সন্ত্রাসী হামলায় প্রথম আলোর সাংবাদিক গুরুতর আহত



প্রথম আলো ডেস্ক | তারিখ: ২৯-০৩-২০১৩
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন মাসুদ আলম
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন মাসুদ আলম
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোর যশোরের অভয়নগর প্রতিনিধি মাসুদ আলমকে পিটিয়ে বাঁ হাত ভেঙে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। তাঁর কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ধোপাদী গ্রামের উলুবটতলা স্থানে ওই হামলা চালানো হয়।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন করায় সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ বিশ্বাসের লোকজন ওই হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একইভাবে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান চলাকালে প্রকাশ্যে প্রথম আলোর ধরমপাশা প্রতিনিধি সালেহ আহমদের ওপর হামলা চালান আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। 
এর আগে গত বছর প্রথম আলোর মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি আব্দুল মোমিন, রংপুরের তারাগঞ্জ প্রতিনিধি রহিদুল ইসলাম মিয়া, মাদারীপুরের কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলম ও লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি এম জে আলমের ওপর হামলা চালানো হয়। এ নিয়ে ছয় মাসে প্রথম আলোর ছয়জন সাংবাদিক হামলার শিকার হলেন।
মাসুদ আলম হাসপাতালে: পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, সুন্দলী গ্রাম থেকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে করে অভয়নগরে নওয়াপাড়া পৌর শহরে যাচ্ছিলেন মাসুদ আলম। ধোপাদী গ্রামের উলুবটতলায় পৌঁছালে একদল সন্ত্রাসী মাসুদকে এলোপাতাড়ি পেটায়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 
হামলার প্রতিবাদে ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে যশোর ও নওয়াপাড়া শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন সাংবাদিকেরা।
হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় কাতর মাসুদ আলম বলেন, ‘ধোপাদী গ্রামে আসার পর চার যুবক ইজিবাইক থেকে আমাকে নামিয়ে পাশে রাখা গাছের ডাল দিয়ে বেদম পেটাতে থাকে। এরপর স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে নিয়ে আসেন।’ 
কারা মারতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বলেন, ‘২০ মার্চ প্রথম আলোর পৃষ্ঠা ৯-এ জলবায়ু প্রকল্পে দুর্নীতিবিষয়ক একটি অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন ছাপানো হয়। সেই প্রতিবেদনে সুন্দলী ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা পরিতোষ বিশ্বাসের লুটপাটের খবর ছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে পরিতোষ বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে কোপানোর হুমকি দিয়েছেন। ধারণা করছি, পরিতোষের লোকজন এ হামলা চালাতে পারে।’ 
স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, পরিতোষের সমর্থক ধোপাদী গ্রামের সুফিয়ান (২৮), হান্নান (২২), ইয়াসিন (১৯) ও শাহিন (২২) মাসুদকে পেটান। 
মাসুদের চিকিৎসক যশোর মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক রাশিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর বাঁ হাত ভেঙে গেছে। বাঁ পায়ের হাড় ভাঙার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরীক্ষার পরে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে এমনভাবে পেটানো হয়েছে যে রক্ত জমে গেছে। এ জন্য রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক নেই। এতে কিডনি ও হূদ্যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন।’
হামলার খবর পেয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র হাসপাতালে মাসুদকে দেখতে যান এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। এ সময় তাঁরা আশ্বস্ত করেন, হামলাকারীরা যে দলের বা যার লোকই হোক না কেন, অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহাসহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’
অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সালেক বলেন, কিছু সূত্র ধরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
মামলা নেয়নি ধরমপাশার পুলিশ: গত মাসে ধরমপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর কবীরের নেতৃত্বে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর গণজাগরণ মঞ্চে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী আহত হন। এই সংবাদ পরদিন প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই ধরমপাশা প্রতিনিধি সালেহ আহমদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন হামলাকারীরা। গত মঙ্গলবারের ধরমপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যদের সামনে হামলা চালানো হলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। আহত সালেহ আহমদ বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সালেহ আহমদ জানান, বুধবার রাতে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর কবীর, তাঁর দুই ভাই উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জুবায়ের পাশা ও মুরাদ আহমদ, ভাগনে মহিবুর রহমান, খালাতো ভাই সাইফুল ইসলাম, যুবলীগের কর্মী তৈমুর ও পলাশের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। 
কিন্তু পুলিশ গতকাল বিকেল পর্যন্ত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি। ধরমপাশা থানার ওসি বায়েস আলম বলেন, ‘তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
সালেহ আহমদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলা, পূর্বধলা ও কেন্দুয়া উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। 
সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘হামলা হয়েছে প্রকাশ্যে আর পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করবে, এটা হয় না। মামলা না নিলে আমরা কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেব।’
অন্য হামলাগুলো যে কারণে: গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ইউনিয়নের নওগাঁও গ্রামে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন আব্দুল মোমিনসহ চার সাংবাদিক। ওই বছরের ৭ নভেম্বর রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার মেনানগর গ্রামে আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতের নির্মাণাধীন একটি মসজিদ ও এক ব্যক্তির বাড়িতে অগ্নিসংযোগের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে রহিদুলকে এলোপাতাড়ি পেটান জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা। ১০ নভেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলমসহ স্থানীয় সাত সাংবাদিককে পেটান কালকিনি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, তাঁর ভাতিজা উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুজিবুল হায়দারসহ অন্যরা। দুর্নীতি ও দখল নিয়ে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন দেলোয়ার। কিছুদিন পর ২৩ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের রামগতি সড়কের মার্কাজ মসজিদসংলগ্ন স্থানে জমি দখলের ছবি তুলতে গেলে এম জে আলমকে পেটান লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহের।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন যশোর ও সুনামগঞ্জ অফিস, নেত্রকোনা, পূর্বধলা ও কেন্দুয়া প্রতিনিধি]

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়