আজ থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু



আবু হেনা মুক্তি : আজ সোমবার থেকে সুন্দরবনে আনুষ্ঠানিকভাবে মধু আহরণ শুরু হচ্ছে।  সুন্দরবনের মধু ও মোম দেশের একটি অন্যতম অর্থকরী সম্পদ। বিভিন্ন প্রকার ঔষধ তৈরি ও ঔষধি খাবার হিসেবে মধুর জুড়ি মেলা ভার। বিশ্ববিখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে প্রাকৃতিভাবে সৃষ্টিকর্তা যে মধুর চাক দিয়েছেন তার গুণাগুণ অনস্বীকার্য। তবে অনেক ক্ষেত্রে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ মৌয়ালরা সরকারি নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা করছে না। মৌয়ালরা মধু সংগ্রহের নিয়মনীতি উপেক্ষা করার কারণে মধু উৎপাদন হ্রাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছির বংশ ধ্বংস হচ্ছে। সুন্দরবনে প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এ তিন মাস মৌয়ালদের মধু ও মোম সংগ্রহের অনুমতি দেয়া হয়। মৌসুমের শুরুতেই আজ থেকে মৌয়ালরা পারমিট নিয়ে শত শত নৌকাযোগে দল বেধে মধু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সুন্দরবনে যাত্রা করবে। মৌয়ালরা যাতে নিয়মনীতি মেনে মধু ও মোম সংগ্রহ করে সে লক্ষ্যে সম্প্রতি সন্দুরবন পশ্চিম বন বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। আজ বন বিভাগের সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিন আহম্মেদ নেতৃত্বে বুড়িগোয়ালিনীতে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। তিনি যোগদানের পর এ খাতে রাজস্ব আদায় বাড়ছে। মৌয়ালরা বন বিভাগের সতর্ক পাহারার কারণে অপেক্ষাকৃত নিরাপদে মধু সংগ্রহ করতে পারছে। তাছাড়া মৌয়ালরা আগের তুলনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারছে।  সেমিনারে ডিএফও সকল মৌয়ালদের যাবতীয় দিক নির্দেশনা দিবেন। ডিএফও জহির উদ্দিন ইনকিলাবকে বলেন, আমি আশা করি চলতি মৌসুমে মৌয়ালরা যথারীতি নিয়ম কানুন মেনে এ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে। মৌমাছির প্রজনন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যেভাবে মধু আহরণ করলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের কোন ক্ষয়ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্যক জ্ঞান দান করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মৌয়ালরা যাতে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত বা অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে বিশেষ সচেতন করা হয়। আশা করছি চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় বেশি মধু সংগ্রহ করা যাবে। তাছাড়া এবার মৌয়ালদের কর্মকা-ের প্রতি বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে।
সূত্রমতে,  ১০০০ টাকা মধু ও ৭৫০ টাকা মোমের প্রতি কুইন্টালে রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাত থেকে গত বছর সাড়ে ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। এ বছর ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ে হবে বলে আশা করছে বন বিভাগ। এবার ৬ হাজার মণ মধু ও ১৫শ’ মণ মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ হাজার মৌয়াল মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনে যায়। মৌয়ালরা জানায়, মধু সংগ্রহের জন্য তারা খড়কুটা একত্রিত করে “উকো বা বড়পা” প্রস্তুত করে তাতে আগুন ধরিয়ে জঙ্গলে ধোয়া ছেড়ে দিলে মৌমাছি বের হয়ে মৌচাকের দিকে ধাবিত হয়। তখন তারা তাদের পিছু নিয়ে মৌচাকের সন্ধান পায়। মধু সংগ্রহের পূর্বে মৌয়ালরা আগুনের ধোয়া দিলে ঝাকে ঝাকে মৌমাছি চাক ছেড়ে উড়ে যায়। সুন্দরবনে লোকেরা তাকে “বৈলেন দেয়া” বলে। মৌমাছি সরে গেলে চাক থেকে তারা মধু ও মোম সংগ্রহ করে। বন বিভাগের নিয়মানুযায়ী ধোয়ার কু-ুলী দিয়ে মৌমাছি তাড়িয়ে মধু সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও মৌয়ালরা এ নিয়মের কোন তোয়াক্কা করে না। কম পরিশ্রমে অধিক লাভবান হওয়ার আশায় বন বিভাগের আইন উপেক্ষা করে মৌয়ালরা মৌচাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে হাজারো মৌমাছি পুড়ে যায়। যার কারণে মৌমাছির বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত ও মধু উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি মৌয়ালদের ধরণা আগুনে যে কোন সময় বৃহৎ বনের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। আর এ কারণেই মাঝেমধ্যে সুন্দরবনে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে মৌয়ালরা পদে পদে বিপদ তথা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ হাজার মণ মধু সংগ্রহ করে। নিয়মনীতি উপেক্ষা তথা পরিকল্পিতভাবে মধু  সংগৃহীত না হওয়ায় মধু সংগ্রহের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত এক দশকে মধু আহরণ গড়ে আড়াই হাজার মণ। কিন্তু নব্বই দশকে মধু আহরণ হয়েছিল গড়ে ৪ হাজার ৪৪৫ মণ। ঐ সময় মোম আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৩৫ মন। তবে এ বছর বিভিন্ন গাছে ফুল ফোটার পরিমাণ অনেক বেশি। সে কারণে মৌচাক বৃদ্ধিসহ এ বছর মধু সংগ্রহের পরিমাণও বাড়তে পারে।
অপরদিকে পূর্ব বনবিভাগের ডিএফও ইনকিলাবকে বলেন, আমার ডিভিশনে অপেক্ষাকৃত মধু কম। আনুষ্ঠানিকভাবে আজ থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হলেও আরও কয়েক দিন লাগবে বাস্তবে শুরু হতে । তবে পারমিট সংগ্রহের সময় আমরা মৌয়ালদের প্রয়োজনীয় মোটিভেশন দিয়ে দিবো। তাছাড়া এবার মধু আহরণকালে বিশেষ তদারকি করা হবে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়