কিছুই তো বদলাল না



এ কে এম জাকারিয়া | তারিখ: ২৯-০৩-২০১৩
হরতালে অগ্নিদগ্ধ গাড়ি
হরতালে অগ্নিদগ্ধ গাড়ি
‘আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি, রাজনীতি বিষয়টা এতটাই সিরিয়াস যে তা রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।’ এই বোধোদয় ফরাসি জেনারেল ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রেঞ্চ ফিফথ রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস দ্য গলের। যার রয়েছে দুই-দুটি বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা। রাজনীতি তবে কার হাতে ছাড়তে হবে? আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি বলছে, রাজনীতিটা রাজনীতিবিদেরাই করবেন, কিন্তু সুতাটি থাকবে জনগণের এবং তাদের পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির হাতে। তাঁরা কোনো রাজনীতিককে টেনে তুলবেন, আবার কাউকে নামাবেন। রাজনীতির মতো ‘সিরিয়াস’ বিষয়টি তাই গণতান্ত্রিক দেশে শুধু রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
আমাদের দেশে গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে। এখানেও রাজনীতিবিদেরাই রাজনীতি করেন, কিন্তু রাজনীতি বিষয়টি যে পুরো তাঁদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি, সেটা সম্ভবত তাঁরা ভুলে যান। সে কারণে তাঁরা যখন বেশি ‘রাজনীতি’ করতে যান, যখন রাজনীতিটাকে পুরো দখল করতে চান, তখন জনগণ ও অন্যান্য সামাজিক শক্তিকে পথে নামতে হয় এই দখলদারির অবসান ঘটাতে। তাতে ব্যর্থ হলে হতাশ জনগণ অনেক সময় রাজনীতির বাইরের শক্তির প্রতিও সমর্থন জানিয়ে বসে। কিন্তু আমরা দেখছি, এর পরও আমাদের রাজনীতিবিদেরা রাজনীতিকে (বিশেষ করে ক্ষমতায় যাওয়ার পর) দখল করতে যাওয়ার ভুলটি করতেই থাকেন। ভুলে যান যে সুতাটি আসলে জনগণের হাতেই।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর মাস আটেক বাকি আছে। এরই মধ্যে সরকার পতন আন্দোলনের অংশ হিসেবে দফায় দফায় হরতাল হয়েছে। ২৭ ও ২৮ মার্চ হয়ে গেল ৩৬ ঘণ্টার টানা হরতাল। এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বছর দুয়েক ক্ষমতায় ছিল এক বিশেষ সরকার। সেই সরকারের সবচেয়ে পরিচিত নামটি হচ্ছে ‘সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’। জনগণকে বিবেচনায় না নিয়ে রাজনীতিকেরা যখন রাজনীতির ওপর পুরো দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, তার ফল হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি এসেছিল সেই সরকার। ‘রাজনীতিকদের’ বাইরের সেই সরকারকে তখন জনগণ স্বাগত জানিয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতা ছেড়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষে, এর মাস আটেক আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমরা আবার স্মরণ করতে পারি। তাতে দেখব যে বর্তমান অবস্থার সঙ্গে প্রায় হুবহুই মিলে যাচ্ছে।
বিচারপতি কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে আওয়ামী লীগ এবং সেই সময়ের ১৪-দলীয় জোট কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নেবে না, তা তারা অনেক আগেই স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল। এই দাবিতে হরতাল, অবরোধ, গণমিছিল—এ ধরনের নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু আগেই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পরিস্থিতিতে এখন যেমন দেশের নানা মহল থেকে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হচ্ছে, সমঝোতায় আসার অনুরোধ করা হচ্ছে (এমনকি দুই নেত্রীর মধ্যে কেন সংলাপ নয়, তা নিয়ে আদালতের রুল জারির ঘটনাও ঘটেছে), তখনো সেই অবস্থাই বিরাজ করছিল। তখনো উদ্বিগ্ন বিদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসছিল একই অনুরোধ। আজ যেমন ড্যান মজীনারা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানান (প্রথম আলো, ১২ মার্চ, ২০১৩), সেই ২০০৬ সালেও আমরা একই তৎপরতা দেখেছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৫টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রয়কার প্রতিনিধিদের উদ্বেগ বা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিনা রোকার সফর। ট্রয়কা প্রতিনিধিদের মন্তব্য ছিল, সরকার ও বিরোধী দলের সংলাপ চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন; চায় সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন (প্রথম আলো, ২৬ জানুয়ারি, ২০০৬)। আজ সাত বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা দেখছি যে দেশের পরিস্থিতি কিছুই বদলায়নি। এখনো সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় কাটেনি। আগামী নির্বাচন নিয়ে এক ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশ। কীভাবে নির্বাচন হবে? সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে তো—এসব প্রশ্নের জবাব কোনো মহল থেকেই মিলছে না।
এসব অনিশ্চয়তা দূর করার দায়িত্ব যেহেতু রাজনীতিকদের, তাই জনগণের তা না ভাবলেও চলত। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তো এই দায়িত্ব থেকে জনগণকে মুক্তি দিচ্ছে না। হরতাল ও অবরোধের মতো সহিংস এবং জীবন ও সম্পদবিনাশী কর্মসূচি তো জনগণের জীবনকে চিড়েচ্যাপ্টা করে দিচ্ছে। এতে সাধারণ জনগণই মরছে, পুড়ছে। তাদেরই সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীবন-জীবিকা। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার বছর খানেক আগে যে পরিস্থিতি ছিল, এখন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার একই সময় আগে পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় বলেই মানতে হচ্ছে। টানা ৪৮ বা ৩৬ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি তখন এসেছিল সরকারের মেয়াদের আরও শেষের দিকে। আর ২০১৩ সালে এসে এসব শুরু হয়েছে আরও আগে থেকে, আরও বেশি সহিংসতা নিয়ে। বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া সেদিন বললেন, ‘আন্দোলন করতে গেলে হয়তো আরও কিছু প্রাণহানি হবে, জানমালের ক্ষতি হবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে এই ক্ষতি মেনে নিতে হবে।’ (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ, ২০১৩)। সেই একই দিনের পত্রিকায় আমরা দেখলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘হত্যাকাণ্ডের দায় বিরোধী নেত্রীকে নিতে হবে।’
আরও প্রাণ ও সম্পদহানি যে সামনে ঘটতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। কিন্তু এতে দেশের বা জনগণের কী ‘স্বার্থ’ উদ্ধার হবে, সেটা বুঝতে আমরা সত্যিই অক্ষম। আর আমরা এটাও জানি, যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে বা সামনে হবে, তার দায় আসলে কাউকেই নিতে হবে না। কারণ অতীতে কেউ নিয়েছেন, এমন কোনো নজির আমাদের সামনে নেই। আজ যে খালেদা জিয়া দেশের ও জনগণের স্বার্থে হরতালের মতো সহিংস কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন, ২০০৬ সালে তিনি কী ভাবতেন? ‘হরতাল করে তারা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে চায়।’ (প্রথম আলো, ১৪ মার্চ, ২০০৬)। ‘আমাদের উন্নয়ন ও কর্মকাণ্ড দেখে বিরোধী দল বুঝতে পেরেছে, আগামী নির্বাচনেও জনগণ আমাদের ভোট দেবে। তাই তারা আন্দোলনের নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর করছে। এই হচ্ছে বিরোধী দলের রাজনীতি।’(প্রথম আলো, ৩ মে, ২০০৬)। যারাই বিরোধী দলে থাক, জ্বালাও-পোড়াও আর ভাঙচুরই যে তাদের রাজনীতি, তারাই যে যানবাহনে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারে, ধ্বংসের রাজনীতি করে, সেটা বাংলাদেশের জনগণের চেয়ে আর কে বেশি জানে! তখন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার দল ও জোট—কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়—এই দাবিতে আন্দোলন করছে। এক অবরোধ কর্মসূচির দিন সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন দুজন। এর প্রতিবাদে নতুন হরতাল ঘোষণা করে হাসিনা বললেন, ‘যত হত্যা, তত হরতাল’ (প্রথম আলো, ৩ জুলাই, ২০০৬)। আর ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বলছেন, ‘আর মানুষ পোড়াবেন না, গাড়ি ভাঙবেন না। দেশের মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন।’ (প্রথম আলো, ২৮ মার্চ, ২০১৩)
২০০৬ সালে বিএনপির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক করা খুবই কঠিন। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার করেই এ দেশে নির্বাচন হতে হবে। তা না হলে কোনো নির্বাচন জনগণ মানবে না’ (প্রথম আলো,২৯ জুন ২০০৬)—সংসদে এটাই ছিল সেই সময়ের বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার স্পষ্ট ঘোষণা। ‘আপসহীন’ হিসেবে অনেকের কাছেই সমাদৃত খালেদা জিয়া, তিনি কম যাবেন কেন! ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, তিনিই (কে এম হাসান) হবেন প্রধান উপদেষ্টা। তারা (বিরোধী দল) মানেন কি মানেন না, তাতে কিছু আসে-যায় না’ (প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৬)। এর দুই দিন পর ৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘সরকার কিছুতেই ছাড় দেবে না, দাবি আদায়ে বিরোধীরা অনড়’। এক অচলাবস্থার দিকেই এগিয়ে গেল দেশ। ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন, ‘বিচারপতি কে এম হাসান ক্ষমতা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগঞ্জ ও জেলা-উপজেলা থেকে নৌকার বৈঠা, লগি, লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকায় চলে আসবেন। আমরা দেখব হাসান-আজিজ মার্কা সরকার কীভাবে চলে। সেদিন দেখিয়ে দেব কত ধানে কত চাল।’ (প্রথম আলো)। অক্টোবরের শেষে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার সময় কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল এবং ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল, তা আমাদের সবারই জানা।
এখন বিএনপি কয়েক বছর ধরে বলে আসছে যে তারা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হলে তারা তা প্রতিহত করারও ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার বারবার বলে আসছে, সংবিধানে উল্লেখ করা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে সংলাপ, আলোচনা বা সমঝোতার কোনো লক্ষণই নেই। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, আমরা কি তবে সেদিকেই এগোচ্ছি?
রাজনীতির মতো ‘সিরিয়াস’ বিষয়টি দ্য গলের মতে, রাজনীতিবিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া না গেলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি মেয়াদ বা সময়কাল পর্যন্ত তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পথটিই বেছে নেওয়া হয়েছে। এই সময়টা রাজনীতিবিদদের একটি পক্ষ ক্ষমতায় আর আরেকটি পক্ষ এর বাইরে থেকে তাদের কাজ করে যায়। এরপর জনগণ হিসাব-নিকাশের একটা সুযোগ পায়। আমাদের রাজনীতিকেরা জনগণকে এই হিসাব-নিকাশটাই করতে দিতে চান না, যদি তারা ওলট-পালট করে দেয়! ২০০৬ সালে যা হয়েছিল, তা এই ভয় থেকেই হয়েছে, এখনো তা-ই হচ্ছে। কিন্তু জনগণকে ভয় পেয়ে এই দুই পক্ষই কিসের মুখে পড়েছিল, সেটা সম্ভবত তারা এরই মধ্যে ভুলে গেছে!
রাজনীতিকেরা আসলে নাকি রাজনৈতিক জীবনের বাইরের কিছু চান, এই মত গ্রিক রাজনৈতিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের। সেটা হচ্ছে ‘ক্ষমতা ও গৌরব বা সুখের’ আকাঙ্ক্ষা। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের জন্য সম্ভবত এটা সবচেয়ে বড় সত্য। ‘ক্ষমতা ও গৌরব বা সুখ’ এমনই জিনিস, 
যা ধরে রাখা বা দখল করার আকাঙ্ক্ষা রাজনীতিবিদদের এক-এগারোর অভিজ্ঞতাকেও সহজে ভুলিয়ে দিতে পারে! 
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়