একটি পরিত্যাজ্য রাজনৈতিক দর্শনের কথা
ড. মা হ্ বু ব উ ল্লা হ্
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
সংস্কৃত ভাষায় একটি শ্লোক আছে। শ্লোকটি হলো, ‘য পলায়তি, স জিবতি’। যে পলায়ন করতে পারে সেই বেঁচে যায়। দেশে এমন এক পরিস্থিতি এখন বিরাজ করছে যাতে মনে হয়, যদি পলায়ন করতে পারতাম, তাহলে হয়তো বাঁচতে পারতাম, কিন্তু তারও তো কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত দেশপ্রেমিকের জন্য দুনিয়ার কোথাও ঠাঁই পাওয়া কঠিন। আপনি যদি মার্কিনপন্থী হন কিংবা ব্রিটিশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানপন্থী হন তাহলে আপনার আদরযত্নে আতিথেয়তা পাওয়ার একটা সুযোগ হয়তো থাকবে। কিন্তু আমার মতো মানুষ যারা বাংলাদেশ ছাড়া আর অন্য কোনো দেশের পন্থী হতে পারেনি তারা যে কখন গুম বা নিহত হবে অথবা কারা-প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হবে তা কেউ বলতে পারে না। এখন দেশে এমন এক পরিস্থিতি, যখন সত্য বলা কঠিন। কারণ আপনার সত্য বাক্যকে কদর্য করে আপনাকে এমন এক তকমা চড়িয়ে দেবে, যে অপমান আপনি সহ্য করতে পারবেন না। এদেশে এখন অপরাধ একটিই। সেটি হলো আন্তরিকভাবে দেশপ্রেমিক হওয়া। যদি আপনি দেশপ্রেমিক হন তাহলে আপনাকে নাজেহাল করার জন্য, আপনার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার জন্য এমনসব বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হবে এবং এর ফলে আপনি যেভাবে মানসিকভাবে আহত হবেন তার কোনো প্রতিবিধান আপনি খুঁজে পাবেন না। এই অবস্থায় নির্বাক হয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু নির্বাক হয়েও রেহাই পাবেন কিনা সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতি কারও কারও দৃষ্টিতে ফ্যাসিবাদের সমতুল্য। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো কী সেটাও আমাদের জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য যে ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনায় লিপ্ত হওয়া দরকার সেটাও করা হচ্ছে না। এর জন্য কাউকে দোষ দিতে চাই না। কারণ এ ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা করার জন্য যে ধরনের মুক্ত পরিবেশ দরকার তাও নেই।
জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বই পড়া আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। বিচিত্র ধরনের বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে দেশের পরিবেশ এমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতেও শান্তি পাই না। ভারতীয় পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তার দু’চারদিনের মধ্যেই আরেকটি খবর হলো ভারত সরকার বাংলাদেশে মুক্তমনাদের অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমাদের নিয়ে ভারতের এত কৌতূহল কেন সেটাই প্রশ্ন। ভারতপ্রীতিতে মুগ্ধরা হয়তো বলবেন তার প্রতিবেশী দেশের ঘটনা তার স্বার্থকে স্পর্শ করে বলেই ভারতের এই কৌতূহল যথার্থ। এই যথার্থতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। কারণ সেসব কথা বলতেও মানা। এই মানা আইন করে করা হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতিগতভাবে এই মানা এখন আইনের চাইতেও কঠিন এবং কঠোর। এখন আসা যাক ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু তাত্ত্বিক আলোচনায়। এসব বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত আছে অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রিন্সিপাল লেকচারার রোজার গ্রিফিনের Fascism গ্রন্থে। এটি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশ করেছে। আশা করি কোনো মহলের ওপর অঙ্গুলি নির্দেশ না করে ঋধংপরংস’র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা কাউকে আহত করবে না।
ফ্যাসিবাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো উদারনীতি বিরোধিতা। ফ্যাসিবাদ উদারনীতিবাদকে এর সব বহিঃপ্রকাশে প্রত্যাখ্যান করে। যেমন বহুত্ববাদ (Pluralism), সহনশীলতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, পরম্পরাবাদ (Gradualism), শান্তিবাদ, সংসদীয় গণতন্ত্র, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, প্রকৃতিগত অধিকারের নীতি, সমতাবাদ, প্রগতির সরলরেখাতত্ত্ব, মুক্ত সমাজ, বিশ্বজনীনতাবাদ, একবিশ্ববাদ ইত্যাদি। মনে রাখা দরকার ফ্যাসিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধিতা করলেও ফ্যাসিস্ট দলগুলো সংসদীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতিতে কাজ করে; তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সংসদীয় গণতন্ত্রকে কবর দেয়া। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ রক্ষণশীলতাবিরোধী এই অর্থে যে তারা নতুন জন্ম, নতুন ব্যবস্থা, নতুন জাগরণের কথা বলে। তারা আইন-শৃঙ্খলার নীতি অনুযায়ী বা আইনের শাসনের নীতি অনুযায়ী বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চায় না। এরা অতীত থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করে। তারা ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে ফিরিয়ে দিতে চায়। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য সামরিক বাহিনী, সিভিল সার্ভিস, গির্জা, শিল্পপতি, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া প্রভৃতি শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছিল এবং তাদের সাধারণ শত্রু ছিল কমিউনিজম, বিশ্বজনীনতাবাদ এবং আইন ও পরিবারের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। তারা জাতির অতীত গৌরব নিয়ে জনশ্রুতির ওপর ভর করে এবং যেসব বীরকে কেন্দ্র করে এসব জনশ্রুতি প্রচলিত তা বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে চায়। এসব তারা নিছক স্মৃতিকাতরতার জন্য করে না, তাদের ভাষায় জাতির অতীত সত্যিকারের পরিচয় এবং পরিণতির পথে চালিত করার জন্যই করে থাকে। তারা মনে করে এর দ্বারা তারা জাতির অতীত ইতিহাসের মহত্ত্বের পুনরুদ্ধার করতে পারবে। THE EIGHTEENTH BRUMAIRE OF LEWIS BONAPARTE’র প্রবন্ধে মার্কস যেমনটি বলেছিলেন যে, তৃতীয় নেপোলিয়নের শাসনামলে অতীত ইতিহাসের কল্পকাহিনী যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল তাতে করে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের জন্য সমর্থন সংগ্রহ করা যায়, তেমনটি ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মার্কস একে বলেছিলেন, “Awakening of the dead.” তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদ সম্মোহনি রাজনীতির আবরণে আবির্ভূত হয়। ম্যাক্স ওয়েবারের পরিভাষা ব্যবহার করে বলা যায়, ফ্যাসিবাদ প্রাচীন যুগের ঐতিহ্যবাহী নীতিকে পরিহার করে এবং অন্যদিকে উদারনীতিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের আইনি যুক্তিবাদী নীতিকেও একইভাবে পরিহার করে। ফ্যাসিবাদের প্রবণতা হলো সম্মোহনী ধারার রাজনীতিকে ব্যবহার করা। ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদের রাজনীতিতে নেতার পূজা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। তারা সর্বক্ষণ Social engineering-কে ব্যবহার করে এই নেতা পূজার রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে। চতুর্থত, ফ্যাসিবাদ যুক্তিবাদবিরোধী। সম্মোহনবাদের ব্যবহারের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদ যুক্তিবাদকে খর্ব করার চেষ্টা করে এবং কল্পকাহিনীর ওপর ভর করে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। তারা বিশ্বাস, কল্পকাহিনী, প্রতীক এবং জাতির মতো আদর্শিক শক্তিকে ব্যবহার করে জনগণকে বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পায়। তারা পরিচয়ের কথা বলে, নেতার কথা বলে এবং ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কথা বলে। পঞ্চমত, আছে ফ্যাসিবাদী ‘সমাজতন্ত্র’। স্পষ্টতই, ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ ও মার্কসীয় বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা একধরনের জাতীয় সমাজ নির্মাণ করতে চায় যা শ্রেণীবিরোধ, ঐতিহ্যবাদী সামাজিক স্তরভেদ এবং পরজীবীবাদকে অতিক্রম করে যাবে। তারা নতুন জাতির সব উত্পাদনশীল সদস্যদের পুরস্কৃত করার কথা বলে। তারা পুঁজিবাদ ও প্রযুক্তির শক্তিকে তাদের নতুন ব্যবস্থার স্বার্থে ব্যবহার করে এবং দাবি করে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে শোষণ ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবে। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বলশেভিকরা যখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল যে তাদের পথ নতুন মানবপ্রগতির স্তরকে প্রতিনিধিত্ব করছে তখন অনেক ফ্যাসিবাদী উল্টো দাবি করে বসল যে, তাদের সমাধানই সভ্যতার সঙ্কট নিরসন করতে পারবে এবং তাদের সমাজতন্ত্রই হলো খাঁটি সমাজতন্ত্র। অথচ তাদের ব্যবস্থাটি ছিল Corporatist economics, national syndicalism এবং উচ্চমাত্রার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। ষষ্ঠত, ফ্যাসিবাদ একদলবাদের সঙ্গে যুক্ত। ফ্যাসিবাদ একদল বা এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হয়। নাস্তিবাদ (নাস্তিকতাবাদ নয়) অথবা বর্বরতাবাদ এর চালিকাশক্তি না হলেও একজন দৃঢ়চেতা ফ্যাসিবাদী হন কল্পস্বর্গে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন সবদিক থেকে সুষম এবং নির্ভুলভাবে সমন্বিত একটি জাতীয় সমাজই হলো আধুনিক সমাজের সমস্যাবলীর সমাধান। এটা করতে গিয়ে একটি কেন্দ্রীভূত একদলীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। এই রাষ্ট্র Social engineering’র মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অতিশয় কঠোর ও নির্মম আইনের আশ্রয় নেয়। জনগণের জীবনযাত্রাকে সামরিক ব্যারাকের শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করা হয়। প্রচারণা এবং মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে জনসম্মতি নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনে নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়া হয়। তারা দেশের ভেতর ও বাইরের শত্রুদের অপতত্পরতার ধুয়া তুলে। ফ্যাসিবাদের সপ্তম বৈশিষ্ট্য হলো বিচিত্ররূপী সামাজিক সমর্থন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর অর্থ হলো ফ্যাসিবাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীসমর্থন থাকে না। যদিও আমরা লক্ষ্য করি যে, ফ্যাসিবাদী দলগুলোর প্রতি মধ্যবিত্তশ্রেণীর সমর্থন বেশি। তার কারণ এই যে, ফ্যাসিবাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী দর্শন একটি পুনর্জাগরণবাদী মতবাদ। এর মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীপেশাকে ফ্যাসিবাদের পক্ষে একসূত্রে গেঁথে ফেলা সম্ভব হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে অন্যসব ভেদরেখা মুছে যায়। অষ্টমত, ফ্যাসিবাদী চরিত্র হলো বর্ণবাদী। সব ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্যে বর্ণবাদ নিহিত থাকে। যেই প্রধান বর্ণগোষ্ঠীকে নিয়ে জাতি তাদের মধ্যেই সব গুণাবলী এবং মহত্ত্ব নিহিত এবং অন্য কারোর মধ্যে তা নেই এমন ধরনের একটি ভাবধারায় জাতিকে স্বাতন্ত্র্যচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে অন্যসব বর্ণ বা জাতিগোষ্ঠীকে ঘৃণা করতে শেখায়। হিটলার বলেছিলেন, জার্মানরাই পৃথিবীকে শাসন করবে। কারণ তাদের মধ্যে নীল রক্ত প্রবাহিত। এছাড়া অন্যসব জাতি রক্তের শুদ্ধতায় পবিত্র নয়। হিটলার প্রচারিত এই মতবাদ একসময় জার্মান জাতিকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছিল এবং পরিণতিতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। অনেক সময় কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনীতিতে এই সবগুলো প্রবণতার মিশ্রণ না ঘটলেও কোনো কোনোটি এত প্রবল হয়ে উঠে যে তখন একে ফ্যাসিবাদী বলে মনে হয়।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ
mahbub.ullah@yahoo.com
জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বই পড়া আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। বিচিত্র ধরনের বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে দেশের পরিবেশ এমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতেও শান্তি পাই না। ভারতীয় পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তার দু’চারদিনের মধ্যেই আরেকটি খবর হলো ভারত সরকার বাংলাদেশে মুক্তমনাদের অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমাদের নিয়ে ভারতের এত কৌতূহল কেন সেটাই প্রশ্ন। ভারতপ্রীতিতে মুগ্ধরা হয়তো বলবেন তার প্রতিবেশী দেশের ঘটনা তার স্বার্থকে স্পর্শ করে বলেই ভারতের এই কৌতূহল যথার্থ। এই যথার্থতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। কারণ সেসব কথা বলতেও মানা। এই মানা আইন করে করা হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতিগতভাবে এই মানা এখন আইনের চাইতেও কঠিন এবং কঠোর। এখন আসা যাক ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু তাত্ত্বিক আলোচনায়। এসব বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত আছে অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রিন্সিপাল লেকচারার রোজার গ্রিফিনের Fascism গ্রন্থে। এটি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশ করেছে। আশা করি কোনো মহলের ওপর অঙ্গুলি নির্দেশ না করে ঋধংপরংস’র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা কাউকে আহত করবে না।
ফ্যাসিবাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো উদারনীতি বিরোধিতা। ফ্যাসিবাদ উদারনীতিবাদকে এর সব বহিঃপ্রকাশে প্রত্যাখ্যান করে। যেমন বহুত্ববাদ (Pluralism), সহনশীলতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, পরম্পরাবাদ (Gradualism), শান্তিবাদ, সংসদীয় গণতন্ত্র, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, প্রকৃতিগত অধিকারের নীতি, সমতাবাদ, প্রগতির সরলরেখাতত্ত্ব, মুক্ত সমাজ, বিশ্বজনীনতাবাদ, একবিশ্ববাদ ইত্যাদি। মনে রাখা দরকার ফ্যাসিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধিতা করলেও ফ্যাসিস্ট দলগুলো সংসদীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতিতে কাজ করে; তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সংসদীয় গণতন্ত্রকে কবর দেয়া। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ রক্ষণশীলতাবিরোধী এই অর্থে যে তারা নতুন জন্ম, নতুন ব্যবস্থা, নতুন জাগরণের কথা বলে। তারা আইন-শৃঙ্খলার নীতি অনুযায়ী বা আইনের শাসনের নীতি অনুযায়ী বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চায় না। এরা অতীত থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করে। তারা ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে ফিরিয়ে দিতে চায়। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য সামরিক বাহিনী, সিভিল সার্ভিস, গির্জা, শিল্পপতি, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া প্রভৃতি শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছিল এবং তাদের সাধারণ শত্রু ছিল কমিউনিজম, বিশ্বজনীনতাবাদ এবং আইন ও পরিবারের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। তারা জাতির অতীত গৌরব নিয়ে জনশ্রুতির ওপর ভর করে এবং যেসব বীরকে কেন্দ্র করে এসব জনশ্রুতি প্রচলিত তা বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে চায়। এসব তারা নিছক স্মৃতিকাতরতার জন্য করে না, তাদের ভাষায় জাতির অতীত সত্যিকারের পরিচয় এবং পরিণতির পথে চালিত করার জন্যই করে থাকে। তারা মনে করে এর দ্বারা তারা জাতির অতীত ইতিহাসের মহত্ত্বের পুনরুদ্ধার করতে পারবে। THE EIGHTEENTH BRUMAIRE OF LEWIS BONAPARTE’র প্রবন্ধে মার্কস যেমনটি বলেছিলেন যে, তৃতীয় নেপোলিয়নের শাসনামলে অতীত ইতিহাসের কল্পকাহিনী যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল তাতে করে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের জন্য সমর্থন সংগ্রহ করা যায়, তেমনটি ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মার্কস একে বলেছিলেন, “Awakening of the dead.” তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদ সম্মোহনি রাজনীতির আবরণে আবির্ভূত হয়। ম্যাক্স ওয়েবারের পরিভাষা ব্যবহার করে বলা যায়, ফ্যাসিবাদ প্রাচীন যুগের ঐতিহ্যবাহী নীতিকে পরিহার করে এবং অন্যদিকে উদারনীতিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের আইনি যুক্তিবাদী নীতিকেও একইভাবে পরিহার করে। ফ্যাসিবাদের প্রবণতা হলো সম্মোহনী ধারার রাজনীতিকে ব্যবহার করা। ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদের রাজনীতিতে নেতার পূজা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। তারা সর্বক্ষণ Social engineering-কে ব্যবহার করে এই নেতা পূজার রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে। চতুর্থত, ফ্যাসিবাদ যুক্তিবাদবিরোধী। সম্মোহনবাদের ব্যবহারের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদ যুক্তিবাদকে খর্ব করার চেষ্টা করে এবং কল্পকাহিনীর ওপর ভর করে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। তারা বিশ্বাস, কল্পকাহিনী, প্রতীক এবং জাতির মতো আদর্শিক শক্তিকে ব্যবহার করে জনগণকে বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পায়। তারা পরিচয়ের কথা বলে, নেতার কথা বলে এবং ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কথা বলে। পঞ্চমত, আছে ফ্যাসিবাদী ‘সমাজতন্ত্র’। স্পষ্টতই, ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ ও মার্কসীয় বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা একধরনের জাতীয় সমাজ নির্মাণ করতে চায় যা শ্রেণীবিরোধ, ঐতিহ্যবাদী সামাজিক স্তরভেদ এবং পরজীবীবাদকে অতিক্রম করে যাবে। তারা নতুন জাতির সব উত্পাদনশীল সদস্যদের পুরস্কৃত করার কথা বলে। তারা পুঁজিবাদ ও প্রযুক্তির শক্তিকে তাদের নতুন ব্যবস্থার স্বার্থে ব্যবহার করে এবং দাবি করে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে শোষণ ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবে। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বলশেভিকরা যখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল যে তাদের পথ নতুন মানবপ্রগতির স্তরকে প্রতিনিধিত্ব করছে তখন অনেক ফ্যাসিবাদী উল্টো দাবি করে বসল যে, তাদের সমাধানই সভ্যতার সঙ্কট নিরসন করতে পারবে এবং তাদের সমাজতন্ত্রই হলো খাঁটি সমাজতন্ত্র। অথচ তাদের ব্যবস্থাটি ছিল Corporatist economics, national syndicalism এবং উচ্চমাত্রার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। ষষ্ঠত, ফ্যাসিবাদ একদলবাদের সঙ্গে যুক্ত। ফ্যাসিবাদ একদল বা এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হয়। নাস্তিবাদ (নাস্তিকতাবাদ নয়) অথবা বর্বরতাবাদ এর চালিকাশক্তি না হলেও একজন দৃঢ়চেতা ফ্যাসিবাদী হন কল্পস্বর্গে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন সবদিক থেকে সুষম এবং নির্ভুলভাবে সমন্বিত একটি জাতীয় সমাজই হলো আধুনিক সমাজের সমস্যাবলীর সমাধান। এটা করতে গিয়ে একটি কেন্দ্রীভূত একদলীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। এই রাষ্ট্র Social engineering’র মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অতিশয় কঠোর ও নির্মম আইনের আশ্রয় নেয়। জনগণের জীবনযাত্রাকে সামরিক ব্যারাকের শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করা হয়। প্রচারণা এবং মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে জনসম্মতি নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনে নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়া হয়। তারা দেশের ভেতর ও বাইরের শত্রুদের অপতত্পরতার ধুয়া তুলে। ফ্যাসিবাদের সপ্তম বৈশিষ্ট্য হলো বিচিত্ররূপী সামাজিক সমর্থন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর অর্থ হলো ফ্যাসিবাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীসমর্থন থাকে না। যদিও আমরা লক্ষ্য করি যে, ফ্যাসিবাদী দলগুলোর প্রতি মধ্যবিত্তশ্রেণীর সমর্থন বেশি। তার কারণ এই যে, ফ্যাসিবাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী দর্শন একটি পুনর্জাগরণবাদী মতবাদ। এর মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীপেশাকে ফ্যাসিবাদের পক্ষে একসূত্রে গেঁথে ফেলা সম্ভব হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে অন্যসব ভেদরেখা মুছে যায়। অষ্টমত, ফ্যাসিবাদী চরিত্র হলো বর্ণবাদী। সব ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্যে বর্ণবাদ নিহিত থাকে। যেই প্রধান বর্ণগোষ্ঠীকে নিয়ে জাতি তাদের মধ্যেই সব গুণাবলী এবং মহত্ত্ব নিহিত এবং অন্য কারোর মধ্যে তা নেই এমন ধরনের একটি ভাবধারায় জাতিকে স্বাতন্ত্র্যচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে অন্যসব বর্ণ বা জাতিগোষ্ঠীকে ঘৃণা করতে শেখায়। হিটলার বলেছিলেন, জার্মানরাই পৃথিবীকে শাসন করবে। কারণ তাদের মধ্যে নীল রক্ত প্রবাহিত। এছাড়া অন্যসব জাতি রক্তের শুদ্ধতায় পবিত্র নয়। হিটলার প্রচারিত এই মতবাদ একসময় জার্মান জাতিকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছিল এবং পরিণতিতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। অনেক সময় কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনীতিতে এই সবগুলো প্রবণতার মিশ্রণ না ঘটলেও কোনো কোনোটি এত প্রবল হয়ে উঠে যে তখন একে ফ্যাসিবাদী বলে মনে হয়।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ
mahbub.ullah@yahoo.com
Comments