গণহত্যা রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ


আর্কাইভ: --
 


শওকত মাহমুদ
« আগের সংবাদপরের সংবাদ»
সময়টা কি একাত্তরের মার্চের মতো নয়? জল্লাদ ইয়াহিয়ার বাহিনী তখন মুক্তিপাগল, গণতন্ত্রপিপাসু বাংলাদেশিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আজ হাসিনা সরকারের র্যাব-পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষক বিজিবি নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি-গ্যাস চালাচ্ছে। তারা একদিনে অর্থাত্ ২৮ ফেব্রুয়ারির কালো দিনে অর্ধশতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। আমরা কি এমন কখনও দেখেছি? না, একাত্তরের উত্তাল ফেব্রুয়ারি-মার্চেও নয়। শহরে শহরে র্যাব-পুলিশকে বিনা উস্কানিতে শত শত রাউন্ড গুলি ছুড়তে দেখিনি। কিন্তু ২০১৩-তে দেখছি। কী জন্য? স্রেফ একজনের প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখতে। সর্বত্র শুরু হয়েছে গণহত্যা। ধরে নিয়ে কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করছে। জানি না কোথায় গণকবর দেয়া হচ্ছে। বা কোন পুকুরে লাশের সারি ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। জেলবন্দী বা রিমান্ডে আটকদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার হচ্ছে। খুনি স্টালিনের নব্য অনুসারী বোধহয় গোটা বিশ্বে এখন একমাত্র বাংলাদেশে। স্টালিন বলতেন, ‘হত্যা সব সমস্যার সমাধান’। বন্দীদের কাছ থেকে যারা স্বীকারোক্তি নিত তাদের স্টালিন বলত, There is a man, there is a problem. No men no problem (Arguably Essays; Christoper Hitchens). সোভিয়েত ইউনিয়নের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আলেকজান্ডার সোলসেনিিসন বলেছিলেন, স্টালিন প্রায় বলতেন এক ব্যক্তির মৃত্যু বিয়োগান্তক ঘটনা; কিন্তু ১০ লাখের মৃত্যু একটি পরিসংখ্যান (Statistics) মাত্র। বাংলাদেশে এখন কার নির্দেশে, ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা জুডিশিয়াল ইনকোয়ারির কথা না বলাই ভালো, এমন হত্যাযজ্ঞ হচ্ছে? একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন, ‘এখন পুলিশ গুলি খরচ না করলে শাস্তি পেতে হয়। আপনি দেখছেন, তোপখানার মোড়ে দাঁড়ানো পুলিশ যদি বায়তুল মোকাররম থেকে আসা মুসল্লিদের ওপর গুলি শুরু করে তখন হাইকোর্টের মোড়ে, কাকরাইল মোড়ে, প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়ানো পুলিশও গুলি ছুড়তে শুরু করে। কেন? এক, গুলি খরচ না করার শাস্তির ভয়ে। দুই. সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে। আগে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের নিয়মেই যাচ্ছে না পুলিশ।’ মার্চের এই নতুন খান- সেনাদের সঙ্গে রাজাকার হিসেবে যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলোর গুণ্ডারা এবং শাহবাগের নেতৃত্বে থাকা ডিজুস জেনারেশনের একটা অংশ, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোকিত তরুণ সমাজের কোনো মিল নেই। জাতীয় কবি নজরুলের সেই বাণী স্মরণ করুন—পথের ঊর্ধ্বে ওঠে ঝড়ো বায়ে পথের আবর্জনা।
তাই বলে ওরা ঊর্ধ্বে উঠেছে কেহ কভু ভাবিও না।
গণতন্ত্রের মুখোশে ফ্যাসিবাদ আজ নাগিনীর বিষাক্ত ফণা তুলেছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রক্তাক্ত জন্মের পেছনে আপামর জনসাধারণের ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধের আগুন ছিল। আজ এক ধাপ পিছিয়ে সেদিনকে স্মরণ করে দু’ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই বীরত্বগাথা হঠাত্ মূর্তিমান ইতিহাস হয়ে আজ বাংলাদেশের কাছে সরে এসেছে। মনে হতে পারে ধর্ম, দেশ, গণতন্ত্র বোধহয় যায় যায়। কিন্তু না, প্রতিরোধে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। এই অগ্রগমন সময়ের দাবি। চলুন এগোই। ববর্রতার প্লাবণে বাংলাদেশকে নিমজ্জিত করার চক্রান্ত সফল হয়নি।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে শনিবার যে বিশাল শান্তিপূর্ণ গণমিছিল হলো, তা সেই রুখে দাঁড়ানোর চেতনা থেকেই। কিন্তু সরকার বাধা দিল। চক্রান্ত অনুযায়ী মিছিলের ওপর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বোমা ফেলল, গাড়ি ভাংচুর করল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো পুলিশের গুলি, টিয়ারগ্যাস। মৌচাকে বোমা ফাটাল, শান্তিনগর, মালিবাগে পুলিশের ববর্রতা শুরু হলো। এ কেমন কথা? উল্টো বিএনপি নেতাদের নামে মিথ্যা মামলা। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক হানিফ খোয়াব দেখেছেন, ২/১ দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। ওই গণমিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা বা বোমা ফাটানো তো হয়নি। বিশাল এবং সফল মিছিল যারা করে, তারা তো নিজের মিছিল পণ্ড করে না। পুলিশের আক্রমণে খিলগাঁও থানা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক লতিফ খান নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি আমার এলাকা বুড়িচংয়ের লরীবাগ গ্রামে। অভিবাদন এই শহীদকে। আরও অনেকে সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কোথায়, কীভাবে বেঁচে আছেন জানি না।
বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড চলমান আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও রায়কে যথার্থভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন। ফ্যাসিবাদে অতিষ্ঠ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মুখর এবং হাসিনা সরকার ও ভারত সরকারের যৌথ প্রযোজনায় শাহবাগ মঞ্চের ব্লগারদের উচ্চারিত ইসলামবিদ্বেষে তীব্র ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের জনগণ দেশ রক্ষায় আওয়ামী সরকারকে বিদায়ের এক দফার দিকে যাচ্ছে। এই রোববার বগুড়ায় পুলিশের গুলিতে সাতটি প্রাণ ঝরেছে। সর্বত্র রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ। সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে চালানো হচ্ছে গণহত্যা। সেনা নামানো হয়েছে পরিস্থিতি শান্ত করতে। আবার সেনা বিষয়ে সংবেদনশীল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্টো কথা বলেছেন। গোটা বাংলাদেশ আজ ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। সড়ক পথে, রেল পথে অবরোধ আর অবরোধ। র্যাব-পুলিশের গুলি, সেনা প্রহরা, ১৪৪ ধারা, কারফিউ অথবা ইমার্জেন্সি কতটুকু রক্ষা করবে হাসিনা সরকারকে? টিভি খুললেই লাঠি হাতে অযুত জনতা এবং গুলিবর্ষণরত বিজিবি-র্যাব-পুলিশের ছবি। ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার এতো লোভ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো এই ফ্যাসিবাদীদের অন্তঃবাসনা এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন—‘আর কিছু না বুঝি একটা কথাই ক্রমে স্পষ্ট হয়ে আসছে; এত আগুনেও কলিযুগের অন্ত্যেষ্টি সত্কার হলো না, মন বদল হয়নি। কলিযুগের সেই সিংহাসনটা আজ কোনখানে। লোভের উপরে। পেতে চাই, রাখতে চাই, কোনোমতেই কোথাও একটুও ছাড়তে চাইনে। সে জন্যই অতিবড় বলিষ্ঠের ভয়, কী জানি দৈবাত্ এখন বা সুদূরকালেও একটুখানি লোকসান হয়। যেখানে লোকসান কোনোমতেই সইবে না, সেখানে আইনের দোহাই, ধর্মের দোহাই মিথ্যে’ (বাতায়নিকের পত্র, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী)। নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে খুঁড়িয়ে দিতে জঙ্গিবাদ বা একাত্তরের কথিত ঘাতক দমনের দস্তানা পরে হাসিনা সরকার ফ্যাসিবাদী আক্রমণ শুরু করেছে। উদার মুসলিম সমাজ হিসেবে বিশ্বসভ্যতায় বাংলাদেশ যতটা আলোকিত স্থান অর্জন করেছিল, আজ সেখানে সভ্যতার সব আদর্শ, সভ্যতাকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে অমানুষিক নিষ্ঠুরতায়। উন্মত্ত দানবিকতায় দেশকে অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা প্রধানমন্ত্রীকে সহিংসতা থেকে সরে আসার উদাত্ত আহ্বান রাখছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা শুনছেন না। আমেরিকার ফরেন ‘অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের’ ২০০৮ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছিল … history has taught us that tyranny often looks stronger than at really is, that it has unexpected vulnerabilities very often to do with the hunt fact that tyranny, as much, is incapable of self-analysis. (ইতিহাসের শিক্ষা হলো অত্যাচারী স্বৈরশাসককে প্রায়ই বাস্তবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে হয়। এসব দুঃশাসনের জন্য কিছু অপ্রত্যাশিত বিপদ থাকে, যেমন তারা আত্মবিচারে অক্ষম হয়ে পড়ে)। শেখ হাসিনার সরকার গোটা দেশের আগুন, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি মালুম করতে পারছে না। শাহবাগিদের ইসলামবিদ্বেষে সায় দিয়ে গণহত্যা উস্কে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে ধিকৃত সরকারে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন আবারও প্রমাণ করেছে বেগম খালেদা জিয়াই অবিসংবাদিত এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী যিনি ধর্ম, গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের অন্তরাত্মার অজেয় প্রতীক।
পবিত্র কোরআন শরিফের সূরা নিস-এর ৯২ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি অপর মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম। তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। সূরা মায়াদায় বলা হয়েছে, (আয়াত-৩১) অযথা কেউ কাউকে যদি হত্যা করে তবে সে মানব জাতিকেই হত্যা করল।
ভারতের রাষ্ট্রপতির সফর
ভারতের রাষ্ট্রপতি অগ্রগণ্য রাজনীতিক প্রণব মুখার্জি এখন বাংলাদেশে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। তাকে স্বাগত। কিন্তু তিনি কি বাংলাদেশের চলমান ফ্যাসিবাদ, গণতন্ত্রহীনতা, গণহত্যা, গুলি, লাশ, আগুন অনুভব করতে পারবেন? নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ফ্যাসিবাদের জনক মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি গিয়ে ফ্যাসিবাদ দেখতে পাননি, শুধু একনায়কতন্ত্রের জয়গান শুনেছেন, সেরকম আপনি কি জেগে ঘুমাবেন? শাহবাগ আন্দোলনে ভারত মদত দিচ্ছে বলে ভারতের শীর্ষ দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া খবর দিয়েছে। ভারত বা বাংলাদেশের সরকার এমনকি শাহবাগিরা পর্যন্ত সে খবরের প্রতিবাদ করেনি। এর আগে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদের জন্য ভারতকে দায়ী করে লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ প্রতিবেদন ছেপেছিল। ভারত কোনো রা-ই করেনি। এবার আপনি কী বলবেন? সংঘাত পরিহার করে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলবেন, কিন্তু হত্যাযজ্ঞের হোতাদের জন্য কোনো বাণী রাখবেন না? আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভারতের লেখক-শিল্পীরা কী দারুণ সংগ্রামই না করেছিলেন গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে। বাঙালি কমিউনিস্ট নেতা আবদুল হালিম লিখেছিলেন, ‘ফ্যাসিজমের মূল প্রচারনীতি হইতেছে ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধে ঘৃণা, অবজ্ঞা ও নিন্দাবাদ প্রচার করা। জনগণ জানে ফ্যাসিজম তাহাদের ধ্বংস করিয়া দিবার মতলবে নিদারুণ অত্যাচার-নির্যাতন করিতেছে।’ ১৯৪৪ সালের ১৫-১৭ জানুয়ারি কলকাতায় ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের দ্বিতীয় সম্মেলনের সভাপতি প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেছিলেন, ‘ফ্যাসিজম মানুষের চিন্তা ও জগতের শত্রু। স্বনামধন্য সাংবাদিক লেখক [ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা] আবুল মনসুর আহমদ বলেছিলেন, ভারতের হিন্দু ও মুসলমানের জীবনাদর্শের এবং ঐতিহাসিক শিক্ষা ফ্যাসিজমের বিরোধী। কাজেই ভারতের লেখক ও শিল্পীদের ফ্যাসিস্ট বিরোধিতা একটা নেতিবাচক ভাব-বিলাসিতা নহে। ইহার মধ্যে আমাদের জীবনের যোগ আছে।’ জনাব প্রণব মুখার্জি আপনি যদি সেই ভারতের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হয়ে থাকেন, আপনি যদি সেই প্রতিবাদী বাংলার উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন তাহলে বলুন বিরোধী দল, সংবাদপত্র দমন এবং মানুষের ওপর গণহত্যা চালানো আমরা সমর্থন করি না। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ইতালি গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, তার সফর মুসোলিনিকে ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করেছে। তখন রবীন্দ্রনাথ লন্ডনের ‘দ্য স্টার’ পত্রিকায় সাক্ষাত্কারে বললেন, ‘যে সব ইতালীয় আমার সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছিলেন, তারা আমার বক্তব্যকে বিকৃত করেছেন। জানতে পারলাম, এমন ধারণার নাকি সৃষ্টি হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদের প্রতি আমার একটা নিরুচ্চার মুগ্ধতা ছিল। কাজেই তীব্র অনিচ্ছা নিয়েই আমি এই ভ্রান্ত ধারণার নিরসনে বাধ্য হলাম। ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়তো একদিন তাই বলবেন, কিন্তু ততক্ষণে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক লাল পানি গড়াতে পারে। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের দুঃশাসন এবং মাইনাস টু ফর্মুলার প্রতি ভারতের সমর্থন ছিল এবং মইনুদ্দিনকে দিল্লির লাল গালিচা সংবর্ধনা প্রদানের ঘটনা ছিল প্রণব মুখার্জির পররাষ্ট্রমন্ত্রিত্বের কালে। সেই ধূম্রজাল থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে সময় লেগেছে বৈকি।
শাহবাগ প্রসঙ্গ
শাহবাগের মঞ্চ সম্পর্কে মানুষ যতই জানছে, ততই জনসমাগম সেখানে কমছে। জাতীয় পতাকা এখন সরকারের ভবনে ওঠে ইমরান সরকারের কথায়। ইমরান দাবিও করছে সরকারের চেয়ে তারা শক্তিশালী। ফাঁসির দাবি থেকে নানা দাবিই সেখানে উঠছে। এক তরুণ আমাকে বলেছে ভুল করেছি। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে মা’কে মেরে ফেলেছি। একশ্রেণীর মিডিয়া এখনও বুনো আত্মবিশ্বাসে সাংবাদিকতার ব্যাকরণ ভুলে শাহবাগকে উন্মুক্ত এবং উন্মত্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এই আন্দোলন হত্যার জিঘাংসা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ফাঁসির মঞ্চে পাঠানোর ফ্যাসিবাদকে জন্ম দিয়েছে। মিডিয়া বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। সত্য লুকাচ্ছে। পুলিশের গণহত্যা নিয়ে কোনো অনুসন্ধান করছে না। জামায়াতের তাণ্ডব বলে সবকিছু আড়াল করছে। তাণ্ডব যদি জামায়াত-শিবিরের হয়, তবে সাধারণ মানুষ মরছে কেন? পুলিশ সমানে গুলি করছে, প্রতিপক্ষের গুলিবর্ষণের ছবি তো টিভিতে নেই। শাহবাগে লোক কম হলেও মিডিয়া দেখায় না। শাহবাগকে সমর্থন করে না, এমন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মৃত্যু ঘটানোর আহ্বান পর্যন্ত প্রচার করছে ওইসব অন্ধ আবেগী মিডিয়া। কিন্তু বাংলাদেশজুড়ে যে বিক্ষোভের আগুন, তা কি তাদের অনুভবে নেই? বাংলা সাহিত্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ধারার অন্যতম পত্রিকা কলকাতার পরিচয় এ ‘সংস্কৃতির সঙ্কট’ শীর্ষক প্রবন্ধে হীরেন মুখার্জির এই মতটি তাদের জন্য প্রযোজ্য, ‘একথা যারা ভুলে যাচ্ছেন, তারা ওই পাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে ভাবছেন, ঝড় কেটে যাবে তাদের স্পর্শ না করে।... ঝড় আসছে জেনেও তারা তৈরি হচ্ছেন না। কারণ আসলে তারা চান না যে ঝড় আসে, যে আমাদের সমাজের রূপ বদলায়।’ হে গণমাধ্যম হুঁশে ফিরুন। হে টকশো’ সঞ্চালক-সঞ্চালিকাগণ, নিরপেক্ষ হোন। এক সময় আনন্দবাজার বা দেশ সাময়িকী ছিল ফ্যাসিবাদের সমর্থনে। দেশ পত্রিকা তার প্রথম বছর প্রথম সংখ্যায় হিটলার ও জার্মানি নিবন্ধে লিখেছিল... ‘জার্মান জাতি যখন পরাজয়ের গ্লানি লইয়া অবসাদের অন্ধকারে দুঃসহ ব্যথা ভোগ করিতেছিল, সেই সময় আবার আশা ও শক্তির বাণী লইয়া আবির্ভূত হইলেন হিটলার। আজ তিনি জার্মানির সর্বপ্রভূ। সমস্ত জাতির কাছে আজ তিনি ত্রাণকর্তা রূপে প্রতিভাত হইতেছেন।’ পরে এইসব পত্রিকার সম্বিত ফিরেছিল। শাহবাগ মঞ্চের ইসলামবিদ্বেষীরা বহুদিন থেকেই আল্লাহ-রাসুল সম্পর্কে ঘৃণ্য প্রচারণা চালাচ্ছে। হাইকোর্ট গত মার্চ মাসে তাদের ইসলামবিরোধী প্রচারণা বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকার তাদের ধারেকাছেও যায়নি। আজ তারা নাস্তিক মহলের প্ররোচনায় ও মদতে শাহবাগে গেড়ে বসেছে। বাংলাদেশকে ডিক্টেট করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। এ প্রজন্ম কি হঠাত্ করেই মাটি ফুড়ে বেরিয়েছে? না, এই নাস্তিক, ধর্মবিদ্বেষী, অসভ্য তরুণদের উত্থানের মধ্যে সেই ডিজুস (ডিজিটাল জুস) প্রচারণার কথা মনে পড়ে। গ্রামীণফোনের মাথা কোম্পানি টেলিনর ডিজুস ক্যাম্পেইনের প্রবর্তক। একুশ শতকের শুরুতে বাংলাদেশের এই ক্যাম্পেইন দিয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যান্ডসঙ্গীতের দল খোঁজা হয়েছিল। ক্যাম্পেইনের অশ্লীলতার কারণে গ্রামীণফোন তা ত্যাগ করে। গ্রামীণফোনের ওই সময়ের তরুণ কর্মকর্তারা এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন সেল কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রচারণা বাজেটকে চুষে খাচ্ছে। এই ডিজুস মানে হলো উদ্দ্যমী আনন্দের অন্বেষণ। তরুণদের বাঁধভাঙা সংঘবদ্ধতা কিছু একটার জন্য। আমাদের বড় বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রোডাকশন এবং সেলফোন কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগগুলোয় ভারতীয় তরুণরা দাপটে বসে আছে। এদেশে তারা বিয়ে শাদিও করেছে। এদের শাহবাগেও দেখা গেছে। কলকাতা থেকে সতীর্থদের আনিয়েছেন। তারা বিজ্ঞাপনে হিন্দি শব্দ ধামাকা জুড়ে দেয়ার সময় মোটেও ভাবে না, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। গ্রামীণফোনের ‘আলো আসছে’ শীর্ষক একটি বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হতো, আলোর জন্য ঘরে কয়েক বালক কোরআন শরিফ পাঠ করা থেকে বিরত হয়ে বাইরে দৌড় দিল। অর্থাত্ ধর্মের আলোর চেয়ে ডিজুসের আলো আকর্ষণীয়। ডিজুসের অশ্লীল বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ছেয়ে ফেলা হয়েছিল। তখন বিএনপি সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। বাংলালিঙ্কের দিনবদলের স্লোগান ছিল রাজনৈতিক। অথবা সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপন ‘সহি মোবাইলনামা’ ইসলামি আমলনামার প্রতি ব্যঙ্গাত্মক। এদের বক্তব্যই হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসহীন, তা বাংলাদেশের নৈতিক মূল্যবোধ রহিত দেশ-সমাজ, ইতিহাস সম্পর্কে অনবহিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের খণ্ডিত অংশ এবং মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সংগ্রামের ইতিহাস তারা জানে না। লক্ষ্য ভোগবাদী স্ফূর্তিবাজ, মুরব্বি অমান্যকারী এক প্রজন্ম তৈরি করা। ভারতীয় বিএসএফের পাঠানো ফেনসিডিল আর উচ্চবিত্ত চোরাচালানিদের আনা ইয়াবা তাদের জন্য নতুন স্বর্গ তৈরি করেছে। এই ডিজুস জেনারেশনের একটা অংশ শাহবাগে বসেছে। আর সেল কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপননির্ভর টিভিগুলো যেখানে ডিজুস সাংবাদিক এবং প্রোগ্রাম প্রডিউসার রয়েছেন তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে অসত্যের মচ্ছব করছে। বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো থার্টিফার্স্ট নাইটের কনসার্টগুলোর জন্য অঢেল স্পন্সর পায়। কিন্তু রবীন্দ্র-নজরুলগীতি এমনকি জোর গলায় বলতে পারি, জহির রায়হানের ‘বরফ গলা নদী’র মতো নাটকও যদি এখন হয় স্পন্সর পাবে না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এমনি। যৌনতার সুড়সুড়ি এনে নারীকে কতভাবে উপস্থাপন করা যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও কিন্তু তাই হচ্ছে। ইংরেজি ও হিন্দির মিশেলে ঐতিহ্যবাহী বাংলা সংস্কৃতি হুমকির মুখে। কিন্তু সেখানে প্রতিবাদ আছে। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো-সহগামিতা। ইমরান সরকার আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পেছনে কোন আক্কেলে অন্যতম শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধা এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মপুরুষ নাসিরুদ্দিন ইউসুফ দাঁড়িয়ে থাকেন। তার বা আলী যাকেরের সাংস্কৃতিক সত্তার সঙ্গে ওই নাস্তিক ব্লগারদের সংস্কৃতির কোথায় মিল? শুধু জামায়াত বিরোধিতার গাঁট-বন্ধন দিয়ে পুরো মুক্তিযুদ্ধ অথবা এই দেশের মূল্যবোধ সমৃদ্ধ সত্, গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংস্কৃতিকে কি বিসর্জন দিতে হবে? আজকের লড়াইটা বড় দাগে সংস্কৃতির। প্রান্তিক, নিম্নবর্গ, ধর্মপ্রাণ, দেশপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিশ্বায়নের বেনোজলে আসা কতিপয় উচ্চবর্গের অপসংস্কৃতির সঙ্গে। প্রান্তিককে প্রান্তে রেখে কখন অন্তে যাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ এর অপভ্রংশ। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদের নিকৃষ্ট রূপ। ম্যাক্সিম গোর্কি ১৯৩৫ সালেই বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদের সৃষ্টি এই অবক্ষয়ী বুর্জোয়া সংস্কৃতি থেকে। বুর্জোয়া সংস্কৃতির ওপর যে এক ক্যান্সারের স্ফীতি। আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বায়ন শীর্ষক এক বক্তৃতায় (সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা : পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) অশোক সেন জানিয়েছিলেন, ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কথা ভাবলে ধনধান্যে পুষ্পেভরা বসুন্ধরা শান্তি ও মাধুর্য এখন খুব দূরের কথা নয়। সেটা বিশ্বায়নের অনুষঙ্গ। পুঁজির প্রকল্পে সে সম্ভাবনা উল্টো বাঁকে যাত্রা করে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ধনতন্ত্র নিজেকে নিরঙ্কুশ প্রভুত্বের অধিকারী করতে পারে। তবে উত্পাদনের বিপুল সম্ভাবনা তার কাছেও এক সীমান্তের সঙ্কেত। তাই যে সম্ভার হতে পারে কর্মিষ্ঠ জনজীবনের স্বাভাবিক প্রাচুর্য, তাকেই অপচয়-অপঘাতে নষ্ট করার এত তাগিদ। অহোরাত্রি পুণ্যের প্রলোভন বিস্তারে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া স্পন্সরশিপের ক্ষান্তি নেই। শিশুর প্রত্যুষ থেকে বৃদ্ধের জরা পর্যন্ত বাঁধা তার খোঁয়াড়ের এলাকা। পুঁজি তো সন্ত্রাসকে ব-কলমে শাগরেদ করে নিয়েছে। বাকিটা তো লোক দেখানো নাটক, যাতে মানুষ আরও বিপন্ন, দিশেহারা হয়।”
আজ মিডিয়া গণহত্যা চোখে দেখবে না, কোটি কোটি মানুষের কান্না কানে তুলবে না। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণকে ফাঁসিতে ঝোলানোর নামে যে সন্ত্রাস, যে আলোড়ন, একদিন ইতিহাসবিদরা বিচার করবেন—এই ঘটনাবলী বাংলাদেশকে কেমন এক অতল গভীরে তলিয়ে পড়তে দিয়েছিল। যেখান থেকে কারও ফেরার কথা নয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের সঙ্গে আমরা যারা আছি, যারা বিপর্যয়কে মোটেও মানছি না, বিশ্বাস করি ধর্ম, গণতন্ত্র এদেশকে আলোর পথে ঘোরাবেই, যেমনি করে কোনো বন্দী তার কারাকক্ষের ঘুলঘুলি দিয়ে আসা আলোর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। দেশের শাসন ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রের উচ্চাবচতা এক নায়কতন্ত্রের ইস্তিরী চালিয়ে পীড়িত করা হচ্ছে আর জনসাধারণের একটা অংশকেও তাতে শামিল করা হচ্ছে। আজ মুষ্টিমেয়ের আস্ফাালনে জাতি উদ্বিগ্ন, কিন্তু শঙ্কিত নয়। আরেক মুক্তিযুদ্ধের লগ্ন এখন উপস্থিত। বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাখা, পরপদানত অবস্থা থেকে মুক্তির লক্ষ্য এক কেন্দ্রবিন্দুতে সুস্থির হয়েছে। আসুন রুখে দাঁড়াই।
ওই যে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল বলেছিলেন—
অশান্তিকামী ছলনার রূপে/জয় পায় মাঝে মাঝে/
অবশেষে চিরলাঞ্ছিত হয়/অপমানে আর লাজে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়