প্রতিযোগিতা হোক সৌজন্যের
- Get link
- X
- Other Apps
আনিসুল হক | তারিখ: ২৫-০৩-২০১৩
দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত দেশে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যখন ব্যাহত, তখন হঠাৎ করেই তিনটা দিন রাজনৈতিক উপদ্রব ছাড়া পার হয়ে গেল। বিএনপির পক্ষ থেকে সৌজন্য দেখানো হলো। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে বিএনপি শোক প্রকাশ করল, রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে হরতালের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, খালেদা জিয়ার বগুড়া অঞ্চল সফর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষণিকের জন্য হলেও জনমনে স্বস্তি দেখা দিয়েছিল তাতে। দেশের মানুষ সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখল, খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে যাচ্ছেন, মরহুম রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। খালেদা জিয়া ও বিএনপির এ ধরনের পদক্ষেপে তিন দিনের জন্য হলেও লাভবান হয়েছে দেশ, লাভবান হয়েছে রাজনীতি এবং লাভবান হয়েছে বিএনপি নিজে। মানুষের মনে একটুখানি স্বস্তি ফিরে এসেছে, তারা সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আশার আলোর ক্ষীণ একটা রেখা যেন দেখতে পেয়েছে, মনে হচ্ছে, হয়তো দ্বন্দ্ব-সংঘাতই এই দেশের রাজনীতির শেষ কথা নয়, কোথাও একটা সমঝোতার সম্ভাবনা আছে।
আসলে সৌজন্য, সুরুচি, সদ্ব্যবহার, উদারতা—সব দেশে সব সময়ই প্রশংসনীয়। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবেই। ভিন্নমত আছে বলেই তো একাধিক রাজনৈতিক দল, তা না হলে তো দেশে একটাই রাজনৈতিক দল থাকত। কিন্তু রাজনৈতিক ভিন্নমত মানেই ব্যক্তিগত বা দলগত রেষারেষি নয়, আদর্শের দ্বন্দ্ব মানেই মুখোমুখি সংঘাত নয়। পলিটিক্সকে বলা হয় আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। আমরা কম্প্রোমাইজের একটা নেতিবাচক বাংলা করে নিয়েছি—আপস, আমরা আপসকে ঘৃণা করি, স্লোগান দিই, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’। আমরা বলি, অমুক ভাই আপসহীন, অমুক ভাইকে ভোট দিন। কিন্তু কম্প্রোমাইজের একটা বাংলা হতে পারে সমঝোতা। সমঝোতার শিল্পই হলো রাজনীতি। আবার রাজনৈতিক সমঝোতা যদি না-ও হয়, সে ক্ষেত্রেও উদারতা, ভদ্রতা, সৌজন্যের দাম কিংবা প্রয়োজনীয়তা কমে যায় না। জানালার ধারে রাখা গাছ যেমন আলোর দিকে যায়, তেমনি মানুষও ভালো ব্যবহার, ভদ্রতা, নম্রতা পছন্দ করে। এই যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রশংসা করে কথা বলা হচ্ছে, সবাই বলছেন, তিনি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন, তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গেও মিশতেন, সবার কথা শুনতেন। এইটা পঞ্চাশের দশকের রাজনীতিকদের একটা গুণ ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গুণের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, করাচিতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাঁর দপ্তরে গিয়ে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, খাজা নাজিমউদ্দিন নিজে উঠে এসে তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিলেন। পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে তাঁরা গল্প করেছেন। রাজনীতি নিয়ে আলাপ করেছেন। রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তরুণ শেখ মুজিব কোনো রকমের অশ্রদ্ধা দেখাননি।
বিএনপি একটুখানি এগিয়েছে, এবার আওয়ামী লীগকে একটুখানি এগোতে হবে। তিন দিন দেশে হরতাল হানাহানি ছিল না, মনে হচ্ছিল, যেন কী একটা অপ্রত্যাশিত স্বস্তির তিন দিন আমরা পার করলাম, যেন স্বস্তি আমাদের প্রাপ্য ছিল না, নেতারা আমাদের দান করলেন। অথচ আমাদের প্রতিটা দিনই তো হওয়া উচিত স্বস্তির দিন, শান্তির দিন।
অবশ্য বাস্তববাদীরা মনে করেন, এই দেশে বিএনপি আর আওয়ামী লীগে কোনো দিনও সমঝোতা হবে না। বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ চায় বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে, বিএনপি চায় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দগদগে স্মৃতি মনে রেখে আওয়ামী লীগ ভাবতে পারে, বিএনপির সঙ্গে কীভাবে সৌজন্য দেখানো সম্ভব? আমরা বলব, আওয়ামী লীগ সৌজন্য দেখাবে এই জন্য নয় যে তাতে বিএনপি লাভবান হবে, এই জন্য যে তাতে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়বে। যে যত সৌজন্য দেখাবে, দেশের মানুষ তাকে তত পছন্দ করবে। কাজেই এখন শুরু হওয়া উচিত ভালো মানুষী অর্জনের প্রতিযোগিতা, সৌজন্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। সব সময় যে আঘাত করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করা যায় তা নয়, অনেক সময় হাত বাড়িয়ে দিয়েও প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করা যায়। বিএনপি রাষ্ট্রীয় শোক পালনের দিনগুলোয় হরতাল না দিয়ে কিংবা খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে গিয়ে সৌজন্যের একটা নজির স্থাপন করেছেন। সুবাতাস যেন বয়ে গেল দেশের ওপর দিয়ে। আওয়ামী লীগের উচিত এখন তাদের পক্ষ থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া। সৌজন্যমূলক একটা পদক্ষেপ নিয়ে বিএনপির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আমার কথাটা সত্যি সত্যি অরণ্যে রোদনের মতো শোনাচ্ছে। কারণ, এরই মধ্যে বগুড়ায় গিয়ে খালেদা জিয়া কঠোর কর্মসূচির কথা বলেছেন। আরও কিছু কথা বলেছেন, যা আমাদের আশ্বস্ত করে না, আতঙ্কিত করে। তবু বলব, দেশের মানুষ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায়, তারা নিরাপদে ফিরে আসুক ঘরে, সেটা চায়, সবাই নিজ নিজ জীবিকা পালন করে রাতের বেলা শান্তিতে ঘুমুতে চায়। এটা নিশ্চিত করা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব, কাজেই সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে হানাহানির পথ বন্ধ করতে, হানাহানির উপলক্ষ অপসারণ করতে। নিজেদের আদর্শে ছাড় না দিয়েও সৌজন্য, ভদ্রতা, নম্রতা, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে তা করা সম্ভব।
পৃথিবীর অনেক দেশেই দুটো ধারার রাজনীতি, দুটো দল আছে। দুটোই মধ্যপন্থী, একটা মধ্য বাম, আরেকটা মধ্য ডান। আমাদের দেশেও এই রকম দুটো ধারা আছে। এদের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য এখন কমে গেছে, দুই পক্ষই গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে। তবে তার পরও উভয়ের মধ্যে পার্থক্যও আছে। এই দুটো ধারারই শেকড় এই দেশের মাটির গভীরে প্রোথিত। কেউ কাউকে উপড়ে ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। বাঙালিত্ব যেমন এই দেশের বেশির ভাগ মানুষের রক্তের মধ্যে জিনের মানচিত্রে আঁকা, তেমনি এই দেশের ভাষা-সংস্কৃতি-স্থানিকতা-ধর্মচেতনাও এই দেশের মানুষের একেবারে ভেতরের জিনিস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেশির ভাগ মানুষই উদ্বুদ্ধ। আবার প্রতিটি সম্প্রদায়ই তার ধর্মীয় মূল্যবোধকে পরম শ্রদ্ধায় লালন করে। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার বিরোধ নেই, বরং আছে সমন্বয়ধর্মিতা।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটো দলই অনেকবার এই দেশে ক্ষমতায় ছিল। এদের জনসমর্থন ব্যাপক। এই দল দুটো কেউ কাউকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারবে না। এই দল দুটোর নাম পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু দেশের মধ্যে দুটো মধ্যপন্থী দল থাকবেই।
কাজেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যদি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ বেছে নেয়, সেটা হবে সবার জন্য মঙ্গল। সমঝোতার পথের বাস্তব বাধাগুলো আমরা জানি। যে করেই হোক ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতা ধরে রাখাই এখানে রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য। ক্ষমতা মানে আবার ব্যবসা-বাণিজ্য, টাকাকড়ি, নিয়োগ, দলীয়করণ এবং সামন্তবাদী মোড়লপনা। বিরোধী দল ও বিরোধী মত দমন। আর ক্ষমতার বাইরে থাকা মানে ক্রমাগতভাবে নানা ধরনের নির্যাতন বরণ করা। অনেক কর্মীকে এলাকা ত্যাগ করে চলে পর্যন্ত যেতে হয়। হাটে মাঠে বাজারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া দাপট, যেখানে বিরোধীদের শ্বাস নেওয়ার মতো সামান্য পরিসরও থাকে না। এই অবস্থায় কে বা ক্ষমতায় যেতে চাইবে না, আর কেই বা ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে?
তবু আমরা বলব, উদার হোন। কৌশলী হোন। উদারতাই দেশের মানুষ পছন্দ করে। সুজন সজ্জনকেই মানুষ সমর্থন করে। সৌজন্য আপনার জন্য লাভজনক বলেই আপনি সেটা অবলম্বন করুন। আর আপনার সৌজন্য জাতির জন্য লাভজনক বলে সবাই সেটা সমর্থন করে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
আসলে সৌজন্য, সুরুচি, সদ্ব্যবহার, উদারতা—সব দেশে সব সময়ই প্রশংসনীয়। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবেই। ভিন্নমত আছে বলেই তো একাধিক রাজনৈতিক দল, তা না হলে তো দেশে একটাই রাজনৈতিক দল থাকত। কিন্তু রাজনৈতিক ভিন্নমত মানেই ব্যক্তিগত বা দলগত রেষারেষি নয়, আদর্শের দ্বন্দ্ব মানেই মুখোমুখি সংঘাত নয়। পলিটিক্সকে বলা হয় আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। আমরা কম্প্রোমাইজের একটা নেতিবাচক বাংলা করে নিয়েছি—আপস, আমরা আপসকে ঘৃণা করি, স্লোগান দিই, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’। আমরা বলি, অমুক ভাই আপসহীন, অমুক ভাইকে ভোট দিন। কিন্তু কম্প্রোমাইজের একটা বাংলা হতে পারে সমঝোতা। সমঝোতার শিল্পই হলো রাজনীতি। আবার রাজনৈতিক সমঝোতা যদি না-ও হয়, সে ক্ষেত্রেও উদারতা, ভদ্রতা, সৌজন্যের দাম কিংবা প্রয়োজনীয়তা কমে যায় না। জানালার ধারে রাখা গাছ যেমন আলোর দিকে যায়, তেমনি মানুষও ভালো ব্যবহার, ভদ্রতা, নম্রতা পছন্দ করে। এই যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের প্রশংসা করে কথা বলা হচ্ছে, সবাই বলছেন, তিনি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন, তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গেও মিশতেন, সবার কথা শুনতেন। এইটা পঞ্চাশের দশকের রাজনীতিকদের একটা গুণ ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গুণের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, করাচিতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাঁর দপ্তরে গিয়ে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, খাজা নাজিমউদ্দিন নিজে উঠে এসে তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিলেন। পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে তাঁরা গল্প করেছেন। রাজনীতি নিয়ে আলাপ করেছেন। রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তরুণ শেখ মুজিব কোনো রকমের অশ্রদ্ধা দেখাননি।
বিএনপি একটুখানি এগিয়েছে, এবার আওয়ামী লীগকে একটুখানি এগোতে হবে। তিন দিন দেশে হরতাল হানাহানি ছিল না, মনে হচ্ছিল, যেন কী একটা অপ্রত্যাশিত স্বস্তির তিন দিন আমরা পার করলাম, যেন স্বস্তি আমাদের প্রাপ্য ছিল না, নেতারা আমাদের দান করলেন। অথচ আমাদের প্রতিটা দিনই তো হওয়া উচিত স্বস্তির দিন, শান্তির দিন।
অবশ্য বাস্তববাদীরা মনে করেন, এই দেশে বিএনপি আর আওয়ামী লীগে কোনো দিনও সমঝোতা হবে না। বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ চায় বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে, বিএনপি চায় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দগদগে স্মৃতি মনে রেখে আওয়ামী লীগ ভাবতে পারে, বিএনপির সঙ্গে কীভাবে সৌজন্য দেখানো সম্ভব? আমরা বলব, আওয়ামী লীগ সৌজন্য দেখাবে এই জন্য নয় যে তাতে বিএনপি লাভবান হবে, এই জন্য যে তাতে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়বে। যে যত সৌজন্য দেখাবে, দেশের মানুষ তাকে তত পছন্দ করবে। কাজেই এখন শুরু হওয়া উচিত ভালো মানুষী অর্জনের প্রতিযোগিতা, সৌজন্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। সব সময় যে আঘাত করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করা যায় তা নয়, অনেক সময় হাত বাড়িয়ে দিয়েও প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করা যায়। বিএনপি রাষ্ট্রীয় শোক পালনের দিনগুলোয় হরতাল না দিয়ে কিংবা খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে গিয়ে সৌজন্যের একটা নজির স্থাপন করেছেন। সুবাতাস যেন বয়ে গেল দেশের ওপর দিয়ে। আওয়ামী লীগের উচিত এখন তাদের পক্ষ থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া। সৌজন্যমূলক একটা পদক্ষেপ নিয়ে বিএনপির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আমার কথাটা সত্যি সত্যি অরণ্যে রোদনের মতো শোনাচ্ছে। কারণ, এরই মধ্যে বগুড়ায় গিয়ে খালেদা জিয়া কঠোর কর্মসূচির কথা বলেছেন। আরও কিছু কথা বলেছেন, যা আমাদের আশ্বস্ত করে না, আতঙ্কিত করে। তবু বলব, দেশের মানুষ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায়, তারা নিরাপদে ফিরে আসুক ঘরে, সেটা চায়, সবাই নিজ নিজ জীবিকা পালন করে রাতের বেলা শান্তিতে ঘুমুতে চায়। এটা নিশ্চিত করা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব, কাজেই সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে হানাহানির পথ বন্ধ করতে, হানাহানির উপলক্ষ অপসারণ করতে। নিজেদের আদর্শে ছাড় না দিয়েও সৌজন্য, ভদ্রতা, নম্রতা, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে তা করা সম্ভব।
পৃথিবীর অনেক দেশেই দুটো ধারার রাজনীতি, দুটো দল আছে। দুটোই মধ্যপন্থী, একটা মধ্য বাম, আরেকটা মধ্য ডান। আমাদের দেশেও এই রকম দুটো ধারা আছে। এদের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য এখন কমে গেছে, দুই পক্ষই গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে। তবে তার পরও উভয়ের মধ্যে পার্থক্যও আছে। এই দুটো ধারারই শেকড় এই দেশের মাটির গভীরে প্রোথিত। কেউ কাউকে উপড়ে ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। বাঙালিত্ব যেমন এই দেশের বেশির ভাগ মানুষের রক্তের মধ্যে জিনের মানচিত্রে আঁকা, তেমনি এই দেশের ভাষা-সংস্কৃতি-স্থানিকতা-ধর্মচেতনাও এই দেশের মানুষের একেবারে ভেতরের জিনিস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেশির ভাগ মানুষই উদ্বুদ্ধ। আবার প্রতিটি সম্প্রদায়ই তার ধর্মীয় মূল্যবোধকে পরম শ্রদ্ধায় লালন করে। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার বিরোধ নেই, বরং আছে সমন্বয়ধর্মিতা।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটো দলই অনেকবার এই দেশে ক্ষমতায় ছিল। এদের জনসমর্থন ব্যাপক। এই দল দুটো কেউ কাউকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারবে না। এই দল দুটোর নাম পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু দেশের মধ্যে দুটো মধ্যপন্থী দল থাকবেই।
কাজেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যদি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ বেছে নেয়, সেটা হবে সবার জন্য মঙ্গল। সমঝোতার পথের বাস্তব বাধাগুলো আমরা জানি। যে করেই হোক ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতা ধরে রাখাই এখানে রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য। ক্ষমতা মানে আবার ব্যবসা-বাণিজ্য, টাকাকড়ি, নিয়োগ, দলীয়করণ এবং সামন্তবাদী মোড়লপনা। বিরোধী দল ও বিরোধী মত দমন। আর ক্ষমতার বাইরে থাকা মানে ক্রমাগতভাবে নানা ধরনের নির্যাতন বরণ করা। অনেক কর্মীকে এলাকা ত্যাগ করে চলে পর্যন্ত যেতে হয়। হাটে মাঠে বাজারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া দাপট, যেখানে বিরোধীদের শ্বাস নেওয়ার মতো সামান্য পরিসরও থাকে না। এই অবস্থায় কে বা ক্ষমতায় যেতে চাইবে না, আর কেই বা ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে?
তবু আমরা বলব, উদার হোন। কৌশলী হোন। উদারতাই দেশের মানুষ পছন্দ করে। সুজন সজ্জনকেই মানুষ সমর্থন করে। সৌজন্য আপনার জন্য লাভজনক বলেই আপনি সেটা অবলম্বন করুন। আর আপনার সৌজন্য জাতির জন্য লাভজনক বলে সবাই সেটা সমর্থন করে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments