মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আপিল আজ
আলমগীর হোসেন
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
বিশিষ্ট আলেমে দীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আজ আপিল মোকদ্দমা দায়ের করবে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে এ মোকদ্দমা দায়ের করা হবে। আপিলের সব কার্যক্রমও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। গতকাল আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী তাজুল ইসলাম ও মিজানুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে আপিল মোকদ্দমায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড আনা হয়েছে। এর মধ্যে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি চার্জের মধ্যে যে ৮টি চার্জ প্রমাণিত হয়েছে, এগুলোর বিপরীতে নানা তথ্য-প্রমাণ মোকদ্দমায় রয়েছে।
এদিকে রায়ের পর আল্লামা সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে রাখা হয়। সম্প্রতি কারাগারে আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা দেখা করতে গেলে মাওলানা সাঈদী রায়ের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আপিলের নির্দেশনা দেন। তিনি আইনজীবীদের বলেন, মৃত্যুর পরোয়া আমি করি না। বরং দেশ, কোরআন ও ইসলামের জন্য হাসিমুখে শহীদ হতে প্রস্তুত আছি। তিনি আরও বলেন, সারাজীবন আমি মানুষকে কোরআন ও ইসলামের দিকে আহ্বান করেছি, আমি শাহাদাতের গৌরবান্বিত মৃত্যু চাই, খুন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের জঘন্যতম মিথ্যা অপবাদ নিয়ে মরতে চাই না।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেবু্রয়ারি ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রথম ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার পর সারাদেশে সাধারণ মানুষসহ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিক্ষোভে বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৬ দিনে প্রাণ হারান শতাধিক ব্যক্তি। জামায়াত-শিবির ও সাঈদী মুক্তি পরিষদ এ রায় প্রত্যাখ্যান করে মাওলানা সাঈদীর মুক্তি দাবি করে আসছে। তারা মাওলানা সাঈদীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে ট্রাইব্যুনাল সংশোধিত আইন অনুযায়ী রায় ঘোষণার এক মাসের মধ্যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে মাওলানা সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করতে হবে। আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী তাজুল ইসলাম জানান, আজ ২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার তারা সুপ্রিমকোর্টে আপিল মোকদ্দমা দায়ের করবেন। তাজুল ইসলাম জানান, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দেশের সিনিয়র আইনজীবীরা লড়বেন। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আইনজীবী প্যানেলের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক বিচারপতি টিএইচ খান, বারের সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন, মিজানুল ইসলাম প্রমুখ আইনজীবী।
আপিলে উল্লেখযোগ্য গ্রাউন্ড প্রসঙ্গে আইনজীবী : মাওলানা সাঈদীর অন্যতম আইনজীবী মিজানুল ইসলাম জানান, আপিল মোকদ্দমায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারের এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায় অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও তার প্রবাসী বন্ধু ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যকার স্কাইপ সংলাপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এতে তিনি মামলার যুক্তিতর্ক শুরুর আগেই ‘মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায় লিখে রাখা’সহ বিভিন্ন আলাপ করেন। আপিলে আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে বিশা বালীকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারপক্ষের তালিকাভুক্ত সাক্ষীর মধ্যে আরেকজন হচ্ছেন বিশা বালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী। গত ৫ নভেম্বর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসা রাষ্ট্রপক্ষের এই সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশ। ওইদিন সকাল ১০টায় মাওলানা সাঈদীর দুই আইনজীবীসহ গাড়িতে করে ওই সাক্ষী ট্রাইব্যুনাল গেটে আসার পরপরই অপহরণের ঘটনাটি ঘটে। আজও সুখরঞ্জন বালীর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আপিলে আমরা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছি।
মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগটি প্রমাণিত দেখানো হয়েছে। আমরা এ অভিযোগের বিপরীতে ১৯৭২ সালের ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর দায়ের করা মামলার সার্টিফাই কপি ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেছিলাম। যে মামলায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ছিল না। তিনি বলেন, আপিলে আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তিনি আরও বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ড. এমএ হাসান সম্পাদিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত রাজাকারের একটি তালিকা ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। এ বইটিকে রিলাই করে ট্রাইব্যুনাল। অথচ বইয়ের লেখককে সাক্ষী করা হয়নি। তিনি বলেন, ২০১২ সালের লেখা একটি বইয়ে রাজাকারের তালিকায় মাওলানা সাঈদীকে রাজাকার দেখানো হয়েছে। অথচ লেখককে সাক্ষী করা হয়নি। আইনজীবী বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব সাক্ষী নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন, তারা ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সুন্দরবন সাব-সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড শামছুল আলম তালুকদার, পারেরহাটের বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরুল আলমসহ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা সাক্ষ্য দেন।
মিজানুল ইসলাম আরও বলেন, প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জে মাওলানা সাঈদীকে কখনও দেলু বা দেলাওয়ার সিকদার হিসেবে আখ্যায়িত করে। আপিলে আমরা বলেছি—তিনি দেলু বা দেলাওয়ার সিকদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, তিনি কখনই মুদি ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকে ওয়ায়েজিন হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করতেন। বিশেষত যশোর জেলায় ওয়াজ মাহফিল করতেন। আইনজীবী বলেন, তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে যশোরের নিউমার্কেট এলাকায় নিউটাউনে বসবাস করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিউটাউন হতে বিভিন্ন যায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করার পর মাহিরনের পীর সাহেব সদরুদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে পরবর্তীতে দহকুলার রওশন আলীর বাড়িতে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত অবস্থান করে নিজ এলাকায় ফেরত আসেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বেশ কিছুদিন নিজ এলাকায় থাকার পর খুলনায় যান এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিল করতে থাকেন। মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা সাঈদী পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা নির্বাচিত হন। এরপর তিনবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তিনি জনপ্রিয় ওয়ায়েজিন হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। এই অভিযোগগুলোকে আল্লামা সাঈদী শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষ হতে বরাবর তার নাম দেলু, দেইল্লা বা দেলু সিকদার হিসেবে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে প্রসিকিউশন পক্ষ কোনো প্রামাণ্য তথ্য ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেনি। ফরমাল চার্জে তাকে ওই নামে অভিহিত করা হলেও এর সমর্থনে প্রসিকিউশন পক্ষ কোনো দালিলিক প্রমাণ হাজির করেনি। এমনকি এই মামলার নালিশ দায়েরকারী অর্থাত্ রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার নিজে বাদী হয়ে জিয়ানগর থানায় যে এজাহার দায়ের করেন বা এ মামলার অপর সাক্ষী মানিক পশারী পিরোজপুর থানায় যে মামলা দায়ের করেন, তাতেও দেলোয়ার শিকদার বা দেলু শিকদার বা দেইল্লা উল্লেখ ছিল না, যা আসামিপক্ষ হতে প্রদর্শন করা হয়। উপরন্তু যেসব সাক্ষী বিজ্ঞ প্রসিকিউটরদের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে এবং পরিকল্পিতভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে ‘দেলু শিকদার’ কথাটি না থাকলেও সাক্ষীদের আদালতে দেলোয়ার শিকদার বলতে বাধ্য করেছে। সাক্ষীরা যে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে দেলোয়ার শিকদার কথাটি বলেননি, তা তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আসামির নাম ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শিকদার ছিল মর্মে দাবি করলেও প্রসিকিউশনের দাখিল করা প্রদর্শনী হতে দেখা যায় যে, মাওলানা সাঈদীর ১৯৫৭ সালের দাখিল সার্টিফিকেটে তার নাম দেলোয়ার হোসেন সাঈদী এবং তার বাবার নাম ইউসুফ সাঈদী লেখা আছে। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী জেরায় এটা স্বীকার করেছেন যে, পারেরহাটে রাজাকার বাহিনী গঠনকারীদের মধ্যে ছিল দেলোয়ার শিকদার, বাবা রসুল শিকদার—যিনি স্বাধীনতার পর গণরোষে নিহত হন। তিনি দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে ডেকে শনাক্ত করেননি। আইনজীবী বলেন, ওই দেলোয়ার শিকদারের সব অপরাধ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সহজেই অনুমেয় যে, প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে দেলোয়ার শিকদার হিসেবে চিত্রায়িত করার যে অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ের প্যারা ১৫তে আসামির বর্ণনায় যেসব বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, তা একপেশে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর নয়। আপিলে এসবসহ বেশকিছু গ্রাউন্ড উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবী টিমের প্রধান ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দৈনিক আমার দেশকে জানান, ‘মাওলানা সাঈদী সম্পূর্ণ নির্দোষ। প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি; তারপরও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে—এটা দুঃখজনক। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আশা করি আপিলে আমরা সুবিচার পাব। ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলেও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে রায়ের পর আল্লামা সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে রাখা হয়। সম্প্রতি কারাগারে আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা দেখা করতে গেলে মাওলানা সাঈদী রায়ের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আপিলের নির্দেশনা দেন। তিনি আইনজীবীদের বলেন, মৃত্যুর পরোয়া আমি করি না। বরং দেশ, কোরআন ও ইসলামের জন্য হাসিমুখে শহীদ হতে প্রস্তুত আছি। তিনি আরও বলেন, সারাজীবন আমি মানুষকে কোরআন ও ইসলামের দিকে আহ্বান করেছি, আমি শাহাদাতের গৌরবান্বিত মৃত্যু চাই, খুন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের জঘন্যতম মিথ্যা অপবাদ নিয়ে মরতে চাই না।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেবু্রয়ারি ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রথম ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার পর সারাদেশে সাধারণ মানুষসহ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিক্ষোভে বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৬ দিনে প্রাণ হারান শতাধিক ব্যক্তি। জামায়াত-শিবির ও সাঈদী মুক্তি পরিষদ এ রায় প্রত্যাখ্যান করে মাওলানা সাঈদীর মুক্তি দাবি করে আসছে। তারা মাওলানা সাঈদীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে ট্রাইব্যুনাল সংশোধিত আইন অনুযায়ী রায় ঘোষণার এক মাসের মধ্যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে মাওলানা সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করতে হবে। আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী তাজুল ইসলাম জানান, আজ ২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার তারা সুপ্রিমকোর্টে আপিল মোকদ্দমা দায়ের করবেন। তাজুল ইসলাম জানান, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দেশের সিনিয়র আইনজীবীরা লড়বেন। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আইনজীবী প্যানেলের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক বিচারপতি টিএইচ খান, বারের সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন, মিজানুল ইসলাম প্রমুখ আইনজীবী।
আপিলে উল্লেখযোগ্য গ্রাউন্ড প্রসঙ্গে আইনজীবী : মাওলানা সাঈদীর অন্যতম আইনজীবী মিজানুল ইসলাম জানান, আপিল মোকদ্দমায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারের এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায় অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও তার প্রবাসী বন্ধু ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যকার স্কাইপ সংলাপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এতে তিনি মামলার যুক্তিতর্ক শুরুর আগেই ‘মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায় লিখে রাখা’সহ বিভিন্ন আলাপ করেন। আপিলে আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে বিশা বালীকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারপক্ষের তালিকাভুক্ত সাক্ষীর মধ্যে আরেকজন হচ্ছেন বিশা বালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী। গত ৫ নভেম্বর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসা রাষ্ট্রপক্ষের এই সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশ। ওইদিন সকাল ১০টায় মাওলানা সাঈদীর দুই আইনজীবীসহ গাড়িতে করে ওই সাক্ষী ট্রাইব্যুনাল গেটে আসার পরপরই অপহরণের ঘটনাটি ঘটে। আজও সুখরঞ্জন বালীর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আপিলে আমরা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছি।
মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগটি প্রমাণিত দেখানো হয়েছে। আমরা এ অভিযোগের বিপরীতে ১৯৭২ সালের ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর দায়ের করা মামলার সার্টিফাই কপি ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেছিলাম। যে মামলায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ছিল না। তিনি বলেন, আপিলে আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তিনি আরও বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ড. এমএ হাসান সম্পাদিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত রাজাকারের একটি তালিকা ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। এ বইটিকে রিলাই করে ট্রাইব্যুনাল। অথচ বইয়ের লেখককে সাক্ষী করা হয়নি। তিনি বলেন, ২০১২ সালের লেখা একটি বইয়ে রাজাকারের তালিকায় মাওলানা সাঈদীকে রাজাকার দেখানো হয়েছে। অথচ লেখককে সাক্ষী করা হয়নি। আইনজীবী বলেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব সাক্ষী নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন, তারা ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সুন্দরবন সাব-সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড শামছুল আলম তালুকদার, পারেরহাটের বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরুল আলমসহ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা সাক্ষ্য দেন।
মিজানুল ইসলাম আরও বলেন, প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জে মাওলানা সাঈদীকে কখনও দেলু বা দেলাওয়ার সিকদার হিসেবে আখ্যায়িত করে। আপিলে আমরা বলেছি—তিনি দেলু বা দেলাওয়ার সিকদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন না, তিনি কখনই মুদি ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকে ওয়ায়েজিন হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করতেন। বিশেষত যশোর জেলায় ওয়াজ মাহফিল করতেন। আইনজীবী বলেন, তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে যশোরের নিউমার্কেট এলাকায় নিউটাউনে বসবাস করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিউটাউন হতে বিভিন্ন যায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করার পর মাহিরনের পীর সাহেব সদরুদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে পরবর্তীতে দহকুলার রওশন আলীর বাড়িতে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত অবস্থান করে নিজ এলাকায় ফেরত আসেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বেশ কিছুদিন নিজ এলাকায় থাকার পর খুলনায় যান এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিল করতে থাকেন। মিজানুল ইসলাম বলেন, মাওলানা সাঈদী পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা নির্বাচিত হন। এরপর তিনবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তিনি জনপ্রিয় ওয়ায়েজিন হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। এই অভিযোগগুলোকে আল্লামা সাঈদী শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষ হতে বরাবর তার নাম দেলু, দেইল্লা বা দেলু সিকদার হিসেবে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে প্রসিকিউশন পক্ষ কোনো প্রামাণ্য তথ্য ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেনি। ফরমাল চার্জে তাকে ওই নামে অভিহিত করা হলেও এর সমর্থনে প্রসিকিউশন পক্ষ কোনো দালিলিক প্রমাণ হাজির করেনি। এমনকি এই মামলার নালিশ দায়েরকারী অর্থাত্ রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার নিজে বাদী হয়ে জিয়ানগর থানায় যে এজাহার দায়ের করেন বা এ মামলার অপর সাক্ষী মানিক পশারী পিরোজপুর থানায় যে মামলা দায়ের করেন, তাতেও দেলোয়ার শিকদার বা দেলু শিকদার বা দেইল্লা উল্লেখ ছিল না, যা আসামিপক্ষ হতে প্রদর্শন করা হয়। উপরন্তু যেসব সাক্ষী বিজ্ঞ প্রসিকিউটরদের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে এবং পরিকল্পিতভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে ‘দেলু শিকদার’ কথাটি না থাকলেও সাক্ষীদের আদালতে দেলোয়ার শিকদার বলতে বাধ্য করেছে। সাক্ষীরা যে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে দেলোয়ার শিকদার কথাটি বলেননি, তা তদন্তকারী কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আসামির নাম ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শিকদার ছিল মর্মে দাবি করলেও প্রসিকিউশনের দাখিল করা প্রদর্শনী হতে দেখা যায় যে, মাওলানা সাঈদীর ১৯৫৭ সালের দাখিল সার্টিফিকেটে তার নাম দেলোয়ার হোসেন সাঈদী এবং তার বাবার নাম ইউসুফ সাঈদী লেখা আছে। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী জেরায় এটা স্বীকার করেছেন যে, পারেরহাটে রাজাকার বাহিনী গঠনকারীদের মধ্যে ছিল দেলোয়ার শিকদার, বাবা রসুল শিকদার—যিনি স্বাধীনতার পর গণরোষে নিহত হন। তিনি দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে ডেকে শনাক্ত করেননি। আইনজীবী বলেন, ওই দেলোয়ার শিকদারের সব অপরাধ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সহজেই অনুমেয় যে, প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে দেলোয়ার শিকদার হিসেবে চিত্রায়িত করার যে অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ের প্যারা ১৫তে আসামির বর্ণনায় যেসব বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, তা একপেশে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর নয়। আপিলে এসবসহ বেশকিছু গ্রাউন্ড উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবী টিমের প্রধান ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দৈনিক আমার দেশকে জানান, ‘মাওলানা সাঈদী সম্পূর্ণ নির্দোষ। প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি; তারপরও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে—এটা দুঃখজনক। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আশা করি আপিলে আমরা সুবিচার পাব। ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলেও সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
Comments