শাপলা চত্বরে মওলানা ফরিদের ‘মহাসমাবেশ’ ক্যারিকেচারে পরিণত হলো কেন?
প্রথমে তো প্রায় সকলেই ধারণা করেছেন যে, আব্দুল হামিদ সাহেবই স্থায়ী প্রেসিডেন্ট হবেন। কারণ তিনি প্রধান মন্ত্রীর আস্থাভাজন। চূড়ান্ত নির্বাচনে হামিদ সাহেবই স্থায়ী প্রেসিডেন্ট হন কি-না সেটি সময় বলবে। কিন্তু আমার মনে এখানে রয়েছে দুটি খটকা। প্রথমত, তিনি যদি পুনরায় ইলেকশন করতে চান তাহলে তো তাকে ইলেকশনের আগে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হবে। তাহলে সেই নির্বাচনকালীন প্রেসিডেন্ট কে হবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বিষয়টি ভেবে দেখেছেন বলে তো আমার মনে হয় না।
সংশোধিত সংবিধান অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনী মোতাবেক যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন তিনি কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য ওই পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। যিনি যাই বলুন না কেনো, যাকেই প্রেসিডেন্ট করা হবে তিনি হয় সরাসরি একজন আওয়ামী লীগার হবেন, অথবা কট্টর আওয়ামী পন্থী হবেন। যদি রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় ধরনের কোনো ওলট-পালট না ঘটে তাহলে আজ থেকে পরবর্তী ১০ মাসের মধ্যেই দেশের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ যদি এবারেও সেই ইলেকশনে জয় লাভ করে তাহলে এখন যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন তিনি টিকে যাবেন। অর্থাৎ নির্বাচনের পর আবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও এখনকার প্রেসিডেন্ট পরবর্তী ৫ বছর ক্ষমতায় থেকে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নাই।
॥ দুই ॥
কিন্তু তর্কের খাতিরে বলছি, যদি বিরোধী দল নির্বাচনে জয় লাভ করে এবং সরকার গঠন করে তাহলে ওই প্রেসিডেন্টের অবস্থাটি কি হবে? তিনি তো সাবেক সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সাবেক সরকারি দল নির্বাচনে পর বিরোধী দলে। আর সাবেক বিরোধী দল এখন সরকারি দলে। এই অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে ১০ মাস আগে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কি ১০ মাস পর নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে পারবেন? নাকি ১০ মাস পর নির্বাচিত সরকার ১০ মাস আগে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সাথে কাজ করতে পারবেন? বিষয়টি আরো খোলসা করে বলছি।
বিগত রবিবার পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদের জন্য জল্পনা-কল্পনায় যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন, স্পিকার আব্দুল হামিদ, বিরোধী দলীয় উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক, প্রধান মন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এর আগে আরেকটি নাম উঠে এসেছিল। সেটি হলো সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ। তবে এরশাদ নিজেই এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এরশাদ বলেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হতে চান না, তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান। এরশাদ ছাড়া আর যে ৬টি নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে ৪ জন অর্থাৎ স্পিকার আব্দুল হামিদ, ডেপুটি লিডার সাজেদা চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকার এবং শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা সরাসরি আওয়ামী লীগার। অবশিষ্ট দুই জন অর্থাৎ সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক এবং বাংলার প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান আওয়ামী লীগার না হলেও ‘মোর ক্যাথলিক দ্যান দি পোপ’ অর্থাৎ পোপের চেয়েও বেশি ক্যাথলিক। এদের একজনও বিরোধী দল বা ১৮ দলীয় জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাকেই মনোনীত করুন না কেনো তার সাথে আওয়ামী লীগের স্ট্রং কানেকশন থাকবেই। সে কারণেই কে প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন সে ব্যাপারে আমি মোটেই ইন্টারেস্টেড না।
॥ তিন ॥
বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন ওই সরকারের মেয়াদ শেষে আমি ওই সরকারের মন্ত্রীদের উদ্দেশে লিখেছিলামÑ দেওয়ালের লিখন পড়–ন। তখন সরকারের জনপ্রিয়তার পারদ নিচে নেমে আসছিল। কিন্তু দেওয়ালের লেখা তারা পড়েননি। ২০০০ সালে যখন শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন তখন তার সরকারের মন্ত্রীদের উদ্দেশে লিখেছিলাম, দেওয়ালের লিখন পড়–ন। তাদের জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটারও নেমে আসছিল। তারাও দেওয়ালের লিখন পড়েননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রীদের বলছি, দেওয়ালের লিখন পড়–ন। সুপ্রিমকোর্ট বারসমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্যানেল যে সে হারা হারেনি, একেবারে গো হারা হেরেছে। ১৪টি পদের মধ্যে ১৩টি পদেই জয় লাভ করেছে বিএনপি ও জামায়াতের প্যানেল। আওয়ামী লীগ জিতেছে মাত্র ১টি পদে। এছাড়া বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র নির্বাচনের কথা বাদই দিলাম। মফস্বলের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের খবরা-খবরও পত্র-পত্রিকায় দেখছি। অধিকাংশ জেলাতেই আওয়ামী লীগ বিরোধী প্যানেল জয়লাভ করছে। এগুলো দেখেও কি মনে হয় না, যে ‘মর্নিং সোজ দি ডে’?
সবচেয়ে বেশি করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেটা দেখিয়েছে সেটি হলো- আওয়ামী পন্থী মওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদের শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত ৪০০ লোকের ‘মহা সমাবেশ’। ছোটকালে যখন বুদ্ধি গজায়নি তখন মফস্বল জেলাতে এবং গ্রামে-গঞ্জে পুঁথি পাঠের আসর বসতো। একজন পুঁথি পাঠ করতেন আর অন্যরা পাঠকের চার দিকে বসে সেই পুঁথি পাঠ শুনতেন। আমিও ছোটকালে পুঁথি পাঠ শুনেছি। এমনি একটি পুঁথি পাঠের দুটি লাইন মনে পড়লো। আওমায়ী মওলানা মাসুদের শত লোকের বিশাল মহা সমাবেশ দেখে। পুঁথির দুটি লাইন হলো-
লাখে লাখে সৈন্য মরে
কাতারে কাতার
শুমার করিয়া দেখে
চব্বিশো হাজার
পুঁথিতে তাও সৈন্য মৃত্যুর হার লাখে লাখের জায়গায় ২৪ হাজার ছিল। কিন্তু মওলানা মাসুদ যখন গত ২৩ মার্চের মহাসমাবেশে বলছিলেন যে, আজ এই সমাবেশে হাজির হয়েছেন ‘লাখ লাখ’ তৌহিদি জনতা, তখন তার সামনে পেছনে এবং ডানে বাঁয়ে সাকুল্যে দর্শক শ্রোতার সংখ্যা ছিল ৩০০ থেকে ৪০০। দুপুর ৩টায় দেখা গেলো, ২৪ থেকে ২৫ জন মাত্র মানুষ। মওলানা মাসুদ এবং সেই সুবাদে ওই সভার নেপথ্য উদ্যোক্তা সরকার তো ভেবেছিল যে ওই সভায় লাখ লাখ মানুষ হাজির হবেন। তাই শাপলা চত্বরের চার দিকের রেডিয়াসকে নিñিদ্র পুলিশ বেস্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। দক্ষিণে মধুমিতা সিনেমা হল ও টিকাটুলির মোড়, উত্তরে মতিঝিল ছাড়িয়ে দৈনিক বাংলার মোড়। সমগ্র এলাকা গিজ গিজ করছিল পুলিশ এবং র্যাবে। একজন রসিক রির্পোটার বললেন যে, এই সভায় তো দেখছি দর্শকের চেয়ে পুলিশ এবং র্যাবের সংখ্যাই বেশি। অথচ এই সভার জন্য বিগত ৭ দিন ধরে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। আওয়ামী ঘরানার পত্র-পত্রিকাগুলোতে ঢাউস সাইজের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। টেলিভিশনে দুই দিন ধরে ফরিদ মওলানার সভার খবর বার বার প্রচার করা হয়।
॥ চার ॥
প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের ইন্তেকালের পর ৩ দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্টের প্রতি শ্রদ্ধার নির্দশনস্বরূপ বিরোধী দল তাদের কর্মসূচি বাতিল করে। ঢাকা জেলায় বিএনপির হরতাল কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচিও প্রত্যাহার করা হয়। মওলানা সাঈদীর মুক্তি দাবি করে বগুড়া ও জয়পুর হাটে যে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে সেসব বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বিনা প্ররোচনায় এবং বিনা উসকানিতে গুলি বর্ষণ করে। ফলে বগুড়ায় ১৩ জন এবং জয়পুরহাটে ৬ ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে শাহাদত বরণ করেন। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বেগম জিয়া যে কর্মসূচি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর ফলে বেগম জিয়ার উত্তর বঙ্গের সফরসূচিও বাতিল করা হয়।
সুতরাং দেখা গেলো যে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর কারণে সমগ্রজাতি শোক প্রকাশ করেছে এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য সব কর্মসূচি বাতিল করেছেন। অথচ একজনমাত্র ব্যক্তি এবং একটিমাত্র গোষ্ঠী প্রেসিডেন্টের শোক দিবসকে মোটেই পাত্তা দেয়নি। সেই ব্যক্তি হলো শোলাকিয়া ঈদগাহের ঈমাম মওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ। তিনি তো ভেবেছিলেন যে সরকার যখন তার পেছনে আছে তখন দেশের সমস্ত আলেম ওলামা ঝাঁকে ঝাঁকে তার সভায় আসবেন। সেই ভরসায় কাউকে কোনো পাত্তা না দিয়ে, প্রেসিডেন্টের মুত্যু উপলক্ষে উদযাপিত ৩ দিনব্যাপী জাতীয় শোককে অশ্রদ্ধা দেখিয়ে মওলানা ফরিদ শাপলা চত্বরে যে মহাসমাবেশ করেন সেটি চূড়ান্ত পরিণামে একটি ক্যারিকেচারে পরিণত হয়। দর্শক শ্রোতার সংখ্যা এতো কম দেখে মঞ্চে উপবিষ্ট অন্যসব মওলানা লজ্জায় মাটির দিকে সারাক্ষণ চোখ নামিয়ে ছিলেন।
কেন মওলানা মাসুদের এই সমাবেশটি সুপার ফ্লপ করলো? ঐ যে বলেছি সেই দেওয়ালের লিখন। সরকার যদি দেওয়ালের লিখন পড়তেন তাহলে বিলক্ষণ বুঝতে পারতেন যে তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। ঢাকার বাইতুল মোর্কারমসহ সারা দেশের আলেম ওলামাদের ওপর এই সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী পেশী সঞ্চালকরা ভয়াবহ জুলুম চালিয়েছে, পাখীর মতো গুলি করে মানুষ মেরেছে, শত শত আলেমকে লাল দালানে আটকে রেখেছে। তার পরে আর মানুষ সরকার দলীয় আলেম মওলানা মাসুদের ডাকে সাড়া দেবে কেন? এখন তো ফরিদ উদ্দিন মাসুদ দালাল মওলানা বলে মশহুর হয়েছেন।
এখনো সময় আছে, সরকার এবং মাসুদ মওলানারা দেওয়ালের লিখন পড়–ন। এখনো সময় আছে, আল্লামা সফি এবং হেফাজতে ইসলামের কথা শুনুন।
email: journalist15@gmail.com
Comments