বিভিন্ন স্থানে যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে তান্ডব


নওগাঁ জেলা সংবাদদাতা : ‘মেয়েক র‌্যাখা চোলা গেলো। এই পৃথিবীতে বাপের মতো কেউ আর ভালোবাসা দিতে পারবে না। আমার মেয়ের আর কেউ থাকলো না।’ আড়াই বছর বয়সের একমাত্র মেয়ে শিখাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদকে জ্ঞান হারালেন যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত দিনজুর বাবুল হোসেনের স্ত্রী হাসি বেগম (২২)। পাশেই বিলাপ করছিলেন বাবুলের বাবা-মা মান্দা উপজেলার নূরুল¬াবাদ ইউনিয়নের চকদেবীরাম গ্রামের নজের আলী ও তাঁর স্ত্রী পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগি জহুরা বেগম। সেই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি সেখানে উপস্থিত গ্রামবাসীরাও
ঘটনার দিন নওগাঁর মান্দা উপজেলার চকদেবীরাম গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী গৃহবধূ মর্জিনা ও আছমা জানান, গ্রামের আঞ্জুয়ারা বিবি মহাজোট প্রার্থী ইমাজ উদ্দিনের পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য বাবা আইজুল ও স্বামী আব্দুল কাদেরের শত বাধা সত্ত্বেও ঘটনার দিন সকাল পৌনে সাতটার দিকে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে রামনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। এ সময় পথিমধ্যে কে বা কারা ভোট কেন্দ্রে যেতে তাঁকে নিষেধ করে। ওই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের ভোটারদের ভোটদানে বিরত থাকার সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিহিংসাবশত প্রচার করা হয় গ্রামের সবাই জামায়াত-বিএনপি’র সমর্থক। ওই প্রচার-প্রপাগা-া চালিয়ে গ্রামবাসীকে ফাঁসাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্ররোচনায় আঞ্জুয়ারা নিজে রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে শরীরে ধুলো-বালি লাগিয়ে তাকে নির্যাতন চালানো হয়েছে মর্মে যৌথবাহিনীকে দ্রুত সংবাদ দেয়া হয়। যৌথবাহিনীর সদস্যরা ওই গ্রামে পৌঁছে অতর্কিতভাবে এলোপাতাড়ি বুলেট ও রাবার বুলেট বর্ষণ করতে থাকে। এক সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা গ্রামের পাশের শিশু গাড়ী বিলের মধ্যে পেঁয়াজসহ রবিশস্য লাগানোর কাজে নিয়োজিত নিরীহ কৃষকদের দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ১৫ জন। এরা হলো চকদেবীরাম গ্রামের নজের আলীর ছেলে বাবুল হোসেন বাবু ওরফে জঞ্জাল (২৮), শহীদুল ইসলামের ছেলে রাজু (১২), মৃত ফয়েজ উদ্দিন কালার ছেলে শুটক্যা ওরফে ভুট্টো (৩৫), মিজানুর রহমান মিজান (৩০) মৃত আলহাজ দেলবরের ছেলে আব্দুল¬øাহ হেল বাকী শাহ (২৮), রফিকুল ইসলামের ছেলে উজ্জল হোসেন (২৩), এবাদুল হকের ছেলে গোলাম রাব্বানী (২২), ফজলুর ছেলে আব্দুর রাকিব (২১), জমির উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (২১), আব্দুস সামাদের ছেলে বাবুল হোসেন (২২), মৃত ফয়েজ উদ্দিনের মেয়ে অমিচান বিবি (৩৮), রামনগর গ্রামের কফিল উদ্দিন সরকারের ছেলে রহিদুল ইসলাম (২৮) সহ ১৫ জন আহত হন । এদের মধ্যে আশংকাজনক অবস্থায় বাবুল, রাজু, শুটক্যা, বাকী ও মিজানকে রামেক হাসপাতালে নেয়ার সময় পথ্যিমধ্যে চকদেবীরাম গ্রামের নজের আলীর ছেলে বাবুল হোসেন মারা যায়। অপর ৪ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশংকাজনক। 
ঘটনাস্থলে সেদিন উপস্থিত মেহেরজান বলেন, আমি ভাত নিয়ে মাঠে যাচ্ছিলাম। এসময় র‌্যাব ও পুলিশ গ্রামে প্রবেশ করে গুলিবর্ষণ করে। আমি ভয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ি। এসময় এক র‌্যাব সদস্য আমার কাছে চলে আসে। আমার পা তখন তার দু’পায়ের মাঝামাঝি চলে যায়।  
মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল্ল¬¬াহ হেল বাকী সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন বানচাল করতে গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে তীর-ধনুক নিয়ে হামলা চালালে তাদের প্রতিহত করতে যৌথবাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। এখনও পর্যন্ত থানায় কোন মামলা দায়ের হয়নি বলে তিনি জানান । 
গ্রামবাসীরা অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জানান, তিনি তীর-ধনুকের কথা বললেও বাস্তবে নিরীহ গ্রামবাসীর কাছ থেকে কিছুই উদ্ধার করতে না পারায় ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহের অপচেষ্টা করছেন। বর্তমানে ওই গ্রামে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নিহতের পরিবারে ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। 
এদিকে সোমবার বিকেলে নিহত বাবুল হোসেনের লাশ জানাজা শেষে স্থানীয় করবস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান দিন মজুর বাবুলের মৃত্যুতে তাঁর অসুস্থ পিতা-মাতার আহাজারি আর স্ত্রীর বুকফাটা কান্নায় চকদেবীরাম গ্রামের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে। বাবুল হোসেনের জানাজা ওই গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে কয়েক হাজার মানুষ শরিক হন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সাবেক এমপি শামসুল আলম প্রামাণিক, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা আব্দুর রাকিব। তারা নিরীহ ওই কৃষকের হত্যার বিচার দাবি করেন। অপরদিকে মান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মকলেছুর রহমান নিহত বাবুল হোসেনকে বিএনপির কর্মি বলে দাবি করেছেন।
যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে সন্ত্রাসীদের তান্ডব
অভয়নগর(যশোর) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় যশোরের অভয়নগর উপজেলার জামায়াতের আমিরসহ বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর, হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে এ হামলা করে বলে জানা যায়। ঘটনার সময় পুরুষ শূন্য এলাকায় আতংকে মহিলারা দিগি¦দিগ ছোটাছুটি করে। ল--ভ- করে দেয়া হয়েছে বাড়ির প্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র। মঙ্গলবার ভোর রাতে উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ও চাপাতলা গ্রামে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, গতকাল মঙ্গলবার ভোর রাতে যৌথবাহিনী এবং আওয়ামী ক্যাডাররা-১৮ দলের নেতাকর্মীদের বসতবাড়িতে অভিযান চালায়। এ অভিযানের সময় তাদের বাড়িতে না পেয়ে যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে ওই এলাকার কয়েকজন আওয়ামী লীগের নেতার  নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক মুখোশধারী বাড়ির আসবাবপত্র লুটপাট, ভাঙচুর ও তছনছ করে। এসময় উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আজিজ এর বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তারা এখান থেকে ৫টি সিলিং ফ্যান, একটি ল্যাপটপ, একটি ডেক্সটপ, একটি ফ্রিজ, স্বর্ণাংলকারসহ নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া একই সময় ওই গ্রামের ডাঃ সোহরাব হোসেন, আয়ুব আলী, চাপাতলা মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ইউসুফ আলী, বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়া, মিজানুর রহমান, জামায়াত নেতা ও ইউপি সদস্য আবুল কাশেম মোল্যাসহ ১০/১২টি বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এসময় বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম থেকে বিএল কলেজ ছাত্র হাদিউজ্জামান কানন (২১), কৃষক মোহাম্মদ আলী (২৮) কে যৌথবাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় চরম আতংক বিরাজ করছে।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/01/08/153464.php#sthash.AX131YXt.dpuf

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়