দলমত যার যার কিন্তু রাষ্ট্রটি সবার
- Get link
- X
- Other Apps
আলী ইমাম মজুমদার | তারিখ: ০৭-০৩-২০১৩
শাহবাগের জাগরণ মঞ্চ থেকে একটি স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তা হলো ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এর মর্মার্থ বিনা দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য। এটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাও বটে। আর যেকোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনও তা-ই। পাশাপাশি বলা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নানা মত ও পথ থাকতে পারে। থাকতে পারে বিভিন্ন আদর্শের দল। এ ধরনের থাকাটাই স্বাভাবিক। আর অত্যন্ত বাস্তব সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্রটি সবার। এ রাষ্ট্রের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এর সব নাগরিকের ভাগ্য। রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন হলে তাকে সমালোচনা করা চলে। বলা যায়, সে মতবাদ ভুল ও দেশের স্বার্থের অনুকূল নয়। জোর করে তার মতবাদ কেউ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। কোন মতবাদটি সঠিক, তা সময়ে সময়ে জনগণ নির্ধারণ করে নেয় ভোটের মাধ্যমে। কেননা, দেশটির প্রকৃত মালিক তারাই।
দেশপ্রেমের ওপর কারও একচেটিয়া অধিকার নেই। প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে হবে, সবাই দেশটিকে ভালোবাসেন। এর কল্যাণ চান। কেননা, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এর কল্যাণের সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের স্বার্থ। এমনকি যে রাষ্ট্রবিরোধী, তারও বিচার হয় রাষ্ট্রের আইনের আদালতে। প্রমাণিত হলে সাজাও পায় সে ব্যক্তি। এ দেশটিতেই তারও জন্মমৃত্যু।
প্রসঙ্গটি আনা হলো বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ঘটনাবলি কিছুটা বিশ্লেষণের জন্য। এর সূচনা ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তির বিচার কার্যক্রম নিয়ে। শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থক ইসলামী ছাত্রশিবির এর বিরোধিতা করে আসছে। বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দলটির এ বিষয়ে অবস্থান অস্পষ্ট।
প্রথমে আলোচনা করা যাক, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘটনার দিকগুলো। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঝটিকা হামলা করতে থাকে। এরই মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি একটি মামলার রায়ে একজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এতে তরুণ সমাজের একটি বিক্ষুব্ধ অংশ শাহবাগ চত্বরে বিরতিহীন সমাবেশ করে এ দণ্ড অপর্যাপ্ত বলে অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকে। দাবি করতে থাকে আসামির মৃত্যুদণ্ডের। যদিও এর নেতৃত্ব অরাজনৈতিক, কিন্তু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির এতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। কারণ, শাহবাগের সে সমাবেশে এসে সরকারের বহু নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস আন্দোলন চালায়। ভাঙচুর ও অগ্নিদগ্ধ হয় বহু গাড়ি, স্থাপনা, রেললাইন থেকে রেলগাড়ি পর্যন্ত। হতাহত হয় অনেক। এ সময়ে মূলত তাদেরই নেতৃত্বে পরিচালিত হয় আরেকটি আন্দোলন, শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনকে নাস্তিকদের দ্বারা পরিচালিত ও তাদের শাস্তি দিতে হবে, এই দাবিতে। হতাহত হয় বেশ কিছু। আবার ক্ষমতাসীন দলের কিছু অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থক জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন বলে পরিচিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ওপরে বর্ণিত বেশ কিছু ঘটনায় গ্রেপ্তার ও মামলাও হয়। কিন্তু সেগুলো সব একতরফা। জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই হয় মামলাগুলো। সরকার-সমর্থক দলের যাঁরা সন্ত্রাসী কাজ করে চলছেন, তাঁরা থেকে যাচ্ছেন আইনের আওতার বাইরে। স্বাভাবিকভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নৈতিকভাবে দুর্বল হলো।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি মামলার রায় ঘোষিত হয়। সেদিন আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী হরতালের ডাক দিয়েছিল। অন্যদিকে, শাহবাগ থেকে আসামির ফাঁসির দাবি চলছিল বিরতিহীনভাবে। ট্রাইব্যুনাল আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলে শাহবাগকেন্দ্রিক তরুণেরা উল্লাস প্রকাশ করে। পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের মারমুখী বিক্ষোভ মোকাবিলা করতে থাকে পুলিশ। তাদের পাশাপাশি আবার সরকারি দলের কিছু কর্মী-সমর্থক আইন হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। সেই এক দিনেই নিহতের সংখ্যা কম-বেশি ৪০ জন বলে জানা যায়। এর মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। তাঁদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। পরবর্তী তিন দিন হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১ মার্চ বিরোধী দলের নেতা এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, এসব ঘটনার দায়ভার সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সরকারি দলের সদস্য সন্ত্রাসীদের। ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করে ৫ মার্চ হরতাল ডেকেছেন। আর জামায়াত আগেই হরতাল ডেকেছে ৩ ও ৪ মার্চ। উভয় পক্ষই আত্মঘাতী এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, এটা লক্ষণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরও লক্ষণীয় যে কিছু স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়। কোথাও কোথাও ভেঙে ফেলা হয় দেবমূর্তি। পত্রিকান্তরে অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মীরা এ ঘটনাগুলো করছেন। এ থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, চলমান সংঘাতকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। দুটি শিবিরেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের অভাব নেই। হয়তো বা তাঁরা এ দুর্যোগে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগই পাচ্ছেন না। ঘটনা এভাবে চলমান থাকলে এর ব্যাপকতাও বাড়বে, খুলে যাবে নতুন নতুন ফ্রন্ট; এটা খুব দূরদৃষ্টি না থাকলেও বলা চলে।
শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনটি চলমান আছে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে। তাদের যেসব দাবি আছে, তার সব পূরণে সরকারই বা কতটা সক্ষম হবে আর কী পরিমাণ সময় লাগবে, তা বোধগম্য হচ্ছে না। চলমান মামলাগুলোর রায় ও আপিল নিষ্পত্তিতেও বেশ সময় লাগবে। কিন্তু আন্দোলনটি এই রূপে বিরতিহীনভাবে কত দিন চলবে, তাও অনুমান করা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, কোনো দৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো নেই আন্দোলনটির। তাই এটা একটানা দীর্ঘায়িত হতে থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক স্বার্থে একে ব্যবহার করতে সক্রিয় থাকতে পারে কোনো কোনো মহল। যেমন ধরা যাক, তারা এযাবৎ দুই দিন ঠিক ১০টায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার আহ্বান জানায়। আপাতদৃষ্টিতে এতে দোষণীয় কিছু নেই। বরং এ দেশে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় না মর্মে অভিযোগ রয়েছে। গণদাবির মুখে এসব প্রতিষ্ঠান এটা করতে বাধ্য হবে; এ সরল বিশ্বাস থেকেই সিদ্ধান্তটি হয়তো বা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংগীত কখন কোথায় গাওয়া হবে আর জাতীয় পতাকাই বা কখন ওঠানো হবে, এর জন্য পৃথক পৃথক বিধিমালা রয়েছে ন্যাশনাল এনথেম রুলস ও ফ্ল্যাগ রুলস নামে। এগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুশীলনের সরকারি নির্দেশিকাও আছে। স্কুল শুরুর সময়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার সরকারি নির্দেশও রয়েছে। একেক স্কুল একেক সময় শুরু হয়। সুতরাং যে স্কুল সকাল সাতটা বা আটটায় জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং জাতীয় পতাকা উড়িয়ে শুরু হলো, তারা আবার ১০টায় তা করবে কেন? যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশটি এড়িয়ে যাচ্ছে, যথাযথ অনুসন্ধান করে খুঁজে বের করে সব সরকারি সাহায্য বন্ধসহ অন্যবিধ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা চলে। সুনির্দিষ্ট বিধিমালার লঙ্ঘন যে-ই করুক আর তাতে যতই সদিচ্ছা থাকুক, একে স্বাগত জানানো যায় না। আইন কেউ হাতে তুলে নিতে পারেন না।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যারা চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে তারা সফল হলে জাতীয় সংহতি বিপন্ন হবে। সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে আমাদের সমাজ। যারা এটা করতে চাইছে, তারা জেনে-শুনে তা চাইছে। তাই সূচনাতেই এটাকে ঠেকাতে হবে। ঠেকাতে হবে অতি দৃঢ়তার সঙ্গে। পাশাপাশি দৃঢ়তা ও কৌশলের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে যেকোনো দলমতের সন্ত্রাস। এটা করতে হবে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবে। সব দলেরই কিছু সুযোগসন্ধানী লোক সন্ত্রাস করতে সচেষ্ট থাকেন। সন্ত্রাসের বদলা পাল্টা সন্ত্রাস হতে পারে না। আইনের প্রয়োগ করবে একমাত্র আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অন্য কেউ নয়। যে কেউ আইন হাতে তুলে নিলে যদি প্রতিহত করা না হয়, তাহলে যে কালনাগিনী ঝাঁপি থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে, তাকে আটকানো যাবে না। তার বিষাক্ত ছোবল গ্রাস করে ফেলবে গোটা দেশকে।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল এ দেশের মানুষ। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সালের দূরত্ব ৪২ বছর। এ সময়ে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। এখন সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ছাড়া কারও আইন প্রয়োগে অন্য কেউ অংশ নিতে পারে না। স্বাধীন আধুনিক ও গণতান্ত্রিক এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ত্র থাকবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। আর সেগুলোও ব্যবহূত হবে অতি সতর্কতার সঙ্গে এবং বিরল ক্ষেত্রে।
সবশেষে আসে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারাধীন মামলাগুলোর কথা। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই আসছে, কোনো রাখঢাক ছাড়া। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। আইন অনুযায়ী বিচারের দায়িত্ব হাইকোর্ট বিভাগ বেঞ্চের ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাইব্যুনালের। আর এর আপিল নিষ্পত্তি করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আমরা রাষ্ট্র ও এর সার্বভৌমত্ব মানলে আদালতকে মানতে হবে। আদালতের বিচারকদের ওপর যেন কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ না পড়ে, সে জন্য সব মহলকে এ সংকটকালে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। এর বিপরীতটা হবে দেশ ও জাতির স্বার্থের পরিপন্থী।
মনে রাখতে হবে, আমাদের সবাইকেই এ দেশটিতে থাকতে হবে। গণতন্ত্রকে আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছি। তাই দেশটিতে থাকতে পারে নানা মত ও পথ। কেননা, যত মত আর পথই থাকুক, রাষ্ট্রটি তো সবারই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com
দেশপ্রেমের ওপর কারও একচেটিয়া অধিকার নেই। প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে হবে, সবাই দেশটিকে ভালোবাসেন। এর কল্যাণ চান। কেননা, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এর কল্যাণের সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের স্বার্থ। এমনকি যে রাষ্ট্রবিরোধী, তারও বিচার হয় রাষ্ট্রের আইনের আদালতে। প্রমাণিত হলে সাজাও পায় সে ব্যক্তি। এ দেশটিতেই তারও জন্মমৃত্যু।
প্রসঙ্গটি আনা হলো বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ঘটনাবলি কিছুটা বিশ্লেষণের জন্য। এর সূচনা ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তির বিচার কার্যক্রম নিয়ে। শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থক ইসলামী ছাত্রশিবির এর বিরোধিতা করে আসছে। বিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দলটির এ বিষয়ে অবস্থান অস্পষ্ট।
প্রথমে আলোচনা করা যাক, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘটনার দিকগুলো। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঝটিকা হামলা করতে থাকে। এরই মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি একটি মামলার রায়ে একজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এতে তরুণ সমাজের একটি বিক্ষুব্ধ অংশ শাহবাগ চত্বরে বিরতিহীন সমাবেশ করে এ দণ্ড অপর্যাপ্ত বলে অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকে। দাবি করতে থাকে আসামির মৃত্যুদণ্ডের। যদিও এর নেতৃত্ব অরাজনৈতিক, কিন্তু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির এতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। কারণ, শাহবাগের সে সমাবেশে এসে সরকারের বহু নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস আন্দোলন চালায়। ভাঙচুর ও অগ্নিদগ্ধ হয় বহু গাড়ি, স্থাপনা, রেললাইন থেকে রেলগাড়ি পর্যন্ত। হতাহত হয় অনেক। এ সময়ে মূলত তাদেরই নেতৃত্বে পরিচালিত হয় আরেকটি আন্দোলন, শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনকে নাস্তিকদের দ্বারা পরিচালিত ও তাদের শাস্তি দিতে হবে, এই দাবিতে। হতাহত হয় বেশ কিছু। আবার ক্ষমতাসীন দলের কিছু অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থক জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন বলে পরিচিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ওপরে বর্ণিত বেশ কিছু ঘটনায় গ্রেপ্তার ও মামলাও হয়। কিন্তু সেগুলো সব একতরফা। জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই হয় মামলাগুলো। সরকার-সমর্থক দলের যাঁরা সন্ত্রাসী কাজ করে চলছেন, তাঁরা থেকে যাচ্ছেন আইনের আওতার বাইরে। স্বাভাবিকভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নৈতিকভাবে দুর্বল হলো।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি মামলার রায় ঘোষিত হয়। সেদিন আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী হরতালের ডাক দিয়েছিল। অন্যদিকে, শাহবাগ থেকে আসামির ফাঁসির দাবি চলছিল বিরতিহীনভাবে। ট্রাইব্যুনাল আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলে শাহবাগকেন্দ্রিক তরুণেরা উল্লাস প্রকাশ করে। পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের মারমুখী বিক্ষোভ মোকাবিলা করতে থাকে পুলিশ। তাদের পাশাপাশি আবার সরকারি দলের কিছু কর্মী-সমর্থক আইন হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। সেই এক দিনেই নিহতের সংখ্যা কম-বেশি ৪০ জন বলে জানা যায়। এর মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। তাঁদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। পরবর্তী তিন দিন হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১ মার্চ বিরোধী দলের নেতা এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, এসব ঘটনার দায়ভার সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সরকারি দলের সদস্য সন্ত্রাসীদের। ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করে ৫ মার্চ হরতাল ডেকেছেন। আর জামায়াত আগেই হরতাল ডেকেছে ৩ ও ৪ মার্চ। উভয় পক্ষই আত্মঘাতী এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, এটা লক্ষণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরও লক্ষণীয় যে কিছু স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়। কোথাও কোথাও ভেঙে ফেলা হয় দেবমূর্তি। পত্রিকান্তরে অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মীরা এ ঘটনাগুলো করছেন। এ থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, চলমান সংঘাতকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। দুটি শিবিরেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের অভাব নেই। হয়তো বা তাঁরা এ দুর্যোগে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগই পাচ্ছেন না। ঘটনা এভাবে চলমান থাকলে এর ব্যাপকতাও বাড়বে, খুলে যাবে নতুন নতুন ফ্রন্ট; এটা খুব দূরদৃষ্টি না থাকলেও বলা চলে।
শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনটি চলমান আছে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে। তাদের যেসব দাবি আছে, তার সব পূরণে সরকারই বা কতটা সক্ষম হবে আর কী পরিমাণ সময় লাগবে, তা বোধগম্য হচ্ছে না। চলমান মামলাগুলোর রায় ও আপিল নিষ্পত্তিতেও বেশ সময় লাগবে। কিন্তু আন্দোলনটি এই রূপে বিরতিহীনভাবে কত দিন চলবে, তাও অনুমান করা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, কোনো দৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো নেই আন্দোলনটির। তাই এটা একটানা দীর্ঘায়িত হতে থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক স্বার্থে একে ব্যবহার করতে সক্রিয় থাকতে পারে কোনো কোনো মহল। যেমন ধরা যাক, তারা এযাবৎ দুই দিন ঠিক ১০টায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার আহ্বান জানায়। আপাতদৃষ্টিতে এতে দোষণীয় কিছু নেই। বরং এ দেশে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় না মর্মে অভিযোগ রয়েছে। গণদাবির মুখে এসব প্রতিষ্ঠান এটা করতে বাধ্য হবে; এ সরল বিশ্বাস থেকেই সিদ্ধান্তটি হয়তো বা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংগীত কখন কোথায় গাওয়া হবে আর জাতীয় পতাকাই বা কখন ওঠানো হবে, এর জন্য পৃথক পৃথক বিধিমালা রয়েছে ন্যাশনাল এনথেম রুলস ও ফ্ল্যাগ রুলস নামে। এগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুশীলনের সরকারি নির্দেশিকাও আছে। স্কুল শুরুর সময়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার সরকারি নির্দেশও রয়েছে। একেক স্কুল একেক সময় শুরু হয়। সুতরাং যে স্কুল সকাল সাতটা বা আটটায় জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং জাতীয় পতাকা উড়িয়ে শুরু হলো, তারা আবার ১০টায় তা করবে কেন? যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশটি এড়িয়ে যাচ্ছে, যথাযথ অনুসন্ধান করে খুঁজে বের করে সব সরকারি সাহায্য বন্ধসহ অন্যবিধ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা চলে। সুনির্দিষ্ট বিধিমালার লঙ্ঘন যে-ই করুক আর তাতে যতই সদিচ্ছা থাকুক, একে স্বাগত জানানো যায় না। আইন কেউ হাতে তুলে নিতে পারেন না।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যারা চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে তারা সফল হলে জাতীয় সংহতি বিপন্ন হবে। সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে আমাদের সমাজ। যারা এটা করতে চাইছে, তারা জেনে-শুনে তা চাইছে। তাই সূচনাতেই এটাকে ঠেকাতে হবে। ঠেকাতে হবে অতি দৃঢ়তার সঙ্গে। পাশাপাশি দৃঢ়তা ও কৌশলের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে যেকোনো দলমতের সন্ত্রাস। এটা করতে হবে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবে। সব দলেরই কিছু সুযোগসন্ধানী লোক সন্ত্রাস করতে সচেষ্ট থাকেন। সন্ত্রাসের বদলা পাল্টা সন্ত্রাস হতে পারে না। আইনের প্রয়োগ করবে একমাত্র আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অন্য কেউ নয়। যে কেউ আইন হাতে তুলে নিলে যদি প্রতিহত করা না হয়, তাহলে যে কালনাগিনী ঝাঁপি থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে, তাকে আটকানো যাবে না। তার বিষাক্ত ছোবল গ্রাস করে ফেলবে গোটা দেশকে।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল এ দেশের মানুষ। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সালের দূরত্ব ৪২ বছর। এ সময়ে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। এখন সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ছাড়া কারও আইন প্রয়োগে অন্য কেউ অংশ নিতে পারে না। স্বাধীন আধুনিক ও গণতান্ত্রিক এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অস্ত্র থাকবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। আর সেগুলোও ব্যবহূত হবে অতি সতর্কতার সঙ্গে এবং বিরল ক্ষেত্রে।
সবশেষে আসে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারাধীন মামলাগুলোর কথা। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই আসছে, কোনো রাখঢাক ছাড়া। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। আইন অনুযায়ী বিচারের দায়িত্ব হাইকোর্ট বিভাগ বেঞ্চের ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাইব্যুনালের। আর এর আপিল নিষ্পত্তি করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আমরা রাষ্ট্র ও এর সার্বভৌমত্ব মানলে আদালতকে মানতে হবে। আদালতের বিচারকদের ওপর যেন কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ না পড়ে, সে জন্য সব মহলকে এ সংকটকালে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। এর বিপরীতটা হবে দেশ ও জাতির স্বার্থের পরিপন্থী।
মনে রাখতে হবে, আমাদের সবাইকেই এ দেশটিতে থাকতে হবে। গণতন্ত্রকে আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছি। তাই দেশটিতে থাকতে পারে নানা মত ও পথ। কেননা, যত মত আর পথই থাকুক, রাষ্ট্রটি তো সবারই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com
- Get link
- X
- Other Apps
Comments