‘মাটির সন্তান’ তছনছ পালপাড়ায় আতঙ্ক
- Get link
- X
- Other Apps
আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া | আপডেট: ০২:১১, জানুয়ারি ২৭, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ
ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে ভাঙা মৃৎসামগ্রীর স্তূপের পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন গৌরচন্দ্র। অকৃত্রিম দরদ দিয়ে গড়া একেকটি মৃৎসামগ্রী তাঁর কাছে সন্তানতুল্য। গৌরচন্দ্র বলেন, ‘এক একডা মাটির জিনিসপাত্তি হামাকেরে কাছে এক একডা সন্তান। এডাই হামাগরক প্যাটত ভাত জোগায়। সেই জিনিসগুলো ভাঙ্গে ফালায় বুকটা ফাটে যাচ্চে।’
গৌরচন্দ্রের মতো কষ্টে আছেন পালপাড়ার অন্তত ৩০টি সংখ্যালঘু কুমার পরিবার। দুর্বৃত্তদের হামলায় এসব পরিবারের সবারই কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে হামলার আশঙ্কায় রাত জেগে তাঁরা মৃৎসামগ্রী পাহারা দিচ্ছেন।
গতকাল রোববার দুপুরে বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে বামুনিয়া পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর সদস্যদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। পালপাড়ার কারিগরেরা জানান, শুক্রবার রাতে গ্রামে ইসলামি জলসার আয়োজন করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও ওয়াজ শুনতে যান। এ সুযোগে পালপাড়ায় হামলা চালিয়ে মৃৎসামগ্রী ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে দুই তরুণকে স্থানীয় লোকজন চিনে ফেলেন। তাঁরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতার ছেলে হওয়ায় পাল সম্প্রদায়ের লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের অভিভাবকদের বিষয়টি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শাহিন মিয়া ও মেহেদী হাসান নামের ওই দুই তরুণ দ্বিতীয় দফায় পালপাড়ায় এসে প্রকাশ্যেই মৃৎসামগ্রী ভাঙচুর করেন।
এ সময় পালপাড়ার লোকজন দুই তরুণকে আটক করার পর শাহিনের বাবা বালুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক আনারুল ইসলাম ও তাঁর ছোট ভাই ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন ঘটনাস্থলে এসে লোক দেখানো ‘শাসন’ করে দুজনকেই কৌশলে নিয়ে যান। মেহেদী বালুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি রফিকুল ইসলামের ছেলে। এ ঘটনায় শাহিন ও মেহেদীসহ আটজনের বিরুদ্ধে পালপাড়ার দুলাল চন্দ্র পাল বাদী হয়ে শনিবার সোনাতলা থানায় মামলা করেন। তবে দুই দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
আনারুল ইসলাম বলেন, ‘ওই রাতে বামুনিয়ায় একটি ইসলামি জলসায় গিয়েছিল শাহীন। পালপাড়ার হামলার ঘটনায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার ছেলের ওপর দোষ চাপানোয় সে ওই রাতেই বিষয়টি প্রমাণ দিতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। এ সময় পালপাড়ার লোকজনের সঙ্গে তার বাগিবতণ্ডা হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।’
জাকির হোসেন দাবি করেন, শাহীন সঙ্গদোষে ছাত্রদলের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ায় মানসম্মান বাঁচাতে তাঁকে পড়ালেখার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। মেহেদীও ছাত্রদলের সমর্থক। তিনি এ-ও বলেন, প্রথম দফা হামলার ঘটনায় দোষারোপ করায় শাহীন ও মেহেদী প্রমাণ চাইতে পালপাড়ায় যান। সেখানে বাগিবতণ্ডার একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তাঁরা মাটির জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় তাঁদের শাসন করে বাড়িত নিয়ে যাওয়া হয়।
গৌরচন্দ্র পালের স্ত্রী আরতি পাল বলেন, ‘মাটির জিনিসপত্র ভাঙার শব্দ শুনে ঘুমত থ্যাকি চেতন পাই। দেকি ওরা বাড়িত আগুন লাগাবার জন্যি ম্যাচের আগুন ধরাচ্চে। যেই না কেরে কেরে করিচি, ওমনি ওরা দৌড় দিচে।’
বামুনিয়া রাধাগোবিন্দ মন্দির কমিটির সভাপতি নিত্যনন্দন পাল বলেন, ঘটনার পর থেকেই পাড়ায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘শাহীন ও মেহেদী ছাত্রদল করেন কি না সেটা জানা নেই। তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে উভয় পক্ষকে ডেকেছি।’
সোনাতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাফ্ফর হোসেন জানান, মামলার পর থেকে শাহীন ও মেহেদী গা ঢাকা দিয়েছেন।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments