স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই


নাজমুল হক : আগুনে পুড়ে কয়লা হয়েছে, সিদ্ধ হয়েছে, রাজপথ লাল হয়েছে তাজা রক্তে, চার দেয়ালের মাঝে বাঁচার জন্য ছটফট করেছে, কিন্তু বাঁচতে পারেনি, নির্মম মৃত্যু তাদের আলিঙ্গন করেছে। শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী আর মধ্য বয়সীরাও রেহাই পায়নি অস্বাভাবিক মৃত্যু থেকে। মৃত্যু যেন ধীরে ধীরে আমাদের সকল প্রত্যাশা কেড়ে নিচ্ছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হচ্ছে। গেল বছরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এর চেয়েও ভয়াবহ অবস্থায় ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়া, পুলিশি অভিযান, গ্রেফতার, পুলিশ কর্তৃক বাড়ি-ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া, সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা, শিবির কর্মীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ প্রভৃতি ছিল নিত্য ঘটনা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসাক)-এর সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি-২০১৩ প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরে সারাদেশে ৫৩ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাতে ৫০৭ জন নিহত, ৭২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ সাংবাদিক নিহত ও ২৮০ জন আহত, সীমান্তে ২৬ জনকে হত্যা ও ৮১২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। 
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। বছরব্যাপী ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন যানবাহনে পেট্রল বোমা ছোড়ার কারণে এবং বোমা বানাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে দেশের সাতটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৯৭ জনের মধ্যে ২৫ জন মারা যান। এ বছর বিভিন্ন সময় সহিংসতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন পক্ষের রোষানলে পড়ে তিনজন সাংবাদিক মারা গেছেন। দেশে গুম ও গুপ্তহত্যা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নতুন সংযোজন। ২০১৩ সালে হত্যা, গুম, ক্রসফায়ার নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ৭২ জন। এছাড়া এ বছর ৮১২ জন গণধর্ষণ, সীমান্তে হত্যা ৩৬৫ জন এবং ক্রসফায়ারের নামে হত্যাও করা হয়।
সংবিধান মানুষের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার প্রদান করেছে। স্বাধীনভাবে পেশা বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছে। তেমনি জনগণের অংশগ্রহণে নির্বাচনের অধিকার প্রদান করেছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। মানুষ অন্ন বস্ত্রের পরে এখন শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ গেল বছর সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে মানুষ পরতে পরতে হোঁচট খেয়েছে। কোমলমতি শিশুরা পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে নিরাপদ বোধ করেনি রাজনৈতিক রোষানলের কারণে। খাবারের সন্ধানে কাজের মানুষগুলোকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার ও আসার পথে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আগুনে রক্ত-মাংসের দেহ সিদ্ধ হয়ে পড়েছে রাজপথের কালো পিচের ওপর। যৌথ বাহিনীর অভিযানে সাতক্ষীরা, মেহেরপুরে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর। চিকিৎসা নিতে গ্রাম থেকে শহরে আসতে পারছে না মানুষ। মানবাধিকার যেন ধুকে ধুকে মরছে। আর এ সবকিছু হচ্ছে রাজনৈতিক দুই জোটের ক্ষমতার লিপ্সা আর জেদের কারণে।
গেল বছরের শুরু থেকে মানুষের ওপর হামলা-মামলা, নির্যাতন করা হলেও দেশের মানবাধিকার সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিশ্চুপ ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনের অভাব না হলেও তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো ছিল না। কয়েকটি সংগঠন ছাড়া বাকিগুলোর কোন পাত্তা ছিল না। মানবাধিকার কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা দেখে মনে হয়, গেল বছর দেশে কোন মানুষের অধিকার ক্ষুণœ হয়নি। ১৬ কোটি মানুষ খুব সুখে শান্তিতে ছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কয়েকবার কথা বললেও বর্তমানে তার কোন শব্দ নেই। হয়তো তার দৃষ্টিতে দেশে মানুষের অধিকারের পরিপন্থী কিছুই ঘটছে না! দেশের সাধারণ মানুষ মারা গেলে যা হয় রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা মারা গেলে একই অবস্থা। তারাও কারো না কারো স্বামী, পিতা, ভাই-বোন। এটা যারা বুঝতে পারেন না, তাদের মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়ার দরকারটা কী? নিজেদের আখের গোছানোর জন্য মানবাধিকার সংগঠন না করে মানুষের সেবায় কাজ করার জন্য, তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করুন। কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার জন্য আদালত আছে, আছে দেশের প্রচলিত আইন। সেই আইনে বিচার করুন, বিনা বিচারে মারবেন না। 
ভারত আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশের অনেক কিছুই ভারত নির্ভরশীল, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারতে গরু আনতে যাওয়া অপরাধ কিন্তু বিনা বিচারের মৃত্যুর মতো অপরাধ তারা করেনি। এ বিষয়ে সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। সুরক্ষা দিতে হবে ঘরে ও ঘরের বাইরে মহিলাদের। তাদের লঞ্ছিত হতে দেয়া যাবে না। তারা আমাদের সমাজের অর্ধাঙ্গ।
সাংবাদিকরা আমাদের সমাজের দর্পণের কাজ করেন। অথচ তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতিও শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। এর আগেও এসব ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু একটিরও বিচার হয়নি। সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি রাজনৈতিক শিকার হয়ে কিছুটা শাস্তি পেয়েছেন। কিন্তু বাকিরা অধরা রয়ে গেছে। সরকার ও রাষ্ট্রের উচিৎ এ সব হত্যাকা- ও নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। সাংবাদিকদের নির্যাতনকারীদের যদি বিচার না হয় তাহলে সাধারণ মানুষ বিচার পাবে কীভাবে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যেভাবে ন্যক্কারজনক হামলা হলো তা মিডিয়ার সৌজন্যে দেখেছে সারা বিশ্ব। কিন্তু সরকার এবং পুলিশ বলেছে তারা পাতাকা মিছিল করেছে। এই যদি হয় পতাকা মিছিলের নমুনা তা হলে বলতে হবে পতাকা খামছে ধরেছে পুরোনো শকুন। এই শকুনদের নিপাত করতে হবে। নইলে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না।
গেল বছরে দেশে ৫০৭ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। অথচ রাজনীতি মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু যাদের হত্যা করা হয়েছে, যারা হত্যা করেছে তারা কি মানুষের মধ্যে পড়ে না? যদি পড়ে তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনা সম্ভব? এ জন্য প্রয়োজন দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, মানুষের জন্য সত্যিকারের কাজ করার মানসিকতা।
লেখক : সহকারী পরিচালক (কাব), বাংলাদেশ স্কাউটস
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/01/08/153373.php#sthash.4mo2Qp6R.dpuf

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়