বার্তা স্পষ্ট, হাসিনার ভুল পাঠ


ইলিয়াস হোসেন
পরের সংবাদ»
কখনও কখনও নীরবতা বজ্রের চেয়েও বেশি শব্দ করতে পারে। এই প্রবাদটির সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশে। ওই দিন একতরফা দশম সংসদ নির্বাচনে নীরব থেকে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে গগনবিদারী বার্তা দিয়েছেন।
এদেশের জনগণ স্পষ্ট করেই বলেছেন তারা কী চান। তারা জানিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে দেশ চালিয়েছে তাতে তারা চরম অসন্তুষ্ট। পাতানো একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দেয়া এবং গণতন্ত্র ধ্বংস করার জোরালো বিরোধিতা করেছেন তারা। এসব করার জন্য জনগণকে অস্ত্র কিংবা লাঠি হাতে তুলে নিতে হয়নি। রাজপথে সহিংস বিক্ষোভও করতে হয়নি। তারা যেটা করেছেন তা হলো শুধু ভোটকেন্দ্রে যাননি। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান বা বর্জন করেছেন।
তবে শুধু বর্জন বা প্রত্যাখ্যান শব্দের মাধ্যমে এর ব্যাপকতা বোঝা যাবে না। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষ হতো তাহলে দেখা যেতো ৫ জানুয়ারি ৪ থেকে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি।
এটা কীভাবে সম্ভব?
যেমন, একটি কেন্দ্রে যদি ৩০০০ ভোটার থাকেন আর তাদের যদি ৫ শতাংশও ভোট দিতে আসেন তাহলে ভোট পড়ে ১৫০টি। কেউ কী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন সেদিন সাধারণভাবে এর চেয়ে বেশি ভোটার কোনো ভোটকেন্দ্রে এসেছিলেন? ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে। তার বিপরীত চিত্রও তো দেখা গেছে। বহু কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি।
সাধারণ নির্বাচনে কম ভোট পড়ার ক্ষেত্রে যদি বিশ্বে সত্যি কোনো রেকর্ড থেকে থাকে তাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আগের সব রেকর্ডকে ধুয়ে মুছে দিয়েছে।
৫ জানুয়ারির ভোটের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে সত্যিই প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগ
এখন জনগণ থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। তাদের পায়ের নিচে এখন মাটি বলতে আর কিছু নেই।
তবে রাজনৈতিকভাবে এসব শব্দের বহুল ব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে তা হয়তো তাত্পর্যহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটেছে এদেশে।
সত্যি কথা বলতে কী, শেখ হাসিনার তুলনা এখন তিনি নিজেই। সিরিয়ার বর্বর বাশার আল আসাদ, জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে কিংবা আফ্রিকার জংলি শাসকরাও হাসিনার মতো এতোটা জনধিকৃত নয়। এসব দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীনরা নিশ্চয়ই ২৫-৩০ শতাংশ ভোট পাবে।
ভোটের আগের দু’দিন বিএনপি জামায়াতের আন্দোলন চরমসীমায় পৌঁছালেও সরকার কিন্তু ভোট দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। ৩০০ আসনের জন্য যতটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হতো তা নিয়োজিত ছিল মাত্র ১৪৭ আসনে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি ছিল না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, ভোট দিতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের হাতে মার খেয়েছে সেরকম ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। যেমন, ঢাকায় ভোট বিরোধীদের কোনো তত্পরতা না থাকলেও জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। সারাদিন ভোট কেন্দ্রগুলো খাঁ খাঁ করেছে।
এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো জনগণ আওয়ামী লীগ এবং তাদের নীলনকশার ভোট প্রত্যাখ্যান করেছে।
কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নেতারা জনগণের এই স্পষ্ট বার্তা বুঝতে পারেননি অথবা বুঝলেও স্বীকার করেনি। জনগণের প্রত্যাখ্যানকে তারা দেখছেন ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে।
শেখ হাসিনা গতকাল এক অনুষ্ঠানেও দাবি করেছেন ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, জনগণের ম্যাসেস বুঝতে শেখ হাসিনা এবং তার দল চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ একই ভুল এর আগেও বারবার করেছে।
পাঁচ সিটি করপোরেশনে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্বঘোষিত দুর্গ গাজীপুরে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের পরও ভুল সংশোধনের কোনো চেষ্টা করেনি দলটি। শেখ হাসিনা বরং একথাও বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে গাজীপুরের জনগণ ‘হাহাকার করছে’।
এর আগে ইসলামবিদ্বেষী শাহবাগিদের মদত দিয়ে এবং ধর্মপ্রাণ মানুষদের প্রিয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমর্থকদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের মানুষের আবহমানকালের চিন্তাচেতনার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।
একই ঘটনা ঘটেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের বহু মানুষ যুদ্ধাপরাধের ন্যায় বিচার চাইলেও আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বিচারকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেশি বিদেশি একাধিক জরিপে তার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু জনমতকে আমলে না নিয়ে বরং আরও ভয়ঙ্করভাবে এগিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ সরকার।
শেখ হাসিনা বুঝতে চাইছেন না যে তিনি এখন আর এদেশের মানুষের প্রতিনিধি নন। যে নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং ৪৭ শতাংশের ভোটারের ৯৫ শতাংশ ভোটার সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে সেই নির্বাচন জয়ী দাবি করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের ওপর হয়তো কিছুদিন বোবা ভূতের মতো চেপে বসতে পারবেন কিন্তু জনগণের প্রতিনিধি হতে পারবেন না।
বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের মর্মার্থ বুঝতেও শেখ হাসিনা ব্যর্থ হয়েছেন।
দীর্ঘ দুই মাস ধরে বিএনপির মতো একটি উদারপন্থী এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো উচ্চশিক্ষিত লোকদের দল কীভাবে দেশ অচল করে রাখল তা বোঝার চেষ্টা করেননি শেখ হাসিনা।
দীর্ঘ এই আন্দোলনে জনগণের অপরিসীম কষ্ট এবং বিপুল সম্পদ ও প্রাণহানি হলেও তারা এর কোনো প্রতিবাদ করেননি। ‘নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ’ কথাটি মাথায় রেখে তারা নীরবে এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
একথা কেউ বলতে পারবে না যে, বিএনপি-জামায়াতের এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো গণবিক্ষোভ হয়েছে। আওয়ামীপন্থী গণমাধ্যমগুলো হরতাল অবরোধের বিরুদ্ধে নানা প্রতিক্রিয়া দেখালেও আমজনতা এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলেছে বলে দাবি করতে পারছে না। বরং জনগণের সমর্থনেই আন্দোলন আরও গতিশীল হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব বুঝতেও শেখ হাসিনা এবং তার সরকার ভুল করছে। ফলে তামাম দুনিয়া থেকে হাসিনা এরই মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন আক্ষরিক অর্থেই।
শেখ হাসিনার বোঝা উচিত, তথাকথিত জয়ের দুদিন পেরিয়ে গেলেও একটি দেশও কেন তাকে অভিনন্দন জানায়নি। এমনকি তার ‘পেয়ারে জান’ ভারতও নয়। অথচ কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণার পরপরই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে বিজয়ের স্পষ্ট ঘোষণার পরপরই অভিনন্দন বার্তা এবং টেলিফোন আসতে শুরু করে।
জাতিসংঘসহ সমগ্র দুনিয়া বরং নির্বাচন শেষ হতে না হতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নতুন করে নির্বাচনের তাগিদ দিতে শুরু করেছে।
জনগণের সুস্পষ্ট বার্তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা আবারও শাসক হিসেবে চেপে বসলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পূর্ণমাত্রায় গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং তার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশের জনগণের অপরাধ কী’ বলে তিনি পার পাবেন না।
তবে একথা ঠিক, সেরকম কোনো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে দুর্ভোগ জনগণকেই পোহাতে হবে। শেখ হাসিনা এবং তার দলের নেতাদের বিলাসী জীবনযাপনে কোনো ছেদ পড়বে না।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়