সারা দেশে ৩৬০ মামলা আসামি তিন লাখ
- Get link
- X
- Other Apps
গোলাম মর্তুজা | তারিখ: ২২-০৩-২০১৩
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গায় জামায়াত-শিবির কুপিয়ে হত্যা করে চার পুলিশকে। সেদিন সুন্দরগঞ্জ সদরে সহিংসতায় নিহত হন আরও চারজন। এসব ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়। এক হাজার ৩৬৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫৯ হাজার ৮৪৫ জনকে মামলাগুলোয় আসামি করা হয়। তবে গত ২১ দিনে সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৬০ জন।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৫ নভেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে পুলিশের ওপর জামায়াত-শিবিরের হামলার মাধ্যমে সহিংসতা শুরু হয়। সেই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে চলা সহিংসতার ঘটনায় ৩৬০টি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় তিন লাখেরও বেশি লোককে। নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা পাঁচ হাজারের মতো।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, এসব মামলায় এ পর্যন্ত দুই হাজারের কিছু বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের এক হাজার ১০০ জন নেতা-কর্মী বলে পুলিশ দাবি করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া সবাই কারাগারে রয়েছেন। এই সহিংসতার মামলা ছাড়াও ৫ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় ১৬ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
সহিংসতার এসব মামলায় আসামির এই বিপুল সংখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, একটি এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া সব মামলায় ঘুরেফিরে একই ব্যক্তি আসামি। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মামলায় তাদের বারবার হিসাবে আনতে হচ্ছে। তাই আসামির সংখ্যা এত বড় হয়েছে।
পুলিশের হিসাবে ঢাকাসহ সারা দেশের ১৯টি স্থানে ব্যাপক সহিংসতা হয়। এর মধ্যে গাইবান্ধা, বগুড়া, সাতক্ষীরা, রংপুর, চট্টগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাণ্ডব ছিল উল্লেখযোগ্য।
বগুড়া: দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাচ্ছে, এমন গুজব ছড়িয়ে এবং মানুষকে উসকানি দিয়ে ৩ মার্চ বগুড়া জেলাজুড়ে তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবির। ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় নিহত হয় ১৫ জন। জেলা সদরের পাঁচটি পুলিশ ফাঁড়ি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়ি, স্থানীয় সাবেক ও বর্তমান দুই সাংসদের বাড়ি এবং নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলা হয়েছে নন্দীগ্রাম ও শাজাহানপুর থানা, উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে।
ব্যাপক ওই সহিংসতার পর জেলার আটটি থানায় ৫৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় প্রায় চার হাজার জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় দেড় লাখ অজ্ঞাতনামা লোককে আসামি করা হয়। এই ৫৪টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫১ জনকে। তবে এরা নাম উল্লেখ করা, নাকি অজ্ঞাতনামা আসামি, তা জানা যায়নি।
বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫৪টি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার কথা অনেক। কিন্তু নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যাই প্রমাণ করে যে গণগ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, কিছু গণমাধ্যম পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে গণগ্রেপ্তারের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সাতক্ষীরা: ২৮ ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী সহিংসতায় সাতক্ষীরায় ১১ জন নিহত হয়। এসব ঘটনায় জেলার ছয়টি থানায় ৬৫টি মামলা হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৫০ হাজার জনকে আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৯০ জন।
রংপুর: জেলায় পুলিশের এক সদস্যসহ সাতজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় পীরগাছা ও মিঠাপুকুর থানায় দুটি মামলায় আসামি ১৩৯ জন। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৫ জন।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভাগের সাত জেলায় ৮০টি এবং চট্টগ্রাম নগরে ৩৫টি মামলা হয়েছে। এতে এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা দুই হাজার ৬০২ জন। আর অজ্ঞাত আসামি ৮৫ হাজার ৪৯৩ জন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলায় এসব মামলা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশ কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেনি বলে জানা গেছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা: চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভাগের আরও কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ১৪টি মামলা হয়েছে। এতে ৩৫৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা আরও ২৭ হাজার ৬৬ জন।
চট্টগ্রাম নগরের চিত্র: গত ১ ডিসেম্বর থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে সহিংসতার ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পুলিশ কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেনি। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জামায়াত-শিবিরের সহিংস কর্মসূচি শুরু হয় চট্টগ্রাম নগরে। ওই সময় ১১টি মামলা হয়। জানুয়ারিতে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। মামলা হয়েছে দুটি। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে জামায়াত-শিবির আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পুলিশ ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি মামলা নথিভুক্ত করে। মার্চের তিন সপ্তাহে সাতটি মামলা নথিভুক্ত হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: শিবগঞ্জের কানসাটে অবস্থিত জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়, সংলগ্ন আবাসিক এলাকা ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটপাট চালায় জামায়াত-শিবির। এ ঘটনায় শিবগঞ্জ থানায় ১৪টি মামলায় ৩০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৩০ জন।
সিলেট: এই বিভাগে চারজন নিহত হয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় ৪৮টি মামলা দায়ের করা হয় বিভিন্ন থানায়। এসব মামলায় কয়েক হাজার আসামি থাকলেও গ্রেপ্তার হয়েছে ২৫৭ জন। ৪৮টি মামলার মধ্যে দ্রুত বিচার আইনে দায়ের হওয়া সাতটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।
পুলিশের সিলেট রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মকবুল হোসেন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, একের পর এক ঘটনা ঘটছে। একটি ঘটনার তদন্ত চলাকালীন অনেক ঘটনা ঘটায় তদন্তের গতি কমে যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেই একেকটি ঘটনা সামাল দেওয়া হচ্ছে।
অন্যান্য: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে দুজন এবং বাঘায় একজন গুলিতে নিহত হয়। তবে কোনো জায়গাতেই হত্যা মামলা হয়নি। রাজশাহী বিভাগে ৫৩টি মামলা হয়েছে। আর রাজশাহী মহানগরের চারটি থানায় মামলা হয়েছে ১১টি।
২৮ ফেব্রুয়ারির সহিংসতায় ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়ায় গুলিতে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলায় এক হাজার ৭০০ জনকে আসামি করা হলেও এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাত্র দুজনকে।
দিনাজপুরের সদর, রানীরবন্দর, কাহারোল ও বীরগঞ্জ উপজেলায় সাতটি মামলায় আসামি নয় শতাধিক। তবে কোনো গ্রেপ্তার নেই।
নীলফামারীর জলঢাকা ও সদর উপজেলায় তিনটি মামলায় আসামি ৭০০ জন। এখানে গ্রেপ্তার হয়েছে ২৫ জন।
মামলা ও আসামির এই বিপুল সংখ্যা এবং এর প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এ সমস্ত ঘটনায় এলাকার প্রত্যেকে জড়িত ছিল না। যারা জড়িত ছিল, তাদের সবার অপরাধের মাত্রা ও ধরন এক রকম নয়। ঘটনার প্রধানদের চিহ্নিত করতে হবে। আর এই মামলাগুলো যেন পুলিশ-প্রশাসনের অবৈধ অর্থ উপার্জনের উপকরণ না হয়, কোনো সাধারণ মানুষকে যেন এ সমস্ত মামলায় হয়রানি করা না হয়, সে দিকে সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও এ বিষয়ে নজরদারি করবে।
প্রথম আলোকে এই প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় মিজানুর রহমান সুন্দরগঞ্জের ধ্বংসযজ্ঞস্থলে ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে যে বীভৎস হামলা চালানো হয়েছে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি ফেরানোর জন্য সরকারকে এর ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই এ সমস্ত ঘটনার বিচার-প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়।
(সহযোগী প্রতিবেদক: একরামুল হক, চট্টগ্রাম; উজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট; আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া; আরিফুল হক, রংপুর; শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা; কল্যাণ ব্যানার্জী, সাতক্ষীরা; আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ, রাজশাহী)
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৫ নভেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে পুলিশের ওপর জামায়াত-শিবিরের হামলার মাধ্যমে সহিংসতা শুরু হয়। সেই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে চলা সহিংসতার ঘটনায় ৩৬০টি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় তিন লাখেরও বেশি লোককে। নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা পাঁচ হাজারের মতো।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, এসব মামলায় এ পর্যন্ত দুই হাজারের কিছু বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের এক হাজার ১০০ জন নেতা-কর্মী বলে পুলিশ দাবি করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া সবাই কারাগারে রয়েছেন। এই সহিংসতার মামলা ছাড়াও ৫ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় ১৬ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
সহিংসতার এসব মামলায় আসামির এই বিপুল সংখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, একটি এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া সব মামলায় ঘুরেফিরে একই ব্যক্তি আসামি। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মামলায় তাদের বারবার হিসাবে আনতে হচ্ছে। তাই আসামির সংখ্যা এত বড় হয়েছে।
পুলিশের হিসাবে ঢাকাসহ সারা দেশের ১৯টি স্থানে ব্যাপক সহিংসতা হয়। এর মধ্যে গাইবান্ধা, বগুড়া, সাতক্ষীরা, রংপুর, চট্টগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাণ্ডব ছিল উল্লেখযোগ্য।
বগুড়া: দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাচ্ছে, এমন গুজব ছড়িয়ে এবং মানুষকে উসকানি দিয়ে ৩ মার্চ বগুড়া জেলাজুড়ে তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবির। ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় নিহত হয় ১৫ জন। জেলা সদরের পাঁচটি পুলিশ ফাঁড়ি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়ি, স্থানীয় সাবেক ও বর্তমান দুই সাংসদের বাড়ি এবং নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলা হয়েছে নন্দীগ্রাম ও শাজাহানপুর থানা, উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে।
ব্যাপক ওই সহিংসতার পর জেলার আটটি থানায় ৫৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় প্রায় চার হাজার জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় দেড় লাখ অজ্ঞাতনামা লোককে আসামি করা হয়। এই ৫৪টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫১ জনকে। তবে এরা নাম উল্লেখ করা, নাকি অজ্ঞাতনামা আসামি, তা জানা যায়নি।
বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫৪টি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার কথা অনেক। কিন্তু নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যাই প্রমাণ করে যে গণগ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, কিছু গণমাধ্যম পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে গণগ্রেপ্তারের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সাতক্ষীরা: ২৮ ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী সহিংসতায় সাতক্ষীরায় ১১ জন নিহত হয়। এসব ঘটনায় জেলার ছয়টি থানায় ৬৫টি মামলা হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৫০ হাজার জনকে আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৯০ জন।
রংপুর: জেলায় পুলিশের এক সদস্যসহ সাতজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় পীরগাছা ও মিঠাপুকুর থানায় দুটি মামলায় আসামি ১৩৯ জন। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৫ জন।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভাগের সাত জেলায় ৮০টি এবং চট্টগ্রাম নগরে ৩৫টি মামলা হয়েছে। এতে এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা দুই হাজার ৬০২ জন। আর অজ্ঞাত আসামি ৮৫ হাজার ৪৯৩ জন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলায় এসব মামলা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশ কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেনি বলে জানা গেছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা: চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভাগের আরও কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ১৪টি মামলা হয়েছে। এতে ৩৫৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা আরও ২৭ হাজার ৬৬ জন।
চট্টগ্রাম নগরের চিত্র: গত ১ ডিসেম্বর থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে সহিংসতার ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পুলিশ কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেনি। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জামায়াত-শিবিরের সহিংস কর্মসূচি শুরু হয় চট্টগ্রাম নগরে। ওই সময় ১১টি মামলা হয়। জানুয়ারিতে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। মামলা হয়েছে দুটি। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে জামায়াত-শিবির আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পুলিশ ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি মামলা নথিভুক্ত করে। মার্চের তিন সপ্তাহে সাতটি মামলা নথিভুক্ত হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: শিবগঞ্জের কানসাটে অবস্থিত জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়, সংলগ্ন আবাসিক এলাকা ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটপাট চালায় জামায়াত-শিবির। এ ঘটনায় শিবগঞ্জ থানায় ১৪টি মামলায় ৩০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৩০ জন।
সিলেট: এই বিভাগে চারজন নিহত হয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় ৪৮টি মামলা দায়ের করা হয় বিভিন্ন থানায়। এসব মামলায় কয়েক হাজার আসামি থাকলেও গ্রেপ্তার হয়েছে ২৫৭ জন। ৪৮টি মামলার মধ্যে দ্রুত বিচার আইনে দায়ের হওয়া সাতটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।
পুলিশের সিলেট রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মকবুল হোসেন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, একের পর এক ঘটনা ঘটছে। একটি ঘটনার তদন্ত চলাকালীন অনেক ঘটনা ঘটায় তদন্তের গতি কমে যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেই একেকটি ঘটনা সামাল দেওয়া হচ্ছে।
অন্যান্য: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে দুজন এবং বাঘায় একজন গুলিতে নিহত হয়। তবে কোনো জায়গাতেই হত্যা মামলা হয়নি। রাজশাহী বিভাগে ৫৩টি মামলা হয়েছে। আর রাজশাহী মহানগরের চারটি থানায় মামলা হয়েছে ১১টি।
২৮ ফেব্রুয়ারির সহিংসতায় ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়ায় গুলিতে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলায় এক হাজার ৭০০ জনকে আসামি করা হলেও এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাত্র দুজনকে।
দিনাজপুরের সদর, রানীরবন্দর, কাহারোল ও বীরগঞ্জ উপজেলায় সাতটি মামলায় আসামি নয় শতাধিক। তবে কোনো গ্রেপ্তার নেই।
নীলফামারীর জলঢাকা ও সদর উপজেলায় তিনটি মামলায় আসামি ৭০০ জন। এখানে গ্রেপ্তার হয়েছে ২৫ জন।
মামলা ও আসামির এই বিপুল সংখ্যা এবং এর প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এ সমস্ত ঘটনায় এলাকার প্রত্যেকে জড়িত ছিল না। যারা জড়িত ছিল, তাদের সবার অপরাধের মাত্রা ও ধরন এক রকম নয়। ঘটনার প্রধানদের চিহ্নিত করতে হবে। আর এই মামলাগুলো যেন পুলিশ-প্রশাসনের অবৈধ অর্থ উপার্জনের উপকরণ না হয়, কোনো সাধারণ মানুষকে যেন এ সমস্ত মামলায় হয়রানি করা না হয়, সে দিকে সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও এ বিষয়ে নজরদারি করবে।
প্রথম আলোকে এই প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় মিজানুর রহমান সুন্দরগঞ্জের ধ্বংসযজ্ঞস্থলে ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে যে বীভৎস হামলা চালানো হয়েছে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি ফেরানোর জন্য সরকারকে এর ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই এ সমস্ত ঘটনার বিচার-প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়।
(সহযোগী প্রতিবেদক: একরামুল হক, চট্টগ্রাম; উজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট; আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া; আরিফুল হক, রংপুর; শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা; কল্যাণ ব্যানার্জী, সাতক্ষীরা; আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ, রাজশাহী)
- Get link
- X
- Other Apps
Comments