জনপ্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীনরা : নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাসিন্দারা পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে


আমার দেশ 

আজঃঢাকা, শনিবার ১৬ মার্চ ২০১৩, ২ চৈত্র ১৪১৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
কাজী জেবেল ও আলতাফ হোসেন
« আগের সংবাদপরের সংবাদ»
জনপ্রতিরোধের মুখে পড়েছে সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর পর থেকে পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা নিজেরাই দিন-রাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। সাতক্ষীরা শহর এলাকা বাদে অন্যান্য এলাকাগুলোতে পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলেই নারী-পুরুষ ও শিশুরা রাস্তায় নেমে আসছেন। বিশাল বহর নিয়ে গভীর রাতে অভিযানে যাওয়া পুলিশ-বিজিবির ৩-৪টি অভিযান প্রতিরোধের মুখে পিছু হটেছে। এ অবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আপাতত সব ধরনের অভিযান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইন্ধনদাতা আওয়ামী লীগের নেতারা জনরোষের ভয়ে নিজ বাসা ছেড়ে শহর এলাকায় অবস্থান করছেন। পরিবারসহ বেশ কয়েকজন নেতা সাতক্ষীরা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার প্রতিবাদে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাস্তায় নেমে আসে সাতক্ষীরার কয়েক হাজার মানুষ। তারা বিক্ষোভ করে শহরে ঢুকতে চাইলে পুলিশ-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ে। ওইদিনই গুলিতে ৭ জনের মৃত্যু হয়। এরপর গত ৩ মার্চ সাতক্ষীরা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রইছপুর গ্রামে বিজিবির গুলিতে দুই গ্রামবাসী ও এরপর দিন ৪ মার্চ কলারোয়ার কোফাপুর গ্রামে বিজিবি-পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হন। অনেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এরপর থেকেই সাতক্ষীরার উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও গ্রামগুলোতে পাহারা বসিয়েছে স্থানীয়রা। গাড়ির বহর ঢুকলেই গ্রামবাসী রাস্তায় নেমে আসছেন।
জনপ্রতিরোধের মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি স্বীকার করে সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন স্থানে সারারাত পাহারা দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করতে গেলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষ রাস্তা নেমে আসছে। মামলার আসামি জামায়াত নেতাদের যাতে ধরনে না পারি সেজন্য গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যে এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে সেখানেই এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এতে আমাদের কয়েকটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। কারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্ধকার রাতে কারা নামছে, কারা গাছ কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে তা চিহ্নিত করা কঠিন। ওসি গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি ভালো আছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটুক তা আমরা চাইনা।
সাতক্ষীরায় দায়িত্বরত পুলিশের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন। এতে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধের মুখে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সাধারণ মানুষ আমাদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করছে। প্রতিটি অভিযানে দা, বঁটি, লাঠি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অপরদিকে জামায়াত-বিএনপি নেতাদের আটক করতে উপরের মহল থেকে অব্যাহত চাপ দিচ্ছে। এ অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা বিপাকে পড়ছেন। তারা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছুটি চেয়েছেন।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলায় ৭টি উপজেলা, ৮টি থানা, ৭৮টি ইউনিয়ন ও এক হাজার ৩৫৬টি গ্রাম রয়েছে। এ জেলার বাসিন্দা প্রায় ২১ লাখ। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দেবনগর গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ রাত ২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ৮-১০ গাড়িতে চড়ে দেবনগর গ্রামে অভিযান চালায়। ওই সময়ে বিষয়টি জানিয়ে মাইকিং করা হলে অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা বিজিবি-পুলিশের গাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে অবস্থা বেগতিক দেখে ফিরে যায় তারা। একই ঘটনা ঘটে ঘোনা ও আগরদাড়ী ইউনিয়নে। ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবদুল খালেককে ধরতে গত ৮ মার্চ গভীর রাতে বিপুল সংখ্যক বিজিবি-পুলিশ সদস্যরা অভিযান চালায়। খবর পেয়ে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আলীপুর চেকপোস্ট থেকে বাদামতলা পর্যন্ত রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আটকে দেয়া হয়। জনপ্রতিরোধের মুখে বিকল্প পথে ঘোনা বাজার হয়ে খানপুর রোডে ফিরে যায় তারা। এর আগে গত ৫ মার্চ অভিযান চালাতে গিয়ে বাবুলিয়া বাজার পর্যন্ত গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের তোপের মুখে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে ফিরে আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাম এলাকায় অভিযান পরিচালনা বন্ধ রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। তাদের আশঙ্কা, জনপ্রতিরোধ উপেক্ষা করে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে জনবিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা করছেন তারা। সর্বশেষ গত ১২ মার্চ সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা শহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪১ জনকে আটক করা হয়েছে। এরপর বড় কোনো অভিযানে যায়নি স্থানীয় প্রশাসন।
তবে জামায়াতের জেলা নায়েবে আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, গুলি করে মানুষ হত্যার পর মামলা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের হয়রানি করছে পুলিশ। নিরীহ মানুষদের আটক করছে। দলীয় কর্মীর ভূমিকা পালন করছে পুলিশ। সাধারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সহিংসতার জন্য পুলিশ ও ক্ষমতাসীনরা যৌথভাবে দায়ী। হত্যাকাণ্ডের দায়দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। তিনি হয়রানি বন্ধ করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
পালাক্রমে পাহারা : সহিংসতা এড়াতে গ্রামে গ্রামে পাহারা বসিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। দিন-রাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে তারা। একই সঙ্গে গ্রামবাসীকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে, গ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বহনকারী গাড়ি বা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ বহর নিয়ে ঢুকলে মাইকে ঘোষণা দেয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসী যেন রাস্তায় নেমে আসে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাশেমপুর, আগরদাড়ী, রইছপুর, আলীপুর, ঝাওডাঙ্গা, পাথরঘাটা, তুঝুলপুর, মাধবকাঠী, দেবনগর, ধুলিহর, কোমরপুর, বকচড়া, বাবুলিয়া, বেলেডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। তাদের ডাকে নারী, পুরুষ, শিশুরা আগেও নেমে এসেছেন, আগামীতেও আসবেন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়