেই তারা ৬৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। আহত হয় এক হাজারেরও বেশি।
হরতাল গণতন্ত্রের শেষ অস্ত্র
বাংলাদেশে এখন অরাজক পরিস্থিতি চলছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার হিম্মত বোধ হয় সরকার হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে কথা স্বীকার করার সাহস তাদের নেই। তাহলে প্রমাণ হয়ে যাবে যে তাদের জনসমর্থন নেই এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা ব্যর্থ। সরকারের খুনিরা এখনও খুন করছে, নয়াপল্টনে বিএনপির অফিসে ঢুকে পুলিশ নািস স্টাইলে ভাংচুর ও গ্রেফতার করেছে। চিরাচরিত পুলিশি টেকনিকে নিজেরা অফিসে বোমা পুঁতে বোমাবাজির অভিযোগে বিএনপির দেড়শতাধিক শীর্ষ নেতাকে ধরে নিয়ে গেছে।
এদিকে সরকারের বিরোধীরা তাদের একমাত্র অবশিষ্ট হাতিয়ার হরতাল করছে। সরকার তাদের লাঠিপেটা করছে, গুলি করে হত্যা করছে। দেশ বন্ধ, অর্থনীতি অচল। সপ্তাহে এক কিংবা দু’দিনের বেশি দোকানপাট, অফিস কোনো কিছু খোলা থাকছে না। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই’র পকেটে টান পড়েছে। তারা দুই নেত্রীকে সংলাপে বসানোর তদবির শুরু করেছে। অথচ বিগত সোয়া চার বছর তারা কথা বলেনি। সরকার নিজেরা দুর্নীতি করেছে, ব্যবসায়ীদেরও অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। তারা তাই তখন মুখ খোলেনি। সবাই এখন বিবৃতি দিচ্ছেন, দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে হবে। কিন্তু কে বসাবেন? মন্ত্রীরা গলাকাটা মুরগির মতো তড়পাচ্ছেন। কেউ বলছেন, সংলাপে রাজি আছেন তারা। অন্যেরা বলছেন, তার আগে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। আরও কেউ কেউ পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটছেন; বলছেন, খালেদা জিয়াকে সংসদে এসে তার দাবি জানাতে হবে। বিএনপি অটল। তারা বলছে, আগে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে রাজি হও, তারপরে সংলাপ হবে। এদিকে দেশ ফুটছে টগবগ করে। জল্পনা-কল্পনার অবধি নেই। রাষ্ট্রপতিকে কেন সিঙ্গাপুরে নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে, তারও নানা মতলব আবিষ্কার করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, তার স্বাক্ষর নিয়ে যাতে সেনা অভ্যুত্থান হতে না পারে, সেজন্যেই তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
বিদেশিদের সন্তুষ্টি বড় কাজ
বর্তমান সরকারকে গদিতে বসিয়েছে ভারত আর আমেরিকা। তাদের খুশি করার জন্য সরকার ও প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই ইসলামী সন্ত্রাস দলনের নামে নিরীহ ধর্মানুরাগী মানুষকে ধরে ধরে এমন সব ইসলামী সংগঠনের সদস্য বলে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে, যেসব সংগঠনের নাম আগে কেউ কখনও শোনেনি। কিন্তু জামায়াত এবং ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের মাথা কখন থেকে খারাপ হয়ে গেছে, আপনাদের কেউ লক্ষ করেছেন? সময়টা ২০১১ সালের জুলাই মাস। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বললেন, বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ মানুষ জামায়াতকে সমর্থন করে এবং জামায়াতের কারণেই বাংলাদেশের মানুষ ভারতবিরোধী হয়ে যাচ্ছে। তার আগে আগেই আগের বছর দিল্লিতে শেখ হাসিনার গোপন চুক্তিগুলোর কিছু আলামত বাংলাদেশের মানুষ দেখতে শুরু করেছে। ক্রমান্বয়ে কিস্তিতে কিস্তিতে প্রকাশ করা হলো যে, ভারতকে সড়ক ও রেলপথে এবং নদীপথে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে করিডোর দেয়া হবে।
আরও জানা গেল, বাংলাদেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা ভারতের ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তখনকার অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলেন। বিশ্বব্যাংকের তিন গুণ বেশি হারের সুদে বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণদান ঘোষণা করলেন। বিস্তারিত বিবরণে বলা হলো, বন্দর ও সড়ক এবং করিডোরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে সে অর্থ নির্দিষ্ট থাকবে। শুধু তাই নয়। ভারতীয় প্রকৌশলীরা সে অর্থে ভারতীয় যন্ত্রপাতি, শ্রম ও উপকরণ ব্যবহার করে সেসব উন্নয়নের কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উপদেষ্টা মশিউর রহমান বললেন, বাংলাদেশের ভূমি, রেল, নদী, সড়ক ও বন্দর ব্যবহারের জন্য (অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিসহ) কোনো রকম ফি চাওয়া হবে না, কেননা সেটা নাকি হবে অসভ্যতা। বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে বসল, তারা কী পেল এবং বসে বসে আঙুল চোষা ছাড়া তাদের আর কী করার আছে? তারা এখনও ভাবছে অত রক্ত দিয়ে যে তারা স্বাধীনতা আনল, সে স্বাধীনতা এখন গেল কোথায়?
এই স্বাধীন চেতনা ও জাতীয়তাবোধকেই সীমান্তের ওপারে ভারত-বিরোধিতা বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আর সে কারণেই বাংলাদেশে র’য়ের এজেন্ট ও ভারতপ্রেমীরা জামায়াতে ইসলামী এবং সাধারণভাবেই ধার্মিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন বিষ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
আউটলুক ভারতের সম্ভবত সবচেয়ে সম্মানিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক সাময়িকী। আউটলুক সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারটা ভারত ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি। ভারতে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল। এ দলের বহু নেতা স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরেও সে দেশের প্রায় বিশ কোটি মুসলমানকে ভারতের নাগরিক বলে মেনে নিতে পারছেন না। ১৯৯২ সালে বিজেপির শীর্ষ নেতারা অযোদ্ধার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভাঙার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
বিজেপির অঙ্গদল শিবসেনারা খোলাখুলি মুসলমানদের ভারত থেকে বিতাড়নের দাবি করে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর উস্কানি ও উত্সাহে ২০০২ সালে সে রাজ্যে দু’হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। সেজন্যে মার্কিন সরকার এখনও নরেন্দ্র মোদীকে আমেরিকার ভিসা দিতে অস্বীকার করে আসছে। তা সত্ত্বেও বিজেপি বিভিন্ন সময় ভারতের কেন্দ্রে এবং কয়েকটি রাজ্যে শাসন করেছে। চলতি বছর কিংবা আগামী বছরের গোড়ায় ভারতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, সে নির্বাচনে বিজেপি আবার ক্ষমতায় আসবে এবং সম্ভবত নরেন্দ্র মোদী হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
সুবিধাবাদী ধর্মনিরপেক্ষতা
এসব সত্ত্বেও ভারত নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে দাবি করে এবং ভারতের চোখে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার গরজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত ইসলামের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছেন। এ সবের এবং আউটলুকের মূল্যায়নের কিছু বাস্তব কারণ আছে। ভারতে শেখ হাসিনার প্রধান উপদেষ্টা তার প্রণব কাকা, যিনি অতীতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ ইত্যাদি বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী ছিলেন এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি। প্রণব মুখার্জি সম্বন্ধে একটা তথ্য এই যে, নিজের দেশের এবং নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরও তিনি মূল্যায়ন করতে পারেননি, তাদের সমর্থন লাভ করতে পারেননি। প্রণব বাবু একাধিকবার প্রত্যক্ষ ভোটে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি, দীর্ঘদিন রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেই তিনি মন্ত্রিত্ব করেছেন। সে প্রণব বাবু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন করে শেখ হাসিনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন বলে আশা করা যায় না।
রাজনীতি মানুষের জন্য। মানুষ যদি ধর্মপরায়ণ হয়, তাহলে ধর্মীয় রাজনীতি এবং রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আসবেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত বাইবেল বেল্ট সে দেশের রাজনীতিতে অনানুপাতিক বেশি প্রভাব বিস্তার করে। যুক্তরাজ্যে চার্চ অব ইংল্যান্ড একটা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। সোভিয়েত ইউনিয়নে ধর্মীয় প্রভাব লোপ করার যথাসাধ্য চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতোত্তর কালে ধর্ম আবার সুদে-আসলে ফিরে এসেছে, রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের ওপর রুশ অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব খুবই বেশি।
সবাই স্বীকার করবেন পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না। পাকিস্তান হয়েছিল ধর্মীয় দল মুসলিম লীগের আন্দোলনের ফলে। তত্কালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম ছাত্রলীগের হয়ে আন্দোলন করেছেন, সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেবে কিনা সে প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে তিনি মুসলিম লীগের হয়ে এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রচারাভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগেরও জন্ম হয়েছিলো মূলত মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মীয় দল হিসেবে, আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে। এখন হাসিনা কি জামায়াতে ইসলামী এবং সার্বিকভাবেই ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে চান?
মধ্যযুগীয় রাজনীতি ও বর্তমান বাস্তবতা
শেখ হাসিনা সম্ভবত মধ্যযুগে ফিরে যেতে চান। ১৪৮১ সালে স্পেনের রাজদম্পতি আরাগনের দ্বিতীয় ফার্ডিন্যান্ড এবং কাস্টিলের প্রথম ইসাবেলা ক্যাথলিক ধর্মের বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইহুদি ও মুরিশ মুসলমানদের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন শুরু করেন, ইতিহাসে সেটা স্প্যানিশ ইনকুইজিশন নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। ধর্ম বিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালিয়ে ইতিহাসে ধিকৃত হয়ে থাকার বাসনা যদি শেখ হাসিনার থেকে থাকে তাহলে কিছু বাস্তবতা তাকে মনে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের ভোটারসংখ্যা এখন মোটামুটি সমান তিন ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ ভোট আওয়ামী লীগের। তার মধ্যে তাদের ভোটব্যাংক হিন্দুদের এবং উপজাতীয় ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ১২-১৩ ভাগ। সংখ্যালঘু ভোট বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের ভোটাংশ ১৬-১৭ ভাগের বেশি নয়। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশের অর্ধেক ভোট বিএনপির এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য সব দলের। সংখ্যালঘু ভোটের ভিত্তিতে এবং বিদেশিদের প্রভাবে মাস্টার প্ল্যানের নির্বাচনে বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর আঘাত করলে নিজের সর্বনাশই ডেকে আনবেন।
ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে লেখা উপরোক্ত কলামের উপসংহারে লিখেছিলাম, ‘নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির গা-ঢাকা দেবে, আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। ভোল পাল্টে এবং হয়তো জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হঠাত্ এসে তারা ছোবল মারবে, মোক্ষম আঘাত হানবে সরকার ও শাসকদলকে। সেসব আঘাত কখন কোত্থেকে আসবে, সরকারের মন্ত্রীরা এবং পুলিশের কমিশনার বেনজীর আহমেদ টেরই পাবেন না। সামনের চেনা শত্রু পেছনের অচেনা শত্রুর চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ—এ কথাটা মনে রাখলে সবাই ভালো করবেন।’
তার কিছু আলামত এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পুলিশই বলছে, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম নামে জামায়াত ও শিবিরের চাইতেও উগ্র একটা ধর্মীয় দল নাকি বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করেছে। সরকার বাড়াবাড়ি বন্ধ না করলে এ রকম আরও বহু গোষ্ঠী গড়ে উঠতে বাধ্য।
(লন্ডন, ১৭.০৩.১৩)
serajurrahman34@gmail.com

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়